গতরাতে ঠিক যখন "সেলোফেন" ছাড়ছি, তখনই খবর এলো- বেগুনবাড়ি অঞ্চলে পাঁচতলা ভবন ধসে পড়েছে! তিনজন ফটোগ্রাফারই বাড়ি চলে গেছে। দুজনের ফোন বন্ধ, একজন ছুটে এলো। সাথে পাঠালাম একজন রিপোর্টার। টিনের কম ভাড়ার ঘরগুলোতে বসবাস করা গরিব মানুষগুলোর লাশ দেখে বাছাই করে ছবি ছাপলাম দ্বিতীয় সংস্করণে।
রাত তিনটায় বাড়ি ফিরে আর ঘুম এলো না। বায়োস্কোপের মত চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল মাথায় "আসমান" ভেঙ্গে পড়ার কল্পিত লোমহর্ষক দৃষ্যাবলি। সাভারের "স্পেক্ট্রাম" গার্মেন্ট ভবনেও এমন হয়েছিল! চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম কিছু মানুষ প্রাণপণে চিৎকার করে বলতে চাইছে- তোমরা কে আছো, দেখো আমি এখনো বেঁচে আছি! কিন্তু ফায়ার ব্রিগেড আর অন্যান্য কর্মীরা হট্টগোলে শুনতেই পারছেনা! তারা হয়ত "লাশ উদ্ধার" করে ফিরে এসেছে! হয়ত তখনো ধড়ে নিবু নিবু প্রাণ নিয়ে কেউ কাতর মিনতি জানাচ্ছে-আমি মরিনি! আমাকে বাঁচাও!!
মাত্র চব্বিশ ঘন্টা পর, আবারো যখন সেলোফেন ছাড়ব, তখনই খবর এলো নীমতলির পেছনে আগামসি লেনে ভয়াবহ আগুন লেগেছে! রিপোর্টার পাঠাতে পাঠাতেই মৃতের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলেছে.....। মৃতেরা আমাদের টাইপ করার সময় মেপে চলেনা! চড়চড় করে চামড়া আর তার নিচের চর্বি পোড়ার মরণযন্ত্রনা তাদের মুহূর্তে মরার আগেই পরপারে নিয়ে যায়। রিপোর্টার যখন কল দিল, ততক্ষণে লাশের ফিগার-৪৫! অনেক ভেবে চিন্তে করা হেডিং তুলে আবার নতুন করে বসাতে হলো। মেইলে আসা ছবিগুলো যখন ডাউনলোড করলাম তখন আর আঙুল চলছেনা! কী লিখব? একেকটা বাচ্চার পোড়া ঝলসানো ছবি থেকে চোখ সরাতে পারছিনা।
আবারো সেই অপার্থীব অনুভূতি! আমরা যেন মাংসের হাড়িতে কাঠ কয়লার জ্বাল দিচ্ছি, আর মাংস কষানো হচ্ছে। এবং আমরা কাঠ কয়লার বদলে আস্ত মানুষই চূলোয় ঠেলে দিয়েছি। আমি পারছিনা। একটা শব্দও এডিট করতে পারছিনা। ঘাড়ের পেছনে সম্পাদক দাঁড়ানো। তবুও কী-বোর্ডে আঙ্গুল থমকে যাচ্ছে। কী ভয়াবহ এই শহরে, এই দেশে কম আয়ের এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকা, টিকে থাকা! কিসে মরে না? কত মরে না? শত শত? না। হাজার হাজার।
এটা সেই দেশ, যেখানে পঁচিশ বছর ধরে লেখা থাকে-"ক্ষতিতগ্রস্থ ব্রীজ সাবধানে চলুন" তারপর কোন এক অলুক্ষুণে দিনে ব্রীজ ভেঙ্গে জনা বিশেক মানুষ মরলে সেই ব্রীজ মেরামত হয়।
এটা সেই দেশ, যেখানে লঞ্চ ডুবে ৪ শ' মানুষ মরার পর নৌপরিবহন মন্ত্রী দুদিন পর জনপ্রতি একটি করে ছাগল বরাদ্দ করেন!
এটা সেই দেশ, যেখানে প্রতি বছর অন্তত পাঁচ বার বস্তিতে আগুন দিয়ে জায়গা দখলের কারণে জনা দশেক অবুঝ শিশুসমেত মানুষকে "রোস্ট" হতে হয়!
এটা সেই দেশ, যেখানে অল্প আয়ের "বেজন্মা" মানুষগুলোর জন্য রাষ্ট্র-সরকার-সুশীল কারোরই কোন দায় ভার নেই।
এই অদ্ভুত মরণফাঁদের মত বিকলাঙ্গ এক শহরে আমি অনাহূত এক নাবিকের মত বলে চলি- এই মৃত্যু উপত্যকা আমারই দেশ, তাই আমারই অধিকার আছে এই দেশ-জাতি-শিক্ষিত মানুষদের অভিসম্পাৎ করার।
আমি এই নগরের সকল কুশি-লব, সকল সুশীল, সকল ক্ষমতাবান অপরিনামদর্শী মানুষকে, সকল অনিয়মের হোতা ক্ষমতাবলয়ের এলিটদের, সকল ভাগ্য বিধাতাদের অভিসম্পাৎ দেই। কারণ কিছুতেই আমি এই সব অতিপ্রাকৃত অধিজাগতিক দৃশ্যাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে টিভি উপস্থাপিকার মুখে লটকে থাকা নির্বিকার হাসিতে উদ্ভাসিত হতে শিখিনি।
যারা চলে গেছেন তাদের এতে কিছুই হবেনা। তবুও আসুন, আমরা কিছুক্ষণের জন্য তাদের প্রতি নতমস্তক হয়ে দাঁড়াই।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


