পোয়াতি বিলাই
--------------------------------------
মুন্সিবাড়ীর পোলার লুঙ্গীর কোছড় থিকা কল্কি বাইর অইলে হাত দিয়া আমরা আসমানে নাও বাই। এই কল্কি বানাইছে পশ্চিম পাড়ার আমাগো শোভার বাপে আর শেষ রঙের ছাপ্পা বহাইছে শোভায়। আমার বিষম রাগ ধরে। শোভার কাছে কইছিলাম আমার মতন চেহারার একটা ঘোড়া বানাইয়া তগো উডানে বাইন্দা রাখিস। ছ্যামড়ি হুনেনাই; কল্কি বানাইয়া বাজারে ছাইরা দিছে।
"নে! শালারা আমার কান্ধে উইঠ্যা অহন আসমানের চরকি হ"।
আমার কিচ্ছু ভালো লাগেনা। শইল্লের মধ্যে চৈত মাইস্যা ভাপাইন্না গরম, সেই গরমের মইধ্যে মুড়ি ভাজে মুন্সির পো। শালার লুঙ্গীর কোছড়ে আমি খালি শোভারে দেহি।
শোভারে একদিন জিগাইছিলাম, " পুতলা বানাওনা কেন"?
আমারে মুখ ঝামটা দিয়া কয়; "ইস নাগর আইলো পিতলা আলাপ পারতে, মাডির হাড়ি-পাতিলই অহন মাইনশ্যে কিনেনা আবার পুতলা"।
শোভা আমারে এক কোনাও দাম দেয়না; ও যত্তো বড় অইতাছে তত্তো ওর দেমাগ বাড়তাছে। আসলেইতো দাম দিবো কেন? ভাদাইম্যাগো কোন হালায় দাম দিবো। মায়ের খুতির থিকা মাঝে মইদ্যে পয়সা সরাইয়া শোভার কল্কি তে দম লই আমাগো আছে কি? কিচ্ছু নাই। ভাদাইম্যাগো আড্ডায় আমি চুপ মাইরা থাকি; আমি শোভার কথা ভাবি মনে মনে, শোভার কথা বাইর অইয়া যাইতে চায় কিন্তু গলার মইদ্যে আঙ্গুল দিয়া চাপা মাইরা রাখি। শোভার কথা তুলোন যাইবোনা তাইলে ভাদাইম্যারা শোভারে অহন যাত্রার শোভা রানী বানাইবো। মুন্সির পোলায় আমার জিগরি দোস্ত; তয় এই হালায়ও শোভাগো বাড়ির আসেপাশে ঘুরনা খায়। এই বালের জিনিস খাইলে আমার শোভার কথা মনে অয় কেন এতো? কিছু একটা করন লাগবো, যেই কাম হোক পয়সা আহন্দা কথা। দিন দিন বড় অইতাছি ভাদাইম্যা নিচ্চুবা ঢ্যাং অইয়া বাপের হোটেলের চাউল ফুরাইতাছি আর শোভার বরই গাছের বরই ও পাকন ধরছে। আর কত? শোভার তো একদিন বিয়া অইবো পোয়াতি অইবো। আমার আর এই আসর অহন ভালো লাগতাছেনা। আমি ঝারা দিয়া উডি।
মুন্সির পো আমারে কয়; "গুরু অইলো কি? কই যাও? সব্বে তো কইলজা ভইরা বাতাস লইলা অহন একটা গান ধরো"
আমার গান গাইতে মন চায়না। কইলজায় বাতাস গেলেও সেই বাতাস গরম-চৈত মাইস্যা ভাপাইন্না গরম; আমি কইলজায় সুখ পাইনা।
"নারে আইজ গান গামুনা"
-"না গুরু অই ভাওয়াইয়া গানডা ধরো, আমাগো কইলজ্যার মইদ্যেও সুখ নাই আইজ"
এক লগে আরো সবাই আমারে পেজগি মাইরা ধরে- "গান গাও গুরু, গান গাও"।
আমি চিন্তা করি এই হালাগো কইলজ্যায় সুখ নাই কেন? এরাও কি গলায় আঙ্গুল দিয়া চিপা মাইরা রাখছে শোভার কথা? আমি অহন সব হালাগো মুখের মইদ্যে, লুঙ্গির কোছরে শোভারে দেহি। আমার আর কিচ্ছু ভাল্লাগেনা।
"ঠিক আছে আমি একখান গান গাইয়া যামুগা পেজগি মাইরা ধরবিনা কইলাম, তাইলে গুষ্টির পাছায় আইট্টা বাশ দিয়া আসমানে ঠিকা দিয়া রাখুম "
আমি গান ধরি----
""কন্যা আশা দিলু ভরসা দিলু
কলার থোপাক মোক বসায় থুলু
সারারাইত মোক মশায় কামরাইছে
কন্যা বিশ্বাস যদি না হয় তোর
পিরান খুইল্ল্যা দেখেগ মোর
গাওটা ফুলিয়া টুমটুমা হইছে""
কল্কির ঝিমানিতে অহন আসমানের সাঁকো কাঁপতাছে আমার ঠ্যাং যেন পাহাড় বাইয়া উঠতাছে। আমার পশ্চিম পাড়ায় যাইতে মন চায়, শোভার কাছে যাইতে মন চায়। আইজ একটা দফারফা করন লাগবো। আমি শোভাগো ঘাটলার কাছে গিয়া ঝিম মাইরা খারাইয়া থাকি। অগো বাড়ীর পোয়াতি বিলাইডা উডানের দিকে যাইতে যাইতে আমারে এক নজর দেহে। বিলাইডা কি আমার দুঃখ বুজছে? জীব জানোয়ার আমার কষ্ট বুঝে কিন্তু শোভা বুঝেনা কেন? কেন ঝামটা মাইরা গতর ঘুরাইয়া চইল্যা যায়? আমারে মশায় কামরাইতে থাকে শোভা ঘর থিকা বাইর অয়না। আমি ঝিম মাইরা খারাইয়া থাকি। পাকনা বরই গাছে ঢিল না মাইরা আমি শোভার বাপেরে ডাকি
"কাকা ও কাকা"
রাও নাই কোন যাউগ বাইত নাই তাইলে। শোভা বাইর অইয়া আসে।
"বাবায় বাইত নাই; কি কইবা কও"
"ভালো অইছে তোমার কাছেই আইছিলাম; দেখবার মন চাইলো"
-"তয় আমারেই ডাকতা, নাকি ডাকোনের মুরদ নাই"
আমি কোন কথা কইতে পারিনা, এই ছ্যামরি এমন কইরা কথা কয় তাতে আমার কইলজ্যা হুগাইয়া যায়। শালির কোন দরদ নাই মায়া নাই।
"মুরদ যেদিন অইবো ওদিন ডাকলে কি তুমি কাছে আইবা শোভা?"
