somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গে মার্কসীয় ব্যাখ্যা এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতি


“মৃত্যুপ্রান্তরে জীবনের নিস্ফল দাপাদাপি এবং জীবিতদের বেঁচে থাকার উদগ্র বাসনা!” নামে আমার একটি পোস্টে দেশের চলমান রাজনীতি, এলিট ফোর্স র‌্যাবকে দিয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের বেছে বেছে হত্যা করা, তথাকথিত বাম নামধারী দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তা তুলে ধরা হয়েছিল। ওই পোস্টে অনেকেই মনতব্য আকারে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছিলেন। তার ভেতর থেকে দুটি মন্তব্য নিয়ে বিশদে আলোচনা করাই এই পোস্টের উদ্দেশ্য।

শাহেরীন আরাফাত প্রশ্ন তুলেছিলেন; “ দ্বান্দিকতার প্রকৃত অর্থ আমাদের দেশের নামধারী কমিউনিস্ট/সোস্যালিস্ট নেতাদের ক'জন বোঝে, তা নিয়ে আমি সন্দিহান... আর এদের আসল লক্ষ্য সম্পর্কে এরা নিজেরাও কনফিউজড... দলগুলোতে কেন্দ্রীকতা বলতে বোঝায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকতা, কারণ নিজেরা দিকভ্রান্ত হওয়ায় তারা ভাল করেই জানেন যে, যদি আজ ক্ষমতা কুক্ষিগত না হয়, তবে কাল এই কেন্দ্রেও তিনি থাকবেন না... হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা এসব দল নিয়ে কেন কথা বলব? বলব এই কারণে যে, দলগুলো আমাদের মোটা দাগে কিছু ভাঙ্গা টেপ চালিয়ে বছরের পর বছর মশকরা করে যাচ্ছে; অথচ কানসাট, আড়িয়াল বিল, ফুলবাড়ী, রূপগঞ্জের মতো কোথাও একটা বিদ্রোহেও নেতৃত্ব দিতে পারেনি। তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আমি সন্দিহান!”

এখানে দেখা যাচ্ছে শাহেরীন বর্তমানে সক্রিয় বাম দলগুলোর দিকভ্রান্ত হওয়া, নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া এবং নেতাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখাকে সম সাময়ীক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ত হতে না পারার ব্যর্থতা বলে মনে করছেন।

শাহেরীন এর তুলে ধরা এই দিকটি নিয়ে চমৎকার পয়েন্ট তুলে ধরেছেন সুজয় সাম্য। তিনি বলেছেন; “ বামপন্থিদের নিয়ে খুব কমন এবং পুরোন একটা অভিযোগ হচ্ছে এরা মানুষের কাছে পৌছাতে পারে না। এর কারণ হিসেবে আপনি দেখাচ্ছেন আসলেই বামপন্থা নিয়ে বাম দলগুলোর নেতাগুলর স্বচ্ছ ধারণা আছে কী না? কিন্তু আপনি পুঁজিবাদী সংস্কৃতির শক্তিটাকে একবারও বুঝতে চাইলেন না। এই সমাজে তো মানুষ জন্মের পর পরই পুঁজিবাদী সংস্কৃতি আয়ত্ব করে ফেলে। সবাইকে শিক্ষা দেয়া হয় ক্যারিয়ার গড়তে,নিজ নিজ ভালো বুঝতে। সেখানে তো শিক্ষাই দেয়া হয় সমাজ সম্পর্কে আগ্রহী না হয়ে ,ব্যাক্তিগত উন্নতির দিকে ধাবিত হতে। এই মানুষগুলোকে ফুলবাড়ী ,কানসাট বোঝানো কী এতো সহজ,সর্বহারার সংস্কৃতি বোঝানো এতো সহজ? মিডিয়া পুঁজিবাদী,শিক্ষা পুঁজিবাদী আর দোষ ঐ বামপন্থিদেরই?”

সুজয় সাম্যর বক্তব্যে উঠে এসেছে বামপন্থা নয়, পুঁজিবাদী মিডিয়া, পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ঘটনা পরম্পরা ধরতে না পারায় বামপন্থীদের উপর দোষ চাপানো হয়। আসলে তাদের ওপর দোষ চাপানোর আগে স্যোসিও ইকোনমিক স্ট্রাকচার বা আর্থ সামাজিক কাঠামো বিবেচনায় আনতে হবে।

ওই পোস্টের আলোচনায় বলেছিলাম নেতৃত্বের কেন্দ্রীকতাকে মার্কসবাদী বিশ্লেষণে বিশেষত বস্তুবাদী দ্বান্দ্বিকতায় বিচার করতে হবে। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি দিয়ে বিচার করতে ব্যর্থ হওয়ায় এদেশের মার্কসবাদী দলগুলোকে ঠিক এই ধরণের প্রশ্নের সন্মুখিন হতে হচ্ছে, যে প্রশ্ন উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে বিচার করার আগে দেখে নিতে হবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কি? এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদই বা কি?

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টির দৃষ্টিভঙ্গী হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এই বস্তুবাদকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বলা হচ্ছে, কারণ বস্তুজগতের ঘটনাপ্রবাহের প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গী ও সেগুলোকে বিশ্লেষন ও ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি হলো দ্বান্দ্বিক, আর ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা হলো সে সম্পর্কে এর ধারণা ও তত্ত্ব হলো বস্তুবাদী। এবং সমাজজীবনের অনুশীলনে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নীতিগুলোর প্রয়োগকে বলা হয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ; সমাজজীবনের ধারা, সমাজ ও তার ইতিহাসের অনুশীলনে দ্বান্দ্বিক নীতিগুলোর প্রয়োগ হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। মার্কসের মতে ‘মানস’ মানুষের মন কর্তৃক প্রতিফলিত এবং বিভিন্ন মনন প্রকরণে রূপান্তরিত বস্তুজগত ছাড়া আর কিছুই নয় (কার্ল মার্কস, ক্যাপিটাল, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০, জর্জ অ্যালেন ও অ্যন উইন লিমিটেড, ১৯৩৮)। মার্কসীয় বস্তুবাদকে আমরা ডায়ালেকটিক্স ম্যাটারিলিজিয়ম কেন বলি? ডায়ালেকটিস বা দ্বন্দ্বতত্ত্ব কথাটি এসেছে গ্রীক শব্দ ডায়ালেগো থেকে। এর অর্থ হলো আলোচনা করা, তর্ক করা। চিন্তার স্ববিরোধগুলি প্রকাশ করা এবং পরস্পর বিরোধী মতের সংঘাত হলো সত্যে পোঁছানোর শ্রেষ্ঠতম পদ্ধতি।
মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে, বস্তুজগত পরস্পর সংযুক্ত এবং সমগ্রভাবে সুসংহত, যার মধ্যে বস্তুসমষ্টি ও ঘটনাপুঞ্জ পরস্পরের সঙ্গে প্রকৃতিগতভাবে সংযুক্ত, তারা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল এবং পরস্পরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কাজেই কোন ঘটনাকে পারিপার্শ্বিক ঘটনাপুঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে সেটি আর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে দেখা হবে না। কিভাবে এই ঘটনা প্রবাহ দেখতে হবে সে প্রসঙ্গে মার্কস-এঙ্গেলস আরো বিশদে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা এই পরিসরে স্থান সংকুলান হবে না। তাই সংক্ষিপ্তসার আলোচনা করছিঃ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বলে যে, নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তরে বিকাশের প্রক্রিয়া ঘটনার সুসামঞ্জস্য প্রকাশ হিসেবে ঘটে না, তা ঘটে বস্তু ও ঘটনার অন্তর্নিহিত বিরোধের অভিপ্রকাশ হিসেবে, এই সব বিরোধের ভিত্তিতে বিরুদ্ধ ধারাগুলির একটি ‘সংঘাত’ হিসেবে। এ বিষয়ে লেনিন বলেছেনঃ ‘প্রকৃত প্রস্তাবে দ্বন্দ্বতত্ত্ব হলো বস্তুর একেবারে মর্মে অবস্থিত অন্তর্নিহিত বিরোধের অধ্যয়ন।’ (লেনিন, ফিলোসফিক্যাল নোট বুক, রুশ সংস্করণ, পাতা ২৬৩) লেনিন আরো বলেছেন-‘বিপরীতের সংঘাতই হলো বিকাশ’।

অতএব কর্মপন্থায় ভুল এড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই সর্বহারা শ্রেণী-কর্মপন্থা অনুসরণ করতে হবে। সর্বহারা এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থের সামঞ্জস্য আছে এই রকম সংস্কারবাদী কর্মপন্থা অনুসরণ করা চলবে না যে ‘পুঁজিবাদ আপনা-আপনি সমাজবাদে রূপান্তর হয়ে যাবে’! এটা আপোষপন্থীদের পথ। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আরো বিস্তারিত আলোচনায় গেলে আমাদের মূল বিষয় থেকে সরে যাব, তাই এখানেই থামতে হচ্ছে।

এবার শাহেরীনের প্রশ্নে আসা যাক। আমাদের নেতারা যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা করেন এবং সেই চেষ্টার আলটিমেট রেজাল্ট আরো একটি নতুন দল গজিয়ে ওঠা কিংবা নতুন একটা ফ্র্যাকশন তৈরি হওয়া, তা কিন্তু এই ‘বিপরীতের সংঘাত’ না বোঝার ফলে সৃষ্ট। দলে হোক বা রাষ্ট্রে হোক প্রতিটি ঘটনা যে বস্তুজগতে পরস্পর সংযুক্ত এবং সমগ্রভাবে সুসংহত, যার মধ্যে বস্তুসমষ্টি ও ঘটনাপুঞ্জ পরস্পরের সঙ্গে প্রকৃতিগতভাবে সংযুক্ত, তারা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল এবং পরস্পরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এবং কোন ঘটনাই যে পারিপার্শ্বিক ঘটনাপুঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন নয় সেটি তারা বুঝতে সক্ষম হন না। এবং সে কারণে দলের ভেতর ভিন্নমত আসলে মনে করে বসেন ‘উপদলীয় কোন্দল’। তেমনি সমাজজীবনে এটা বুঝতে না পেরে ভাবেন পরিস্থিতি বিকোশিত হয়নি, কিংবা রাষ্ট্রের বিরোধীতা করার মত সময় আসেনি, বা রাষ্ট্রের বিপক্ষে যাওয়ার মত ক্ষমতা তারা অর্জন করেননি! তাই দলের ভিন্নমতের মীমাংশার ক্ষেত্রে দুই লাইনের সংগ্রাম বা দুটি ভিন্নমতের সংগ্রাম হিসেবে দেখতে পারেন না।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল কেন্দ্রীকতা। এই কেন্দ্রীকতা অর্থ কিন্তু এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করা নয়। বিরাজমান দ্বন্দ্বের দুটি দিকের প্রধান দিককে কেন্দ্র করা। যদি দলের ভেতর দ্বন্দ্ব থাকে যে, ‘দেশে এখন বিপ্লব অবস্থা বিরাজ করছে’ এবং ‘দেশে এখন বিপ্লব অবস্থা বিরাজ করছে না’। তাহলে এই দ্বন্দ্বের কোনটিকে কেন্দ্র করতে হবে? আমরা মার্কসের সূত্র মতে পাই ‘পুঁজিবাদ আপনা-আপনি সমাজবাদে রূপান্তর হয়ে যাবে! এটা আপোষপন্থীদের পথ’। এই সূত্রই বলে দিচ্ছে দ্বন্দ্বের কোনটি প্রধান দিক। কিন্তু আমাদের দেশের পার্টিগুলোর (যারা নিজেদের মার্কবাদী-লেনিনবাদী পার্টি বলে দাবী করেন) নেতৃত্বের সমস্যা হচ্ছে একটি মার্কবাদী পার্টি যে আদর্শে, যে লক্ষ্যে, যে পদ্ধতিতে গড়ে তোলার কথা তা করতে তারা ব্যর্থ হন। এবং সে কারণেই বিরাজমান দ্বন্দ্বগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চান। যে পক্ষ এটি চায় না, তারা নিজেদের মতামতের মূল্য দেয়া হলো না, তাদের মতামত জয়ী হলো না ভেবে অবশেষে বেরিয়ে আরো একটি নতুন পার্টি গড়েন। এই ধারা চলে আসছে বছরের পর বছর। কখনো কখনো এই সব ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা দলগুলো নিজেদের ভেতরকার সমস্যা জিইয়ে রেখে একটা নামকা ওয়াস্তে ঐক্যের সুর তুলে ঐক্যবদ্ধ হনও। আবার কিছুদিন পর সেই আগের মতই ভাঙ্গন এসে পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে।

কেন্দ্রীকতার আর একটি দিক হচ্ছে, কোন দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেবলই কমিউনিস্ট পার্টিই করবে এমন নয়। এই বিপ্লবে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটরাও থাকতে পারে। থাকতে পারে বুর্জোয়া ধারার কিছু দল যারা নিজেদের সাম্রাজ্যবাদের নিগড় থেকে মুক্ত মনে করে। ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় এমন শত শত পার্টি ছিল। কিন্তু বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিল বলশেভিক আর মেনশেভিকরা। পরবর্তীতে অক্টোবর মাসের ১৭ তারিখে বলশেভিকরা পুরোপুরি ক্ষমতা দখল করে। চীনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগী হিসেবে প্রায় আশিটির মত দল ছিল। তাদের অন্যতম ছিল সানইয়াৎ সেন এর গণতান্তিক দল। জাপ বিরোধী যুদ্ধের সময় এই জাতীয়তাবাদী দলটি কাধে কাধ মিলিয়ে জাপানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল কমিউনিস্ট পার্টি তথা মাও এর নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। এই কেন্দ্রীকতা জাতীয় বুর্জোয়া বা জাতীয়তাবাদী দলগুলো মানতে বাধ্য ছিল, কারণ তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে যোগ্যতম দল হিসেবেই দেখেছিল। তখন সমগ্র চীনকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ছিল।

আমাদের দেশের বামপন্থী দলগুলো বা মার্কসবাদী দলগুলো, কিংবা কমিউনিস্ট নামধারী দলগুলো আদৌ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে চান কি-না, তা করতে তারা কতটুকু প্রস্তুত, তারা কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে দল পরিচালনা করছে, তাদের মতে বাংলাদেশের সমাজজীবনের ঐতিহাসিক বা বস্তবাদী দ্বন্দ্বগুলোকে তারা কিভাবে দেখছেন এবং কিভাবে সেই দ্বন্দ্বের বিকাশ ঘটাবেন বা ঘটনাবলির ব্যাখ্যা তারা কিভাবে দাঁড় করিয়ে তার মীমাংসা করবেন সেই সব প্রসঙ্গ অনেক বেশি বিস্তৃত আলোচনার দাবী রাখে । তার পরও এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলো আনার চেষ্টা করছিঃ

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণে নানা মুনির নানা মত আছে। প্রত্যেকটি দলের ‘সয়ংসম্পূর্ণ’ থিসিস আছে। রণকৌশল-রণনীতি আছে। আছে দল পরিচালনার গঠনতন্ত্র বা ম্যানিফেস্টো। তারা সেই মত দল পরিচালনা করে চারটি ধারার কাজ করতে পেরেছেন। অন্তত তাদের সাম্যক পরিস্থিতি বিবেচনায় তা-ই দেখা যায়। এ নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে।

১. বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থান পুঁজিবাদী, শাসক শ্রেণী পুঁজিবাদের প্রতিভূ, সমাজের অগ্রসরমান শ্রেণী মধ্যবিত্ত, শিল্পীয় শ্রমিকরা বিপ্লবের অগ্রগামী অংশ, মধ্যবিত্ত শ্রেণী সেই বিপ্লবের সহায়ক। ছাত্র-কৃষক-বুদ্ধিজীবীরা বিপ্লবের অনুগামী। বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক। বিপ্লবের পদ্ধতি গণঅভ্যুত্থান। এই দলগুলির অবস্থান এত বেশি দুর্বল যে এরা সমাজ রাজনীতিতে কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।

২. বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থান পুঁজিবাদী, শাসক শ্রেণী পুঁজিবাদের প্রতিভূ, সমাজের অগ্রসরমান শ্রেণী মধ্যবিত্ত, শিল্পীয় শ্রমিকরা এবং কৃষকরা বিপ্লবের অগ্রগামী অংশ, মধ্যবিত্ত শ্রেণী সেই বিপ্লবের সহায়ক। ছাত্র-কৃষক-বুদ্ধিজীবীরা বিপ্লবের অনুগামী। বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক। বিপ্লবের পদ্ধতি গণঅভ্যুত্থান। তবে বর্তমান অবস্থায় জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে ইস্যুভিত্তিক ঐক্য করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পদ্ধতি অধিকতর কার্যকর। এই মতের দলগুলি নিজেদের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার লিখিত নীতি আদর্শ আঁকড়ে ধরার বদলে বুর্জোয়া দলগুলোকে ‘জাতীয় বুর্জোয়া’ ভেবে নিয়ে দুই প্রধান বুর্জোয়া দলের সাথে গাঁটছড়া বেধে ক্ষমতার শেয়ার পাওয়ায় ব্যস্ত। এদের এক গ্রুপ আওয়ামী লীগের সাথে, অন্য গ্রুপ বিএনপির সাথে নির্বাচনি আতাত করে ক্ষমতার শেয়ার পেয়ে কার্যত বিপ্লবকে ড্রইংরুমে তালাবন্ধ করে দিয়েছে।

৩. বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থান ঔপনিবেশিক। শাসকশ্রেণী ঔপনিবেশিক দালাল। সাম্রাজ্যবাদ এবং তার অঞ্চলিক এজেন্টই প্রধান শত্রু। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে পরাভূত করেই বিপ্লব সম্পন্ন হবে। বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এরা অগ্রসর হলেও কার্যক্ষেত্রে সমাজের মধ্যবিত্ত বিলাসী অংশ ছাড়া ব্যাপক সাধারণ মানুষের ভেতর এদের কোনোও ভূমিকা নেই। থিসিস, অ্যন্টি থিসিস, দই লাইনের সংগ্রাম, বিশ্ব রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ, গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ভূমিকা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, নিও মর্ডানাইজেশন, মার্কসবাদের তাত্ত্বিক অনুশীলন ইত্যাদি নিয়ে এই ধরণের দলগুলি তাদের কর্মকাণ্ডকে শহরকেন্দ্রীক করে রেখেছে। কারো কারো গ্রামাঞ্চলে কিছু কাজের ক্ষেত্র থাকলেও তা নগণ্য।

৪. বাংলাদেশের আর্থসামজিক অবস্থান আধা সামন্তবাদী-আধা উপনিশেবাদী। পুঁজিবাদের বিকাশ হয়নি। পুঁজিবাদ এখানে প্রধান ডোমিনেটিং ফ্যাক্টর নয়। শাসকশ্রেণী সামন্তবাদী ভাবধারায় দেশ পরিচালনা করে। শিল্পীয় শ্রমিকরা সমাজতান্তিক বিপ্লবের প্রধান শুক্ত হলেও এখানে শিল্পীয় শ্রমিকের বদলে কৃষকরা প্রধান শক্তি। বিপ্লবের স্তর নয়া গণতান্ত্রিক। বিপ্লবের পদ্ধতি বলপূর্বক ক্ষমতা দখল। শ্রেণী সংগঠনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে গণসংগঠনকে পুরোপুরি অস্বীকার করায় শহরাঞ্চলে এদের কোনো ভূমিকা নেই। গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রুপে ভাগ হয়ে এরা কাজ করে। লেনিনের ‘বিপরীতের সংঘাতই হলো বিকাশ’ তত্ত্বকে এরা যান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করে একের পর এক দল ভেঙ্গে নতুন নতুন দল গড়ে। এদের সংগঠন পরিচালনার পদ্ধতি গোপনীয় ভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দল পরিচালনা। গত ৭ বছরে র‌্যাব এর হাতে একের পর এক এদের নেতা নিহত হওয়ার পর এই ধরণের দলগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলিন।

এই সব দলের বা গ্রুপের শত শত রাজনৈতিক থিসিস, কর্মকৌশল, কর্মপদ্ধতি, বর্তমান অবস্থান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষপট বিশ্লেষণ, সাম্রাজ্যবাদী রণকৌশল, নয়া বাজার অর্থনীতির বিশ্লেষণ, করপোরেট আগ্রাসনের প্রেক্ষাপট অনুধাবন, সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, তাদের আঞ্চলিক এজেন্ট, সেই এজেন্টের স্বার্থসংশ্লিষ্ঠতা, গ্লোবাল পলিটিক্স, গ্লোবাল ইকোনমিকস, পুঁজির বিকাশ, পুঁজির লগ্নি, লগ্নিপুঁজির পুনঃলগ্নিকরণ, জাতীয় বুর্জোয়াদের বিকাশ, জাতীয় বুর্জোয়া চরিত্র বিশ্লেষণ, শাসকশ্রেণীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট, সাম্রাজ্যবাদের কাছে তাদের অসহায় আত্মসমর্পণ, শাসকদের ক্ষমতার পালা বদলের পদ্ধতি, তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল, অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা, শিল্পের ভূমিকা, শ্রমিক শ্রেণীর সংঙ্ঘবদ্ধতা, শিল্পীয় শ্রমিক শ্রেণীর চারিত্রিক বৈশিষ্টহীনতা, উৎপাদন পদ্ধতি, উৎপাদন সম্পর্কের শ্রেণী বিভাজন, উৎপাদন সম্পর্কের সাথে সামাজিক অপরাপর শ্রেণীসমূহের বৈপরিত্য, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দোদুল্যমানতা, তরুণ সমাজের রাজনীতি বিমূখতা, পেটি বুর্জোয়া কর্তৃক সামাজিক ক্ষেত্রগুলোর দখল, মিডিয়ার দালালী, বিকৃত পুঁজি কর্তৃক মিডিয়া এবং সমাজের অগ্রসর অংশকে দখল করা, রাষ্ট্রের ভৌগলিক অবস্থান, রাষ্ট্রের প্রতিবেশীদের শক্তিমত্তা, তাদের সরকার পদ্ধতি, শ্রেণী হিসেবে শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুরদের রাজনৈতিক বিকাশসহ শত শত দিক বিবেচনা করে একথা বলা যায় যে বাংলাদেশের বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক নয়, নয়া গণতান্ত্রিক বা জাতীয় গণতান্ত্রিক। এই স্তরের বিপ্লবে বুর্জোয়া দলগুলোও সম্পৃক্ত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার মত শিল্পীয় শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ত্বে বিপ্লবের সুযোগ নেই। কেননা সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণী হিসেবে বাংলাদেশের শ্রমিকরা গড়ে ওঠেনি। এরা শিল্প কারখানায় কাজ করে ঠিকই, কিন্তু সারা বছর কাজ করে টাকা জমিয়ে একখণ্ড জমির মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এবং কোন এক সময় তারা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেও। এবং সাথে সাথে সেই শ্রমিক একজন ক্ষুদে মালিক হয়ে যায়। সুতরাং তার চরিত্রে সর্বহারা শ্রমিকের বৈশিষ্ট নাই।

এমন ক্রিটিক্যাল বৈশিষ্ট আর জটিল সমীকরণে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করে বাম দলগুলোর অধিকাংশ নেতা-কর্মী হতাশ এবং ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে এখান থেকে ‘মুক্তির’ উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন বৃহৎ বুর্জোয়া দলের ছত্রছায়ায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দালালী কৌশল। এবং চারিত্রক বৈশিষ্ট অনুযায়ী আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত এই তিনটি ফ্যাকশনের প্রত্যেকটিতে এরা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। এই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরে থাকার আরাম বিসর্জন দিয়ে এরা কষ্মিনকালেও বিপ্লবের কথা চিন্তা করবেন না। করতে পারেন না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29380067 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29380067 2011-05-13 00:05:53
সারা বিশ্বের কত কি বদলে গেল! বদলালো না শ্রমিকের হাতের সেই সনাতনী কাস্তে-হাতুড়ি আর জন্ম জন্মান্তরের শ্রম শোষণ!


বছর ঘুরে আবারো খেটে খাওয়া মানুষের স্বপ্ন সার্থকতার দিন মহান মে দিবস এসেছে। তবে আর দশ-পাঁচটা দিবসের মত আপামর বাঙালির জীবনে এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। থাকার কথাও নয়। এখানে মে দিবস আসে নেহায়েত ৩০ এপ্রিলের পরের দিন ১লা মে, সেই হিসেবে। ওই দিন সরকারি ছুটি থাকে বলে মধ্যবিত্ত বাঙালিরা বউ বাচ্চা নিয়ে একটু ঘুরতে টুরতে বেরোয়। পয়লা বৈশাখের মত পান্তা ইলিশের জবজবানি নেই। ভ্যালেন্টাইন দিবসের মত রংচঙা কাপড় চোপড় পরে একে অপরকে খামোখা ভালোবাসার ছেনালি দেখাবার সুযোগও নেই।

আর বছরের মত এবারও এই দিনটিতে সরকার প্রধান, মন্ত্রীবর্গ, রাষ্ট্র প্রধান, প্রধান বিরোধী দল, ছাও পোনা বিরোধী বা সহমতের দলগুলো বাণী দেবে। খুব সকালে পরিবহন শ্রমিকরা মাথায় লাল পট্টি বেঁধে বিনা ভাড়ার বাসে-ট্রাকে মিছিল করে হৈহুল্লোড় করবে। নেতা-নেত্রীরা এখানে ওখানে ভাষন টাষন দেবেন। মিডিয়ায় দিন ভর আরোপিত শ্রমিক দরদি কাসুন্দি বেটে দর্শককে খাওয়ানো হবে। রাতে তাবড় তাবড় সব বিদ্ব্যৎজনেরা স্টুপিড বাক্সো গরম করে ফেলবেন। বেসুরো হেঁড়ে গলায় এক স্বখ্যাত বিপ্লবী ‘জন হেনরী’ গান গেয়ে বাবরি চুল ঝাঁকিয়ে মাতম করবেন। পত্রিকাঅলারা প্রথম পাতার কোণায় এক ইট ভাঙ্গা শ্রমিকের বা নারী শ্রমিকের ছবি ছেপে ক্যাপশন লিখবে.....‘আজ ঐতিহাসিক মে দিবস’! ‘আজও কি শ্রমিকের মুক্তি এসেছে?’ এবং রাত ফুরোলেই ওই মহান মে দিবসের যবনিকা টেনে দেয়া হবে।

কিন্তু, যে শিশু শ্রমিকটি বাসা বাড়িতে অগুনতি ঘণ্টা ধরে গাধার খাটনি খেটে চলেছে, খুব ভোরে উঠে যার দিন শুরু, আবার রাতে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে যার ঘুমোনোর সময়, তার জন্য কোন আট ঘণ্টার মহান মে দিবস নেই। সে জানেও না আট ঘণ্টা মানে কত ঘণ্টা? ট্যানারির নাড়িভুড়ি বেরিয়ে যাওয়া গন্ধময় পরিবেশে যে শ্রমিকরা কাজ করছে, তাদের সাথে যে শিশু শ্রমিকরা নোংরা ময়লা ঘেটে জীবনের সুকুমার শৈশবকে মাটি চাপা দিচ্ছে, বয়লারের পাশে গনগনে আগুনের পাশে দাঁড়ানো যে শ্রমিকটির মুখ সারাক্ষণই লাল হয়ে জ্বলছে, শহরের বাইরে মায়ের সাথে ইট ভাঙ্গছে যে কচি শিশুটি তার কাছেও মে দিবস কোন গুরুত্ব বহন করে না। সে জানে তার হাতে ধরা হাতুড়ি একটু বেসামাল হলেই আর এক হাতে পড়বে! চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে।
সায়েবদের বাজার বয়ে বয়ে বাড়ি পৌছে দেয়া শত শত কচি ছেলে মেয়েগুলো সেই কাক ডাকা ভোরে উঠে বাজারে আসে। ওখানেই খায়, ওখানেই ঘুমায়। ডাইং ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে তাদের কারো হাতে গ্লাভস নেই। কস্টিক সোডা, ব্লঙ্কা ফল, এসিটিক এসিড, রেজিন, ব্লিচিং পাউডার আর এমন হরেক রকম জটিল রাসায়নিকে ভিজে তাদের হাতগুলো থ্যাকথেকে সাদা সাদা হয়ে আছে। সেই দগদগে ঘা কখনোই শুকোয় না। ঝাল মরিচে রান্না তরকারি দিয়ে ভাত খেতে গেলই অন্তরাত্মা পর্যন্ত জ্বলে উঠে। চোখের পানি গাল বেয়ে ঠোঁটের কোণা দিয়ে মুখে চলে যায়। ওভাবেই দিন শুরু আর দিন শেষ! দয়াগঞ্জ ব্রিজের দুপাশে দাঁড়ানো যে শিশুরা তাদেরও জীবন শুরু হয় খুব ভোরে। বোঝাই রিকসা ঠেলে ঠেলে ব্রিজ পার করা তাদের কাজ। এখানে আট ঘণ্টা নামক কোনো ব্যাপার নেই। সারা ঢাকা শহরে শকুনের মত শ্যেন দৃষ্টি মেলে আরো হাজার হাজার শিশুর দিন শুরু হয়। তারা কাগজ কুড়োয়। এক হাতে পলিথিনের বস্তা আর এক হাতে ক্রমাগত কাগজ কুড়িয়ে চলে। ওদেরও শ্রম দিবস মানে বার থেকে ষোল ঘণ্টা।
এই মহানগরীতে ঠিক কত লাখ শ্রমিক এবং সেই সব শ্রমিকের কত লাখ অপ্রাপ্ত বয়সের শিশু শ্রমিক তার কোন খতিয়ান মহান রাষ্ট্রের কোন দপ্তরে নেই। ঠিক কত লাখ ‘কাজের মেয়ে’ এই মহানগরীতে শ্রম শোষণের শিকার, কত লাখ নারী-পুরুষ বাসা বাড়িতে যৌন হয়রানির শিকার, কত লাখ অপরিণত বয়সী মেয়ে বাড়ির কর্তা, দারোয়ান, গ্রামের আত্মিয়, ড্রাইভার আর এই টাইপ অফিসিয়াল ধর্ষকের দ্বারা ধর্ষিত তারও কোন অথেনটিক স্ট্যাটাস সরকারের হাতে বা তথাকথিত মানবাধীকার সংগঠনগুলোর কাছে নেই। এদের কেউ তার কর্ম জীবনে আট ঘণ্টা বলে যে একটা শব্দ আছে সেটাই জানেনি। বোঝেনি। তাদের জানতে বা বুঝতে দেয়া হয়নি।

শ্রম শোষণ বা শ্রম চুরির মত একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় নিয়ে এই রাষ্ট্র, সরকার, বিরোধী দল, ছোট বড় হেন-ত্যান দল এবং বুদ্ধিব্যাপারিদের কোন চিন্তা নেই। এ নিয়ে সংবিধান সংশোধনও হবে না, সংসদে কোনো বিলও পাশ হবে না। অথচ সারা দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি গতরখাটা শ্রমিকের সিংহভাগই শ্রম শোষণের শিকার। সেই অজ পাড়াগাঁ থেকে শুরু করে এই তিলোত্তমা মহানগরীতে বেশুমার সেই শ্রম শোষণ আর শ্রমচুরি চলছে। এদেশে যে কোটি কোটি ক্ষেতমজুর সারা দিনমান শ্রম দিয়ে চলে তারা অফিসিয়ালি শ্রমিক নয়! সরাসরি এই চুরির সাথে জড়িত এ দেশের প্রায় সকল বিত্তবান, মধ্যবিত্ত এবং ক্ষুদে বিত্তের মালিকগণ।
‘এই দেশে গার্মেন্ট এসে কাজের বুয়া পাওয়া যায় না, তাদের এখন বেজায় দেমাগ, বাসায় কাজের চেয়ে তারা গার্মেন্টে কাজ করে যুৎ পায়’, এই টাইপ ‘হতচ্ছাড়াদের’ কারণে এই মহানগরীর তামাম গৃহবধূ বিরক্ত, রুষ্ঠ! যে মেয়েটি বাসায় কাজ করার বদলে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করে সে মনে করে এখানে বার ঘণ্টা কাজ করলেও সকাল-বিকাল মালকিনের লাথি গুতো নেই। কিন্তু লাথি গুতো যাদের নিত্যসঙ্গি তারা পার পাবে কি করে? গার্মেন্টেও ওদের ছোট ছোট শরীরের ওপর বড় বড় শরীর রাত বিরেতে উঠে পড়ে। ‘না’ করতে পারে না। ‘না’ বললে চাকরি থাকবে না। ওই অপারেটারদের ভেতর থেকেই কোনো কোনো মেয়েকে যারা দেখতে একটু ভালো তাদের ডাক পড়ে মালিকের খাস চেম্বারে। ওই সব মালিকরা বেশ তৃপ্তি সহকারেই বলেন- ‘বাজারের অসুখ বিসুখঅলাদের চেয়ে এরাই ভালো!’

