somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শৈশব যেন বিক্রি না হয়... (স্যালুট টু "লিটল স্পার্টাকাস")

১২ ই নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চায়ের দোকান সেই ছেলে টা
আমার কাছে আসে,
পৌঁছে দিয়ে কাপটা চায়ের
ফোকলা দাঁতে হাসে।

একট নয় দুটো ছেলে। ওদের ডিউটি হল পুরো বিল্ডিং এর প্রত্যেক টা সেলে চা পৌঁছে দেওয়া। কত আর বয়েস, একজন ১০, একজন ১২। কাপটা টেবিলে রেখে বলে, চা খায়া নেন। আমি বলি, তুই যা আমি খেয়ে নিচ্ছি। রাজী হয়না, আপনের ঘর থেইকা খালি কাপ হারায় আর আমি মাইর খাই।

চায়ের দোকান সেই ছেলেটা
আমার দেখে কাজ
কাপ হারানোর কানমলাটা
সে খেয়েছে আজ।

এই তুই চা খাস? চোখে শয়তানির ঝিলিক খেলে যায় বলে, মাঝে মাঝে লুকায়ে লুকায়ে খাই। তাহলে এই চা টা খেয়ে নে। না স্যর খাব না আপনে খান আরাম পাইবেন, কত কাজ করেন। ইয়ার্কি করি, তাহলে সিগারেট খা। আপনে একটা পাগল। আমার টিফিনের প্যাকেট টা গেঞ্জির ভেতর লুকিয়ে নিয়ে চলে যায়।

চায়ের দোকান সেই ছেলেটার
বয়স নাকি দশ,
চায়ের দোকান সেই ছেলেটা
পেটের ক্ষিদের বশ।

তুই স্কুলে যাস না কেন? যাইতাম তো! বাবা ছাড়ায় দিছে। আমার খালি ক্ষিদা পায় যে। আমরা ৫ ভাইবোন। তোর বাবা কি করে রে? বাবা জন খাটে (দিন মজুরী)। মা কি করে? বাসন মাজে। আমরা গরীব, অল্প খাওয়া রান্না হয় তাই মা এইখানে দিয়ে গেছে। স্কুলে যাবি? না, স্কুলে গেলে বাড়িতে টাকা দিব কি করে!

..........................................................
সারা পৃথিবীজুড়ে শিশু শ্রমিকের সমস্যা প্রবল আকার ধারন করেছে। আফ্রিকার মতো এশিয়ার দেশ গুলোতেও এই সমস্যা রয়েছে। ভারতবর্ষে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৪ কোটি। বাংলাদেশেও রয়েছে এই সমস্যা। প্রতিদিন বিক্রি হয়ে যাচ্ছে নিস্পাপ শৈশব।

শিশু শ্রমিক জন্মের কিছু কারন:

১। শিশুদের দিয়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটিয়ে নিয়েও তার জন্য মূল্য দিতে হয় বড়দের চাইতে কম। এই কারণে মালিক পক্ষ শিশু শ্রমিক পছন্দ করেন।

২। দারিদ্র একটি অন্যতম গুরুত্ব পূর্ণ কারণ। শিশুর জন্য অন্ন সংস্থান না করতে পেরে মা বাবা তাদের কাজে লাগাতে বাধ্য হন। শিশুর আয়ও পরিবারে রসদ যোগাতে সাহায্য করে।

৩। কোন কোন পরিবারে সন্তানের সংখ্যা অধিক হওয়ায় দেখা যায় দুএক জনের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ যোগাতে দুএক জনকে আত্মত্যাগ করতে হয়।

৪। বড়সড় পাচার চক্র এই ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে আছে। এরা নান জায়গা থেকে শিশু পাচার করে "কন্ট্রাক্ট ফার্মিং" এ নিযুক্ত করছে। অনেক মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিও এতে জড়িত।

শিশু শ্রমিকের ক্ষেত্র:

কৃষিকাজ থেকে শুরু করে ভিক্ষা করানো পর্যন্ত সব জায়গাতেই শিশু শ্রমিক রয়েছে। ভারতের গুজরাট, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশে তুলো চাষে প্রচুর শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। সমীক্ষা বলে ১ কোটি ৫০ লক্ষ শিশু গ্রামাঞ্চলে কৃষির সাথে যুক্ত। এছাড়াও রয়েছে নানা রকম কারখানা, ইঁটভাটা, মানুষের বাড়ি, ক্ষুদ্র অসংগঠিত ক্ষেত্র, চায়ের দোকান ইত্যাদি। বাংলাদেশেও নিশ্চই একইরকম, যেমন এখানেও রয়েছে "টোকাই" অন্য নামে।

সরকারের ভূমিকা: ভারতে শিশু শ্রমিক শোষন থেকে শিশুদের মুক্ত করতে সরকার ১৯৮৬ সালে 'শিশু শ্রমিক নিবারন ও নিয়ন্ত্রন' আইন প্রনয়ন করে। এই আইনকে কঠোর ভাবে কার্যকর করতে ২০০৭ সালে শিশু শ্রমিক নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়। ভারতের সাথে সাথে বাংলাদেশেও শিশুদের জন্য স্কুলে 'মিড ডে মিল' চালু করা হয়েছে যাতে অন্তত একবেলা তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া যায়। তবে শক্তিশালী সংগঠিত ক্ষেত্র থাকার ফলে ভারতে এই ব্যবস্থা কার্যকরী হলেও বাংলাদেশে "শিক্ষার বদলে খাদ্য" কর্মসূচি চরম ভাবে ব্যর্থ।

বাংলাদেশে শিশুদের স্কুলে ধরে রাখতে এবং পুষ্টি যোগাতে "পুষ্টি বিস্কুট" প্রকল্প চলেছে ২ টা ২টা করে ৪ টি উপজেলায় । আশাব্যঞ্জক হলেও খরচ , মানরক্ষা এবং লোকাল প্রডাকশন - ইত্যাদি বিষয়গুলো এখনো স্টাডি হচ্ছে।

কর্পোরেট সোসাল রেস্পন্সিবিলিটি নিয়ে বেশ কিছু সংস্থা কাজ করার চেষ্টা করছে । এর ভিতর শিশু শ্রমিকদের কাজ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে স্কুলের খরচ দিয়ে পড়ালেখায় নিয়োজিত রাখার কাজ চলছে ।

এত সত্বেও শিশু শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হয় নি। এর কিছু বাস্তব প্রতি বন্ধকতা রয়েছে। দেখা গেছে শিশু শ্রমিক একেবারে নিষিদ্ধ হলে পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যা খাওয়া জুটত তাও জোটেনা। সরকার চেষ্টা করছেন যাতে শিশু শ্রমিক পুরোপুরি বন্ধ না করে তাদের জন্য কিছু করা যায়। খোলা হয়েছে শিশু শ্রমিকদের জন্য স্কুল। কাজের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অনেক এন জি ও এদের নিয়ে কাজ করছে।

এর বাইরে কি ভূমিকা নেওয়া যেতে পারে: বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি গুলো তাদের উৎপাদিত বিলাসদ্রব্য গুলির দামের সাথে ১ টা বা ২ টাকা যোগ করে সেটা কাজে লাগাতে পারে এই শিশুদের উন্নয়নে। আপনি আপনার বাড়ির কাজের ছেলে বা মেয়েটিকে (যদি থাকে) নিয়ম করে স্কুলে পাঠাতে পারেন যাতে ভবিষ্যতে সে নিজের ভবিষ্যত খুঁজে নিতে পারে। স্থানীয় ক্লাব গুলো এলাকা থেকে ন্যুনতম মাসিক চাঁদা তুলে এদের সাহায্য করতে পারে। এতে আপনারও ভূমিকা রয়েছে। দেখবেন যাতে ব্যবসা না হয়ে যায়। এর বাইরে আপনার আইডিয়া এখানে কমেন্ট আকারে পেশ করতে পারেন।

সবশেষে আপনার সচেতনতা গড়তে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যত, দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম। আসুন প্রতিজ্ঞা করি "শৈশব যেন বিক্রি না হয়"।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৪:৫১
৩৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×