-"তা তোমাগো কোন কাইলেও অইবোনা আর ডাকবার ও পারবানা; অহন বাইত যাও, বাবায় আইয়া পরবো। আর হুনো! ছাইপাশ না খাইয়া আহন যায়না?"
আমি আর কথা বাড়াইনা, আমি আলগোছে পাও বাড়াই বাড়ি দিকে। একবার পিছন ফিইরা চাইতে মন চায়, শোভা কি অহনো আমারে দেখতাছে? আমার খুব দেখতে মন চায়। কিন্তু ভরসা পাইনা। আমি তারপরও পিছনে তাকাই, দেখি পোয়াতি বিলাইডা তাকাইয়া আছে।
আমার অহন বাড়ি যাইতে ইচ্ছা করতাছেনা। আমি মাঠের মাঝখানে চিৎ হইয়া কালা আসমান দেহি, তারা দেহি। আমার কানে খালি শোভার একখান কথাই টেন্ডেষ্টরের মতন বাজতাছে
"তা তোমাগো কোন কাইলেও অইবোনা আর ডাকবার ও পারবানা"।
আমি ভাবতে থাকি শোভা "তোমার" না কইয়া "তোমাগো" কেন কইলো? শোভা কি রোজ রাইতে একটা মুরদওয়ালা নাগরের খোয়াব দেখবো বইলা ঘুমাইতে যায়? শোভা কি মুরদ ওয়ালা নাগর খুজতাছে? তার মানে শোভা সব ভাদাইম্যার মুখে তাকাইয়া খুজে একখান মুরদওয়ালা নাগর। যার বুকে শোভা একখান ঘর বানাইবো, সেই ঘরে শোভা তার গতর উদাম কইরা নিশ্চিন্তে ঘুমাইবো-সংসার করবো আর পোয়াতি বিলাইডার লাহান গর্ব কইরা হাইট্যা বেরাইবো। আমার মুরদ নাই আসলেই নাই, বুক ফুলাইয়া শোভার বাপেরে কইতে পারুম না আমি শোভারে ভালোবাসি তারে নিয়া ঘর করতে চাই। আমার নিজের উপর ঘিন্না ধরে আবার শোভার জন্য কষ্ট লাগতে থাকে।
একবছরের উপরে হইয়া গেল। পশ্চিম পাড়ায় আমি তার পর থিকা আর যাইনা। কল্কি টানিনা মুন্সির পোলার লগে। ভাদাইম্যা থিকা মুরদ ওয়ালা নাগর হইতে হইতে শোভার বিয়া হইয়া গেছেগা অনেক আগে। যেইদিন বিয়া হইছিল হেইদিন শেষ শোভার ছাপ্পা মারা কল্কি তে টান দিছিলাম আমি আর মুন্সির পোলায়। হেইদিন আসমানে নাও বাইছিলাম, অন্য গান ধরছিলাম, মুন্সির পোলার লুঙ্গির কোছরে আমি শোভারে আর দেহিনাই। আমার অহন মুরদ হইছে বাজারে, অহন বাপের আড়ত দেহাশুনা করি। হেদিন শোভার বাপেরে হালখাতার দাওয়াত দিতে আমি শোভাগো বাড়ি যাই অনেক দিন বাদে। শোভা পোয়াতি হইয়া বাপের বাড়ি আইছে। আমি ঘাটলার কাছে গিয়া খারাই।
শোভার বাপেরে ডাকি
"কাকা ও কাকা"
একটা পোয়াতি বিলাই আইসা আমার সামনে খারায়। আমি তার সাথে ভালোমন্দ কথা কই। আমি চইলা আসি- আসার সময় পিছন ফিইরা চাই। আমার পেছনে ফিইরা চাইতে আর ভয় করেনা। দেখি পোয়াতি বিলাই খারাইয়া রইছে।
------------------------------------
আল্লাইয়ার
ছবি সূত্রঃ গুগল থেকে নেয়া

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