ওই যে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি গতরখাটা শ্রমিকের প্রায় এক তৃতীয়াংশই শিশু শ্রমিক। বিশ্বের আর কোথাও বিভিন্ন বিপজ্জনক সেক্টরে এত শিশু শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো হয় না। এখানে হয়, কারণ এখানকার শিল্পপতি থেকে শুরু করে হালের মডার্ণ আইটি স্পেশালিস্ট, টেকনোলজিস্ট, সিভিল ব্যুরোক্র্যাট, মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাট, বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত নিয়মর্ডানিস্ট, একেবারে হালের তরুণ প্রজন্ম সবাই সেই পিতৃপুরুষের এস্তেমালের সামন্তবাদে আক্রান্ত। ভীষণভাবে আক্রান্ত। সামন্ত প্রভুদের জুতো মোজা খুলে দেয়ার জন্য, অজুর পানি দেয়ার জন্য, মাথায় ছাতা ধরার জন্য, ভেতর বাড়ি থেকে পানটা সুপারীটা এনে দেয়ার জন্য একটা ‘পিচ্চির’ দরকার হয়। অথচ পুঁজিবাদে সক্ষম এবং স্কিল্ড শ্রমিক একটা এ্যাসেট। পুঁজিবাদ সেই এ্যাসেটকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে দিয়ে আগামী দিনেও যেন কারখানার চাকা চালু রাখা যায়। সে কারণে পুঁজিবাদের চরম উৎকর্ষেও স্কিল্ড শ্রমিকের চাহিদা ফুরোয় না।

কিন্তু সামন্তপ্রভুরা জানেন, ওদের না বাঁচলেও চলবে, কারণ কালই আবার ঝাঁকে ঝাঁকে পয়দা হতে থাকবে। সামন্তপ্রভুর কাছে শ্রমের বিনিময় মূল্য স্রেফ পেটেভাতে! পেট পুরে ভাত দেয়া হয়, এটাই সামন্তবাদের মহান বদান্যতা! আর বছর বছর জিডিপি নিয়ে রেমিট্যান্স নিয়ে ভেরেন্ডাভাজা আমলা-চামচাদের চিৎকার চেচামেচির পরও, লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে কাজ করে কড়কড়ে কারেন্সি নোট কামাই করে আনলেও, আইটি দিয়ে ডিজিটাল সিস্টেমে দেশ ভরিয়ে দেয়ার কেতাবি ঘোষণার পরও এদেশে যথাযথ পুঁজিবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠল না। অনুদান দেয়া আমেরিকা মাঝে মাঝে শিশু শ্রম নিয়ে, কল কারখানায় বিশেষ করে গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকদের সিবিএ বা বার্গেনিং অথোরিটি করার হুমকি টুমকি দিলে এদেশী চামচারা এক গাল হেসে দিয়ে বলেন- ‘স্যার ও দেখতে ছোট, কিন্তু লইতে পারে’! সাদা সায়েবরা এই জঘণ্য কুৎসিত ইঙ্গিত বোঝেন না। তারা ভাবেন গ্রোথ কম! তারা টিক মার্ক দিয়ে দেন। শিশুরা শ্রমিক ‘শ্রম বঞ্চিত’ হয় না! অর্থাৎ শিশুদেরও কাজের সুযোগ দেয়া হলো! এই আধা সামন্তবাদী- আধা পুঁজিবাদী জগাখিঁচুড়ি পাশবিক বণিক সমাজে তাই মে দিবস এবং সেই সেই দিবসের প্রতিপাদ্য এটুকুই যে দিনটি শ্রমিকদের দিন!

ইতিহাসের মে দিবসঃ
অগাস্ট স্পীজসহ ১৮ জন শ্রমিকের আত্মাহূতির বিনিময়ে আট ঘণ্টা কাজের অধিকার পাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে একশ পনের বছর। সেই ১৮৮৬ সালের পয়লা মে শিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিকদের জীবনের মূল্যে যে আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি তা আজও বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বাস্তবায়ন হয়নি। এই একশ পনের বছর পৃথিবী তার কক্ষপথে নিয়ম করে ঘুরেছে। দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীর সরকার কায়েম হয়ে আবার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর ঘটেছে। গোলার্ধের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত এখনো ন্যুনতম শ্রমের মজুরির দাবি উপেক্ষিত। এখনো শ্রমিককে তার সেই আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন করতে হয়। এখনো শ্রমিককে আট ঘণ্টার বদলে দশ ঘণ্টা এমনকি বার ঘণ্টা কাজ করিয়ে সেই আট ঘণ্টার হিসেবেই মজুরি দেয়া হয়। এত কিছুর পরও বছরের এই একটি দিন, পহেলা মে, এই দিনটি যেন শ্রমিকদের বিজয়ের দিন! এই একটি দিনেই যেন সারা বিশ্বের শ্রমিক তার মুক্তির দিন মনে করে ক্ষণিকের উল্লাস করে। আসলেই কি শ্রমিকের মুক্তি ঘটেছে? শ্রমিক কি তার প্রাপ্য মজুরি পেয়েছে, বা পাচ্ছে? বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা নয়, এই বাংলাদেশে কি শ্রমিক আজও তার ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে? না। পাচ্ছে না। আজ থেকে একচল্লিশ বছর আগে এই দেশটি যখন পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিল তখনও পায়নি। একাত্তরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর পরও শ্রমিক আজও এই দেশের সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে নিগৃহীত এক জনগোষ্ঠি বিশেষ। আমাদের শ্রমিকদের হাল সাকিন জানার আগে দেখে নেয়া যাক মে দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ

১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘন্টা শ্রমদিনের দাবীতে আন্দোলনরত শ্রমিকের ওপর পুলিশ গুলি চালালে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। এই ঘটনার আগে শ্রমিকদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘন্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন শ্রম দিতে হতো। বিপরীতে মজুরী মিলত নগন্য, এবং সেই কম মজুরি দিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো তাদের। কোথাও কোথাও তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেন ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নেয়নি। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেটে শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে একটি বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। এবং সাথে সাথে পুলিশবাহিনী শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে। হামলায় ঘটনাস্থলেই ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। আবার পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর প্রকাশ্যে ৬ জন শ্রমিকের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে"। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের "দৈনিক আট ঘন্টা কাজ করার দাবী সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে।

বাংলাদেশে সরকারি আধা সরকারি কল কারখানাগুলোতে যেখানে শিফ্ট চালু আছে সেখানে কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম পালিত হলেও সারা দেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে দশ-বার ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ষোল ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়। অফিসিয়ালি বলা হয়, অতিরিক্ত শ্রম ঘণ্টার জন্য ওভারটাইম দেয়া হয়। কিন্তু যে সব সেক্টরে শ্রমিকদের বার্গেনিং এজেন্ট বা সিবিএ আছে সেই সব সেক্টর ছাড়া আর কোথাও ওভারটাইমের টাকা যথাযথভাবে আদায় করা যায় না। বাংলাদেশে গার্মেন্ট চালু হওয়ার আগে দুএকটা বড় বড় কল কারখানায় যে শিল্প শ্রমিকরা কাজ করত তাদেরই ধরে নেয়া হতো দেশের সবচেয়ে সংগঠিত শিল্পীয় শ্রমিক। গার্মেন্ট চালু হওয়ার পর এখন এটাই সবচেয়ে শ্রমঘন সেক্টর। বাইশ থেকে পচিশশ’ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ শ্রমিক কাজ করে। এবং বিস্ময়করভাবে এই সেক্টরে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য কোনো সিবিএ বা বার্গেনিং এজন্ট নেই। তার বদলে বিভিন্ন নামে সরকারি ছত্র ছায়ায় এবং কয়েকটি বিরোধী দলীয় সমর্থনপুষ্ট শ্রমিক সমিতি আছে যারা মাঝে মাঝে মালিক পক্ষের সাথে দেন-দরবার করে তাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করে। এবং অবধারিতভাবে তাদের দাবি আদায় তো হয়ই না, বরং সেই দাবি আদায়ের পদ্ধতিকে দেশের তামাম বুজর্গ, বুদ্ধিজীবী, বিদ্যাজীবী এবং রংবেরঙের সুশীল সমাজপতিরা হঠকারি আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে দাঁড়ায়।

এটা অনেকটা নিয়মের মতই হয়ে গেছে যে, শ্রমিকরা তাদের বেতন ভাতা, বোনাস, ওভারটাইমের দাবিতে কর্মবিরতী করবে, কারখানা গেটের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করবে। এক সময় পোশাক শ্রমিকদের জন্য হিংস্রভাবে গড়ে তোলা বিশেষ পুলিশ আসবে, র‌্যাব-বিডিআর আসবে, বিশেষ বাহিনী আসবে। এবং নির্বিচারে শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতন চালাবে। ঘটনাস্থলেই কিছু শ্রমিক মারা যাবে। হাসপাতালে এবং পথে ঘাটে আরো কিছু মারা যাবে। কিছু শ্রমিককে মালিকের পোষা গুণ্ডারা পিটিয়ে হত্যা করবে। কিছু শ্রমিকের লাশ ওই বিশেষ বাহিনী গুম করে দেবে। চূড়ান্ত বিচারে দেখা যাবে দশ-পনের হাজার নাম না জানা শ্রমিকের বিরুদ্ধে অমুক থানায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজের মামলা দেয়া হবে। ওই মামলায় এর পরে যাকে তাকে ধরে আসামি বানিয়ে দেয়া হবে। আর এই শ্রমিক নিধনের নির্লজ্জ খেলাটা প্রকাশ্যে এদেশের বিশেষ বাহিনী মালিক পক্ষের সহায়তায় সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে খেলবে। এবং এটা প্রায় রোজকার নিয়ম।
এর পরও যদি শ্রমিকরা তাদের দাবি টাবি নিয়ে আরো একটু স্বোচ্চার হতে চায় তাহলে তাদেরকে কারখানার ভেতরে রেখে বাইরে থেকে দরোজা জানালা বন্ধ করে মেইন গেটে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে পালিয়ে যাবে সিকিউরিটি গার্ড নামক পোষা চামচারা। তারপর খুব ঠাণ্ডা মাথায় কারখানায় আগুণ ধরিয়ে দেয়া হবে। জ্যান্ত পুড়ে মরবে ডজন ডজন হতভাগা শ্রমিক। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা দিন শেষে প্রতিবেদন দেবে-‘সর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে’! সরকার এবং মালিক পক্ষ তিন বা চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করবে। সেই কমিটি দিন সাতেক বা দিন দশেক পরে একটা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে। যা কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না। মোদ্দা কথা হচ্ছে এই সেক্টরে যে হতভাগা শ্রমিকরা কাজ করে তারা নির্ভেজাল দাস। সেই দাসদের যতদিন সম্ভব শ্রম শুষে নিতে হবে। যখন তার শ্রম সসীম হয়ে যাবে, অর্থাৎ তাকে দিয়ে আর আগের মত গাধার খাটনি খাটানো যাবে না তখন তাকে বা সেই শ্রমিক গোষ্ঠিকে হয় ছাঁটাই করা হবে, নয়ত বাড়াবাড়ি করলে স্রেফ পুড়িয়ে মারা হবে। এবং বছরের পর বছর এই ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টরে। এ নিয়ে এই দেশের তাবড় তাবড় জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিব্যাপারিদের কোনোও মাথা ব্যথা নেই। যে সব শ্রমিক নেতারা এই শ্রমিকদের পক্ষে কিছু বলতে চাইবে তাদের ‘পাশ্ববর্তী দেশের চর’ বা ‘বিদেশী ষড়যন্ত্রকারিদের চক্রান্ত বাস্তবায়নকারি’ আখ্যা দিয়ে ধরে ধরে জেলে পোরা হবে, নির্যাতন করা হবে।

এই সেক্টরের বাইরে সারা দেশ নয়, শুধু মাত্র ঢাকা শহরেই প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ শিশু শ্রমিককে দিয়ে অমানবিক কাজ করানো হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস তাদের অমানবিকতার বিরুদ্ধে কোনো বার্তা বয়ে আনে না। ঢাকাতে সব চেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক কাজ করে বাসা বাড়িতে আর হোটেল রেস্তোরাগুলোতে। বাসা বাড়িতে যারা কাজ করে তাদের কোন শ্রম ঘণ্টা নেই। ভোর থেকে শুরু করে রাত বারটা একটায় ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তাদের শ্রম ঘণ্টা।খাওয়া-পরা সমেত বেতন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। খাওয়া পরা বাদে বেতন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার। হোটেল রেস্তোরাগুলোয় যে শিশু শ্রমিকরা কাজ করে তাদের বেতন আরো কম। খুব ভোর থেকে শুরু করে হোটেল রেস্তোরা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এদের কাজ করতে হয়। নোংরা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, গুমোট গরমে সেদ্দ হয়ে সারা রাত ঘুমোতে না পারা এই সব ক্রমিকরা জানেও না শ্রম দিবস কি, বা মে দিবস কি? শুধু যে এদের শ্রম শোষণ করা হয় তা নয়। এদের সাথে আরো জঘণ্য কর্মকাণ্ড করা হয়। সিনিয়র শ্রমিক বা হেড বেয়ারা যারা আছে তারা এই সব শিশু শ্রমিকদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এবং প্রায় সবাইকেই কোনো না কোনো সময় বলাৎকারের শিকার হতে হয়।

একানব্বই সালে ক্রেমলিনের চার দেয়াল ভেদ করে পুঁজিবাদী দানব বেরিয়ে এসে সমগ্র পৃথিবীকে আবার নতুন করে গ্রাস করে ফেলার পরও এ দিন মস্কোর রেড স্ক্যয়ারে অশতিপর বৃদ্ধ বৃদ্ধারা লাল পতাকা নিয়ে হাজির হবেন। অপসারিত লেনিনের মুর্তির পাদদেশে ক্ষণিক তাকিয়ে থাকবেন। ১৯১৭ সালের পর এই রেড স্ক্যয়ারে মে দিবসে কি কি ঘটত সে সব ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতি মন্থণ করবেন। তার পরও তারা সারা দিন ওই রেড স্ক্যয়ারে পড়ে থাকবেন। প্যারিসের ল্যূভার স্ক্যয়ারে, স্পেনের রাজ প্রাসাদের বাইরে, বনের ফ্রিডম স্ক্যয়ারে, তিরানার হোক্সা এভেন্যুতে, চীনের তিয়েনআনমেন স্ক্যয়ারে, ভিয়েতনামের হো চি মিন স্ক্যয়ারে, হাভানার চে স্ক্যয়ারে হাজার হাজার শ্রমিক এ দিনও সমবেত হবেন। হয়ত নতুন করে শ্রমিকের মুক্তির শপথ নেবেন। হয়ত কিছুই করবেন না। হয়ত সারা দিন দাঁড়িয়ে বা বসে সেই সব পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে একরাশ হতাশা বুকে নিয়ে আবার ঘরে ফিরে যাবেন। ইউরোপের দেশে দেশে গত এক দশক ধরে নতুন করে যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে পাথরের মত শক্ত হতে শুরু করেছে। সেই পাথরের দৃঢ়তা নিয়ে তারা আরো একটু এগুতে চাইলে হয়ত পুলিশ গুলি ছুড়বে। হয়ত এই মে দিবসেই সারা বিশ্বে পুলিশের গুলিতে আরো শত শত শ্রমিকের মৃত্যু ঘটবে! তার পরও, এত সব হতাশার খণ্ডচিত্রের পরও সারা বিশ্বের শ্রমিক এ দিন তাদের মত করে পৃথিবীকে আরো একবার যাচাই করে দেখে নিতে চাইবে। নতুন একজন অগাস্ট স্পীজ তাদের সামনে এসে না দাঁড়ালেও তারা এই আশায় আবারো বুকের গহিনে বজ্র নিনাদ শুনবে। এক সময় মনের গহিনে ক্ষীণ হলেও সেই আশার সঞ্চার ঘটিয়ে ঘরে ফিরবে- একদিন এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। একদিন আমরাই এই পৃথিবী থেকে মানুষে মানুষে শোষণ বঞ্চণা দূর করে বৈরী দয়ামায়হীন পৃথিবীটাকে সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য করে তুলব। কেননা একমাত্র শ্রমিকরাই পারে একটি সোনালী আগামীর জন্ম দিতে। এবং তারা তা দেবেনও। আজ বা কাল।


১৯৬৬ সালে মে-দিবসে মস্কোর রেড স্ক্যয়ার।

তুরষ্কের ইস্তাম্বুলে মে-দিবসের বৃহত্তম জমায়েত।


ইন্দোনেশিয়ার মহান নেতা সুকর্ণর উপস্থিতিতে মে-দিবসের সমাবেশ।

এই সকল বৃদ্ধরা আজও মস্কোর রেড স্ক্যয়ারে সমবেত হন।

রাজনীতি,মার্কসবাদী দর্শন, সাহিত্য, সমাজ চেতনা ও মুক্তচিন্তার অল্টারনেটিভ ব্লগ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29372735 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29372735 2011-04-30 23:11:02
জন্ম বার্ষিকীতে কমরেড লেনিনকে সশ্রদ্ধ স্যালুট।

আজ ২২ এপ্রিল মহান নেতা কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এর জন্মবার্ষিকী। ১৮৭০ সালের এদিনে তিনি রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অমর কীর্তি এই পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শুধু তাঁকে আরেক বার সশ্রদ্ধ অভিবাদন। হৃদয়ে চিরস্থায়ী হোন কমরেড!

মার্কিনদের ওয়েব সাইট History তে লেনিনকে নিয়ে শুধু এতটুকুই বলা হয়েছে.........Lenin was the founder of the Russian Communist Party, leader of the 1917 Bolshevik Revolution, and the architect, builder, and first head of the Soviet state. !!!!! (যথেষ্ট!!)


আমাদের দেশের 'জাতীয়' দৈনিকগুলোতে লেনিন নেই!! অথচ বিষম খাবার মত তথ্য হচ্ছে এখনকার প্রায় সবকটি দৈনিকের সম্পাদক বা ওই পর্যায়ে যারা আছেন তাদের অনেকেই এক সময় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন!!!!

লেনিনের কিছু উক্তি:
-------------------
"Despair is typical of those who do not understand the causes of evil, see no way out, and are incapable of struggle. The modern industrial proletariat does not belong to the category of such classes."

"It is true that liberty is precious. So precious that it must be rationed."

"Freedom in capitalist society always remains about the same as it was in ancient Greek republics: Freedom for slave owners."

"When one makes a Revolution, one cannot mark time; one must always go forward -- or go back. He who now talks about the freedom of the press goes backward, and halts our headlong course towards Socialism."

"Any cook should be able to run the country."

"All our lives we fought against exalting the individual, against the elevation of the single person, and long ago we were over and done with the business of a hero, and here it comes up again: the glorification of one personality. This is not good at all. I am just like everybody else."



"You all know that even when women have full rights, they still remain fatally downtrodden because all housework is left to them. In most cases housework is the most unproductive, the most barbarous and the most arduous work a woman can do. It is exceptionally petty and does not include anything that would in any way promote the development of the woman."

"The most important thing when ill, is to never lose heart."

"Whenever the cause of the people is entrusted to professors, it is lost."

"Literature must become party literature. Down with unpartisan litterateurs! Down with the superman of literature! Literature must become a part of the general cause of the proletariat."

"No amount of political freedom will satisfy the hungry masses."

"Authority poisons everybody who takes authority on himself."

"To rely upon conviction, devotion, and other excellent spiritual qualities -- that is not to be taken seriously in politics."

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29367489 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29367489 2011-04-22 23:08:11
উপমা নামের আমার সেই মেয়েটি মারাত্মক অসুস্থ্য হয়ে বারডেমের সিসিইউতে


গত কাল ন্যাশনাল মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে অবস্থার অবনতি হওয়ায় এখন বারডেমে। জানিনা কি হবে! নিমুনিয়া, টাইফয়েড এক সাথে আক্রমণ করেছে। সেই হার্টের ভাল্ব নষ্ট তো আছেই।

আপনারা উপমার জন্য প্রার্থণা করুন.........]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29366402 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29366402 2011-04-21 00:35:35
ভারতে ২ লাখ কৃষকের আত্মহত্যার করুণ ঘটনাবলি নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টরি-‘নিরোর অতিথিরা’!!!


গত ৩ মার্চ ভারতের ব্যাঙ্গালোর এর আই আই সায়েন্স সিটিতে প্রথম প্রদর্শনী হয়ে গেল বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘নিরোর অতিথিরা’র। ছবিটির অফিসিয়াল ট্রায়ালকে বাধাগ্রস্ত করতে কর্ণাটকের সরকার কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি মুক্তি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছে গত এক দশক ধরে ভারতের কৃষকদের সঙ্গে কি আচরণ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতের বিখ্যাত সব মিডিয়া টাইকুনেরা! এই ছবিটির নামকরণেও বিশেষ বৈশিষ্ট আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন শত শত চাষী আত্মহত্যা করছে, তখন সরকারের এবং মিডিয়ার ধারণায় সে সব কেবলই ‘নিরোর বাঁশী’র সুর! আর সেই ব্যঙ্গ-শ্লেশকে অবলম্বন করেই ছবিটির নাম হয়েছে ‘নিরোর অতিথিরা’ বা "Niro's Guests"

ছবিটির বিষয় বস্তু ভারতের প্রায় দুই লাখ কৃষক, যারা গত দশ বছরে আত্মহত্যা করেছে। কেন আত্মহত্যা করেছে? কারণ তারা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কষ্টার্জিত ধারের টাকা লগ্নি করে যে ফসল উৎপাদন করে তার বাজার মূল্য পায় না। ধার করা টাকা শোধ দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এভাবে গত দশ বছরে ভারতে প্রায় দুই লাখ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে! চকচকে ঝকঝকে শত শত চ্যানেলে এই খবর আসেনি। তেমনভাবে আসেনি কোনো প্রিন্ট মিডিয়াতেও। ঠিক সেই সময় ‘দ্য হিন্দু’ সংবাদপত্রের মফস্বল বিষয়ক সম্পাদক পি সাঁইনাথ একেবারে প্রান্তিক চাষীদের ভেতরে গিয়ে খবর সংগ্রহ করে তা ছাপিয়ে বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দিতে থাকেন। তার পরও সরকার তার সেই রিপোর্টকে আমলে আনেনি। এতে করেও পি সাঁইনাথ হতদ্যোম হয়ে পড়েননি। তিনি একের পর রিপোর্ট লিখে গেছেন, আর সেই সব রিপোর্টের শেষে তিনি একটি বার্তা সমাজকে জানাতে থেকেছেন, আর তা হলো-‘আমরা ভারতকে এই রূপে দেখতে চাই না।’

পি সাঁইনাথ শুধু ‘দ্য হিন্দু’র মফস্বল বিষয়ক সম্পাদকই নন। তিনি ২০০৭ সালে এশিয়ার সবচেয়ে সন্মানজনক ‘রামন ম্যাগসেসাই’ পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক। যে পুরষ্কারকে ‘এশিয়ার নোবেল’ বলা হয়। তিনি একই সাথে সাহিত্য, সৃষ্টিশীল সামাজিক দায় দায়িত্ব এবং তথ্য প্রবাহ বিষয়েও খ্যাতিমান। এ যাবত ৩৫ বার বিশ্বস্তরের পুরষ্কার জিতেছেন। তার সর্বশেষ কাজ -

"the agrarian crisis has produced the largest journalistic body of work ever on the Indian countryside in terms of the problems faced by farming communities. It is also a body of work that goes far beyond the realm of journalism, capturing issues and complexities that academia and policy makers have failed.”

ছবিটি পরিচালনা করেছেন দীপা ভাটিয়া। যিনি বিখ্যাত চিত্র পরিচালক গোবিন্দ নিহালিনীর সাথে সহকারি হিসেবে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন। (দেব, হাজার চুরাশির মা, দিহাম প্রভৃতি বিখ্যাত ছবির সাথে জড়িত ছিলেন দীপা ভাটিয়া)। এর আগে বাণিজ্যিক ছবি করলেও দীপার এটা প্রথম তথ্য চিত্র। আর এই একটি ছবি কেন্দ্র করেই দীপা এখন আলোচিত। ‘নিরোর অতিথিরা’ তাকে বাণিজ্যিক ছবির আবহ থেকে এক ঝটকায় গণ মানুষের কাতারে সামিল করে দিয়েছে।

এদের দুজনকেই বাংলাদেশের গণমানুষের পক্ষ থেকে স্যালুট! আমাদের দেশে সারের দাবিতে শত শত কৃষকের মৃত্যু হলেও সেই সংবাদও আমাদের মিডিয়ায় আলোচিত হয় না। সেই সব বিভৎস মৃত্যু নিয়ে কেউ ডকুমেন্টারি বানানোর সাহস করেন না। তার বদলে আমাদের মিডিয়ায় মিডিয়া রুলস ভঙ্গ করে পুলিশের হাতে, RAB এর হাতে নিহত হতভাগাদের ভাঙ্গাচোরা ছবির প্রদর্শনী চলে! আর চলে কৃষকে নিয়ে নির্লজ্জ বাণিজ্যিকীকরণের লাম্পট্য! কৃষকে দিয়ে কাবাডি খেলানো হয়, তাদের নিয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মচ্ছব করা হয়। এবং অতি অবশ্যই "কৃষকই বাংলার প্রাণ", "কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে" মার্কা স্লোগান নষ্টামি!

তথ্য সূত্রঃ মুম্বই মিরর ডট কম



পি সাঁইনাথ

পরিচালক দীপা ভাটিয়া

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29363517 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29363517 2011-04-16 02:24:41
এই কবিতাটির কোনো শিরোনাম নেই!




প্রিয়তম তোমায় বলেছি,
নাজিম আমার প্রিয় কবি।
নাজিম হিকমত সম্ভ্রান্ত পাশা,
কিন্তু নাজিম কমিউনিস্ট!
প্রিয়তমা তোমাকে আরো বলেছি;
নাজিমকে ওরা ৫৬ বছর জেল দিয়েছিল!
ছাপ্পান্নটা বছর, যা তার জীবনের চেয়েও বেশী!

প্রিয়তমা ওরা আমায় জেল দেয়নি,
দিয়েছে কালাপানি, দ্বীপান্তর।
আন্দামান-নিকোবর হয়ে আরো দূরে
সেই কিরিবেতি।
আমার চারধারে অথৈ জলরাশী।
সেখানে ঢেউয়ের মাথায়
সফেদ ফেনায় রোদের লুকোচুরি,
হাওয়ায় ভাসানো গাংচিলের ডানা।
আমার চারধারে জলরাশী শেষ হলে
চার চারটি নিরেট দেয়াল।
কংক্রিটের পলেস্তারায় আমি
তোমাকে দেখি প্রিয়তমা আমার!

