সবুজমেয়ে উড়ে যায় এবং তারপর
----------------------------------------------------------
তখনো হাতপা ঝেড়ে বড় হয়ে উঠিনি। গোড়ালি ছোয়া প্যান্টের স্বপ্নে বিভোর থাকতো উদোম উরু। ঠিক সেই সময়কালে উঠোনগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে যারা বসতেন, তারা তাদের প্রাচীন মনমানসিকতা গুলোকে চলমান সময়ের সাথে মেলাতে পছন্দ করতেননা। আর তাদের ঘরের হাফপ্যান্টেরা বড় হয়ে গেলেই ঝড় নেমে আসতো উঠোনে উঠোনে। সবুজ আর ধুসর রঙের ঝড়। আমাদের একান্নবর্তীর উঠোনেও রোজ সকাল থেকে এইরকম ঝড় শুরু হতো। একরোখা সবুজ ঝামটা দিয়ে বেড়িয়ে যায় কাধে শার্ট ঝুলিয়ে; বুড়ো ধুসর গুষ্টি উদ্ধার করে উঠোনের কেন্দ্রে বসে; উড়না জড়ানো বুকেরা গতরাতের গোপন চিঠি রাখে আরো গোপনে; কেরোসিন গন্ধের পুরোন শাড়ীরা ভয়ে উনুনে আগুন জ্বালায় আর আমার মতো হাফপ্যান্টেরা তখন নিতান্তই কানাফকির। আসলে তখন ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না কে কাকে কোন পথ দেখাচ্ছে? কোন পথটা আমার জন্য সরল? কোন পথে আমরা খুব সাবলিল?
গ্রামে তখন একটা নাটকের দল গড়ে উঠলো। যাদের হাটুতে ছিল পচিশ কি ছাব্বিস পেরুনো বয়সের সবুজ শক্তি। যারা রোজ রাত করে বাড়ী ফিরতো কারো বাড়ীর বিয়ের আলপনা এঁকে, কারো কবরের মাটি খুড়ে অথবা শ্মশানে চিতার পোড়া গন্ধ জামায় মেখে। যাদের কারোকারো বালিশের তলায় চারু মজুমদার পরে থাকতো এবং একটা বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর ছিল তাদের চোখেরা; অবশেষে তারা সেই বিপ্লবটা করেই ফেললো। পাড়ার বুড়োরা ব্যাপারটা ভালো চোখে নেয়নি। তাদের চোখে সবুজেরা তখন হয়ে গেল ভাদাইম্যা।
ভাদাইম্যাদের দলে নাটকের জন্য তখন মেয়ের দরকার হয়ে পরলো। কয়েকজন মেয়েও তারা পেয়ে গেলো গ্রামের উঠোনের ধুসররঙ্গা মুরুব্বীদের বুঝিয়েশুনিয়ে। অন্যবাড়ীর উঠোনের খবর আমি জানতামনা তবে আমাদের উঠোনের মেয়েটি নাট্যদলে যোগ দেবার জন্য যখন ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেয় তখন কেরোসিন গন্ধের মা-চাচীরা কিছুটা হলেও গলে যায়। সেই বরফগলা নদীর বুকে একটা বিপ্লব ভেসে উঠতে দেখেছিলাম। ঘুনে ধরা চৌকাঠ থেকে মেয়েকে তারা বের করে দেন ধুসররঙ্গাদের না জানিয়েই।
আমি আমাদের উঠোনের মেয়েটির রাতে লিখা গোপন চিঠির পিয়ন ছিলাম। এক চিঠিতে এক টাকা। এক দৌড়ে চলে যেতাম মাঠের কাছে ঘেষে থাকা দোকানে; সেই টাকায় আমার পকেট ভরে যেত নারকেলের তক্তিতে। খালে ভিড়ে থাকা অলস নাওয়ের গোলোইতে বসে পা ঝুলিয়ে দিতাম জলের বুকে।হা করে জলের মুখে পরে তক্তির গুড়া,পায়ের বাজনায় জল নাচে তক্তির গুড়া ভাসে; আমি তাদের ভেসে যাওয়া দেখতাম বিকেল ভাসানো রোদে। আমার সেই পথ বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েটির বালিশ সবুজ বুকের সাথে আর মিশেনা আর লিখেনা গোপন চিঠি গোপনে। কিন্তু গোপন ভাবনায় ডানা মেলে সে রোজ হারিয়ে যেত গহীন চুলের রাতে। কিন্তু সবুজ বুকের মেয়ে আর চিঠি লিখলোনা। বরং তার সাথে সাথে আমার যেতে হয় নাট্যদলের ডেরাতে। আমি তখন পিয়ন থেকে মা-চাচীর ঘোষিত পাহারাদার হয়ে উঠলাম।
তখন নাটকের রিহার্সেল পুরোদমে চলছে। আমি সবুজ ভাদাইম্যাদের পাঠ শুনি।
কি এক ভাবের জোয়ার বয়ে যায় চিত্তে
হা করা খালের জলের বুকে তক্তি ভাসার মতন
ঢোলের বাজনায় নীলবিপ্লবের ঢেউ বলে- ব-লে যায়
জাগো-পথিক জাগাও চিত্ত----------
আমার চিত্ত জেগে উঠতে থাকে রোজ। আমার মন বায়না ধরে একটা গোড়ালি ছোয়া প্যান্টের। আমারো বড় হয়ে যেতে ইচ্ছে করে-নাটকের পাঠ মুখস্থ করতে ইচ্ছে করে। সবুজমেয়ের গোপন চিঠির গোপন প্রাপকের মতো মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করে "জাগো-পথিক জাগাও চিত্ত"। আমি রোজ হাত দিয়ে আমার হাফপ্যান্ট টানতাম উরু ঢেকে বড় হতে চাইতাম। মঞ্চনায়ক হতে চাইতাম। আমার উরু আর ঢাকেনা; আমি উরু ঢাকা ভাদাইম্যা হতে পারিনা।
রিহার্সেলের পাশাপাশি সবুজমেয়ের পাশে বসে রোজ গল্প করতো গোপন প্রাপক। কি গল্প? কিসের কথা? কি সাহস একে দিল সবুজ মেয়ের বুকে? গহীন চুলের রাতে ভাবনার ডানায় উড়তে উড়তে একদিন সে আসলেই উড়ে গেল। ধুসর ঝড়ে আমি সবুজ হতে না হতেই নাটকটা বন্ধ হয়ে গেল; পাড়ায় আর নাটক হলোনা।
অ-নে-ক-দিন পরের কথা। আমার আর জোড় করে হাফপ্যান্ট টেনে বড় করতে হয়না। আমার গোড়ালি ছোঁয়া প্যান্ট তখন উঠোনের তারে রোদ চুষে খায়। একদিন হুট করে সেই তারে ঝোলা হাফপ্যান্টের পকেটে দেখি ভেজা গোপন চিঠি। মুছেমুছে যাওয়া লিখায় গোপন প্রাপক কেও আমি চিনি। সেও নাটক ভালবাসে।
এবং
কোন একসন্ধ্যার আড্ডায় আমি সেই প্রাপক কে বলেছিলাম পিয়নকে একটা ফুলপ্যান্ট কিনে দিস।
----------------------------------------------
আল্লাইয়ার
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ৯:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