আমার এখানে যখন রাত নামে,
যখন পাখিরা আর ডানা মেলে ওড়ে না,
তখনো আমার ভেতরে প্রবল বাতাসে
নিজেকে অটুট রাখার আকুল ডানা ঝাপটানি!
আমি ডানা ঝাপটাই আর পালাতে থাকি।
জীবন থেকে জীবনে, মরণ থেকে মরণে!
ওরা আমায় ফাঁসী দেয়নি, দিয়েছে দ্বীপান্তর।

তোমার মনে আছে? আমি বলেছিলাম-
নাজিমের কথা? নাজিম বলেছিলো-

‘প্রিয়তমা আমার
তোমার শেষ চিঠিতে
তুমি লিখেছ ;
মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে
দিশেহারা আমার হৃদয়।

তুমি লিখেছ ;
যদি ওরা তেমাকে ফাঁসী দেয়
তেমাকে যদি হারাই
আমি বাঁচব না।

তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার,
আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে
তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী,
বিংশ শতাব্দীতে
মানুষের শোকের আয়ূ
বড় জোর এক বছর।’

আমি জানি ওরা আমায়
ফাঁসী দেবে না।
আমার চোখে কালো কাপড় বেধে
ওরা সটান নিয়ে যাবে আমার
সেই প্রাণ প্রিয় গ্রামের
কোনো নিভৃত খোলা মাঠে।
আমাকে ওরা গোসল করাবে,
দোয়া পড়াবে।
তারপর একটা তপ্ত সীসে আমার বুকে এসে বিঁধবে!
আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে
তোমাকেই ভাবব বলে মরার আগে
শেষ পর্যন্ত তোমার কথা মাথায় গেঁথে রাখব
প্রিয়তমা আমার!

আমি এখন তোমার পাশে বসে
সেই চিরচেনা তিলটি দেখছি,
তোমার অনাবৃত স্কন্ধে
সেই ছোট্ট তিলটির দিকে
অপলক তাকিয়ে আছি, ঠিক সেই সময় প্রিয়তমা ,
ঠিক তখনই আরো একটি লাশ পড়ল!
আরো একজন সাথী আমার একাকী হলো!

আমি যেদিন মনে মনে
তোমার শত ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে
তোমার সিক্ত অধরে ধাবমান,
ঠিক তখনই আমার আরো একজন সাথীর বুকে
ছোট্ট এক টুকরো
সীসে ঢুকিয়ে দেয়া হলো।
প্রিয়তমা, আমি যত বার তোমাকে দেখি,
স্বপনে এবং জাগরণে,
দেখি অনিমেষ কালো রাতের
কালো জোৎস্নানায়, কালো বন্যায়,
দেখি ততবারই আমার একজন সাথীকে
ওরা হত্যা করে!

প্রিয়তম, তুমি চেয়েছিলে
আমি যেন সুস্থ্য থাকি, ভালো থাকি।
তুমি ব্যাকুল হয়ে বলেছিলে-
সময় মত ওষুধটা হাতের কাছে রেখো,
রাতে যেন ঘুমোতে ভুলো না।
প্রিয়তমা তুমি অত দূরে বসে
দেখতে পারো না,
আমি যতবার ঘুমোই-
ততবারই তোমাকে হারাই।
আমি যত বার জাগি- তোমাকে হারাই।
আমি যত বার তোমাকে ভাবি- তত বারই
আমার এক কমরেড মাটিতে লুটিয়ে পড়ে!
আমি একা হয়ে যাই,
ক্রমশঃ একা হতে থাকি।

আমি জানি নিবীর্য কাপুষের দল
তোমাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নেয়ার
সহজতম পথটি খুঁজে পেয়েছে।
ওরা আমাকে তুমিহীন করার
অব্যর্থ উপায় পেয়েছে।

ওরা আমাকে তোমার সারা জীবনের স্মৃতি সমেত
কোন এক কালো রাতে, কালো কাপড়ে
আমার সেই চোখ; যা তুমি
বারে বারে ছুঁয়ে দেখেছ,
সেই চোখে কালো কাপড় বেধে দাঁড় করাবে
কোনো এক নির্জন ধানক্ষেতে।
তারপর নিয়ম মেনে নিয়ম শেখাবে।
আমি শুধু তোমাকে, তোমাকেই,
শুধু তোমাকেই আর একটি বার
দেখতে চাইব প্রিয়তমা!

কিন্তু আমি জানি ওরা তা দেবে না।
এই নিরেট কংক্রিটের দেয়াল,
সফেদ ফেনা, গাংচিল আর
নিকষ কালো পানিকে স্বাক্ষী রেখে
আমি তোমাকে হারাব প্রিয়তমা!

শেষের সেই সময় তোমাকে হারানোর
কষ্ট আরো তীব্র হয়ে উঠলেও
আমি শান্তিতে মরতে পারব,
কারণ আমি আর জানব না
আমার আর কোন কোন সাথী
খুব ভোর বেলায় স্বজনহীন,
প্রিয়তমহীন হয়ে তোমাদের এই
সাধের পৃথিবী থেকে চলে গেল!
শেয়াল শকুনেরা মাংস খুবলে
নেয়ার সময় ভাবে না এখানে
কার পেলব হাতের স্পর্শ ছিল!

শত শত পঁচে যাওয়া দলিত মাংস
কঙ্কাল শরীরে উঠে আসবে,
বেজন্মা জারজ সময় স্বাক্ষ্য দেবে না,
তবুও তারা উঠে আসবে।
প্রেয়সীর ভেজা ঠোঁট, মরাল গ্রীবা,
উন্নত নাকের ভাঁজে জমে থাকা ক্লেদ বিন্দু,
গহিনে জড়িয়ে থাকা অবুঝ প্রেমের স্পর্শে
তারা উঠে আসবে।
কেননা তারা জানে নাজিমের সময়ে
এক বছরের শোকের আয়ু
এখন বড় জোর দুদিন!

প্রিয়তম আমার , এই শেষের বেলায়
আমার চোখে কি লেখা তা যদি
ওরা পড়তে পারে,
দেখবে সেখানে শত সহস্র শব্দে
আকাশ ছোঁয়া বিশাল ক্যানভাসে
আঁকা তোমার মুখটি দেখতে চাই।
একবার প্রাণভরে তোমকে
দেখতে চাই প্রিয়তমা!
আমার মাথার সেই পুরোনো ব্যথাটা
তোমাকে উপহার দিতে চাই!
আমার না থাকা সময়ে যেন তুমি অনুভবে
অস্তিত্বে মেখে নিতে পারো সেই ব্যথা,
যা আমি আজন্ম বয়ে বেড়িয়েছি!

-------------------------------------
৩১ মার্চ ২০১১


অল্টারনেটিভ ব্লগ













]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29357772 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29357772 2011-04-06 00:19:44
সারি সারি লাশের ভেতর আরো একটি জ্যান্ত লাশ হয়ে মিশে যাই!!! স্বাধীনতা দিবসে সবাই যখন প্রাণোচ্ছল খুশির জোয়ারে ভাসে, আনন্দে উদ্বেল হয়, সারাটা শহরময় লাল-সবুজের রঙে রঙে ছেয়ে যায়, শিশুদের গালে মুখে পতাকা অঙ্কিত হয়, চ্যানেলগুলোতে কৃতজ্ঞতার ডালি উপড় করে ঢালা হয়......আমি তখন আমার ঘরের কোণে একাকী বসে থাকি! চোখ বন্ধ করলেই বায়োস্কোপের মত ভেসে ওঠে সমগ্র একাত্তরের ক্যানভাস। সেই ভয়াবহ মেশিনগানের শব্দ, আহত মানুষদের মরণ চিৎকার, আর ভূখা নাঙ্গা মানুষদের চিৎকার আমার কানের পর্দা ভেদ করে মগজে আঘাত করে! সারি সারি লাশের ভেতর আরো একটি জ্যান্ত লাশ হয়ে মিশে যাই।

দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দীন রাজপুতানার চিতোর আক্রমণ করেন ও ছয় মাস কাল অবরোধের পর অধিকার করেন। নগর রক্ষার্থে রাজপুতগণ প্রাণপণে যুদ্ধ করে নিহত হন। দুর্গের অভ্যন্তরে রানী পদ্মিনীর সঙ্গে তেরো হাজার রাজপুত রমণী ‘জহরব্রতের’ অনুষ্ঠান করে প্রাণ বিসর্জন করেন। সময়কাল ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দ।

‘অপারেশন ডে-ব্রেক’ গল্পের প্রধান দুই চরিত্র দুটি কিশোর হানাদার জার্মান বাহিনী দ্বারা ঘেরাও হয়ে মাটির তলে গুপ্ত কুঠিতে আশ্রয় নেয়। ওই দুই পোলিশ কিশোরকে জার্মান সেনাধ্যক্ষ প্রাণে বাঁচার জন্য উঠে আসার শেষ সুযোগ দেয়। ওরা ওঠে না। একসময় বাঙ্কারটিতে পানি ঢেলে পূর্ণ করে দেওয়া হয়। মুখ-নাক-চোখ পর্যন্ত পানি উঠে যেতে দুই ভাই একে অপরের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করে! তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোররা প্রাণের চেয়ে স্বাধীনতা বড়ো জেনেছিল। সময়কাল ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ।

জেরেমি এবাইদ। মিশরীয় ইহুদি। কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়াতে একাধিক ব্যবসা তার। কায়রোর অভিজাত পলীতে বসবাস। অভিজাত মহলে ওঠা-বসা। মিশরের নেতা জেনারেল নাগিব শর্ত দেন, এবাইদ ইসরাইলে যেতে পারবে, তবে তার সকল সহায়সম্পত্তি মিশরে রেখে যেতে হবে। এবাইদ কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি; স্থাবর-অস্থাবর সব ফেলে একবস্ত্রে জেরুজালেমে পা রাখেন। সময়কাল ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ।

ইতিহাসের এই তিনটি কাহিনীতে পরতে পরতে দেশপ্রেমের জয়গান। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবনের চেয়ে, সম্পদের চেয়ে, আরাম-আয়েশের চেয়ে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, স্বদেশভূমি অনেক বড়ো হয়ে প্রতিভাত। অমলিন। মহান। এই তিনটি ঘটনার পরে শতাব্দী শেষে আমরা দেখি, ভারতের অজস্র মিশ্র জাতির সম্মিলনে রাজপুত সবার ওপরে। অন্যান্য জাতির কাছে রাজপুতদের পরিচয় বীরের জাতি। হিটলারের ন্যাৎসি বাহিনী প্রায় পুরো ইউরোপই দখল করেছিল। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাঁক করেছিল লাখ লাখ মানুষকে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আক্রমন নির্যাতন চলেছিল পোলিশদের ওপর। বিশেষ করে পোলিশ ইহুদিদের ওপর। পোলিশদের চরম আত্মত্যাগের কারণেই আজো পুরো ইউরোপে পোলিশরা স্বাধীনচেতা অনমনীয় জাতি। বীরের জাতি। পোলিশ কিশোরী আনা ফ্যাঙ্ক তার ডায়রি লিখে রেখেছিল। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক বিক্রিত সেই ডায়রিটি।

শত-সহস্র বছর ধরে ইহুদিরা ভূমিহীন। পথে পথে, তাঁবুতে তাঁবুতে ঘুরে বেড়িয়েছে। একখণ্ড জমি। একটা দেশ। একটা পা রাখার মাটি কী, তা তাদের চেয়ে আর কে ভালো বোঝে? খ্রিস্টান, মুসলমান দ্বারা শত শত বছর ধরে নিপীড়িত হয়েছে তারা। একখণ্ড জমির জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করেছে। আজ যেমন করছে ফিলিস্তিনিরা। আজ যেমন ফিলিস্তিনিরা নিজের দেশ থাকার পরও উদ্বাস্তু। ইহূদি-খ্রীষ্টান দ্বারা নির্যাতিত।

ইহুদিরা যেদিন ভূমি পেয়েছে তার পর থেকে আর ভুল করেনি একটিও। আশ্রয় দেয়নি তাদের দেশের কোনো রাজাকারকে, কোনো আলবদরকে, কোনো দালালকে, কোনো কোলাবরেটরকে, কোনো চামচাকে, কোনো দোদুল্যমানকে, কোনো সন্দেহগ্রস্তকে, কোনো ঘাপটি মারা সাধুবেশি হন্তারককে, কোনো জ্ঞানপাপী পুরোনোপন্থীকে। তাই তারা আজ ছড়ি ঘোরাচ্ছে পুরো আরব বিশ্বের মাথার ওপর। ওরা কখনো মাথায় বসায়নি কোনো স্বাধীনতাপন্থী-মুক্তিযুদ্ধপন্থী ভেকধারী কোলাবরেটরদের। এক মুহূর্তের জন্যও না। বংশপরম্পরার শত্রুকে ছাড় দেয়নি। চল্লিশ বছর আগে এবং এখনো যে স্কুল শিক্ষয়িত্রী বিকাল চারটে অব্দি স্কুলে পড়াচ্ছেন, তিনিই সন্ধ্যে ছটা থেকে রাত বারোটা অব্দি ন্যাশনাল গার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ রোড ডিভাইডার সাজায় ফার্ন, ইউক্যালিপটাস, পাম দিয়ে। ওরা সাজায় আপেল-কমলা লেবু গাছ দিয়ে। কেননা ওরা জানে, শুধুই সৌন্ধর্য্য নয়, প্রয়োজন টিকে থাকা। তাই তারা ভূমি-স্বদেশ-স্বাধীনতা-আত্মমর্যাদা-পূর্বপুরুষদের আত্মত্যাগের মহিমা বোঝে। ঋণ বোঝে। আমরা বুঝি না। আমরা বুঝিনি।

এই তিনটি উদ্ধৃত ঘটনার মতো অনেক হৃদয়গ্রাহী ঘটনাবলি ঘটে গেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। লাখ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগে সিক্ত হয়েছে এই মাটি। হাজারো অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত লাল পেড়ে শাড়ির মতো মেলে আছে এই বাঙলার ঘাসে। কিন্তু এসব তো কাব্যের মতো। আবেগের কথা। রূঢ় বাস্তব কী? আমরা অকপটে আমাদের স্বাধীনতা-স্বদেশভূমি-দেশ মাতৃকাকে তুলে দিয়েছি ধর্ষকের হাতে। হন্তারকের হাতে। আমরা মৌসুমি স্মৃতিচারণবাদী। বছরে দুবার দুচার দিনের জন্য ঘটা করে তাদের স্মরণ করি। এনার্কিস্টের মতো হতাশা ব্যক্ত করি। ক্ষোভ প্রকাশ করি। শেষে বেলাজ-বেহায়ার মতো ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত নিয়ে নির্লিপ্ত মামদোবাজি করি। বেজন্মা-জারজের মতো তাদের দেওয়া, রক্তস্নাত ভূমিতে স্বাধীনতাবিরোধী বেশ্যা জঠরে প্রতিনিয়ত স্বাধীনতাবিরোধী প্রজন্ম তৈরি করি। যাদের কাছে ৭১ সালটা হলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র!

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমরা কী করেছি? গোটাকতক মনুমেন্ট (খুব বেশি মূর্তি গড়তে পারিনি ‘পাপ’ হবে বলে) সামান্য কটা টাকা ভাতা (মুখ চিনে চিনে), সরকারি চাকরিতে অসম্মানজনক কিছু কোটা (রং চিনে চিনে), আর একটা সাদা হাতি- মন্ত্রণালয়। যাদের কাজ সার্টিফিকেট বিক্রি করা, নবায়ন করা আর রাজাকারের বাচ্চাদের টার্মিনেট করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানে রূপ দেওয়া। অবশ্য এসবের বিপরীতে অনেক কিছু করেও বা কী হতো? কারণ আমরা তো রাজাকারদের হাতেই দেশটা, ভূমিটা, স্বাধীনতাটা, আত্মমর্যাদাটা তুলে দিয়েছি। দেশমাতাকে ধর্ষিতা হতে ধর্ষকের হাতে তুলে দেওয়ার পর উপঢৌকন কী পেলাম না-পেলাম তাতে কী-ই বা এসে যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লিপিবদ্ধ ইতিহাস কলঙ্কিত-খণ্ডিত-ভগ্ন। আমাদের শহীদদের তালিকায় সন্দেহের কালো চাদর। আমাদের বীরদের কাতারে চাষাভূষা নেই। অধিকাংশই সেনা। যেন চাষারা যুদ্ধ করেনি। করলেও মরেনি। মরলেও ‘শহীদ’ হয়নি।

আমাদের খানাকতক মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র অসম্পূর্ণ। বাকোয়াজ। আমাদের সাহিত্যে-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ ঘটনাভিত্তিক। বর্ণনামূলক। নিরাপদ অবস্থান থেকে দেখা। আমাদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ খামখেয়ালি তামাশায় বাণীবদ্ধ। আমাদের সংগ্রহশালায় গোটাকতক বন্দুকের নল আর মর্টারের খোসা। আমাদের যুদ্ধকালীন রণহুঙ্কার যেন পরিত্যাজ্য। 'জয়বাংলা' যেন দলীয় আনুগত্য। আমাদের মননে কোনো মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন নেই। কৃতজ্ঞতা, দায়বদ্ধতা, ঋণ শোধ করার অন্তরের বাধ্যবাধকতা তো দূরের কথা। আমাদের স্বাধীনতা আর বিজয়ের দিন যেন মেঘাচ্ছন্ন। বিজয় এবং স্বাধীনতা দিবস যেন ক্যালেন্ডারের ভুল তথ্য।

এই হচ্ছি আমরা। আবেগগ্রস্ত কবির ভাষায় ‘লড়াকু বাঙালি'। অর্ধশিক্ষিত মতলববাজ ফেরেপবাজদের ভাষায় ‘বীরের জাত বাঙালি’। যে জাতি তার মাতৃভূমি উপহার দেওয়া শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করেনা, রক্তের অব্যক্ত ভাষা বোঝে না, যে জাতি তার স্বদেশ-স্বাধীনতার মর্ম বোঝে না, বীরদের বীরত্বকে ভূলুণ্ঠিত করে ধর্ষিতা হতে দেয় আর বিজাতীয় পুলকে ধেই ধেই করে নাচে সে জাতি আবার বীর হয় কী করে? আমি বুঝি না। আমার বোধে আসে না!

স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার অধ্যুষিত জোট সরকারকে ঊনচলিশ-চলিশ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিল। এর পররও হয়ত তা-ই হবে। এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারা নিজেদের স্বাধীনতার 'পক্ষের' শক্তি বলে বেশুমার বাতেনি-জাহেরি করলেও তাদের ভেতর আয়েশে বেড়ে চলেছে রাজাকারি চিন্তা আর অঙ্কুরিত হচ্ছে নয়া ধর্মানুভূতির জজবা। এই মানুষদের অনেকেই একসময় মুক্তিযোদ্ধা ছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুগামী ছিল। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। এরা জেনেশুনেই সরাসরি রাজাকারি সমর্থন করেছে। জেনেশুনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বেঈমানি করেছে। এখনো দেশের সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসির প্রধান প্রধান পদগুলো শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করাদের দখলে। পাকিস্তানপন্থী কোলাবরেটরদের দখলে। এ জাতি এরশাদের মতো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীর নয় বছরের শাসন মেনে নিয়েছে। পাকিস্তানপন্থাকে বরণডালায় বরণ করেছে। এ জাতির একাধিক মহামান্য বিচারপতি মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে বেঈমানি করার জন্য পয়দা হওয়া সেনা শাসনকে বৈধতা দিয়েছে। ক্রমে ক্রমে আমরা প্রায় পঞ্চান্ন-ষাট ভাগ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে বেঈমানি করার কাতারে চলে গেছি। কী করে বলি তাই আমরা বীরের জাতি? আমরা আসলে জাতিগতভাবে দালাল। তামাশা উপভোগী দর্শক। আত্মবিস্তৃত অপগণ্ড। অকাট মুর্খ।

আমাদেরকে যদি রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, এল সালভাদরের মতো যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুদ্ধ করতে হতো, আমাদের প্রজন্মগুলো যদি ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আগুনে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হতো, যদি আমাদের আত্মমর্যাদা শত শত বছর ধরে পদদলিত হতো এবং তা হলে আমরা বুঝতে শিখতাম। দাম দিতে পারতাম। দাম নিতে পারতাম। হতে পারতাম ওই রাজপুত আত্মহননকারী রমণীদের মতো, যারা বর্বর মুঘলদের বশ্যতা স্বীকারের চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় ভেবেছিল। হতে পারতাম ওই পোলিশ কিশোরের মতো, জাত্যাভিমানী। হতে পারতাম জেরেমি এবাইদের মতো, যে কোটি টাকার মায়া ভুলতে পারে একখণ্ড মাটির জন্য। স্বদেশের জন্য।

আমরা এখন কেবলই মানুষকে স্মৃতিটিতি ভুলে সামনে এগুনোর নসিয়ত করি। কেবলই সামনে এগুনোর জন্য পেছনের সকল গৌরব দুপায়ে ঠেলে সরিয়ে দেই। আমরা এখন হিপোক্র্যাসির চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ষোলই ডিসেম্বর, ছাব্বিশে মার্চ সাদা ফিনফিনে জামা-পাজামা,লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে সেলিব্রেটির মত নিজেকে উপস্থাপন করি...চলতে থাকে বেটাক্যাম....হ্যান্ডিক্যাম আর চ্যানেলে চ্যানেলে সুখের পায়রা ওড়ানোর বালখিল্য আদিক্ষেতা। পেছনে ওৎ পেতে থাকা বহুবর্ণের রাজাকাররা-যুদ্ধাপরাধীরা। তাম্বুল রসে রঞ্জিত অধরে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে আরো একটি বিজয় দিবস-স্বাধীনতা দিবসের আগে আরো কিছু দালাল গড়ে তোলার ফন্দি করতে থাকে।

সব পাওয়া ইতিহাসবিস্মৃত মানুষ ক্ষণে ক্ষণে আগুয়ান হতে থাকে রংবেরং এর রাজাকারীর মোহনার দিকে। বাহাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্মের তকমা লাগে! নিরাপদ নিরুপদ্রপ ঘুরে বেড়ায় গোলাম আযম আর তার চিহ্নিত দোসররা। বিচারের নামে অনন্তকালের মোহনায় ঘাঁটি গেড়ে থাকে বিচারালয়! প্রতি বছর একটু একটু করে চাষাভূষা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা চলে যেতে থাকে পেছনের কাতারে....তারপর এক সময় তারা 'নেই' হয়ে যায়! সেই জায়গাগুলো দখল করে 'দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী'র জওয়ান আর বীরপ্রতিক-বীরউত্তম-বীরশ্রেষ্ঠ অফিসারগণ! আর ঠিক সেই সময়ে লাখ লাখ নিহত যোদ্ধা চরম গ্লানির পরম ঘৃণায় পাশ ফিরে শোয়। শুয়েই থাকে।


নোটঃ আমার মাথায় অসুখ করার পর আমি আর দীর্ঘক্ষণ গুছিয়ে লিখতে পারছি না! প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় পুরোনো এই লেখাটি কিছুটা পরিমার্জন পরিবর্ধন করে প্রকাশ করলাম। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29351676 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29351676 2011-03-26 22:07:12
মৃত্যু মানেই ফুলস্টপ, মৃত্যু মানেই ডট.



দগ্ধ দুপুরে এক কিশোরীকে
লেবনচুষ খেতে দেখেছিলাম।
তার বেণী দুলিয়ে হাঁটার ছন্দ
সদ্যজাত হরিণ শাবকের মত।
এলোমেলো পায়ে যে সারাক্ষণ
মাতৃ স্তন খুঁজে ফেরে! কখনো
বিপুলানন্দে দৌড়ে যায়, ফিরে আসে।

রঙচটা বিকেলে এক তরুণীকে
ভ্রু বাঁকা করে চাইতে দেখেছিলাম।
বাঁকানো ভ্রু কত কি বলে বুঝতে পারিনি;
আমি তখন দৌড়ে বেড়াই, এদিক থেকে
ওদিকে যাই, পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ি,
স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই, স্বপ্ন বেচি!
বিমলানন্দে বাঁকানো ভ্রুর অস্ফুট কথা
নিলাম করি সীতা-রামের কুম্ভ মেলায়।

ঝিমধরা রাতে এক রমণীর ঠোঁটে অবজ্ঞার
ফ্রেমে বাঁধানো পোট্রেট দেখেছিলাম।
সযত্নে লালিত তাচ্ছিল্যের রঙে আঁকা
পুরোনো পোট্রেট ঘসে মেজে নতুনের মত!
আমি তখন স্থির থাকি, নিরব থাকি,
স্বপ্ন নয়, পাহাড় নয়, শুধুই আমার
নিঃশব্দের নিঃসঙ্গ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকি।

ধনুকের মত বাঁকানো ভ্রু ধনুক হয়ে
তীর খুঁজে নেয়, লক্ষ্যভেদে তীর ছুড়ে দেয়!
তখনো আমি স্থানুর মত পলকহীন তাকিয়ে থাকি!
সরতে পারি না, সরাতে পানি না,
বিস্ময়ে বিস্ফোরণে পায়ে আমার শেকড় গজায়।
সেই থেকে আমি অন্ধ।
রূপ রস সুধা কিছুই দেখিনা, কেননা
অন্ধেরা স্বভাবতই দেখার অভিনয় করে না!

ধোঁয়াটে ধূসর অন্ধ চোখে ঘুম আসে না!
তখনো আমি নিঃস্ব নই, আছে বুকের
গহিনে চেনা মানুষের হাজার স্মৃতি।
প্রিয় মানুষের আপন কথা, বানানো ব্যথা।
দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভ্রুকুটি মেশানো সামান্য কথা
অসামান্য হয়ে তীব্র বেগে ছুটে আসে,
ইথারে চেপে শত গুণ হয়ে ছুটে আসে।

আমি তখন খাদের কিনারে শেষ ধাপে!
সামনে ধেয়ে আসা শেল, পেছনে গহীন খাদ।
নিশ্চিত আমি, নিশ্চিত আমি মরণ দেখেও
দাঁড়িয়ে থাকি, কেননা দুপাশেই মৃত্যু!
শেল বেধা বুকে রক্ত ঝরে না, তবুও
সেই থেকে আমি মৃত। কায়াহীন ছায়া!

কারা এসে কফিনে পেরেক পোঁতে!
কারা এসে কফিন ঠেলে ঠেলে নেয়!
ওরা এসে কফিনে দাপাদাপি করে!
ওরা জানে না, শত চেষ্টাও মৃতেরা জাগে না।
ওরা এসে স্নান সারে, সুগন্ধী মাখে!
চোখের কোণায় কালো দাগ দেখে!
সরাতে চায়, সরতে চায়,স্মৃতিভ্রুণের মৃত্যু চায়!
ওরা জানে না, জানতে পারে না,
মৃত্যু মানেই ফুলস্টপ, মৃত্যু মানেই ডট!

২২ মার্চ ২০০১১

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29348978 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29348978 2011-03-22 05:27:56
ঢাকাঃ > সিটি অব ডেঞ্জার, সিটি অব হেল ! (২) রাজধানীর সড়ক বলেই কী রাজপথ ?

ঢাকার গোড়াপত্তনকালে ঢাকায় কেমন রাস্তা বানানো হয়েছিল সে তথ্য খুব একটা বেশি পাওয়া যায়না, তবে আজ থেকে প্রায় চার’শ বছর আগে যে শহরের রাস্তাঘাট গড়ে উঠেছিল সে শহরের রাস্তা ঘাটের হাল এই একবিংশ শতকে এসেও সেই চার’শ বছরের পুরোনো দশাতেই কেন থেকে যাবে সেই প্রশ্ন এই ঢাকাতে অবান্তর। বলা বাহুল্য পুরোনো ঢাকার সেই সময়কার রাস্তা ঘাটের পাশে বর্তমান আধুনিককালের রাস্তাঘাটের চেহারা তুলনায় আনলে বিস্মিত হতে হয়! একটা অদ্ভুত তথ্য হচ্ছে সামান্য বৃষ্টি হলেই যেখানে আধুনিক ঢাকার রাস্তা ঘাট জলে থৈ থৈ করে, রীতিমত নৌকা চালানোর মত অবস্থা হয়ে যায়, সেখানে এখনো পুরোনো ঢাকায় সেই আদ্দিকালে বানানো রাস্তায় জল জমেনা! তাহলে কি ধরে নিতে হবে, চার’শ বছরের পুরোনো প্রযুক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি! ব্যাপারটা সেরকমই!

সে আমলে রাস্তাঘাট বানানোর সময় এখনকার মত প্রতিটি ঘাটে ঘাটে ঠিকাদারকে উৎকোচ দিতে হতোনা। কাজ পাওয়া বা সেই কাজ শেষ করার পর ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাড়িতে টাকার বান্ডিল পাঠাতে হতো না, আর ইঞ্জিনিয়ার সাহেবেরাও বান্ডিল পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফাইনাল বিলে স্বাক্ষর করত না। আধুনিকায়ন এই শহরের ঠিকাদার-ইঞ্জিনিয়র উভয়কেই ‘আধুনিক’ করেছে! পরিশীলিত করেছে! এরা এখন 'ঠিকঠাক' করে নেয় যে কবে নাগাদ এই কাজটার নতুন ঠিকা দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়।

ঢাকার যানজট নিয়ে এই দেশের এমন কোনো সেক্টর নেই যারা কোশেশ করে গলদঘর্ম হয়নি! বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে পুলিশের বড়োকর্তা পর্যন্ত যানজট নিরসনে আলাদীনের চেরাগ ঘসে ফর্মুলা বের করার কসরত করে যাচ্ছে এন্তার। আমরা মাঝে মাঝেই কাগজে সেসবের বিস্তারিত বয়ান দেখি, আর নিশ্চিত হই- আরো এক প্রস্থ কামানোর ধান্ধা হলো বটে! এই সব বড়োকর্তারা এমন সব ফর্মুলা দেন যা বাস্তবায়নের আগেই বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের মাথা ঘুরে যাবার যোগাড়! বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এইসব ‘মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের চিন্তা করা হয় ঢাকার এইসব চন্দ্রপৃষ্ঠের মত এবড়োথেবড়ো ভাঙ্গাচোরা প্রায় ডাস্টবীন বা গোভাগাড়ের মত দেখতে রাস্তাকে অপরিবর্তিত রেখেই! কী সব মহাপরিকল্পনার বহর দেখুন-

যানজট কমাতে এখন দরকার সেকেন্ডারি সড়ক! শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে উঁচু টং ঘর নির্মাণ করে সেখান থেকে চারটি রাস্তার গাড়ির সংখ্যা দেখে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে লাল ও সবুজ বাতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতি রাস্তায় একটি ঘড়ি বসানোর মাধ্যমে ওই রাস্তার সবুজ বা লাল বাতির সময়ও জানিয়ে দেওয়া যাবে। তাতে জ্বালানি খরচ কমবে এবং বায়ুদূষণের পরিমাণও রোধ করা সম্ভব! ড. শামসুল হক অধ্যাপক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট পরিচালক, এক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউট’ এবার আরো কিছু মহাপ্ল্যানদিয়েছেন -" আমরা ইচ্ছা করলে আমাদের উদ্ভাবন ব্যবহার করে যানজট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে উঁচু করে টং ঘর নির্মাণ করে সেখান থেকে চারটি রাস্তার গাড়ির সংখ্যা দেখতে পারি। ওপর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে লাল ও সবুজ বাতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যে রাস্তায় যতটুকু গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া দরকার, তা তাৎক্ষণিকভাবে ওখান থেকেই করতে পারি। প্রতি রাস্তায় একটি ঘড়ি বসানোর মাধ্যমে ওই রাস্তার সবুজ বা লাল বাতির সময়ও জানিয়ে দিতে পারি। এতে জ্বালানি খরচ কমবে এবং বায়ুদূষণ রোধ করা যাবে। ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে, যার জন্য কন্ট্রোল রুমের প্রয়োজন নেই। লোকসংখ্যা কমিয়ে যে খরচ বাঁচবে তা দিয়ে আমরা এ কাজ করতে পারি, যা আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে টেকসই পদ্ধতি।"

এমন শত শত মাথাভারি আর মাথাঘোরানো মহাচিন্তা প্রায়শঃই আমাদের দেখতে হয়। গিলতে হয়। কিছুদিনের ভেতরই যখন এই রকম এক একটি পকিল্পনা বাস্তবায়ন হয় সাথে সাথে যানজট আর এক প্রস্থ বেড়ে যায়। তখন আর এই সব মহাপরিকল্পককে খুঁজে পাওয়া যায়না।

আমরা একটা সহজ হিসাব বুঝি। রাস্তা মসৃণ থাকলে গাড়িগুলো সাবলীলভাবে চলাচল করতে পারে। এটা বোঝার জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞকে ডাকতে হয়না। কিন্তু ঢাকার রাস্তাগুলো কী মসৃণ? এই মসৃণ শব্দটা ব্যবহার ঠিক হলোনা। বলতে হবে ‘ঢাকার রাস্তাগুলো কি গাড়ি চলাচলের উপযোগী ?’ এককথায় এর উত্তর হচ্ছে- না।

কেউ যদি মৌচাক মোড় থেকে রামপুরাগামী রাস্তাটির দিকে কোনো উঁচু জায়গা থেকে তাকিয়ে থাকেন তিনি দেখবেন জবড়জং গোলমেলে হাজার হাজার বিভিন্ন প্রজাতির যানবাহন খুব ধীর গতিতে হেলেদুলে এগুচ্ছে..... প্রথমে মনে হবে এই বাস, কার, রিকসাগুলি মনে হয় পানিতে ভেসে চলছে! এটা মনে হবে তাদের দুলিনি দেখে! এপাশ-ওপাশ দুলে যেন ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে! কারণ কি? কারণ এই মৌচাক থেকে বাড্ডা পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাকে কোনোভাবেই আর রাজপথ বলার উপায় নেই। এই পথে এমন বিশ মিটার রাস্তা নেই যেটুকু সমান! পুরো রাস্তাটার বুকে বড়ো বড়ো ফোস্কার মত ফুলেফেঁপে উঠেছে। ফুলে ওঠার পাশেই আছে হঠাৎ গর্ত। কোনো একটি ম্যানহোল নেই যেটি রাস্তার সাথে মিশে আছে! হয় চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি উঁচু, না হয় পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি নিচু। সেখানে ঘটাং। নিচুতেও ঘটাং আবার উঁচুতেও ঘটাং।

কেন হলো? কারণ খুব সোজা। পিচের সাথে পাথর মিশিয়ে যে পরিমান তাপমাত্রায় জ্বালিয়ে ইমালশন বানাতে হয় তার কিছুই করা হয়না। কোনো মতে পিচের সাথে নুড়ি পাথর জ্বাল দিয়ে রাস্তায় ঢেলে দেয়া হয়। আর সেই কাজটি করা হয় চলন্ত রাস্তায়! ফলে কয়েক মিনিট পরেই সেই ইমালশনের উপর দিয়ে গাড়ির চাকা যেয়ে ইমালশন দুই দিকে সরিয়ে দেয়। পট্টি দেয়া জায়গাটুকু আবার দগদগে ঘা হয়েই থাকে। এ্যাসফল্ট প্লান্ট দিয়ে রাস্তায় কার্পেটিং হয়না কবে থেকে সেটা আর কারো মনে নেই।
গত দেড় দশকে এই বস্তুটিকে কেউ ঢাকার রাজপথে দেখেনি। গত দেড় দশক ধরে ঢাকার কোনো রাস্তা খুঁড়ে নতুন করে মেরামত হয়নি। ঢাকার কোনো রাস্তাই শতভাগ ব্যবহার উপযোগী নেই।

এক’শ ফুট রাস্তার প্রথম চারপাঁচ ফুট দাঁড়ানো রিক্সা, ঠেলাগাড়ি, রিকসা মেরামতের দোকান, সিমেন্ট বালুর দোকান আর ডাস্টবিননে ভরা। সেই সাথে প্রথম পাঁচ ফুটের অনেকাংশেই ভাঙ্গা ড্রেন। হঠাৎ হঠাৎ এক একটা জায়গায় গর্ত। ভাঙ্গা ম্যানহোল। অর্থাৎ কোনো ভাবেও প্রথম পাঁচ ফুট ব্যবহার করার সুযোগ নেই। এর পরের দশ ফুটে আছে ঠাস দেয়া রিকসা বহর। কেউ হাল্কা চালে দুলে দুলে চলছে, কেউ থেমে থেকে দোকানের সাইনবোর্ড দেখছে, কেউ ওইখানেই মোড় ঘুরে বিপরীত দিকে যাবার চেষ্টা করছে। এর পর বাকি থাকল মূল রাস্তার বিশ-ত্রিশ ফুট। সেটুকুরও ডিভাইডারের দিকের তিন-চার ফুট চলাচলের উপযোগী নেই। আইল্যান্ডের ভাঙ্গা অংশ, তারকাটার ছেড়া অংশ, ম্যাহোলের খোলমুখ, অথবা ম্যানহোলের হঠাৎ উঁচু হওয়া মুখ আছে।

মোদ্দা কথা ঢাকায় যদি এক হাজার কিলোমিটার রাজপথ থাকেও তার পুরোটা ব্যবহার উপযোগী নয়। সব চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে সাধারণত আমাদের দেশের বড়ো কর্তাদের সব কিছুই বেশ চকচকে ঝকঝকে থাকে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে সয়ং প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের সামনেই একটি ম্যানহোল বিপজ্জনকভাবে গর্ত হয়ে আছে। সেই গর্তের গভীরতা কমপক্ষে চার-পাঁচ ইঞ্চি! আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে, প্রধানমন্ত্রী যে গাড়িতে যাতায়াত করেন সেই গাড়িটি অত্যন্ত দামি এবং তার শক এ্যাবজর্বারও খুব সহনশীল। অথবা প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি চালক বিচক্ষণ। তা না হলে ওই গাড়িটির চাকা প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে বেরিয়েই সেই গর্তে পড়ার কথা। আর তাতে করে আর কিছু হোক না হোক অন্তত ওই গর্তটা বন্ধ করার আদেশ পেতেন মহান বিভাগীয় কর্ণধারেরা।

রাস্তা। রাস্তার ব্যবহার। রাস্তার মসৃণতা। রাস্তায় বাতির ব্যবহার। রাস্তায় যানবাহনের চলাচলের আইন। ডিভাইডারের উপযোগীতা। যত্রতত্র ডিভাইডার কেটে বাইপাস বানানো। ডিভাইডারে কাটাতারের বেড়া। রাজধানীতে বাঁশের বেড়া দিয়ে রাস্তা আলাদা করা! হাজার হাজার ম্যানহোলের একটিও রাস্তার সাথে সমান্তরাল নয়। রাস্তার উপর আবর্জনার স্তুপ। দিনেদুপুরে খোলা ট্রাকে আবর্জনা নেয়ার সময় সারাটা পথজুড়ে আবর্জনা ছড়ানো। খোলা ট্রাকে মাটি নেয়ার সময় সারাটা পথজুড়ে মাটি ফেলতে ফেলতে যাওয়া। সেই মাটি শুকিয়ে কংক্রিটের মত শক্ত হয়ে ঘটাং! রাস্তার মাঝ বরাবর খুঁড়ে এটা ওটা করার পর আর ঠিকমত মেরামত না করা। এমন হাজার হাজার অনিয়ম আর রাম রাজত্ব বজায় রেখে দিব্যি এই মহানগরীর কর্ণধারেরা বেতন-ভাতা হালাল করে চলেছেন। আর মাঝে মাঝে যানজট নিরসনের বায়বীয় আওয়াজে কান ভারী করছেন। সাথে সাথে কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ করে চলেছেন। এমন উদ্ভট জবড়জং সেই আদ্দিকালে মেঠো পথের মত পথঘাট নিয়ে কী ভাবে এই নগরকর্তারা আধুনিকায়নের বায়বীয় স্বপ্ন দেখেন সে এক আশ্চর্যজনক বিষয় বটে।

পাদটীকাঃ ১. রাস্তার উদ্ধার করুন। ২. রাস্তাকে দখলমুক্ত করুন। ৩. রাস্তার সংখ্যা এবং আয়তন বাড়ান। ৪. রাস্তায় সেবা সংস্থাগুলোর মামদোবাজি বন্ধ করুন। ৫. মেরামত ঠিকঠাক না হলে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা করুন। ৬. ডিভাইডার থেকে অবিলম্বে কাটাতারের বেড়া এবং বাঁশের বেরিকেড সরান। ৭. ম্যানহোল রাস্তার সাথে সমান্তরাল না হলে যারা ম্যানহোল বসাচ্ছে তাদের চাকরিচ্যুত করুন। ৮. রাস্তা থেকে সকল প্রকার মেরামতি কারখানা অপসারন করুন। ৯. প্রতিদিন মেরামতি গাড়ি সেই পাকিস্তান আমলের মত রাস্তায় টহল দিক। ১০. ঢাকার রাস্তাগুলো আগে মনুষ্য চলাচলের উপযোগী করার পর তারপর অন্য উন্নয়নের কথা ভাবুন। চলবে............

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29346456 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29346456 2011-03-18 00:52:32
ঢাকাঃ > সিটি অব ডেঞ্জার, সিটি অব হেল ! (১)


প্রথম কিস্তিঃ
বেশ কিছুদিন আগে বিশ্বের অন্যতম দুষণযুক্ত নগরী হিসেবে ঢাকার নাম আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হয়েছিল। সেই জরিপে বিশ্বের সব চেয়ে দুষিত নগরী বলা হয়েছিল বাকু’কে। আর ঢাকার অবস্থান ছিল- বিশ্বের দ্বিতীয় দুষিত নগরী হিসেবে। এর পরের বছর এবং এবারো ঢাকা তার সেই 'মহান' ঐতিহ্য ধরে রেখেছে! বলা বাহুল্য এই জরিপকাজ করা হয় বা হয়েছিল আমাদের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং বিভিন্ন ভাষ্য কেন্দ্র করে। সংবাদপত্রে ঢাকার দুষণের বা যানজটের কিংবা শব্দদুষণের সব খবর প্রকাশ হয় না। যদি তাই হতো তাহলে বাকু কিংবা হারারে কোনোভাবেই আমাদের ‘তিলোত্তমা’ ঢাকাকে হারাতে পারত না! নিশ্চিতভাবেই আমরা প্রথম হতাম!

ঢাকা যে বিশ্বের সব চেয়ে দুষিত, সব চেয়ে শব্দদুষণে দুষ্ট, সব চেয়ে স্থবির, যানজটে নাকাল, নিয়মহীনতায় শ্রেষ্ঠ এতে আর কারো কোনো সন্দেহ থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু খোদ ঢাকাবাসীর কোনোই সন্দেহ নেই। একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কোনোভাবেই বিশ্বের আর কোনো দেশের রাজধানীর সাথে তুল্য হতে পারে না। উন্নত দেশের রাজধানীর কথা তোলা অনাবশ্যক। আমাদের মত পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর কোনোটির রাজধানীর এমন করুণদশায় নেই। শুধু কি তাই? যাতায়াত, দুষণ, শব্দদুষণ, নোংরা-আবর্জনা এবং যানজটের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য শহরগুলো থেকেও ঢাকা পিছিয়ে! একটা অদ্ভুত নিয়মহীনতা, অনাচার, অনিয়ম, নীতিহীনতা, বিশৃঙ্খলতা, নির্লিপ্ততা, তুঘলকী কারবার আর মগের মুল্লুকের মত প্রায় দেড় কোটি মানুষের চাপ বুকে নিয়ে এটাই বাংলাদেশের রাজধানী! কোন বাংলাদেশে ? যে বাংলাদেশ নিজেকে এখন ডিজিটাল দেশে রূপান্তরের স্বপ্নে বিভোর!

একটি আধুনিক নগরীতে সড়ক থাকতে হবে নগরীর মোট আয়তনের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ ঢাকার আয়তন যদি এক’শ বা এক’শ কুড়ি বর্গ কিলোমিটার হয় তাহলে সড়ক থাকতে হবে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বর্গ কিলোমিটার। এখন আছে খুব বেশি হলে পনের থেকে কুড়ি বর্গ কিলোমিটার। বিশ্বের তো বটেই, বাংলাদেশের আর পাঁচটি বড়ো শহরের তুলনায় ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা নিকৃষ্টতম। সারা ঢাকার কোথাও টানা এক কিলোমিটার মসৃণ সড়ক নেই। জাহাঙ্গীর গেট থেকে ভেতর দিকের ব্যাপার আলাদা। সেখানকার তুলনা আর কোনো কিছুর সাথে চলে না।

ঢাকার এই সড়কগুলো কোনো এক সময় হয়ত সড়ক ছিল। পরে এর সর্ব শরীরে ম্যানহোল বসিয়ে একে করা হয়েছে ‘আন্ডারপাসের উপরিভাগ’। অর্থাৎ পুরোটাই আন্ডাগ্রাউন্ড ড্রেন। সেই ড্রেনের উপরিভাগকে বলা হচ্ছে রাজপথ! সেই তথাকথিত রাজপথে চলছে আদ্দিকালের ঘোড়াগাড়ি থেকে একেবারে লেটেস্ট মডেলের বিএমডাব্লিউ বা মার্সিডিস বেঞ্জ! আছে রিকসা, রিকসাভ্যান, ঠেলাগাড়ি, অটো, অটো রিকসা, পিকআপভ্যান, বাস-ট্রাক, প্রাইভেট কার, পঞ্চাশ ফুট লম্বা কনটেইনারবাহী ট্রেইলার, মোটর সাইকেল, বাই সাইকেল,ভিখারীদের ঘরে বানানো কাঠের ছোট চাকার ঠেলাগাড়ি, আরো হরেক কিসিমের যান্ত্রিক এবং অযান্ত্রিক যানবাহন। এই বিশাল যানমচ্ছবের চলাচলিতে সব কিছুই আছে, কেবল নেই কোনো শৃঙ্খলা। নেই আইন কানুন মানার বালাই।

মাত্র চল্লিশ বছর আগে এই শহরটি যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী, তখন এবং তার পর প্রায় আশির দশক পর্যন্ত এই নগরীতে সকল সড়কেই রিকসার অবাধ যাতায়াত ছিল। তখন গরু বা মোষে টানা ময়লা বহনের গাড়িও ছিল। সে সময় গুলিস্তান থেকে ফার্মগেটে যেতে রিকসায় আধা ঘন্টা লাগত, এখন বিএমডাব্লিউ বা মার্সিডিস গাড়িতে লাগে এক ঘণ্টার উপর। শুধুই কি যানজটের কারণে? না। ঢাকার অদ্ভুত ট্রাফিক সিস্টেমের কারণে এই সময় লাগছে।

ঢাকার যানজট নিয়ে প্রতিটি সরকারই বিশাল বিশাল প্রকল্প হাতে নেয়। সেই সরকারের আমলে তো বটেই, পরবর্তি সরকারও সেই সব প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। এক একটা প্রকল্প মানেই কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ। এক একটা প্রকল্পের গালভরা নামের বাহার দেখা যায় মিডিয়ায়। পত্রিকার পাতায় পেল্লাই সব আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। বিশ্ব ব্যাঙ্ক, এডিবি, বা এই ধরণের দাতা সংস্থার অর্থায়নে সেই সব প্রকল্প বাস্তবায়নের খবর শোনা যায়। কোনো কোনো প্রকল্প বাস্তাবায়ন হয়ও। তারপর দেখা যায় সেই প্রকল্প বাস্তাবায়নের আগের চেয়ে যানজট আরো একমাত্রা বেড়ে গেছে। এ যাবত যতগুলো ‘উপায়’ ঠিক করে সেগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে, তাতে যানজট তো কমেইনি বরং আরো এক প্রস্থ বেড়ে গেছে। এখন আর এ নিয়ে কেউ আশাবাদও ব্যক্ত করে না! সবাই যেন ধরেই নিয়েছে- এ শহরে সবই সম্ভব! এ শহর মরল বলে!

একটি আধুনিক নগর ব্যবস্থা আর সেই নগরের পরিকল্পনা কেন্দ্র করে যা যা থাকা দরকার বা থাকা উচিৎ তার সবই এই নগরকে কেন্দ্র করে ছিলো এবং আছে। প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার বাজেট, সেই বাজেট বাস্তবায়ন, নতুন নতুন প্ল্যান, সেই সব প্ল্যান বাস্তবায়ন, সবই হচ্ছে। তারপরও এই নগরী কোনো ভাবেই স্বাভাবিক মনুষ্য চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে না। যানজট নিরসন, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, শব্দদুষণ কমানো, দুর্ঘটনা কমানো, এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ আর নির্বিঘ্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ আর দপ্তরে একের পর এক প্ল্যান চকআউট করা হচ্ছে আর প্রতি দিনই আগের দিনের চেয়ে যানজটের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে! এই প্রায় মৃত নগরীকে মোটামুটি মনুষ্য চলাচলের উপযোগী করবার জন্য ডজন ডজন প্রতিষ্ঠান আর হাজার হাজার লোকলষ্কর দিন রাত ঘামঝরা পরিশ্রম করে যাচ্ছে! তাদের ‘অক্লান্ত’ পরিশ্রমের ফসল- আরো এক প্রস্থ যানজটের বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা।

এই নগরীকে দেখভাল করার জন্য আছে ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা আরবান কম্যুনিকেশন ডিপার্টমেন্ট, রোডস এন্ড হাইওয়ে, বিআরটিএ, বিআরটিসি, ট্রাফিক পুলিশের ডজন ডজন দপ্তর আর উপ দপ্তর, এশিয়ান হাইওয়ের পার্ট প্রজেক্ট, এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলে একটি আলাদা মন্ত্রক। এদের সাথে আছে, ওয়াসা, ডেসকো, পিডিবি, টেলি কমিউনিকেশন, ঢাকা আরবান ক্লিনিং প্রজেক্টসহ আরো হরেক কিসিমের প্রতিষ্ঠান। এর উপর প্রায় প্রতি মাসেই যানজট নিরসন বা এই ধরণের কিছু গালভরাবুলি সর্বস্ব বিশেষ কমিটি, যাদের কাজ হলো গবেষণা করে ঢাকাকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। তারা একটি কাজই পারেন, তা হলো যে সব প্রকল্পে শত শতকোটি টাকার ব্যাপারস্যাপার আছে, সেই সব প্রজেক্ট সরকারকে গেলানোর চেষ্টা করে যাওয়া।

একটা প্রাগৈতিহাসিক যান চলাচল ব্যবস্থা বহাল রেখে এরা এখন নতুন করে সুর তুলেছেন- ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, আরো ফ্লাইওভার, আরো বাইপাস, আরো আন্ডারপাস, আরো ওভারপাস, ইলেকট্রিক ট্রেন, কমিউটার ট্রেন, চার লেন, ছয় লেনসহ আরো কত কি! এটা জলের মত পরিষ্কার যে এই সব এক একটা প্রকল্প মানেই সেই সব কর্তা ব্যক্তিদের পকেটে মোটা অংকের উৎকোচ ঢুকে যাওয়া। অথচ এই ঢাকা নগরীকে মোটামুটি বসবাসযোগ্য আর সাবলীল চলাচলযোগ করার জন্য খুব বেশি কোশেশ করার দরকার করেনা। সৎ চিন্তা, সঠিক পরিকল্পনা আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়চিত্ত হলেই খুব বেশি হলে ছয় মাসের মধ্যেই এই প্রায় স্থবির হয়ে যাওয়া ঢাকাকে মোটামুটি চলনসই একটি নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সব কিছুর আগে মাথাভারি দপ্তরের মোটামাথা কর্তাদের উচ্ছেদ করতে হবে।

এই আলোচনায় একে একে যে বিষয়গুলি আসতে পারে, তা হলো- নগরীর সড়ক, সড়ক ব্যবস্থা, যানবাহনের প্রকৃতি, যানবাহন নিয়ন্ত্রণের উপায়, শব্দদুষণের কারণ, শব্দদুষণ দূর করার উপায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থা, ট্রাফিক বাতির ব্যবহার, ট্রাফিক পুলিশের যোগ্যতা, সেবাদানকারী বিভাগগুলোর সমন্বয়, আইন তৈরি, আইনের প্রয়োগ, আইনের প্রতি আইন প্রণেতাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন, আইন মানতে বাধ্য করণ, মাথাভারি পরিকল্পনার পরিবর্তে দেশি টেকসই পরিকল্পনা এবং আগামী কুড়ি বছরের আগাম পরিকল্পনা। মোটামুটি এই বিষয়গুলি এই আলোচনায় ক্রমান্বয়ে উঠে আসবে।

এই রচনার সার সংকলন হিসেবে একটি প্রতিচিত্র দেয়া যেতে পারে-

বিশ্বের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক যানজটের শহর ঢাকা! বিশ্বের সবচেয়ে ঘিঞ্জি আর ঘিনঘিনে চলাচলের শহর ঢাকা! বিশ্বের সবচেয়ে নোংরা আর আবর্জনাময় শহর ঢাকা! বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক আর সবচেয়ে প্রাগৈতিহাসিক যানবাহনের সহাবস্থানের শহর ঢাকা! বিশ্বের তো বটেই, বাংলাদেশের সবচেয়ে ধুলিময় শহর ঢাকা! বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদুষণের শহর ঢাকা! বিশ্বের এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে এবড়োথেবড়ো আর ভাঙ্গাচোরা সড়কের শহর ঢাকা! বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানের ট্রাফিক সিস্টেমের শহর ঢাকা! বিশ্বের একমাত্র নাগরিক পরিবহনহীন শহর ঢাকা! বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক যাতায়াতের শহর ঢাকা! পুলিশের সবচেয়ে অথর্ব আর উর্বর মস্তিষ্কের বিভাগ-ঢাকা ট্রাফিক পুলিশ! দেশের সবচেয়ে অথর্ব আর অপদার্থদের দিয়ে কাজ চালানো বিভাগের হাতেই ন্যাস্ত গ্রেটার ঢাকার সড়ক যোগাযোগ আর যাতায়াত ব্যবস্থা!

এই ঢাকা সম্পর্কে ফুট নোটঃ ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল’........এই রাজধানী দেখে আর যাই হোক বিশ্বের কোনো জাতি আমাদের সভ্য ভাবতে পারে না!

চলবে...........




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29345029 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29345029 2011-03-15 20:55:05
লিবিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্সের স্বার্থ কি? তিউনিসিয়া-মিশরে নিশ্চুপ, এখানে সরব কেন?
এর মানে কি বাংলাদেশে এই ঘটনার কোন ইম্পলিকেশন নেই? বাংলাদেশের গণমানুষের মনে কোন প্রভাব পড়ছে না বা পড়বে না এর? এত বড় একটা চলমান ঘটনা, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ৪৯.৮% মানুষ প্রতিদিন খাদ্যাভাবে থাকে, সেখানে কোন প্রভাব না ফেলেই পারে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মনোপলি পুঁজির কুক্ষিগত মিডিয়া মানুষের মানসপটে এর ছোঁয়া লাগতে দিতে নারাজ।

তিউনিসিয়া ও মিশরের দুর্দান্ত অভ্যুত্থানের পর এবার লিবিয়ায় শুরু হয়েছে 'বিদোহ'। পশ্চিমা বিশ্ব একে গৃহযুদ্ধ বলে প্রচার করতে প্রাণপাত করছে। জাতিসংঘ ও ইইউ ইতিমধ্যেই স্যাংকশন ইম্পোজ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করেছে তাদের দেশে থাকা লিবিয়ার সম্পদ। পূর্বাঞ্চলের একাংশ বিদ্রোহীদের দখলে। সরকারী বাহিনী তা পুনঃরুদ্ধারের জন্য আজ থেকে পাল্টা-আক্রমণ শুরু করেছে।

কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিপ্লবের নায়ক গাদ্দাফি কি নিজ দেশের নাগরিকদের এভাবে সাপ্রেস করবেন? যেই লোক ঔপনিবেশিক প্রভুদের হাত থেকে মুক্ত করে লিবিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করলেন, ব্যাপক সংস্কার করলেন রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতি, অর্জন করলেন অভূতপূর্ব হিম্যান ডিভালাপমেন্ট ইন্ডেক্স রেটিং, এ্যাক্টিভলি সমর্থন করলে দেশে দেশে স্বাধীকারের আন্দোলন, নিজের দেশের রাজতন্ত্র হটিয়ে চালু করলেন ডিরেক্ট ডেমোক্রেসী - তাকে কি ডিক্টেটর বলা চলে? তাকে কি ধাই করে বলা যায় বিদায় হও? প্রসঙ্গতঃ আপনার নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে গাদ্দাফি প্রেসিডেন্টও নন প্রধানমন্ত্রীও নন, সুতরাং কোথা থেকে চলে যাবেন তিনি?

এদিকে আমেরিকার যুদ্ধবিমানবাহী নৌবহর সুয়েজ খালের কাছাকাছি চলে এসেছে। ব্রিটেইনের মিলিটারি একেবারে প্রস্তুত, ফ্রান্স ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়বে পড়বে করছে। জাতিসংঘ হঠাৎ ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠেছে, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে লিবিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করেছে। পশ্চিমা বিশ্ব আরেক ইরাক যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আরবদেশগুলোতে গণবিক্ষোভের ঢেউ কাঁপিয়ে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর 'স্ট্যাবিলিটির' ধারণা। কিন্তু এত সহজে হটে যাবার কোন কারণ নেই গত শতকজুড়ে কয়েকশ' যুদ্ধ বাঁধানো সাম্রাজ্যবাদের।

এখানে আরো একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার - পিক অয়েল। সভ্যতার শক্তির মূল উত্স অনবায়নযোগ্য খনিজ পেট্রোলিয়ামের উৎপাদন এখন কমতির দিকে, এই গ্রহের অভ্যন্তরের থাকা তেলের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ছাড়িয়ে এসেছি আমরা। এ নিয়ে তোলপাড় চলছে পশ্চিমা বিশ্বে। এতদিন স্বীকার না করলেও আমেরিকাও এখন স্বীকার করছে পিক অয়েলের কথা। ব্রিটেইন একটি সংসদীয় কমিটি করেছে।

এ অবস্থায় তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলোতে যদি গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটে তাহলে তা প্রবল মাথাব্যাথার কারণ বটে। সুতরাং তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে হবে। এ নিয়ে বেয়াড়া লিবিয়াকে আয়ত্ব করার জন্য 'গন-অভ্যুত্থানের' মোড়ক ব্যবহার কথা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি না ভেবেই পারে না।

বিক্ষোভ শুরুর দিনই বিক্ষোভকারীরা কি করে মেশিনগান নিয়ে রাস্তায় নেমে গেল, কোথায় পেল এন্টি-এয়ারক্রাফট অস্ত্র যা দিয়ে মিলিটারীর বিমান ভূপাতিত করলো, কেন পশ্চিমা মিডিয়া তোলপাড় শুরু করলো মানবাধিকার মানবাধীকার বলে - এসব প্রশ্নের ফয়সালা হওয়া জরুরী।

বন্ধু ব্লগার "প্রশ্নোত্তর" এভাবে ভেবেছেন। আর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা কে কিভাবে ভাবছি সেটা প্রশ্নোত্তর জানতে চাইছেন। আমি লেখাটি হুবহু পোস্ট করলাম। এখানে আমার মতামত দেয়া হলো না। আমার যে যে ক্ষেত্রে দ্বিমত আছে তা আমি পোস্টে একর পর এক আপডেট করতে থাকব ব্রাকেট বন্দী করে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29341503 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29341503 2011-03-10 00:11:01
উন্মত্ত ক্রিকেট উন্মাদনায় চাপা পড়ে গেছে ডলার কামানো মেশিন-লিবিয়ায় আটকে পড়া অসহায় শ্রমিকের মৃত্যুচিৎকার

"আমি বহু কাজের ব্যাখ্যা পেয়েছি কিন্তু কোনোভাবেও খুঁজে পাইনি, মানুষ খেলে কেন?" -- বার্নাড শ' "লগ্নি শত সহস্র কোটি হলেও খেলা মানেই দিন শেষে ধুলো ঝেড়ে ঘরে ফেরা"! "যে শ্রমিকটি লিবিয়ার কোন এক অজ্ঞাত স্থানে জির্ণ তাবুর নিচে মৃত্যু প্রহর গুনছে, তার কানে যখন পৌঁছুবে ৬/৭ হাজার টাকা দিয়ে টিকি কিনে তারই আরেক ভাই "মার ঘুরিয়ে" বলে চিৎকার করছে! তখন সেই শ্রমিকের অনুভূতি বর্ণনা আমার সাধ্যে কুলোচ্ছে না!

স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণের অব্যাহত আন্দোলন এখন গৃহযুদ্ধে মোড় নিয়েছে। সেনাবাহিনীর একাংশ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়ায় পরিস্থিতি এখন এমনই ভয়াবহ যে সামগ্রিকভাবে কে কার বিরুদ্ধে বন্দুক ছুড়ছে তার হিসেব নিকেষ নেই। লিবিয়া এখন কার্যত বর্হিবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। ভূমধ্য সাগরে মার্কিন রণতরী, সুয়েজ খাল অতিক্রম করছে বিমানবাহী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। জাতিসঙ্ঘের সদর দপ্তরে ঘন ঘন বৈঠক বসছে। লিবিয়ার উপর আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ওদিকে ত্রিপোল তে তো বটেই , বেনগাজী এবং অন্যান্য শহরেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে। কার্যত লিবিয়ায় এখন সরকার বা সরকারের কোনো কার্যকর অস্তিত্ব নেই। আর এই রকম টালমাটাল অবস্থায় সেখানে জ্বালানি তেলসহ খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে।

এটা লিবিয়ার নিজস্ব সমস্যা। এর সমাধানও সেখানকার জনগণ খুঁজে বের করবেন। দীর্ঘ দিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলবে, না আন্তর্জাতিক মোড়লরা বৈঠকে বসে গোঁজামিলের একটা সরকার বানিয়ে দেবেন, নাকি গাদ্দাফি তার সমর্থকদের অস্ত্র হাতে মাঠে নামিয়ে, সেনা দিয়ে বিমান হামলা চালিয়ে একসময় বিদ্রোহ দমনে সক্ষম হবেন সেটাও তাদের ভাবনা। তাহলে এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কি? এর উত্তর হচ্ছে ৬০ হাজারেরও বেশী বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবন-মরণ জড়িয়ে গেছে ওই গৃহযুদ্ধে।

এখানে একটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করতে হবে! আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সঠিক কোনো তথ্য নেই যে ঠিক কতজন শ্রমিক বা বাংলাদেশি লিবিয়ায় কাজ করছিলেন! তারা কতজন সরকারিভাবে গেছেন আর কতজন বেসরকারিভাবে গেছেন সেই খতিয়ানও আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেই! ওই মন্ত্রণালয়েরই মূখ্য দুজন দুরকম তথ্য দিয়েছেন। আবার সেই তথ্যকেও খণ্ডন করে দিয়েছেন আরেক মন্ত্রণালয়। এবং সেখান থেকে ফেরত আসা শ্রমিকরা যে সংখ্যা বলছে সেটাও সরকারের সংখ্যার সঙ্গে মিলছে না!
আমরা জানি সরকারি সহায়তায় যাওয়া বাদেও আরো বিভিন্ন উপায়ে মানুষ ওই দেশে যেতে পারেন, এবং গেছেনও। সে কারণে সঠিক সংখ্যা বলা কষ্টকর। তাই বলে ৫০ হাজার থেকে ৯০ হাজার? এত গড়মিল? হ্যাঁ, তা-ই। দেখুন তথ্য বিভ্রাটের একটি নমূনা- ‘ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, লিবিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে গতকাল পর্যন্ত মোট ২৪ হাজার ৯১৩ জন দেশে ফেরার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গতকাল সকাল পর্যন্ত দুই হাজার ৩৯৪ জন ঢাকায় ফিরেছেন ।’ (কালের কণ্ঠ। ০৫.০৩.১১)

ডা. দীপু মনি যেমন সঠিক তথ্য দিতে পারছেন না, তেমনি অন্যদিকে সেখানে অবস্থানকারীদের সংখ্যা নিয়ে অন্যান্য দপ্তর থেকে যা বলা হচ্ছে সেটার কোনো ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছেনা। ‘কৈূটনৈতিক সূত্র বলছে; বৈধ-অবৈধ মিলে লিবিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা কত তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই বাংলাদেশ সরকারের। সরকারি হিসাবে, লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ৬০ হাজার। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ৮৯ হাজার। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, লিবিয়ায় অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, লিবিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে লাখও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

আমাদের কথা হচ্ছে ওখানে কর্মরতদের সংখ্যা কত সেটা এমুহূর্তের বিবেচ্য বিষয় নয়। এখন সবচেয়ে আগে দরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। সেখানেও সরকারের গাফিলতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে; তাদের হাতে এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিককে ফিরিয়ে আনার পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। উপকরণ মানে কি? বিমান বা জাহাজ। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়া করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের তেমন কিছুই করার নেই! এই ‘মোদ্দা কথাটি’ ৫ মার্চ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী বেশ স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন।

যেখানে শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনা যাচ্ছেনা সেখানে তাদের সেখানে আবার পাঠানোর চিন্তা আসে কি করে? হ্যাঁ, আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকদের মাথায় আগেই সেই চিন্তা ভর করেছে। তারা বলছেন; ‘ অবৈধভাবে অবস্থানকারীরা একবার লিবিয়া ছাড়লে আবার তাঁদের সেখানে পাঠানো সরকারের জন্য কঠিন হবে। তা ছাড়া অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের জন্য বাংলাদেশ সরকার লিবিয়ার কাছে ক্ষতিপূরণও চাইতে পারবে না। এ কারণে বাংলাদেশ চাইছে, প্রয়োজন হলে তাঁরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসুক। বাংলাদেশ সরকার তাঁদের জোর করে ফিরিয়ে আনবে না। এ ছাড়া লিবিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ’ !

কেন? বড় চ্যালেঞ্জ কেন? আর তাই যদি হয়ও তাহলে সরকার কি চ্যালেঞ্জ নিতে ভীত? অবস্থাদৃষ্টে কি তেমন মনে করার কোনো কারণ আছে? নেই। সরকার যদি চার-পাঁচশ কোটি টাকার বিশ্বকাপ আয়োজনের চ্যালেঞ্জ নিতে পারে, রাজধানীর কিছু কিছু অংশকে ঘসেমেজে ঝকঝকে তকতকে করতে পারে, বিশাল আয়োজন করে বিস্মরণযোগ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করতে পারে, ক্রিকেট নিয়ে সারা দেশ-জাতিকে মাদকের নেশায় ডুবিয়ে দিতে পারে, তাহলে কেন কয়েক হাজার অসহায় ক্ষুধার্থ শ্রমিককে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে না?

যে কয়েক হাজার সৌভাগ্যবান শ্রমিক নিজেদের চেষ্টায় কেউ তিউনিসিয়া হয়ে কেউবা মিশর হয়ে, আলজেরিয়া হয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সয়ে নিজেদের টাকায় ফিরেছেন, তাদের মুখে ফিরতে না পারা শ্রমিকদের দুর্দশার কথা শুনে পাথরেরও চোখ ভিজে উঠবে! বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষের গুলি-শেল-কামান নয়, তারা না খেয়ে মারা যাবার ভয়ে ভীত! যে শ্রমিকরা বর্ণনা দিচ্ছেন তারাও কাঁদছেন, যারা এসব শুনছেন তাঁদের চোখ ভরে উঠছে জলে। বাড়ি ফেরার টাকা তো দূরের কথা, ওখানে টিকে থাকার জন্য যেটুকু খাবার দরকার সেটাই কেনার টাকা নেই তাদের হাতে!

এই যখন অবস্থা, তখন সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের কূটনৈতিক বাকচারিতায় কি ওই শ্রমিকদের মুখে এক টুকরো রুটি উঠবে? সরকারের হাতে টাকা বা রসদ নেই এটা কোনো সচেতন মানুষ বিশ্বাস করবে না। সরকার চাইলে তাদের দূতাবাসে আরো জনবল পাঠিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শ্রমিকদের আনতে না পারুক, অন্তত তাদের দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবে না সেটাও কোনো বিশ্বাসযোগ্য কথা নয়। তাহলে কি ধরে নিতে হবে সরকার ওই ৬০ বা ৭০ অথবা ৯০, কিংবা এক লাখেরও ওপর বাংলাদেশি শ্রমিকদের তাদের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেবে?

কার্যত তা-ই দেয়া হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে ‘ যার যার নিজ খরচে, নিজ চেষ্টায় তারা ফিরে আসুক’! অবশ্যি তার আগে একটি শব্দ জুড়ে দেয়া হয়েছে; ‘অবৈধভাবে’! তাহলে কি ধরে নিতে হবে ‘বৈধভাবে’ অবস্থানকারি হলে সরকার ব্যবস্থা নিত?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হচ্ছে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে নাকি মাত্র ২জন কর্মকর্তা কাজ করছেন! কেন মাত্র দুজন? সে প্রশ্নের উত্তর আমরা নাইবা খুঁজলাম। কিন্তু আমরা কি একটু খোঁজ নিলেই দেখব না যে ওই মাত্র দুজন লোকের জন্য প্রতি মাসে সরকারের তহবিল থেকে অন্তত কুড়িজনের খরচের মত টাকা বরাদ্দ হচ্ছে! তা হোক। বিদেশে দেশের পতাকাবাহী কূটনৈতিক বলে কথা! এখানেও এই বিষয়টা শেষ করা যেত। কিন্তু তা করা যাচ্ছেনা।

কারণ ঠিক যে সময়ে বেনগাজীতে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের দেহ নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে ঠিক সেই সময় তামিম বা সাকিবের একটা ছক্কা কিংবা বাউন্ডারিতে পুরো দেশ হুংকার দিয়ে আনন্দজোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। ঠিক যে মুহূর্তে ১০/১২জন বাংলাদেশি শ্রমিক সীমান্ত পার হওয়ার সময় অচেনা বন্দুকধারীদের গুলিতে ঝাজরা হচ্ছে, ঠিক সেই সময় সাকিব বা রাজ্জাকের ঘুর্ণীতে কোনো আইরিশ কূপোকাত হচ্ছে। আবার সেই গগনবিদারি চিৎকারে দেশ-জাতির সব্বোশরীরে পুলকের রেণু ছড়িয়ে পড়ছে! বাংলাদেশ দল যখন আইরিশ রূপকথাকে টেনে মাটিতে নামিয়ে উর্ধাকাশে হাত তুলে রয়েলবেঙ্গল টাইগারের মত গর্জন করে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে দিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে হয়ত এক অভাগা শ্রমিক শেষ কাঁপুনি দিয়ে চিরতরে থেমে যাচ্ছে!
আবার যখন বাংলাদেশ দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে শোচনীয়ভাবে হারছে, তখন সারা দেশে আগুন জ্বলে উঠছে! অফিস আদালত থেকে শুরু করে রাজপথ অলি-গলি পর্যন্ত প্রকম্পিত হচ্ছে ক্ষোভ আর হতাশায় কুন্দনে। সারা দেশের একমাত্র আলোচ্য হয়ে উঠছে ‘কেন কিভাবে সাকিবরা হারল’!

কিন্তু নিজেদের মায়ের পেটের ভাই, সেই ডলার কামানোর 'মেশিন', যারা হাজার হাজার মাইল দূর থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, তপ্ত মরুভূমিতে চামড়া পুড়িয়ে, মাথার ঘাম মাথাতেই শুকিয়ে দগদগে ক্ষত হয়ে যাওয়া হাতে ডলার কামাই করে দেশে পাঠাচ্ছে, সেই ডলার গোণার সময় দেশের এইসব টসবগে ঘিলু জবজবে মাথার মানুষদের ভাবনায় একবারও আসছে না যে, সাকিবদের পরাজয় মানে জাতির পরাজয় নয়, জাতির চরম পরাজয় তার নাগরিকের নিরাপত্তা না দিতে পারা! তার দেশের শ্রমিককে যুদ্ধের ময়দান থেকে জীবিত দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারা!
একটি জাতির সন্তানরা কতটা দুর্ভাগা হলে তার দেশ তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না বলে ঘোষণা দেয়ার পর আবার সেই দেশ এবং দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ তুচ্ছ ক্রিকেট নামক নেহায়েতই এক খেলার জয়-পরাজয় নিয়ে মাতম করে!
সরকারের কাছে আমরা আবার নতুন করে দাবি জানাব না। শুধু এতটুকু বলব; লিবিয়াতে যে শ্রমিকটি না খেয়ে মারা যাচ্ছে তার জীবনের দামের চেয়ে আগামী ১০টি বিশ্বকাপ ঘরে তুললেও যে মর্যাদা বা ‘নেকি’ হসিল হবে তার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশী মূল্য একটি শ্রমিকের জীবনের। ওই শ্রমিকদের পাঠানো ডলারে নতুনভাবে ঝকঝকে চকচকে করা রাজধানীর কোণায় কোন একটি ঘরে বসে এই নিবন্ধকার তার জাতির হয়ে ওই অসহায় শ্রমিকদের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করছে! পারলে আমাদের ক্লিবত্বকে ক্ষমা দিও তোমরা।

০৬.০৩.১১
লিবিয়ায় অভুক্ত শ্রমিকদের অসহায় চিত্র!
ইয়াহু নিউজঃ বাংলাদেশি শ্রমিকদের লিবিয়া ত্যাগ।
শ্রমিকদের আকুতিঃ আমরা বাঁচতে চাই!



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29339558 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29339558 2011-03-06 23:01:21
করপোরেট বেনিয়াদের হাতে বন্দী দ্রোহ আর প্রতিবাদের প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি এখন একুশ উৎসব!

রেসের ঘোড়াকে কীভাবে ধীরে ধীরে রেসের ময়দানের প্রথম কাতার থেকে সরিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং ক্রমান্বয়ে ময়দান থেকে সরিয়ে এনে তার ঘাড়ে জোঁয়াল চাপিয়ে গাড়িটানা ঘোড়ায় রূপান্তরিত করা হয়, এবং সবশেষে তাকে শেয়াল-শকুনের খাবারে পরিণত করা হয় তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ আমাদের মহান ভাষা দিবস। যাকে এখন জাতিসঙ্ঘের সনদের বলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলা হচ্ছে। ভাষা দিবস বা মহান শহীদ দিবস কিংবা শুধুই একুশে ফেব্রুয়ারি যে একটি জাতির প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সেই প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের নজির এই ভূবিশ্বে কেবলমাত্র বাঙালিরই আছে সেই সত্যটি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয়ার চেষ্টা যারা করে আসছিল এখন তারা মোটামুটি সফল! নিজের মায়ের ভাষা কেড়ে নেয়ার পাকিস্তানি জুলুম এবং চক্রান্ত প্রতিহত করতে যে বাঙালি গর্জে উঠে অকাতরে প্রাণ দিয়ে তার মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় মাটিচাপা দেয়ার কাজটা দিনের পর দিন সুনিপুণভাবে করা হচ্ছে।

অনেকেই বলে থাকেন একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ দিবস। এটা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এখন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এটা যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, জুলুমের বিরুদ্ধে অসহযোগ যুদ্ধ, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই। সেই জায়গা থেকে বাঙালিকে টেনে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে গত চার দশক ধরে। ১৯৭২ সালের আগ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারিতে খুব ভোরে লখো মানুষ খালি পায়ে শহীদ বেদিমূলে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছিল। সেই শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিলনা। ছিল ভাইয়ের রক্তে কেনা মায়ের ভাষার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা।

১৯৭২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাতের বদলে রাত বারটা শূণ্য মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সরকারিভাবে বেদিমূলে পুষ্পার্ঘ দেয়ার চল করার পর থেকেই প্রভাতফেরি নামক চিরায়ত সংস্কৃতি বদলে যেতে থাকে। তখন থেকেই প্রভাতফেরি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অঙ্গ। সেখানে সৈন্য সামন্ত নিয়ে রাষ্ট্রের একটি আনুষ্ঠানিকতাই প্রধান হয়ে ওঠে। আর এর ফলে ধীরে ধীরে ভাষা দিবস তার স্বকীয়তা হারিয়ে পরিণত হয় কেবলই এক আনুষ্ঠানিকতায়। আরো পরে এসে করপোরেট কালচারের আগমন ঘটার পর ওই মধ্যরাতের পুষ্পার্ঘ নিবেদনের রসদে যোগ হয় করপোরেট কেতা। সৈন্যদের স্যালুট, গার্ড অব অনার, প্রটোকল মতে রাষ্ট্রের কুশিলবদের ক্রমবিভাজন। প্রটোকল মতে কে কে প্রথমে শহীদ মিনারে যাবেন সেই সব কেতাও চালু করা হয়। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়- মহান শহীদ দিবস এখন আর ভাষা রক্ষার সেই গৌরবোজ্জ্বল প্রতিবাদের প্রতীক নয়।

আমরা যারা শহীদ দিবসকে কেবলই ভাষা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগ বলি তারাও যথাযথ মূল্যায়ন করিনা। সেটি কি কেবলই মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন ছিল? শুধুই কি ভাষাকে রক্ষা করার জন্য একশ চুয়াল্লিশ ধারা লঙ্ঘন করে ছাত্ররা গুলি খেয়ে জীবন দিয়েছিল? না। যদিও আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস সেভাবেই লেখা, যদিও সেই বায়ান্ন থেকে আজ এই দুই হাজার এগার সালে এসেও আমরা ইতিহাসে তেমনই বিবরণ দেখি। কিন্তু সেই বায়ান্নর রাজপথের মানুষগুলোর যারা আজো বেঁচে আছেন তারা জানবেন যে সেটি কেবলই ভাষা রক্ষার আন্দোলন ছিল না। ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ ভাষা রক্ষার জন্য না হয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেও হতে পারত। যেহেতু ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের উপনিবেশের প্রজাদের প্রথমে ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তাই প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল ভাষা রক্ষার জন্য। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা যদি বলত ‘বাংলা বা উর্দু নয়, ইংরেজিই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তাতেও বাঙালি প্রতিবাদী হত। কেননা সাতচল্লিশে পাকিস্তান গঠনের পর পরই বাঙালির মোহভঙ্গ শুরু। যা একাত্তরে এসে পূর্ণতা পায়। বাঙালি তার স্বাধীন সার্বভৌম স্বদেশ পায়।

আজ এই দুহাজার এগার সালে যদি কোনো কারণে সরকার ঘোষণা করে- ‘এখন থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের মত দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা আরবী হবে’! তাহলে কি বাঙালি তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে? সরকারের বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী আন্দোলন করে অকাতরে রক্ত দেবে? মনে হয় না। কারণ সেটি হলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার সময় বা এখন পুনরায় বাহাত্তরের ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধান পূর্ণমুদ্রণের পরও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকতে পারত না। তুলনাটি এজন্য আসছে যে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহ বা উপনিবেশের বিরুদ্ধে স্বাধীকারের লড়াই-ই একুশের মূলমন্ত্র। ভাষা সেখানে উপলক্ষ মাত্র। এতো গেল গোড়ার দিককার কথা।

করপোরেট কালচারের অবাধ আমদানি এবং ভাষা দিবসসহ অন্যান্য দিবসে সেই কালচারের দবদবানি এতটাই বেড়েছে যে এর পর থেকে শুরু হয়েছে ভাষা দিবস নিয়ে ন্যাক্কারজনক ‘খেলা’। পঁচাত্তরের পর থেকে সেনা শাসনের দিন শুরুর পর বাঙালির সংস্কৃতিতে ‘সৈনিক’ শব্দটির প্রচলন করা হয়। এই সৈন্য শব্দটিকে জুড়ে দেয়া হয় লেখকের সঙ্গে, শ্রমিকের সঙ্গে, চিত্র পরিচালকের সঙ্গে, এমনকি শিক্ষার সঙ্গেও। সর্বশেষ জুড়ে দেয়া হয়েছে ভাষার সঙ্গে। এখন আর বায়ান্নর ভাষা শহীদ নয়, বলা হয় ‘ভাষাসৈনিক’! সৈনিক কালচারের সঙ্গে অপূর্বভাবে গেলানো হয়েছে করপোরেট কালচার। এই দুই অভূতপূর্ব কালচারের তোড়ে হারিয়ে গেছে মহান একুশ। গৌরবের একুশ। আত্মত্যাগের একুশ। স্বাধীনতার অনুঘটক একুশ। স্বাধীকারের বীজতলা একুশ। ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির একুশ। তার বদলে একুশের এখনকার পরিচয়- ‘ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’!

একুশকে শুধু এভাবেই ‌'নপুংশক' বানিয়ে থামেনি তারা। এর সঙ্গে আরো অনুপান জুড়ে দেয়া হয়েছে। এখন ফেব্রুয়ারি এলেই ডজন খানেক টিভি চ্যানেল আর কুড়ি খানেক সংবাদপত্র হণ্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় সেই সময়কার ‘ভাষাসৈনিকদের’। তাদের একেকজনকে ধরে এনে তাকে দিয়ে স্মৃতিতর্পণ করানো হয়। কে সেই সময় দেয়ালে পোস্টার সেঁটেছিলেন, কে সেই সময়ে মিছিলের ভেতরে কোথাও না কোথাও ছিলেন, কে মনে মনে সেই মিছিলে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু ‘অনিবার্য কারণে’ যেতে পারেননি, কে নিজে না গেলেও তার বাবা-চাচাকে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তারাও আজ ‘ভাষাসৈনিক’! আর সেই সব ভাষাসৈনিকদের ‘মহামূল্য স্মৃতি’ চড়া দামে ‘কিনে’ এই করপোরেট কালচার ভাষাকে মহিমান্বত করার নামে বাজারি পণ্যে রূপান্তর করে দিচ্ছে।

ঠিক এমনি ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও ঘটানো হচ্ছে। যিনি কোনো দিন বন্দুকের বাঁটে হাত রাখেননি, যুদ্ধ তো দূরের কথা, যিনি কখনোই সেই যুদ্ধকে সমর্থন করে পাকিস্তানি বশ্যতা ত্যাগ করে শহর ছাড়েননি, কিংবা নিজের ছেলেকে আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধে পাঠাননি তারাও এখন মুক্তিযোদ্ধা। মহান মুক্তিযোদ্ধা। এদেশে একেকটি সরকার বদলের পর পরই যেমন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বদলে কখনো স্ফিত হয়, আবার কখনো খর্ব হয়। তেমনি বছরের পর বছর ‘ভাষাসৈনিকদের’ সংখ্যা স্ফিত হচ্ছে। যেহেতু রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতদের মত এখন আর মৃত দেখানো সম্ভব হচ্ছে না তাই ‘অংশীদার’ বানানোর কোশেশ চলছে অব্যহতভাবে। এভাবে চলতে থাকলে দুহাজার ত্রিশ সালেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ‘অন্যতম যোদ্ধা’ আবিষ্কার সম্ভব! এমনকি গানিতিক নিয়মে সেই ‘যোদ্ধার’ বয়স বায়ান্নতে এক বছর হলেও!

এটা যে বাঙালি জাতির জন্য কী পরিমান অপরিনামদর্শী এবং সেই ভাষা শহীদদের প্রতি কী পরিমান অপমানজনক তা বোধ করি আমাদের করপোরেট কালচারে ডুব দিয়ে অশেষ পূণ্য হাসিল করা করপোরেট চোগলখোররা বুঝতে পারছেন না। তারা যে বুঝতে পারছেন না তা নয়। তারা সব কিছু বুঝেশুনেই করছেন। কেননা তারা পুঁজির নিয়ম মেনে জগতের সব কিছুতেই পুঁজির অংশীদারিত্ব আবিষ্কার করেন, এবং সব কিছু থেকেই লগ্নিপুঁজির মুনাফা তুলে নিতে চান। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের এই চাওয়াকেই আমাদের বিভিন্ন সরকার সমর্থন করে।

সমাজে আর এক শ্রেণীর কূপমণ্ডুক আছেন যারা মনে করেন সর্বস্তরে বাংলা চালু করলেই ভাষা আন্দোলনে যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে, মর্যাদা দেয়া হবে! তাই তারা ফিবছর গাড়ির নাম ফলক, দোকানের সাইনবোর্ড, বিভিন্ন সতর্কবাণী বা সরকারি নোটিস সমূহ এবং আদালতে বিচারকদের রায় যেন বাংলায় প্রদান করা হয় সেই দাবি তোলেন। তারা ভাবেন এভাবেই ভাষা দিবসকে প্রকৃত সন্মান জানানো হচ্ছে! তাদের এই নিবীর্য কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানিয়ে সমাজের সর্বস্তরে তা চালু করার জন্য তো করপোরেট বণিকেরা বসে আছেন। তারা এসে ভাষা দিবসকে সামনে রেখে ওই এক মাসের বা মাত্র আঠাশ দিনের জন্য বাংলা চালুর মচ্ছব করে চলেছেন।

আমরা একদিকে বাংলা ভাষার স্বকীয়তা, বাংলা ভাষার ‘সতীত্ব’ নিয়ে হাপিত্যেশ করছি, অন্য দিকে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ফেরিওলা ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায়, বিশেষ করে বেসরকারি রেডিও চ্যানেলগুলোতে এক অদ্ভুত ধরণের ‘জারজ বাংলা’ মেনে নিয়েছি! সারা দিন রাত রেডিও-টিভি চ্যানেলগুলোতে দেশের ধীমানরা জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিচ্ছেন, অথচ কেউ প্রতিবাদী হয়ে বলছেন না যে এটা বাংলা নয়! এভাবে বাংলাকে ‘ধর্ষণ’ করার কোনো অধিকার তোমাদের নেই! বলছেন না, প্রতিবাদ করছেন না, সেও তো এমনি এমনি না। সেখানেও বিকিকিনি! ধীমান বুদ্ধিজীবী আলোচকরা জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে তো খালি হাতে ফিরছেন না! তাকেও ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে কড়কড়ে কারেন্সি! কেউ কেউ আবার একে ‘বাক স্বাধীনতা’ নাম দিয়ে এর পক্ষে ওকালতিও করছেন।

মোবাইল কোম্পানিগুলো বাংলায় বার্তা পাঠাচ্ছে, বাংলায় গর্জে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছে, বাংলায় এটা পাবেন ওটা পাবেন বলে সাধারণের নাকের ডগায় মূলো ঝোলাচ্ছেন। জাপানি গাড়ি বিক্রেতারা ‘বাংলাকে ভালোবেসে’ গাড়িরে ব্লুবুক বাংলায় করে দিচ্ছে! বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিষাক্ত শিশুখাদ্যের টিনে বা প্যাকেটে বাংলা লিখে দিচ্ছে! আর এভাবেই বায়ান্নর পর থেকে একেকটি প্রজন্মকে শেখানো হচ্ছে ভাষা আন্দোলন বলতে যা বোঝায় শেষ বিচারে তা হল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন। এখনকার প্রজন্মও শিখে নিচ্ছে সর্বস্তরে বাংলা, কেবলমাত্র বাংলা চালু হলেই মহান একুশে ফেব্রুয়ারির সার্থকতা আসবে।

করপোরেট বেনিয়াদের সঙ্গে শাসকদের এই সখ্যতা যে মহান একুশকে দ্রোহের প্রতীক থেকে ‘সেলিব্রেশন ডে’ বানিয়ে দিচ্ছে সেদিকে আমাদের বিদ্যা বুদ্ধির ব্যাপারিদের নজর আছে বলে মনে হচ্ছে না। তারা যে এই দিনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ফ্যাশন ডিজাইন করছে, কস্টিউম বানাচ্ছে, শাড়ি-পাঞ্জাবীর জমিনে বর্ণমালা বসিয়ে সঙ সাজার প্রতিযোগীতা করছে, গালে-মুখে-হাতে-কপালে বর্ণমালা লিখে দিনটিকে রং উৎসব বা ‘কালারফুল ডে’ বানাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে ‘মহান একুশের বইমেলা’ নাম দিয়ে ‘আনন্দমেলা’র প্রচলন করছে, ঘরে ঘরে একুশ উপলক্ষে সেলিব্রেশন ফুডের মেনু বিলোচ্ছে, একে অপরকে শহীদ দিবসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে! শহীদ বেদিমূলে রাত বারটা থেকে পুষ্পার্ঘ অর্পণের ছবি দিয়ে নিজ নিজ বা গোষ্ঠিগত ক্যারিয়ারকে ইলেক্ট্রিফায়েড করাচ্ছে তাতে করে মোটেই অবাক হওয়া যাবেনা যদি আগামী কয়েক বছর পর শহীদ দিবসে জমজমাট কনসার্টের আয়োজন করে বলিউড-হলিউডের নামকরা গাইয়ে বা অভিনেতা এনে পুষ্পার্ঘ অর্পণের ডেমো করা হয়!

এই বেজন্মা করপোরেট কালচারের ভেতর যারা অতিকষ্টে নিরবে নিভৃতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের জন্য চোখের জল ফেলছেন তারা সেই দ্রোহ আর সংগ্রামের এই করুণ পরিনতি দেখে কি-ইবা করতে পারি! হ্যাঁ, একটি কাজই করতে পারি। আর তা হলো সেই সব বীর শহীদদের কাছে নতজানু হয়ে করজোড়ে ক্ষমা প্রর্থণা!

২০.০২.২০১১


মধ্যরাতের এই শহীদ মিনার আমার নয়

এই করপোরেট ফ্যাশনও আমার নয়!

এই আমার তেপ্পান্ন সালের একুশ।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29330908 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29330908 2011-02-20 22:12:06
মিসরের বিপ্লব পরবর্তী ঘটনায় আমেরিকা গুটি চালালে ৬০ এর দশকের মত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে পারে আরব বিশ্ব!

মিসরের অভূতপূর্ব ঘটনাটির সঙ্গে তুলনা করা যায় ১৯৫২ সালের মিসর বিপ্লবের সঙ্গে। যে বিপ্লবের ফলশ্রুতি রাজতন্ত্রের অবসান। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে মিশর আজকের এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। যেখানে আন্দোলন পরবর্তী আনন্দ উৎসবের বদলে জনমনে অজানা এক শঙ্কা জেঁকে বসেছে। প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পতনের মধ্য দিয়ে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসানের সূচনা হয়েছে আরব বিশ্বে। এটা নিশ্চই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এর মাধ্যমে মিসরের সম্ভাবনার দ্বার যেমন খুলে গেছে, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে নতুন করে সংকটের আবর্তে পড়ার আশঙ্কা। মুবারক পালিয়েছেন কিন্তু রেখে গেছেন একটা ভাঙাচোরা দেশ। ভাঙ্গাচোরা অর্থনীতি। আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
দীর্ঘ ৩০ বছর যে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছে জনতা আপাতত তার অবসান হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন, অর্থনৈতিক মুক্তি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ, বেকারত্বের অবসান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য দূর করাসহ একটি গণতান্ত্রিক মিসরের স্বপ্ন থেকেই আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু মুবারক যাওয়ার আগে কোন অর্ন্তবর্তী সরকার নয় তার অধীনে থাকা তারই প্রিয়ভাজন সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা সপে দিয়ে গেছেন।
যে সেনা পরিষদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গেছেন মুবারক, মুবারকের সঙ্গে সেই সেনাবাহিনীর সম্পর্ক বহু বছরের। তাছাড়া তিনি ছিলেন বিমানবাহিনীরও প্রধান। সেনা কর্মকর্তাদের অনেকেই আছেন যাঁরা এখনো মুবারকের শাসন ব্যবস্থাই চালু রাখতে চাইবেন। এবং মুবারক বিদায়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত মিসরের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে তারই আলামত পষ্ট হচ্ছে দিনে দিনে। সম্ভবত এটাই মিসরের ট্রাজেডি। এমন অবস্থায় সেনাশাসকরা জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে পারবেন, না কি আরো একজন ‘মুবারকের’ জন্ম দেবেন সেটা অদূর ভষ্যিতই বলে দেবে।

১৯৮১ সালে আততায়ীর হাতে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত খুন হওয়ার পর মুবারক
রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাকে নিয়ে জনগণ যে আশার আলো দেখতে চেয়েছিল জনগণের সেই আশা ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে তিনি দেশটিকে পরিণত করেছিলেন এক পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে। প্রায় ১৫ লাখ শসস্ত্র সেনাবাহিনীর ভয়ে জনগণ রীতিমতো আতঙ্কিত থেকেছে টানা ৩০ বছর। আট কোটি জনসংখ্যার মিসরে মুষ্টিমেয় এই লোকগুলোই এত দিন ক্ষমতা ভোগ করে আসছিল।
আজ মুবারক নেই। কী ঘটবে এখন তাদের ভাগ্যে? এটা তারা নির্ধারণ করবেন, না সেনা নির্ধারণ করে দেবে? বিশ্বের বিভিন্ন সেনা শাসিত দেশগুলোর ইতিহাস ঘাটলে এমন অনেক উদাহরণ মেলে। যেখানে ওই সামান্য সংখ্যক এলিট শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করতে বাকি বিশাল সংখ্যক জনতার দাবী পদদলিত হয়। মিসরেও তেমনটি ঘটবে সেটা জোর দিয়ে বলা না গেলেও এটা নিশ্চিত যে মুবারক যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতেন তারা মুবারকহীন মিশরে একেবারেই ক্ষমতাহীন এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
সংবদপত্রে যে সব খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে বলা হচ্ছে “সেনা পরিষদ ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা ৩০ বছরের জরুরি অবস্থা তুলে নেবে, সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে।” আমরা ইতিহাস হাতড়ালেই দেখব এমন গালভরা প্রতিশ্রুতি এধরণের তৃতীয় বিশ্বের যে সব দেশে সেনারা ক্ষমতা দখল করেছে বা তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে কোনো স্বৈরশাসক বিদায় নিয়েছে সেই সব দেশেরই সেনাবাহিনী রুটিন মত এই ধরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরপর হাতে গোণা দুয়েকটি উদাহরণ বাদে সব দেশেই গণতন্ত্র দেয়ার নামে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেনারা তাদের মনোনীত কাউকে বা কোনো একটি শ্রেণীকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য এক ধরণের লোক দেখানো নির্বাচনের আয়োজন করেছে।

আগামী দিনের মিসরে কী তা-ই ঘটতে যাচ্ছে? কারণ বর্তমান অস্থায়ী সরকারের প্রধান মোহাম্মদ হুসেইন তান্তাবি মুবারকের একজন ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। আর সে কারণেই এত সব ঘোষণার পরও তাঁর সদিচ্ছা নিয়ে সন্দিহান মিসরবাসী। বর্তমান আন্দোলনের ফসল হিসেবে হয়তো মিসরীয়রা একটি সংশোধিত সংবিধান পাবে, কিন্তু যিনি এই সংবিধানের আপাতরক্ষক হয়ে বসে থাকবেন সেই তান্তাবির ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না আন্দোলনকারীরা। আর সে কারণে ‘বিজয়য়ের’ পরও তাহির স্ক্যয়ার জনশূণ্য করা যাচ্ছে না। মুবারক বিদায় নেয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই অবস্থান ধরে রাখা আন্দোলনকারীদের সাথে সেনাবাহিনীর ছোটখাট সংঘর্ষ হচ্ছে। তাদের অভিযোগ যে তান্তাবিকে ২০ বছর ধরে সেনা কুজকাওয়াজে মুবারকের পাশে ছায়ার মত দেখা গেছে, তিনি জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতি কতটা সন্মান দেখাবেন? জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে কতটা প্রস্তুত তিনি?

বিষয়টার এখানেই শেষ হলে আশঙ্কার তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু মিসর তো কেবলই মিসর নয়। মিসরকে বলা যেতে পারে আরব বিশ্বের ‘রাজধানী’। মিসরের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের সাথে সাথে ওঠা-নামা করবে পুরো আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যারোমিটারের পারদ। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি অনুসারে ইসরায়েল-মিশর অনাক্রমন স্থিতাবস্থা মেনে চলে। এখন মিসরে যদি নির্বাসিত মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা ফিরে এসে রাজনীতির হালুয়া রুটির ভাগ বুঝে নেয়ার সময় মুসলিম জাতীয়তাবাদ আর ইসলামি ব্রাদারহুডের আওয়াজ তোলেন তাহলে কি আন্দোলনে শরিক অন্য আপাত: গণতান্ত্রিক দলগুলো যাদের এই আন্দোলনে মূখ্য ভূমিকা তারা মেনে নেবে? সেই দলগুলোও কি ব্রাদারহুডকে বিশ্বস্ত ভাবতে পারবে? নাকি চলমান আন্দোলনে মাত্র দশ ভাগ অংশীদারিত্বের অধিকারে ব্রাদারহুড পুরো ক্ষমতা বলয়ে ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ নেবে?

ধরে নেয়া যাক কোনোওভাবে ব্রাদারহুড সেনা সহায়তায় মিশরের ক্ষমতায় চলে আসল, তখন ইসরায়েলের সাথের অনাক্রমন চুক্তির ভবিষ্যৎ কি হবে? সুয়েজ খাল মিসরের সৌভাগ্য এবং গৌরবের যেমন, ঠিক তেমনই অকল্যাণও। এই সুয়েজ খালের অংশিদারিত্ব, তার উপর ভোগ দখলের অধিকার নিয়ে মিসর-ইসরায়েল যে আবারো মরণযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না তারও কোনো গ্যারান্টি মিলছে না।

ষাঁটের দশকে গামাল আব্দাল নাসের যে মিসরকে আধুনিক মিসর হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, সেই নাসেরের সঙ্গে ছিল জেনারেল নাগিবের মত দেশপ্রেমিক সেনা প্রধান। নাসেরের জাতীয়তাবাদ শুধুই মিসরীয় জাতীয়তাবাদ ছিল না। ছিল সমগ্র আরব জাতীয়তাবাদ। এবং সেই আরব জাতীয়তাবাদের অন্যতম কারিগর ছিলেন জেনারেল নাগিব। সেই ইতিহাস নিশ্চই মিসরীয়দের মনে আছে। তাই তারা কায়মনবাক্যে কামনা করবে তাদের বর্তমান সেনাপ্রধান যেন আর একজন ‘নাগিব’ হয়ে ওঠেন। কিন্তু জনগণের একটা ব্যাপক অংশের যদি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকত তাহলে তারা বুঝতেন এই ধরণের দেশগুলোর সেনারা কখনোই পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদের হেডকোয়ার্টারে বসে রিমোট চেপে যে সিদ্ধান্ত ইথারে ভেসে আসে বা আসবে তাদেরকে সেই সিদ্ধান্তই নিতে হবে। আর সেখানেই মিসরের বর্তমান রাজনীতির মোক্ষম ট্যুইস্ট!

আমেরিকা কোনোভাবেও চাইবে না ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসুক। এটা মিসরের গণতন্ত্রকামী অধিকাংশ জনগণও চাইবে না। তাহলে কাদের বসাবে আমেরিকা? মুবারক বিরোধী তথা আমেরিকা বিরোধী দলগুলোর কোয়ালিশনকে? নাকি তাদের ভেতরকার কোনো একটি ‘মডারেট’ দলকে? সমস্যার এখানেই শেষ নয়। মিসরের বর্তমান অগ্নিগর্ভ রাজনীতির সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে আফ্রিকা-এশিয়ার বাকি আরব জাতি এবং দেশ সমূহের রাজিৈনতক ভবিষ্যৎ। এর সাথে আরো জড়িয়ে আছে আমেরিকা-ব্রিটেনের আজন্ম মিত্র ইসরায়েলের অস্তিত্বের প্রশ্ন। সৌদি বাদশার বাদশাহীর স্থায়িত্ব। আরব উপদ্বীপের বাকি ছোট ছোট দেশগুলোর রাজনীতি। মোদ্দা কথা মিসরের আগুন নিভেছে মনে করার কোনো কারণ ঘটেনি। এই আগুনে আরো অনেক কিছু পুড়িয়ে খাক করতে পারে তেমন ভীতিকর সম্ভবনার ক্ষেত্র ক্রমে স্ফিত হচ্ছে।

১৭.০২.২০১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29328301 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29328301 2011-02-17 06:31:50
অসমাপ্ত বিপ্লব, অমর বিপ্লবী- কমরেড চারু মজুমদার

প্রকাশ করেছে শুদ্ধস্বর। প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল। দাম: ১২৫ টাকা।


বই প্রসঙ্গে:
অল্প পরিসরে চারু মজুমদারকে নিয়ে লেখা অসম্পূর্ণ। ঢ্যাঙা-পাতলা ছোটখাট যে মানুষটিই ভারত বর্ষের বিপ্লবের অচলায়তন ভেঙ্গে একটা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ ঘোষণা করেছিলেন। ভারতের সংশোধনবাদী ঘেরাটোপে ঘুরপাক খাওয়া আন্দোলনকে ঝটকা টানে বিপ্লবের চৌরাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেই চারু মজুমদারকে সামগ্রিকতায় ধরতে পারা খুব সহজসাধ্য নয়। বিশাল ক্যানভাসজুড়ে বিস্তৃত চারু মজুমদার এবং সংশ্লিষ্টদের কিছু সংক্ষিপ্ত ঘটনাপ্রবাহ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে।

আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই নকশালবাড়ির প্রভাব অপরিসীম। একটি ‘মৃত’ আন্দোলন সম্পর্কে এখনো শত্রুপক্ষের আতঙ্ক কাটে না। এখনো শত্রুপক্ষের লেখাপত্রে নকশালবাড়ির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা অব্যাহত। আর তখনই জ্বলজ্বলে সত্য হয়ে সামনে দাঁড়ায় সেই সময়কার ঐতিহাসিক জিজ্ঞাস্য: “ভারতবর্ষের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রথম এতো তীব্র ও তীক্ষ্ণভাবে বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্ন করা হয়েছিলো;‌ "তুমি কার পক্ষে?"


স্তালিনের মরদেহ গ্রাস করে মাটি, লেনিনের মূর্তি ভেঙ্গে পড়ে, মার্কসের মূর্তি সরে যায়, লেনিনের কফিনে মোড়া মমি লেনিনগ্রাদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, লেনিনগ্রাদ হয়ে যায় সেন্ট পিটার্সবুর্গ! মাওয়ের মুখে লেপে যায় অপমানের কালি, সেই কালি লেপনকারীকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়, আর তখনই ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কমরেড চারু মজুমদার এবং তার শিক্ষা। ‘ভারতের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কেন্দ্র হল কৃষিবিপ্লব। একে কেন্দ্র করে এবং নেতা মেনেই বিজয়ী হতে পারে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব।’
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29319354 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29319354 2011-02-03 01:26:33
অ্যান্টিগল্প > ব্রুটাল >

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আজ থেকে পাওয়া যাচ্ছে ঐতিহ্য'র স্টলে। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ।দাম: ৯০ টাকা
‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ এরকম একটি ধারণা ছোটগল্প নিয়ে প্রচলিত। গল্প লেখার ক্ষেত্রে সে ধারা থেকে বেরুনোরও উপায় নেই! কোনো না কোনোভাবে গল্পের এক ধরণের পরিণতি দিতেই হয়। তখন সে গল্প প্রচলিত ছকের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। এসব সূত্রটুত্র মাথায় রেখেই ‘অ্যান্টিগল্প’ এগিয়ে চলেছে। অনেকাংশেই সাধারণ গল্পের মত হয়েও শেষ পর্যন্ত গল্পগুলি প্রচলিত ধারার গল্প নয়। কোনো কোনো মোড়ে এসে হঠাৎই তীব্র বাঁক নিয়ে এক ধরণের বিপরীত আবহ সৃষ্টি করেছে, আর সে কারণেই গল্পগুলোকে বলা হচ্ছে - অ্যান্টিগল্প। সাধারণত গল্প উপন্যাসের পটভূমি থেকে প্রাত্র পাত্রী সবই কল্পনায় সৃষ্টি, কিন্তু এই অ্যান্টিগল্পগুলোর পাত্র পাত্রীর নাম ধাম বাদে আর কোনো কিছুই কাল্পনিক নয়। যেমন ‘ক্রান্তিকালের মা’ গল্পটিতে যে নভেরা খাতুনের কথা বলা হয়েছে তিনি চরম বাস্তব চরিত্র। ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত বিপ্লবী মিজানুর রহমান টুটুলের মা। তা বাদেও প্রত্যেকটি চরিত্র, ঘটনা, সময় কাল, ঘটনার পরিসমাপ্তি সবই নিরেট বাস্তব। গল্পের প্রয়োজনে শুধু নামগুলোই বদলে গেছে।
..................................................................................................


রাশেদ। পাঁচ ফুট ছয়। ছত্রিশ-ত্রিশ-চৌত্রিশ। চশমা। স্টিলরীম। ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ। চোখ ভাসা ভাসা। হনুর হাঁড় সামান্য উঁচু। চেস্টের বা পাশের রিবের সাত আর আটের মাঝখানে গর্তমত। ডান বাম দুটো হাতই সমান চলে। আক্রান্ত হলে সোজা এগিয়ে এসে
আক্রমনকারীর কণ্ঠনালী চেপে ধরে। প্রিয় অস্ত্র- জানা যায়নি। চুলে কোন বিশেষ বিশিষ্টতা নেই.....................

ফাইলটা খুলে গড় গড় করে পড়ে গেলেন ডিপার্টমেন্টের সবচে' তুখোড় পুলিশ সুপার মন্ডল। কেরামত মন্ডল। বিশেষ দায়িত্বে এই এলাকায় আসার পর থেকে সাধারণ পুলিশ পর্যন্ত খামারি দেয়া ভুলে গেছে। তার সামনে যাওয়ার পর তাদের স্বভাবিক বোলচালের ছন্দ পর্যন্ত ঘুলুট হয়ে গেছে।...হ্যাঁ স্যার..বানচো... সরি স্যার.....মাদারচো.......না না আমি বলছি কি স্যার.....চুত্.......না স্যার...বলছিলাম....এর পর 'সাট্আপ', 'স্টপ' এসবের কিছুই বলতে হয়নি। মন্ডলের চোখের ঠান্ডা সাপের চাউনিতেই বুকের রক্ত হিম হয়ে গেছে দারোগা-সেপাই সকলের ।

মন্ডল ফাইলটা দারোগার সামনে ছুড়ে দিয়ে বললেন-গেট লস্ট। টাইম ওনলি থারটিসিক্স আওয়ারস। ওনলি থারটিসিক্স।

১৮ মাস আগে। শহরের একটা বিশেষ জায়গায় ঘোরাঘুরি করে গোয়েন্দাদের বিশেষ সন্দেহের উদ্রেগ করার পর ফাঁদ পেতে রাশেদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। রাশেদ একটা ভাঙ্গাবাড়ি খুঁজছিল......... দশ বছর আগেই তো বাড়িটা ছিল এখানে ? যাবে কোথায়? পষ্ট মনে আছে একটা টিনের গেট পেরিয়ে খোঁয়া বিছানো পথ ধরে কুড়ি-পঁচিশ পা হাঁটলেই একটা দোচালা ঘর , তার ঠিক পেছনই একটু ঢিবি মত। ঢিবিটার পাশেই একটা ঘোড়ানীমের গাছ ছিল ! সব মনে পড়ছে ওর। আশ্চর্য! বাড়ি, গাছ, গেট হাওয়া হয় কি করে? পর পর তিন দিন রহস্যজনক ভাবে ঘোরাঘুরি করার পর আশপাশের লোকজন পাগল পাগল বলে পিছু নিয়েছিল।

টিনের সেই গেটটার পাশে এখন কাঁচঘেরা একটা দোকান। টগবগে সব ছেলে-মেয়ে ঢুকছে আর বেরুচ্ছে। ওর দৃঢ়বিশ্বাস জিনিসটা আছে । ওখানেই আছে। কাল আবার আসবে এটা ভেবে বড় রাস্তায় উঠে এসেছিল। তারপর আপন মনে ফিরতি পথ ধরেছিল। নিজেকেই যেন শোনাচ্ছিল...থাকতেই হবে, এখানেই আছে। একবারের জন্যও ওর ষঢ়রিপুর কোনো রিপুতে ক্রিয়া করেনি যে ওর গতিবিধি নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে, একটা ফাইলও তৈরি হয়েছে। জানবে কি করে ? দশ বছর আগের একটা ফাইল যে পুলিশের ওপর মহলের বিশেষ নির্দেশে ধূলো ময়লা ঝেড়ে আপটুডেট করে রখা হয়েছে সেটা ওর জানার কথা নয়।

চতুর্থদিন ও এ্যরেস্ট হলো। কথা বের করার জন্য পুলিশের ট্রাডিশনাল কায়দাগুলো এ্যপ্লাইও করা হলো, কিন্তু পুলিশ কিছুই বের করতে পারল না। সেপাইদের ধারণা হলো মাদা....দ এ্যয়সা ঘোড়েলের ঘোড়েল ,সহজে চিৎ হবে না। জোর করে চিৎ করে তারপর ইয়ে করতে হবে।

সপ্তম দিন পুলিশ হাসপালের ডাক্তার এসে রিপোর্ট দিল ......লেফ্ট আর্ম ব্রোকেন। রাইট নীক্যাপ ডিজলোকেটেড। নাম্বার এইট অব ব্যাকবোন স্পিলিট ডিসপ্লেসড। মে বি ওয়ান এ্যান্ড হাফ লিটার ব্লাড ডিসচার্জড....এ্যান্ড হি ইজ মেন্টালি পার্ট ডিজএ্যাবল।
দারোগা কুদ্দুসের মেজাজ বিগড়ে গেল ওই বালের রিপোর্ট দেখে।
-যা: বাঁড়া,মারলামনা ধরলামনা তাদেই শালার মাল খসে গেল ? এ তো দেখছি মহা চোদনাগিরিতে পড়া গেল !

ডাক্তারের রিপোর্টে যা হলো , রাশেদকে হাসপাতালে ট্রান্সফার করা হলো। চোদ্দ-পনের দিনের মাথায় একটু একটু হাঁটতে পারল দেখে ওই রাতেই বেডশিট টুকরো টুকরো করে দড়ি বানিয়ে জানালা দিয়ে পালালো । ও পালানোর পরদিনই বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে মন্ডল এসেছিলেন।
থারটিসিক্স আওয়ারের দরকার ছিল না। গোয়েন্দা বিভাগের হাসিখুশি চেহারার খুবই সদালাপি এমরান ফিস ফিস করে বললেন -খোঁজাখুঁজির দরকারই নেই, ওই বাড়িটার কাছে যেয়ে বসে থাক, ও ওখানে যাবেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত দারোগার খোমা আবারো লাল হয়ে গেল - শালা বকরিচোদ বলে কি? আমরা বলে ঘাম ঝরিয়ে দিচ্ছি, আর মাগিপটানো চোদনা জ্ঞান দিচ্ছে?

কুদ্দুস যতই গালি দিক ঠিকঠাক ওই বাড়ির সামনে ওৎ পেতে বসল। ঘন্টাখানেক পরই ওর মেজাজ চড়তে শুরু করল। শালা কোথায় কায়েসের দোকানে বসে থাকা কচি মালটা ছানাছানি করব..... শালা জিনিস বটে! ওইটুকু একটা শরীর ! তার মধ্যে ইয়া দুইটা ইয়ে নিয়ে...... ধ্যাত্ বাল! কিছুক্ষণ পর আর থাকতে না পেরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্যান্টের চেন খুলল। কাজটা হয়ে যাবার পর দুতিনটা আড়াঝাঁকি দিয়ে জায়গামত ওটা সাইজ করতে গিয়েই দেখল -চান্দু আসেছ। ঠিক!

প্রথমত:অন্যায়, দ্বিতীয়ত: হাজতপালানো,তৃতীয়ত:ওদের ছানাছানি তে বাগড়া দেয়ার সব ঝাল একসাথে মিটিয়ে দেয়া হলো। যখন প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থা ঠিক সেই সময়ে ধীর পায়ে উদয় হলেন মন্ডল......স্টপ! ধমকে উঠলেন মন্ডল। তোমাদেরকে ধরে আনতে বলেছি, মেরে ফেলতে নয়। স্টুপিড কোথাকার! বেরোও, বেরোও, যত্তোসব আনাংলার ধাড়ি।
রাশেদকে তুলে মন্ডলের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। রক্তটক্ত মুছিয়ে মোটামুটি ভদ্রস্থ করার পর খুব মোলায়েম স্বরে মন্ডল বললেন...
আমার মধ্যে ওরকম কোন ব্রুটালিটি পাবে না। আমি জানি পুলিশের এক্তিয়ার কতটুকু। আমি বিশ্বাস করি টর্চার করে কোন দিন ইনফরমেশন বের করা যায় না। তুমি আমাকে তোমার বড় ভাই ভাবতে পারো। -ছি: দেখেছ কি ভাবে মেরেছে গোঁয়ার গুলো! এই ভাবে কেউ মারে ? আমি এসব নিয়ে রিপোর্ট করব।

অনেক দিন পর একজন মানুষকে দেখে রাশেদ অভিমানে কষ্টে কেঁদে ফেলল। হুড়মুড় করে বলতে গেল তার টর্চারের কাহিনী.........থামো থামো....দরকার নেই, আমি যা বোঝার বুঝে নিয়েছি..... তুমি এখন রিল্যাক্স হও। আর কোন ভয় নেই, আমি থাকা অবস্থায় কেউ তোমার কিচ্ছুটি করতে পারবে না । কিছুক্ষণ মন্ডলের মুখের দিকে চেয়ে রাশেদের আতংক অনেকটাই কেটে গেল । আরো কিছুক্ষণ পর মন্ডল ফিস ফিস করে জানতে চাইল....তুমি ওখানে কি খুঁজছিলে রাশেদ ?
-কই কিছু না তো !
-না না খুঁজছিলে । হাসতে হাসতে বলল মন্ডল।
-আমি ওখানে গিয়েছিলাম......কিন্তু নেই...ওটা নেই......
-কি নেই
-তাতো জানি না ।
-জানো। তুমি কি কিছু লুকিয়ে রেখেছিলে ?
ঝট্ করে মন্ডলের মুখের দিকে তাকায় ও। অফিসার কি বলতে চায় ? ও কি জেনে গেছে?...
-কি ভাবছ? হ্যাঁ আমি জানি। তুমি ........
রাশেদের মাথার মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে...কি যেন মনে করতে চেয়েও পারছে না...কি সেটা ?..এক একবার মনে হয় মনে পড়ছে, আবার গুলিয়ে যাচ্ছে......জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটের রক্ত চাটছিল ও, নোনতা। আসটে গন্ধ। জিহ্বাটা একটা ভাঙ্গা দাঁতে লাগতেই ছড়ে যায়...দাঁত...দাঁত.... হঠাৎ শব্দ করে বলে ওঠে ও...আপনি অফিসার...আপনার একটা দাঁত...উপরের মাঁড়ির আট নম্বর....সোনা বাঁধানো...দাঁত.. হ্যাঁ হ্যাঁ...ঝট্ করে উঠে বসে রাশেদ। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে ও.....আপনি মন্ডল....দশ বছর আগে....রাজশাহী...নওগাঁ....মুখের দুই কষা বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল......আমি চিনেছি আপনাকে.....।
মন্ডলের মুখে দু'ধরণের ছবি খেলে যায়। একবার ঝাঁপসা নেগেটিভ। একবার পরিষ্কার পজেটিভ। মন্ডল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। পকেট থেকে ছোট্ট একটা চাকু বের করে। ব্লেডটা মাত্র সাড়ে তিন ইঞ্চি। ..আমার মধ্যে কোন ব্রুটালিটি পাবে না । আমি জানি বাম বুকের ঠিক স্তনের বোঁটার নিচে দুই রিবের মাঝখানে দিতে হবে। এক ফোঁটা রক্তও বেরুবে না। একেবারে পরীক্ষিত।

এবারো জয়ী হলো মন্ডল । হয়তো ওই বাড়িটার নিচে যা ছিল তা মন্ডলের জন্যই দশ বছর ধরে পড়ে ছিল। হাইরাইজ । ফাস্টফুড। পিচঢালাপথ। মার্বেল স্লাব। মাটি কই? তাছাড়া মাটি অত দিন মেটালকে রাস্ট করে দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা দেন।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29318646 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29318646 2011-02-01 23:17:04
কখনো কোনো ট্রেন এখানে থামেনি, কখনো কোনো ট্রেন এখানে থামেনা!!!



থেমে থাকা জীবনটা হঠাৎ নড়ে উঠেছিল
পুরোনো কলকব্জা, জংধরা কাঠামোতে
বার্ণিশের ছোঁয়ায় হঠাৎ ঝিকিমিকি.......
কেউ কি এলো এই অবেলায়? নিশুতি রাতে?

কবেকার পুরোনো লেফাফা দোমড়ানো ছিলো
তোষকের তলে। আরো পুরোনো কালিতে লেখা
এলোমেলো হাতে, কোথাও ঝাপসা;কোথাও কাঁপা,
কাগজপোকায় খেয়ে ফেলেছে চারিধার।
সেসবও যেন হঠাৎ বাঙময়, হঠাৎই স্মৃতিমন্থনকাতরতা-
তবে কি সত্যি কেউ এলো?

লেঠেল পাহারাদার সটান এসে দাঁড়াল ঠিক
আলোআঁধারির অলিন্দে, একেবারে মুখোমুখি,
ছেড়া সার্ট, পোকাখাওয়া চিঠি, লেফাফা, ধূসর কালিরা
সব মাতোয়ারা হওয়ার আগেই-

পাহারার আদলে সময় জানিয়ে দিল-
যার আসার কথা সে আজ আসছে না।
যার আসার কথা সে কালও আসবে না।
যার আসার কথা সে কখনোই আসবে না।

কখনো কখনো জীবনে এমন একটা সময় আসে
যখন দিগন্তের চারিপাশ থেকে কেবলই বাতাস
আর ধূসর রঙের মেঘ ভেসে আসে, আসে আরো
কিছু অচেনা শব্দ এবং চিরচেনা স্মৃতিরা,
জীবন এখন এমনই এক প্ল্যাটফরম
যেখানে কোনো ট্রেন থামেনা
কখনো কোনো ট্রেন এখানে থামেনি।
কখনো কোনো ট্রেন এখানে থামবে না।
‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍

৩১ ডিসেম্বর ২০১০
০১ জানুয়ারি ২০১১

উৎসর্গঃ আল্লামা শয়তান বন্ধুবরেষু।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29299844 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29299844 2011-01-01 00:54:51
গার্মেন্ট নামক বয়লারে ৩১ জন শ্রমিকের মৃত্যু এবং এই মৃত্যুবিভিষিকা আর মৃত্যুভেট এর অব্যক্ত কথা
ইয়ংওয়ান-এ ৪ জন “বেয়াদপ” শ্রমিককে ফেলে দেয়ার পর (মতান্তরে ১০ বা আরো বেশি হতে পারে) যথারীতি চিরাচরিত নিয়ম মত খুঁজে পাওয়া গেল ষড়যন্ত্র, নাশকতা। রাত ২টায় গ্রেপ্তার করা হল গার্মেন্ট নেত্রী মিশুকে। ঠিক তার পর পরই আর এক “নাশকতা”, “বিদেশি ষড়যন্ত্র” এবং “অর্থনীতির চাকা পেছনে টেনে ধরার অপচেষ্টাকারিদের দুরভিসন্ধী” তে এখন পর্যন্ত “কোটি কোটি টাকার মালামাল ধ্বংস” হয়েছে। “কোটি কোটি টাকার রপ্তানিযোগ্য গার্মেন্ট পুড়ে ছাই” হয়ে গেছে। এটা জাতির জন্য “অপুরণীয় ক্ষতি”। এর পাশাপাশি বেখেয়ালে সামান্য ক’জন শ্রমিক পুড়ে মারা গেছে! হয়ত ওই মৃতের সংখ্যা বেয়াক্কেলের মত আরো বাড়বে। “আবালগুলো” কেন যে কাজ করতে এসে পুড়ে মরে! ছিঃ শালাদের বাঁচার কৌশলটাও জানা নেই। পারে শুধু দেশের অমূল্য সম্পদ ধ্বংস করতে! ছিঃ!!

কাগজওলারা সন্ধ্যেই টের পেয়ে গেছে, আজ কী লিড! এখন একটু একটু করে সংখ্যা বাড়ছে আর লিডের জায়গা বাড়ছে। থ্রী-সি থেকে বেড়ে এখন ফাইভ-সি। একটু পর হয়ত ব্যানার লিড হয়ে যাবে।

ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম, স্টক লট ক্লিয়ার, আরো তিন-চার ধরণের “কার্যকারণে” এই আগুন লাগে। লেগে যায়! লাগতে থাকবে। জয় গার্মেন্টে আগুনের জয়!!!


কোনটি মৃত্যু, কোনটি ' হত্যা '?
একটি দুটি দুর্ঘটনা, একটি দুটি মৃত্যুকে কেউ হত্যা বলবে না। কিন্তু দিনের পর দিন একই ধরণের দুর্ঘটনায় শত শত মানুষের করুণ মৃত্যুকে আর দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া যায়না। সেই ‘দুর্ঘটনা’ আবার যদি বিশেষ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এবং নির্দিষ্ট সময় পর পরই নির্দিষ্ট কারখানাগুলোতে হয় তখন কোনোভাবেই তাকে দুর্ঘটনা বলা যায় না। জন্মের পর থেকে এযাবত এই সেক্টরে কত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। গড়পড়তা যেটা জানা যায়:

দুই দশকে সাত শতাধিক মৃত্যু হয়েছে এই সেক্টরে। তবুও প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা হয়নি। নব্বইয়ের দশক থেকে একের পর এক ভয়াবহ আগুনে সাত শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বড় দুর্ঘটনার পর ত্বরিতগতিতে তদন্ত কমিটি হয়েছে, নানা ধরনের সুপারিশ ও সিদ্ধান্ত হয়েছে; কিন্তু এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার আশুলিয়ার নরসিংহপুরে হা-মীম গ্রুপের কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং গার্মেন্ট মালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সাল থেকে এ শিল্পে আগুনে সাত শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের গরীব অ্যান্ড গরীব কারখানায় আগুনে ২১ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বেশ তৎপর হয়ে ওঠে কর্তৃপক্ষ। সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি কয়েক দিনের মাথায় মালিককে দায়ী করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিজিএমইএর গঠন করা তদন্ত কমিটি কোনো প্রতিবেদন দেয়নি (সূত্র: কালের কণ্ঠ)

আমরা আশঙ্কা করি এবারো ঠিক একই ধরণের তদন্ত এবং তার রিপোর্টের বিলাসীতা হবে। যথারীতি তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দেবে। বিজিএমইএ-এর তদন্ত প্রকাশ হতেও পারে আবার নাও পারে। আর প্রকাশ হলেই বা কী? কর্তৃপক্ষ যদি দেখে যে তদন্তে তাদের বিপদের সম্ভবনা আছে তাহলে ধরে নেয়া যায় ওই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখবে না।

কেন এই মৃত্যু, কেন এই হত্যা?
আমরা দেখেছি বার বার একইভাবে সাবধানতার কথা, যথাযথ নিরাপত্তার কথা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর কথা, শ্রমিকের জান মালের নিরাপত্তার কথা বলা হলেও তার কোনো কিছুই বাস্তাবায়ন হয়নি। কার্যকর হয়নি। আমরা হা করে চেয়ে চেয়ে দেখেছি মাত্র দিন সাতেক পার হলেই আত্মবিস্মৃত জাতি সব ভুলে গেছে। আবারো একেকটা নতুন দিন শুরু হয়েছে। আবারো গার্মেন্ট শ্রমিকরা পেটের টানে সেই সব কারখানায় গিয়ে নাকমুখ গুঁজে কাজে লেগেছে।

কারখানায় দরজা খোলা রাখার ব্যাপারে সরকারের তরফে, বায়ারদের তরফে এবং বিভিন্ন তদন্তকারী দলের পক্ষে বার বার সাবধান করার পরও কেন সে সব ব্যবস্থা নেয়া হয়না? কেন সামান্য কিছু সুতো-বোতাম চুরি ভয়ে কারখানার সব দরজা শেকল দিয়ে তালা মারা থাকবে? কেন দুর্ঘটনার সময় সেই তালার চাবিধারী দারোয়ান পালিয়ে যাবে? কেন আগুন লাগলে বা অন্য কোন দুর্ঘটনা ঘটলে জীবন বাঁচানোর জন্য শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরুতে পারবে না? কেন এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে যাওয়ার গেট বন্ধ থাকবে? কেন ভবনের বাইরে দিয়ে ফায়ার স্কেপ সিঁড়ি থাকবে না? কেন বিভিন্ন ব্যাসায়িক জালিয়াতি এবং জোচ্চুরির মাশুল গুণবে অসহায় নিরুপায় দরিদ্র শ্রমিক?
আমরা জানি, এই সব ‘কেন’র কোনো উত্তর দেবেন না মালিকপক্ষ। উত্তর দেবেন না সরকার এবং সরকারের কোনো দপ্তরও। আমরা এটাও জানি এই ‘কেন’ র মধ্যেই নিহীত আছে প্রতি বছর শত শত শ্রমিকরে করুণ মৃত্যুর আসল কারণ।

গরীব এন্ড গরীব ফ্যাক্টরিতে ২১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হওয়ার পর সেবারই সরকার একটু নড়েচড়ে বসেছিল। সেসময় বেশ কিছু ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ নেয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল। দেখলে মনে হবে এইসব ‘চমৎকার চমৎকার’ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অনেকাংশেই দুর্ঘটনার হার কমে আসবে।

মালিকপক্ষের ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়া সরকারের সিদ্ধন্তসমূহ:

গত ৪ এপ্রিল তৈরি পোশাক শিল্পে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপক বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠকে বসে। সেখানে ২০০৩ সালে ফায়ার ইন্সপেকশনের জন্য সরকার গঠিত ১২টি কমিটিকে আবারও সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত হয়। এসব কমিটি নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করবে বলে তখন বলা হয়। পোশাক কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। আইন অমান্য করলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করার কথাও বলেন তিনি। তবে সেসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে যে সব সিদ্ধান্ত হয়েছিলঃ ১. সব কারখানার ছাদ সম্পূর্ণ খোলা থাকবে। নিচ থেকে ছাদে ওঠার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ছাদে ওঠার দরজা সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে হবে। ২. কারখানার ভেতরে যাতায়াতের পথ, বিকল্প সিঁড়ি ও জরুরি গেট খোলা রাখতে হবে। ৩. দুটি মেশিনের মাঝখানে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ৪. কারখানার ফ্লোরে কাপড়সহ সব ধরনের দাহ্যসামগ্রী বড় লটে স্তূপ করা যাবে না। ৫. শর্টসার্কিট এড়ানোর জন্য কারখানাগুলো নিয়মিত নিজেদের পানি, সুয়্যারেজ লাইন ও বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা করবে। ৬. কারখানাগুলোকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে শ্রমিকদের নিয়ে নিয়মিত মহড়া চালাতে হবে। যতক্ষণ কারখানা চালু থাকবে, ততক্ষণ কারখানার অগ্নি মহড়া কর্মীরা ফ্লোরে টহল দেবেন। বিভিন্ন গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডের পর হতাহতের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনগুলোতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে কারখানা তৈরি করা, দুর্ঘটনার সময় জরুরি অবতরণের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প সিঁড়ি না রাখা, সিঁড়ির মুখে লোহার গেটে তালা লাগানো থাকায় অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকরা বের হতে না পারা, এবং বস্তা, পোশাক ও আবর্জনা রেখে সিঁড়ির প্রবেশপথ বন্ধ করে রাখা ও অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। গাজীপুরের গরীব অ্যান্ড গরীব সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগলে সিঁড়ির মুখে গেট বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বের হতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিস আইন কি বলে?
১. ১৯৬৫ সালের কারখানা আইন অনুযায়ী, কারখানার ভেতরে যতক্ষণ পর্যন্ত একজন শ্রমিক কর্মরত থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কারখানায় ঢোকা ও বেরোনোর গেটসহ রুমের সব দরজা খোলা রাখতে হবে। এ বিধানটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
২. কারখানা আইনে সব তলায় দুটি জরুরি নির্গমন পথ রাখার বিধান থাকবে। এসব সিঁড়ি কমপেক্ষ ৩২ ফুট চওড়া ও সাড়ে ৬ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন হতে হবে।
৩. কোনো কারখানায় ২০ জনের বেশি শ্রমিক নিয়োজিত থাকলে সেখানে জরুরি নির্গমনের জন্য কমপক্ষে একটি চলন্ত সিঁড়ি থাকতে হবে। সিঁড়িগুলো কমপক্ষে ৪৫ ইঞ্চি প্রশস্ত হতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিধান অনুযায়ী, কারখানার প্রতি তলায় কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও শুকনা রাসায়নিক গুঁড়া রাখার কথা রয়েছে। বিকল্প সিঁড়িপথ কমপক্ষে ৪২ ইঞ্চি প্রশস্ত ও সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি কোণে রাখতে হবে। প্রতি তলায় কমপক্ষে দুটি অগ্নিনিরোধক পয়েন্ট থাকতে হবে এবং প্রতি পয়েন্টে ৪৫ গ্যালন পানি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ড্রাম ও চারটি বালতি রাখতে হবে। ধোঁয়া নির্ণায়ক যন্ত্র ও হোস রিল থাকতে হবে। (সূত্র: কালের কণ্ঠ)।

মালিকপক্ষ এসব আইন না মানলেও কোন ব্যবস্থা নেই!
এই যে মালিকপক্ষ সরকারের নির্দেশনার এটি শর্তও পালন করল না, প্রকারন্তরে সকল নির্দেশরাই অগ্রাহ্য করল। শেষ পর্যন্ত গায়েই মাখল না, তার জন্য কি সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে, না নেয়ার কথা ভেবেছে? কিছুই না। ঘটনার রেশ মিটে যেতে না যেতেই নোংরা বুড়িগঙ্গার একটু উত্তাল হওয়া জল আবার থিতু হয়ে গেছে। আকাশে বাতাসে পোড়া লাশের যে গন্ধুটুকু ছিল তাও দখিনা বাতাসে উড়ে গেছে অচেনায়। কিছুদিনের মধ্যেই আর সেই মৃত মানুষদের কথা কেউ মনে রাখেনি।


তিন টাকার সুতো, পাঁচ টাকার বোতাম, দশ টাকার পলি, কুড়ি টাকার কাট পিস যদি ওরা চুরি করে শাড়ির ভেতর গুজে নিয়ে যায়! সেই ভয়ে বিলিওনিয়র মালিকেরা (সবাই, অধ্যাপক মালিক থেকে সেলিব্রেটি, ফুটবলার, অব:সেনা কর্মকর্তা সবাই) মেইন গেটে শিকল দিয়ে পেচিয়ে তালা মেরে রাখে। বাইরে একটা খাকি পোশাক পরা দারোয়ার দাঁড়িয়ে থাকে, সে কার্ড দেখে ভেতরে ঢোকায় আবার কার্ডে টাইম দেখে বের করে। এই দারোয়ান আগুন লাগলে বা আগুনের গুজব শুনলেই দৌড়ে পালায়। চাবি থাকে তার তার কাছে। ডুপ্লিকেট চাবি স্টোর কিপারের কাছে, আর এক পিস মহামান্য মালিকের কাছে।

অসহায় কর্মীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোড়ে। একসময় বাইরের কেউ যেয়ে তালা ভাঙ্গে, ততক্ষণে ডজনখানেক পুড়ে শেষ।

এটা অসাবধানতা বা নিরাপত্তা নয়। স্রেফ হত্যা। ঠান্ডামাথায় খুন। এই খুনের কোন বিচার এদেশের আদালত করে না। সরকার করে না। তথাকথিত বক্তৃতা বিবৃতিবাজ বুদ্ধিব্যাপারিরা করে না।

আমরা এটাকে কোনোওভাবে দুর্ঘটনা বলতে রাজি নই। এটা নির্বিচারে হত্যা। এই হত্যার সাথে জড়িয়ে আছে ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম, স্টক লট ক্লিয়ার করা, ইনসেন্টিভ আদায় করা, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের লিমিটের বাইরের মাল গাপ করে দেয়া। এটা তাই প্রকাশ্য ক্রাইম। এই ক্রাইমটা ধরার মত হ্যাডম আদালত বা সরকারের নেই, কেননা সব সরকারই ওই বিদেশি ডলার-পাউন্ডের চামড়াগন্ধে নেশাগ্রস্ত হয়ে বসে আছে।

এর প্রতিকার করতে হবে গার্মেন্ট কর্মীদেরই। আর সেটা প্রবল বল প্রয়োগের মাধ্যমে। নো বডি ক্যান সেভ য়্যু, নট ইভেন গড! সো ট্রাই টু সারভাইভ। নিজেকে বাঁচাও হে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ!!!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29289586 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29289586 2010-12-14 17:54:03
কার এতবড় সাহস যে পুলিশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে? (মতদাতাদের পরিচয় প্রকাশের দাবি পুলিশের)
বিডি নিউজ ২৪ ডট কম এর খবরটাকে আমরা একটু ভিন্ন মাত্রায় প্রবন্ধ আকারে উপস্থাপন করছি।

পুলিশকে 'সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত' হিসেবে চিহ্নিত করা টিআইবি'র প্রতিবেদন যাদের মতের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে তাদের পরিচয় প্রকাশের দাবি তুলেছে পুলিশ বিভাগ।
এটা কেমন কথা? এই পুলিশ কর্তারা কি সাধারণ নমর্সগুলোও জানেন না! একজন সাধারণ শ্রমজীবি মানুষও জানেন যে আদালতে দাঁড়িয়ে যখন কোন সাক্ষী স্বাক্ষ্য দেয় তখন তার নিরাপত্তা, গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব আদালত তথা সরকারের উপর বর্তায়। ঠিক তেমনিভাবে টিআইবি জনসাধারণের যে অংশের স্বাক্ষ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে সেই স্বাক্ষ্যদাতাদের তথ্য, তাদের পরিচয়, তাদের ঠিকানা গোপন এবং সংরক্ষিত রাখা টিআইবর দায়িত্ব। আর সরকারের দায়িত্ব তাদের নিরাপত্তা দেয়া। ভাবতে অবাক লাগে, ক্ষমতা ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকার অধিকর্তা ব্যক্তিবর্গকে কতটা উদ্ধত করে তোলে!

এ ধরণের জরিপ চালানোর সময় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বেসরকারি সংস্থাকে রাখার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপ) কমিশনার বেনজির আহমেদ।

বাহ! কি অদ্ভুত আব্দার! টিআইব বা ওই ধরণের কোন প্রতিষ্ঠান এই জাতির কলঙ্ক মোচনের যে সামান্য চেষ্টাটুকু করে সেখানেও পার্টিজান সংস্থা পুশ করা! ওই ধরণের একটি "পুলিশ মনোনীত" সংস্থা পুশ করা মানেই পুলিশের বিরুদ্ধে আর কোন অভিযোগ আলোর মুখ দেখবে না। এই ধরণের শত শত ঘটনা দেখা যায় পুলিশের অপকর্ম তদন্ত করতে যখন পুলিশেরই একটি দলকে নির্বাচিত করে দেয়া হয় তখন। কাকে যেমন কাকের মাংস খায় না, তেমনি পুলিশও পুলিশের 'মাংস' খায় না। তদন্ত হোক বা না হোক, তা কখনো আলোর মুখ দেখবে না। দেখে না।

সোমবার বিকালে পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিচয় প্রকাশের ওই দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, "এরা জঙ্গি, না মাদকসেবি, না ব্যবসায়ী তা জানতে হবে। এরা পুলিশের সেবা পেয়েছে কি না বা এদের মধ্যে কারা পুলিশকে ঘুষ দিয়েছে তাও জানা প্রয়োজন।"

দেখুন কী অলঙ্ঘনীয় ল্যাঠা! জনগণ যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তারা পুলিশের ভাষ্যে হয় জঙ্গি, না হয় মাদকসেবী, না হয়ত ব্যবসায়ী। কেন, এরা ছাত্র, শিক্ষক, দোকানদার, কেরাণী, মুটে মজুর, রিকশাচালক, গৃহিনী, ড্রাইভার হতে পারে না? নাকি পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষাৎকার দিলেই তারা বাইডিফল্ট জঙ্গি, মাদকসেবী হয়ে যায়? যেমন পুলিশ, রেব যখন এনকাউন্টার মতান্তরে বন্দুকযুদ্ধ মতান্তরে ক্রসফায়ার করে তখনও এই তোতাপাখির বুলি আউড়াতে দেখা যায়। "মৃতদেহের পাশে একটি পিস্তল, তিনটি গুলিভর্তি ম্যাগজিন এবং কয়েকটি খালি ফেন্সিডিলের বোতল ও গাঁজা পাওয়া যায়"! এখানেও পুলিশ ধরেই নিয়েছে ওই সাক্ষাৎকারদাতারা নিশ্চিতভাবেই ক্রিমিনাল।

সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।

তারাই তো করবেন! এতে অবাক হওয়ার কি আছে? অ্যাসোসিয়েশন বুঝতে পেরেছে আগে আনঅফিসিয়ালি পাবলিকরা এসব বলত। যুগ যুগ ধরে বলে আসছেও। তাতে করে তেমন কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি নেই, কারণ পাবলিকের কথা শুনতে হবে এমন কোন হাদিস নাই। রাষ্ট্রীয় কোন বাধ্যবাধকতাও নাই। কিন্তু টিআইবি বলা তো পাবলিকের বলা নয়! এটা যে রেকর্ড! এটার কারণে জাতিসঙ্ঘের মিশনটিশন ছুটে গেলে কি উপায় হবে!!

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক একেএম শহীদুল হক টিআইবি'র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "এর পেছনে যড়যন্ত্র আছে বলে আমি মনে করি। এটা রহস্যজনক এবং অন্য কোন উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছে।"

নিশ্চই স্যার। ষড়যন্ত্র তো একটা অবশ্যই আছে। আর সেই ষড়যন্ত্রের নাম দায়বদ্ধতা। টিআইবি প্রতি বছর বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতির খতিয়ান এবং সে কারণে অর্থনীতির উন্নয়নের অন্তরায়গুলো তুলে ধরে। সেই ধারাবাহিকতায় পুলিশ আসবে এটা তো ন্যাচারাল সিলেকশন! যেখানে যেখানে দুর্নীতি হয় সেই সেক্টরগুলোই তো ‌"অপারেশন" তালিকায় উঠে আসবে। এর পেছনে আর কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা আমাদের জানা নেই, তবে টিআইবিকে স্বচ্ছ আর জবাবদিহিতার ভেতর থাকতে হলে যেখানে যেখানে দুর্নীতি হয় সেখানে হাত দিতেই হবে। এবং তা নির্মোহভাবেই।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "প্রতিবেদন সম্পর্কে পুলিশ বিভাগ যে মন্তব্য করেছে তা রাজনৈতিক। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবারই আছে। তবে আমরা যেসব গবেষণা করি তা বিজ্ঞানসম্মত, বস্তুনিষ্ঠ এবং আর্ন্তজাতিক মানের।" "আমরা জনগণের অভিজ্ঞতা ও মতামত প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি।"

দ্যাটস গুড! মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবারই আছে। পিপলস ওয়ান্ট রাইট টু নো।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পুলিশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে চিহ্নিত করে ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা। ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা পুলিশকে সর্বাধিক ঘুষগ্রহীতা বলেছেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই খতিয়ান আরো বাড়তো যদি টিআইবি আরো বেশি সময় নিয়ে একেবারে রুট রেভেল পর্যন্ত গবেষণা বিস্তৃত করত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন রোববার টিআইবি'র ওই প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন।
এই মন্ত্রী সাহেবার বিষয়ে কিছু বলতেই বিরক্ত লাগে। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কি করে একটি সংস্থার লোকজনের মুখে ছাই ঘসে দেয়ার কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেন!

সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে একেএম শহীদুল হক বলেন, "পুলিশের বিরুদ্ধে এই নেতিবাচক প্রতিবেদনে অনেকের মনোবল ভেঙে গেছে যার প্রভাব আগামী পৌর নির্বাচন ও বিশ্বকাপের পড়তে পারে।"

খুবই খোঁড়া এবং খেলো অজুহাত। একারণে যদি মনোবল ভেঙ্গেই যায় তাহলে অমন ঠুনকো মনোবলের কি দরকার? মনোবল ছাড়াই পাবলিক যে হারে প্যাদানি খাচ্ছে তাতে করে মনোবল কমে গেলে বরং পাবলিক কিছুটা রেহাই পায়।

আন্তর্জাতিকভাবে যখন পুলিশের সুনাম বাড়ছে, জাতিসংঘ মিশনে পুলিশ সাফল্য দেখানোয় যখন চাহিদা বাড়ছে সেসময় এধরণের 'প্রচারে' পুলিশে কালিমা লেপন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান মোখলেছুর রহমান।

বলেছিলাম না! এই সেই আসল কথা! আন্তর্জাতিক মিশন! জাতিসঙ্ঘ! যে করেই হোক ওই "সুনাম" রক্ষা করতেই হবে, তা না হলে ডলার এবং টাকা উভয় কারেন্সিতে বেতনের কি হবে!! ডলার, বাড়ি, গাড়ি, জমি. ফ্ল্যাট. ডুপ্লেক্স.....ব্লা ব্লা।


এ প্রতিবেদন বিষয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে শহীদুল হক জানান, "এ ব্যাপারে সংগঠনের সব সদস্যের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। আইনজীবিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।"

লে হালুয়া! আইনের আশ্রয় নিয়ে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার? শেষে আবার কেঁচে না যায়!

শহীদুল হক দাবি করেন, "টিআইবি পুলিশ, জনপ্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত আখ্যা দিয়ে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি অঙ্গের ভাবমূর্তি দেশে-বিদেশে ক্ষুণ্ণ করে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের ষড়যন্ত্র করছে কি না তা বিবেচনার দাবি রাখে।"

এটা নিয়ে এখন দেশজুড়ে গবেষণা ,পর্যবেক্ষণ, বাদানুবাদ, চাপান উতোর চলতেই পারে। আইনি লড়াইও চলতে পারে। তবে সেটা পুলিশ, সরকার তথা এই জাতির কোনই মঙ্গলে আসবে না, বরং বিশ্বের দরবারে নিজেদের ভীষণ রকম হাস্যস্পদ করে তুলবে। ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজা পুলিশের ট্রেনিং ,চাকরি এবং নৈপুণ্যের একটি অংশ। সুতরাং এব্যাপারে মোটেই অবাক হওয়ার সুযোগ নেই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29289235 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29289235 2010-12-14 02:08:45
শান্তিচুক্তির ১৩ বছর পর কী পেল পাহাড়ের বঞ্চিত মানুষ ? আরো প্রতিশ্রুতি, আচানক ধেয়ে আসা মৃত্যু এবং বিবমিষা!
পেছন ফিরে দেখা :
পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর এক যুগ পার হয়ে গেলেও এর কোন কিছুই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আর সে কারণে আদিবাসীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তারা চান দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা। আদিবাসীরা মনে করেন, মৌলিক অধিকার বঞ্চিত পাহাড়ি জনগোষ্ঠী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। একদিকে চরম দারিদ্র্য আর অন্যদিকে অব্যাহতভাবে দখলদারদের দৌরাত্ম্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই আদি ভিটা হারানো তাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেশা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিলুপ্ত হওয়াসহ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আদিবাসী সম্প্রদায়। যুগ যুগ ধরে তারা নানাভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত। এখনো হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। ক্রমেই অধিকার হারা নিঃস্ব মানুষে পরিণত হচ্ছে। তারা আজ নিজ দেশে পরবাসী ও উদ্বাস্তু। জুম্ম জনগোষ্ঠীর মুক্তির সনদ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের অধিকার আর গৌরব ফিরিয়ে দিলেই কেবলমাত্র তারা না মের বেঁচে থাকার কোন একটা পথ পেতে পারে।
পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী পাহাড়ি বা জুম্ম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। প্রাক-ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এ অঞ্চলের জুম্ম জনগণ স্বজাতীয় আদিবাসী স্বাধীন রাজ্যের অধীনে ছিলেন। ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ মানচিত্রকর জো ডি ব্যারেজের আঁকা মানচিত্র অনুযায়ী চাকমা রাজ্যের সীমানা ছিল উত্তরে ফেনী নদী, দক্ষিণে নাফ নদী, পূর্ব লুসাই হিলস এবং পশ্চিমে সমুদ্র। এ হিসেবে বর্তমান চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা নিয়ে বিস্তৃত ছিল আদিবাসী রাজ্য। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসন আইন তৈরির মাধ্যমে সমগ্র ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে। পরে ১৮৬০ সালের অ্যাক্ট অনুযায়ী চাকমা রাজার দেশ পার্বত্য জেলা হিসেবে গঠন করে ভারত সরকারের আওতাধীন করা হয়। ১৮৭০ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর আদিবাসীদের ভূমির অধিকার ও স্বশাসনের অধিকার রক্ষার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন পাস করে। এই আইনের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধানিষেধ, ভূমি অধিকার ও স্বশাসনের নিশ্চয়তার আইনি বৈধতা দেয়া হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল ও তাদের অধিকার রক্ষার বিধান বহাল রাখা হয়। ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের প্রথম ও দ্বিতীয় সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ বহাল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসন ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। কিন্তু এক বছর পরে ১৯৬৩ সালে পৃথক শাসন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে সরকারি মদদে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগতদের বসতি স্থাপন ও ভূমি বেদখল বেড়ে যায়।

১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ বহাল রাখা হয়। কিন্তু বন্ধ হয়নি বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য ও ভূমি বেদখল প্রক্রিয়া। তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের জন্য কোন নতুন বার্তা না আসায় এবং শাসকগোষ্ঠির ক্রমাগত বৈরি মনোভাবের কারণে আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধিকার আদায়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথকেই বেছে নেয়। সেই থেকে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ এই আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে প্রাণ দিয়েছে। এর পাশাপাশি আইনি উপায়ে দাবি আদায়ের জন্য ১৯৮৫ সালের পর এরশাদ সরকার, খালেদা জিয়া সরকার এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ২৬ বার বৈঠক হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের জন্য ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আদিবাসী নেতাদের মতে, পাহাড়িদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল এই চুক্তি। যদিও এখন অনেক পাহাড়ি নেতাই মনে করেন চুক্তি করে তারা কিছুই পায়নি, বরং তাদের স্বাধীকারের যে ভীন্নমুখি আন্দোলন সংগ্রাম ছিল তাও স্তিমিত করে দেয়া হয়েছে। শাসকগোষ্ঠির এই "টেবিল টেকনোক্র্যাসি" পাহাড়িরা বুঝে উঠতে পারেনি।
শান্তিচুক্তিতে যা আছে : পাহাড়ি জনগণের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র আন্দোলনের ফসল পার্বত্য শান্তিচুক্তি। আদিবাসীদের ভাষায়, এই চুক্তি তাদের অধিকার রক্ষার চুক্তি। আদিবাসীদের জীবন বৈচিত্র্য, ভাষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নিজস্ব রীতিনীতি রক্ষাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নের ঐতিহাসিক সনদ। দেশের সংবিধানের আওতায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কথা পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রস্তাবনায় উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিটি মন্ত্রিপরিষদে পাস হয় ২২ ডিসেম্বর। ক) সাধারণ, খ) পার্বত্য জেলা পরিষদ, গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্য বিষয়াবলী শিরোনামে চার খণ্ডে বিভক্ত এই চুক্তির উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি ও এই বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী ও রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করে বিশেষ শাসন ব্যবস্থার প্রর্বতন, প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী, অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও জনসংহতির সদস্যদের পুনর্বাসন, ৬টি সেনানিবাস ছাড়া সেনা, এপিবি, আনসার ও ভিডিপির সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, প্রথা ও পদ্ধতি অনুসারে ভূমি কমিশনের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির পর ভূমি জরিপ, অস্থানীয়দের ভূমির ইজারা বাতিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং একজন আদিবাসীকে মন্ত্রী পদে নিয়োগদান। জনসংহতি সমিতির সদস্যসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা। জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অস্ত্র জমাদান। সকল প্রকার চাকরিতে পাহাড়িদের অগ্রাধিকার প্রদান, আদিবাসী কোটা সংরক্ষণ। চুক্তি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ (স্থানীয়), কৃষি ও বন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য সংস্কৃতি, যুব কল্যাণ ও আদিবাসী আইন, রীতি বা প্রথা ও সামাজিক বিচারসহ ৩৩ বিষয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় জেলা পরিষদকে। সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় পরিষদের মধ্যে সমন্বয় করার দায়িত্ব থাকে আঞ্চলিক পরিষদের।

চুক্তির পর রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ সংশোধন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কার্যবিধিমালা ১৯৯৮ প্রণীত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা দায়িত্ব গ্রহণ করেন ১৯৯৯ সালের ১২ মে। ২৭ মে অভিষেক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের যাত্রা শুরু হয়।


চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা : এই অংশ ২য় পর্বে পোস্ট করা হবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29283291 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29283291 2010-12-04 03:47:57
অমাবশ্যার চাঁদে গ্রহণ লেগেছে

অমাবশ্যার চাঁদে গ্রহণ লেগেছে
ডুবে গেছে কবেকার সূর্য,
পূর্ণীমার নিকষ আঁধারে এক মুঠো
ভালোবাসা জ্বালিয়ে পথ খুঁজে ফেরা
এক নাবিকের সাথে কথা হলো সেদিন।

হৃদয়হীনাটা হৃদয় খুঁজতে ডাঙ্গায় নেমেছে!
জানেনা ডাঙ্গার দোকানে থরে থরে তাকে
জলের কুমির ভালোবাসা বিকোয় !!!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29282007 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29282007 2010-12-02 01:44:57
এন্টি গল্প > আচানক পান্থজন অপান্থ বারবেলায় >

শেষ শরতের স্নিগ্ধ চাঁদ সটান উঠে এলো বারান্দা সোজা। নিজের অক্ষের ওপর ঘুরতে ঘুরতে একফাঁকে চোখ বুলিয়ে নিল। ফাঁকা বারান্দা। তারপর একটু নড়েচড়ে আবার নিজের অক্ষে ঘুরপাক খেতে খেতে আরো ওপরে ওঠার দৈনন্দিন রুটিনে মনোনিবেশ করল।
ধীর স্থীর দাঁড়ানো দরজাটা নিজের মনেই অভ্যেসবসে একবার খুলে যেতে চেয়েও বস্তুগত নিয়মে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। ওপরের সিটকানিটার একবার মন বলল- নড়েচড়ে ঠুস করে নিচের দিকে নেমে হাট হয়ে দরজাকে খুলতে দেয়! কিন্তু সেও শেষমেষ নিশ্চল।
রোজকার নিয়ম মত চটি জোড়া মুখ ব্যাদান করে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় নিজের ফিতে দুটোকে হালকা দুলিনি দিয়ে আবার সোজা হতে চাইল। ফিতেরা দুলেও উঠল না, নড়েও উঠল না। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চটি জোড়ার মনে হলো কি সব্বোনাশ! এখনো যে বাথরুমে যাওয়া হলো না! ছড় ছড় করে জলের ধারাও তো বয়ে গেল না!
আড়চোখে চটির ঘাপটিমেরে পড়ে থাকা দেখে বেডসাইড টেবিলটার বেশ মজা লাগল। সে জানে, তাকে নড়াচড়া করতে হবেনা। কিন্তু সেও অনেকক্ষণ নিরবে নিশ্চল থেকে একসময় হাঁপিয়ে উঠল। কই তার বুকের উপর একে একে মারিব্যাগ, চাবির গোছা, ফাউন্টেন পেন, একটা ময়লা রুমাল তো এসে বসল না! মাঝে মাঝে কিছু নতুন নতুন জিনিসও তার বুকের ওপর রাতভর থাকে। মনে মনে ভাবল, কি জানি বাপু, দিন বদলেছে। আজকাল আর কেউ সব কিছু নিয়ম মেনে টেনে করে না!

চাঁদাটা ততক্ষণে বারান্দা পেরিয়ে আরো ওপরে উঠে প্রায় ওই ঘরের ছাদের ওপর চলে গেছে। আবছা আলো তখনো বারান্দাময় ছড়ানো। শেষ বারের মত আর একবার উঁকি দিয়ে আবার মুখ ব্যাদান করে সেও সরে গেল।

এবাড়ি-ওবাড়ির সব বাতি সেই সন্ধ্যে থেকে জ্বলে জ্বলে প্রায় টুক শব্দ করে নেভার সময় হয়ে এলো। কিন্তু এ ঘরের বাতিগুলো জ্বলল না। সদর দরজার কাছেই যে স্যুইচটা, সে খানিকক্ষণ নিজে নিজেই চেষ্টা করল দুম করে নিচের দিকে নেমে যেয়ে তারের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলিয়ে ন্যাংটা বাল্বটা জ্বালিয়ে দেবে, কিন্তু হায়! আজ হাড়ে হাড়ে বুঝল, ওর সে ক্ষমতা নেই। ছিলও না কোন কালে। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে ন্যাংটো বাল্বটার দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বসে রইল। এ দশা দেখে বাল্বটা হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে না পেরে ভ্যবলাকান্ত হয়ে ঝুলতে থাকল।

ও না হয় ওভাবেই ঝুলতে থাকল, কিন্তু বাথরুমের বাল্বটার কি হলো? ওর একবার ইচ্ছে হল নিজেই হাত বাড়িয়ে দেয়ালের স্যুইচে টোকা দিয়ে জ্বলে ওঠে। নিচের কলটাকে ফিস ফিস করে বলে উঠল, কিরে মুখে যে কথাবার্তা নেই, ব্যাপার কি? বিপুল বেগে ছড় ছড় করা শব্দ কই?

কলের মাথার কাছে যে মোটা চাবিটা সে না ঘুরলেও কলের মুখ থেকে খুব অল্প হলেও ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ে। সেটা যে মেঝেতে পড়ে সেও দেখল সেই সকালের দিকে যেটুকু পড়েছিল তারপর আর নেই!

আরো অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবার পর বারান্দার ইজি চেয়ারটা অনড় আধাশোয়া অবস্থায় কার যেন ভারের অপেক্ষা করতে করতে একসময় নিজেই খানিকটা উঁচু হয়ে আবার আগের যায়গায় সটান। সেই আধোশোয়া। খুব রাগ হলো তার। আর কেউ কিছু না বুঝলেও সে বেশ বুঝতে পারছে কিছু একটা ঘটেছে! শীত না এলেও শিরশিরে কনকনে বাতাস মাঝে মাঝেই বয়ে যাচ্ছে। সেই এক দমকা বাতাস বারান্দা দিয়ে সরে যাবার সময় কি এক আকুতিতে ইজি চেয়ারের ঢেউ খেলানো কাপড়টা বাতাসকে একটু থমকে দাঁড়াতে অনুরোধ করে বসল।
বাতাস নিজেকে বরাবরই এজমালি সম্পত্তি ভাবে বলে কারো কোন অনুরোধ বা আদেশ মানতে বাধ্য নয়। তবুও তার মনে হলো কি এমন যায় আসে? শুনি না কি বলতে চায় ইজি? বোঝা গেল তাকে একটু উঁচু-নিচু করে দিতে বলেছে! হায়রে অবুঝ ইজি! রোজকার অভ্যেস, তাই কি?

ইজির পাশে ছোট্ট টুলটার ওপর একটা এ্যাশট্রে শুয়ে ছিল। প্রায় ভরে উঠলেও তার বুক খালি করেনি আজ কেউ। দম বন্ধ হয়ে সেভাবেই পড়ে আছে। কিন্তু ইজিকে নিশ্চুপ দেখে সেও ধরে নিল আধপোড়া সিগারেটের ছাই এই এলো বলে; ভাবলেও কেন যেন মনে হচ্ছে যদি না আসে?

বারান্দায় একটা বাঁশের চটার সঙ্গে পেঁচিয়ে গ্রিল ভেদ করে নিচের দিকে ঝুঁকে থাকা মাধবী লতা গাছটা আপন মনেই দুলে চলেছে। ও জানে কেউ একজন যত দেরিই হোক একাবারটি হলেও ওর লতায়, ডগায় হাতের স্পর্শ দেয়, শুকনো এবং পুরোনো পাতা খসিয়ে দেয়, তারপর একেবারে শেষের দিকের থোকায় যে রংবেরঙের একগুচ্ছ ফুল থাকে তাতে একটা টোকা দিয়ে তারপর আবার ইজি চেয়ারে গিয়ে বসে।
রাত বাড়তে বাড়তে প্রায় শেষ হতে চললেও কেউ তা করল না। অভিমানে নিজেই গা-ঝাড়া দিয়ে একটা পুরোনো পাতা খসিয়ে দিল।

একটা প্রায় মরতে বসা ক্যাকটাসের তেমন একটা রাগ টাগ নেই, কারণ ও জানে ওর গায়ে রোজ রোজ কেউ হাত বুলোয় না। জল লাগে সপ্তায় একবার মোটে। অবহেলায় বড় হওয়া নিয়তি মেনে সে তেমনিভাবেই বসে রইল একটা রংচটা টবে।

নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও বালিশদুটোকে দলাই মলাই করে তার উপর একটা চারকোণা কাপড়ের ঘর বানিয়ে কেউ তার বুকের উপর মাথা রাখল না। একবার ওর মনে হল বুকের ওপর মাথা রাখলে যেমন মাঝখানটিতে একটু নিচু হয়ে যায়, সেভাবে নিজেই একবার নিচু হবে কি-না। কিন্তু শত চেষ্টায় পারল না সে।

বিছানার চাদরটা কোথাও কোথাও এলোমেলো হয়ে সটান শুয়ে ছিল। দক্ষিণের জানালাটা একটু খোলা ছিল বলে সেখান দিয়ে একটু একটু হাওয়া এসে ফ্যানটাকে দোলাচ্ছিল। চাদর ভাবল ফ্যানটা যদি আর একটু জোরে নড়ে উঠত তাহলে সে সমান হয়ে থাকতে পারত। না, ফ্যানের ওই নড়াচড়া পর্যন্তই। সে পুরোপুরি ঘোরার কৌশল যানেনা।

গ্যাসের চূলোটাও অলস বসে রইল। ম্যাচটাও নিজে নিজে তার খাপ খুলে কাঠি বের করে জ্বলে উঠতে পারল না। চূলোর পাশে কয়েকটা বাটিতে আধখাওয়া ঝোল-তরকারি তেমনি অবহেলায় অস্পৃশ্য। একদল তেলাপোকা আজ মনের আনন্দে বীর বিক্রমে এঘর ওঘর ঘুরে বেড়াতে লাগল। রান্নাঘরের কোণায় একটা পিঁপড়ে উঁকি ঝঁকি দিতেই তেলাপোকারা অভয় দিয়ে বলে- বেরিয়ে আয়, কোন ভয় নেই। এদিক ওদিক দেখে পিঁপড়ে ঠিকই সাহস করে বেরুল। অন্ধকারে ঠিকই খুঁজে খুঁজে তরকারির বাটি, ভাতের গামলায় হামলে পড়ল।
গামলাটার একবার মনে হলো নিজেই সরে গিয়ে বাঁচে। পারল না। তারপর অনন্তকাল অপেক্ষায় থাকতে লাগল, যেন পিঁপড়ে বা তেলাপোকারা তার কোলের ভেতর বসে যত রকম হার্মাদিই করুক না কেন, তাতে তার কিছু আসে যায় না।

রাত আরো গভীর। টিক টিক করে দেওয়াল ঘড়িটা কেবল ঘুরে চলেছে। এক একটা ঘণ্টা পেরুচ্ছে আর নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্য ঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে উঠছে। এঘরে একমাত্র সে-ই সচল। বাইরে কারা কারা যেন ঝিম ঝিশ শব্দে একটানা ডেকে চলেছে। আরো দূরে কেউ একজন পাহারাদার রোজকার নিয়মে ল্যাম্পপোস্টে লাঠির বাড়ি মেরে হেঁকে উঠল, হেই..... কে জাগে.....
এঘরের সবার অনেক কষ্টেও হাসি পেল। কে জাগে? বলে কিনা কে জাগে? ওরা এতগুলোতে যে সারাটা রাত ধরে ঠাঁয় জেগে আছে, জেগে জেগে একবার সরব হয়ে আবার যার যার যায়গায় গিয়ে সেই রাতের মত নিশ্চুপ হয়ে যাবার জন্য জেগে আছে সে খবর কি রাখে ওই পাহারাদার? ছোঃ

পুব আকাশ যখন হালকা আবীরের রঙে রঙিন হয়ে উঠছে, জানালার সামান্য খোলা অংশ দিয়ে যখন শেষ শরতের মৃদু হিমেল হাওয়া ঢুকতে শুরু করেছে, দেওয়াল ঘড়িটা যখন ক্লান্তিহীন ঢং ঢং করে চলেছে, তখন সবার মনে হলো কি হয়েছে? কিছু একটা যে হয়েছে তাতে তো কারোই কোন সন্দেহ নাই। তাহলে এখন কি করা যায়? সবার মনে হলো সবাই একসাথে বসে চিন্তা করতে পারলে ভাল হত, কিন্তু কিভাবে হবে তা কেউ ঠাওর করতে পারল না। বারান্দায় বেড়াতে আসা পোকারা, রান্না ঘরের তেলাপোকা, পিঁপড়ে আর খুব কসরৎ করে ঘরে ঢোকা নেংটি ইঁদুর, লাইটের নিচে অকে দিন ধরে এই ঘরের স্থায়ী বাসিন্দার মত বড় হয়ে ওঠা টিকটিকি, ফুলের টবে সেই কত বছর আগে আসা কেঁচো আপ্রাণ চেষ্টা করল দরজা, জানালা, চটি, এ্যাশট্রে, ইজি চেয়ার, বাল্ব, পানির কল, পেস্ট-ব্রাশ, চিরুণী, আয়না, প্যারাসিটামল, মাধবী লতা, বালিশ, চাদর, ফ্যান, জানালার পর্দা-সবাইকে জানিয়ে দেয় যে, ভীষণ খারাপ কিছু একটা ঘটেছে।
কিন্তু ওরা কেউ তো ওদের কথা শুনতে পাবে না! রাত যখন শেষ, পুব দিকটা এখন আর আবীরে রাঙানো নয়, প্রায় সাদা হয়ে এসেছে। বারান্দার পাশ ঘেঁসে একদল পাখি ছটফট করে উড়ে গেল। একটা চড়ুই প্রায় তিন চার দিন পর এঘরের বারান্দায় এসে ওদের সবার মুখ ব্যাদান দেখে মন খারাপ করে চলে গেল। ঠিক এই সময় টিকটিকি টিক টিক করে সবাইকে জানিয়ে দিল- হ্যা গো বাছারা, তোমরাইক নিজেরা একসাথে বসে একটু ভাবতে পারছ না? কেউ সাড়া শব্দ করল না। শুধু ঘড়িটা আরো একবার ঢং করে জানান দিল, আরো একটি ঘন্টা পেরিয়ে গেল।
ঘড়ির ঢং শুনে ওরা সবাই একসাথে ঘড়িটার দিকে তাকায়। তারপর ঝট করে বাইরের দরজারটার দিকে। নাহ্ ! কেউ নেই! সারা রাত কত কথা কত আকুলি বিকুলি করে চিন্তাভাবনা করে, ভয় সঙ্কায় সিঁটকে উঠে, অজানা আশঙ্কায় দুরু দুরু বুকে মঙ্গল কামনা করে ক্লান্ত সবাই সেই ভাবতে না চাওয়া সত্যটার মুখোমুখি হলো,

এ ঘরের প্রৌঢ় মানুষটি কাল রাতে ঘরে ফেরেনি।
এ শহরের অনেক মানুষই কোন কোন রাতে ঘরে ফেরে না।
এরা না ফেরায় অনেক মানুষেরই তেমন কিছু যায় আসে না।


২৩ নভেম্বর, ২০১০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29279247 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29279247 2010-11-28 00:51:04
উপমা আপডেট < ১০ > উপমা অধ্যায়ের আপাতত এখানেই সমাপ্তি.....

২০০৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি উপমাকে নিয়ে প্রথম পোস্ট দিয়েছিলাম। তারপর সেই একই মাসে আরো একাধিক পোস্ট দিতে হয়েছিল। সে বছরের পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সারা ব্লগ আলোড়িত হয়েছিল এই অসুস্থ মেয়েটিকে নিয়ে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই চার লাখের উপর টাকা উঠে এসেছিল। সিডনি থেকে আলাস্কা, কেপ টাউন থেকে ইউক্রেন- সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশি এবং প্রবাসী বাঙালি ব্লগারদের অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল উপমাকে নিয়ে। একসময় প্রয়োজনীয় টাকা উঠে আসায় ফান্ড ক্লোজ করে দিতে হয়েছিল। সেই শুরু.......

তারপর থেকে এ মাসের এগার তারিখ পর্যন্ত টানা এই দীর্ঘ সময় আমার সাধ্যমত উপমাকে নিয়ে দেশের প্রায় সব কয়টি সেরা হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। এনআইসিভিডি, মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশন, ল্যাব এইড, এ্যাপোলোসহ দেশের নামকরা হার্ট স্পেশালিস্ট উপমাকে দেখেছে। এবছর ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে আমেরিকার ভিজিটর কনসালটেন্টরা অপারেশনের দিন-তারিখ দিয়েও পরে অপারেশন হয়নি। ওর দুটি বাল্বই ক্ষতিগ্রস্ত। যেটি রিপেয়ার করা যাবে সেটির জন্য ডাক্তাররা আরো সময় নিচ্ছেন। অন্যটি রিপ্লেস করতে হবে। সেই সাথে চলছে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর উন্নতমানের ওষুধ। এখন ওর অবস্থা অনেকটা স্টাবল।

গত বছর যে উদ্দীপনা নিয়ে আমি ঢাকার এমাথা-ওমাথা উপমাকে নিয়ে ছুটোছুটি করে বেড়িয়েছি, ঠিক সেই পরিমান ছোটাছুটি করার সময়, স্ট্যামিনা এবং এফোর্ট এখন দিতে পারছি না। আমার নিজের চাকরি, সংসার, পরিবারের দাবি-আব্দার সামলে আমি সেইভাবে সময় দিতে পারছিলাম না। তাছাড়া ডাক্তারদের "ট্যুইস্ট" দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে গেছি।

তাই এমাসের প্রথম সপ্তাহে ঠিক করলাম গত দেড় বছর কিস্ততে কিস্তিতে ওর পেছনে যে টাকা খরচ হয়েছে, তা বাদে এখন যা বেঁচে আছে সেই টাকাগুলো ওর মায়ের একাউন্টে দিয়ে দেব। সে মতো গত এগার তারিখে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে কয়েকজন সহব্লগার ডেকে উপমার বাবা-মা'র হাতে সর্বশেষ ব্যালান্স টাকার পে- অর্ডারটি তুলে দেয়া হয়েছে। যেটি উপমার মায়ের অগ্রণী ব্যাংকের এ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে।




এই মেয়েটিকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য দেশ-বিদেশের যে বন্ধুরা তাদের কষ্টার্জিত উপার্জনের একটা অংশ দান করেছেন, যারা এই ক্যাম্পেইনে গায়ে-গতরে খেটেছেন, ব্লগের অধিকর্তাদের নিরলস সমর্থন, পোস্ট স্টিকি করণ, তরুণ ব্লগারদের ছোট ছোট অংকের টাকা সংগ্রহ করা, দিনের পর দিন আমার পাশে থেকে যারা সহমর্মীতা জানিয়েছেন, আমাকে সাহস যুগিয়েছেন যারা, আর যারা নেপথ্যে থেকেও এই মহৎ কাজে সাহায্য করেছেন সেই সব সহব্লগার, ব্লগের অধিকর্তা, অন্য ব্লগের বন্ধু, ব্লগের বাইরের বন্ধুসহ সবার প্রতি আমার এবং উপমার পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাবনত কৃতজ্ঞতা। আপনারা প্রমান করেছেন-আমরাও পারি অন্ধ জনে আলো দিতে........
...............................................................................................

২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একাউন্টে স্থিতি টাকা ------------------ ২,৭৫,০০০/- ৩১.০৩.১০ তারিখে দেয়া........................................... ৩,০০০/- ০৬.০৫.১০ তারিখে দেয়া.......................................... ৫,০০০/- ৩০.০৬.১০ তারিখে দেয়া.......................................... ৪,০০০/- ০৪.০৮.১০ তারিখে দেয়া.......................................... ৫,০০০/- ০৮.০৮.১০ তারিখে দেয়া.......................................... ৩০,০০০- ___________________________________________ একাউন্ট স্থিতি....................................................... ২,২৮,০০০/- একাউন্ট ক্লোজ করার আগে ইন্টারেস্ট জমা...................... ৬,০০০/- ___________________________________________ একাউন্ট নিট ব্যালান্স.......................................টাকা: ২,৩৪,০০০/- ১১.০৮.১০ তারিখে পে-অর্ডার হস্তান্তর....................টাকা: ২,৩৪,০০০/- ___________________________________________

উপমার টাকা ছিল এই একাউন্টে:
105-101-142123
Dutch-Bangla Bank Limited
Motijheel Foreign Exchange Branch

এখন পে-অর্ডার জমা হয়েছে এই একাউন্টে: Eyasmin A/C No. 2934542 Agrani Bank Ltd. Agamasi Lane Branch Dhaka.q
উপমার এর আগের আপডেট এর পোস্ট ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29226764 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29226764 2010-08-21 02:32:13
মৃত শিশুর পোড়া মাংসে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে.....

গতরাতে ঠিক যখন "সেলোফেন" ছাড়ছি, তখনই খবর এলো- বেগুনবাড়ি অঞ্চলে পাঁচতলা ভবন ধসে পড়েছে! তিনজন ফটোগ্রাফারই বাড়ি চলে গেছে। দুজনের ফোন বন্ধ, একজন ছুটে এলো। সাথে পাঠালাম একজন রিপোর্টার। টিনের কম ভাড়ার ঘরগুলোতে বসবাস করা গরিব মানুষগুলোর লাশ দেখে বাছাই করে ছবি ছাপলাম দ্বিতীয় সংস্করণে।

রাত তিনটায় বাড়ি ফিরে আর ঘুম এলো না। বায়োস্কোপের মত চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল মাথায় "আসমান" ভেঙ্গে পড়ার কল্পিত লোমহর্ষক দৃষ্যাবলি। সাভারের "স্পেক্ট্রাম" গার্মেন্ট ভবনেও এমন হয়েছিল! চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম কিছু মানুষ প্রাণপণে চিৎকার করে বলতে চাইছে- তোমরা কে আছো, দেখো আমি এখনো বেঁচে আছি! কিন্তু ফায়ার ব্রিগেড আর অন্যান্য কর্মীরা হট্টগোলে শুনতেই পারছেনা! তারা হয়ত "লাশ উদ্ধার" করে ফিরে এসেছে! হয়ত তখনো ধড়ে নিবু নিবু প্রাণ নিয়ে কেউ কাতর মিনতি জানাচ্ছে-আমি মরিনি! আমাকে বাঁচাও!!

মাত্র চব্বিশ ঘন্টা পর, আবারো যখন সেলোফেন ছাড়ব, তখনই খবর এলো নীমতলির পেছনে আগামসি লেনে ভয়াবহ আগুন লেগেছে! রিপোর্টার পাঠাতে পাঠাতেই মৃতের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলেছে.....। মৃতেরা আমাদের টাইপ করার সময় মেপে চলেনা! চড়চড় করে চামড়া আর তার নিচের চর্বি পোড়ার মরণযন্ত্রনা তাদের মুহূর্তে মরার আগেই পরপারে নিয়ে যায়। রিপোর্টার যখন কল দিল, ততক্ষণে লাশের ফিগার-৪৫! অনেক ভেবে চিন্তে করা হেডিং তুলে আবার নতুন করে বসাতে হলো। মেইলে আসা ছবিগুলো যখন ডাউনলোড করলাম তখন আর আঙুল চলছেনা! কী লিখব? একেকটা বাচ্চার পোড়া ঝলসানো ছবি থেকে চোখ সরাতে পারছিনা।

আবারো সেই অপার্থীব অনুভূতি! আমরা যেন মাংসের হাড়িতে কাঠ কয়লার জ্বাল দিচ্ছি, আর মাংস কষানো হচ্ছে। এবং আমরা কাঠ কয়লার বদলে আস্ত মানুষই চূলোয় ঠেলে দিয়েছি। আমি পারছিনা। একটা শব্দও এডিট করতে পারছিনা। ঘাড়ের পেছনে সম্পাদক দাঁড়ানো। তবুও কী-বোর্ডে আঙ্গুল থমকে যাচ্ছে। কী ভয়াবহ এই শহরে, এই দেশে কম আয়ের এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকা, টিকে থাকা! কিসে মরে না? কত মরে না? শত শত? না। হাজার হাজার।

এটা সেই দেশ, যেখানে পঁচিশ বছর ধরে লেখা থাকে-"ক্ষতিতগ্রস্থ ব্রীজ সাবধানে চলুন" তারপর কোন এক অলুক্ষুণে দিনে ব্রীজ ভেঙ্গে জনা বিশেক মানুষ মরলে সেই ব্রীজ মেরামত হয়।

এটা সেই দেশ, যেখানে লঞ্চ ডুবে ৪ শ' মানুষ মরার পর নৌপরিবহন মন্ত্রী দুদিন পর জনপ্রতি একটি করে ছাগল বরাদ্দ করেন!

এটা সেই দেশ, যেখানে প্রতি বছর অন্তত পাঁচ বার বস্তিতে আগুন দিয়ে জায়গা দখলের কারণে জনা দশেক অবুঝ শিশুসমেত মানুষকে "রোস্ট" হতে হয়!

এটা সেই দেশ, যেখানে অল্প আয়ের "বেজন্মা" মানুষগুলোর জন্য রাষ্ট্র-সরকার-সুশীল কারোরই কোন দায় ভার নেই।

এই অদ্ভুত মরণফাঁদের মত বিকলাঙ্গ এক শহরে আমি অনাহূত এক নাবিকের মত বলে চলি- এই মৃত্যু উপত্যকা আমারই দেশ, তাই আমারই অধিকার আছে এই দেশ-জাতি-শিক্ষিত মানুষদের অভিসম্পাৎ করার।

আমি এই নগরের সকল কুশি-লব, সকল সুশীল, সকল ক্ষমতাবান অপরিনামদর্শী মানুষকে, সকল অনিয়মের হোতা ক্ষমতাবলয়ের এলিটদের, সকল ভাগ্য বিধাতাদের অভিসম্পাৎ দেই। কারণ কিছুতেই আমি এই সব অতিপ্রাকৃত অধিজাগতিক দৃশ্যাবলি থেকে মুখ ফিরিয়ে টিভি উপস্থাপিকার মুখে লটকে থাকা নির্বিকার হাসিতে উদ্ভাসিত হতে শিখিনি।

যারা চলে গেছেন তাদের এতে কিছুই হবেনা। তবুও আসুন, আমরা কিছুক্ষণের জন্য তাদের প্রতি নতমস্তক হয়ে দাঁড়াই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29169721 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29169721 2010-06-04 02:16:55
ডিসক্লেইমার অনুরোধ, দয়া করে এধরণের পোস্ট দেবেন না।

আমি “বিদায় পোস্ট” দিয়ে চলে যাইনি, সুতরাং “ফিরে আসুন” জাতীয় পোস্ট অনভিপ্রেত। দুঃখিত ক্যামেরাম্যান(রঞ্জু ভাই)।

বন্ধু ক্যাটাগরিতে কিছু রুচিহীনের সন্নিবেশের কারণে আমি মাসখানেক ধরে পোস্ট লিখছিনা, কমেন্ট করছিনা। ব্লগে আসছি কালে-ভদ্রে।

ব্যক্তিগত আক্রমন, ট্যাগিং, কুৎসা, গালাগালিতে ভীত হয়ে চলে যাইনি। ওসব কেয়ার করিনা, কারণ সম্মূখ লড়াইয়ে কোন কালেই পিছু হটিনি, কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে বন্ধুস্থানীয় কিছু ব্লগারের পোস্টে রাজাকার মানসজাত এবং প্রগতিশীলতার মুখোস পরা কিছু কুলাঙ্গারের বিশ্রী আক্রমনকে সেই সব বন্ধুরা আস্কারা দেওয়ায়,পিঠ চাপড়ে
দেওয়ায় তাদের আস্ফালন সীমা ছাড়ানোয় বন্ধুদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছি।
সেটা এক ঘরোয়া আড্ডায় বয়োঃজ্যেষ্ঠ্যদের কাছে উল্লেখও করেছি।

পেছন থেকে ছুরি মারা শত্রুর সাথে প্রথাগত লড়াই চলে না।

যেহেতু উপমা নামের মেয়েটির চিকিৎসা বিষয়টা এখনো ঘাড়ে চেপে আছে, সেহেতু আমি চাইলেই ডুব দিতে পারিনা।

মডারেশন নিয়ে কখনোই ব্লগ কর্তৃপক্ষের সাথে কোন মনমালিণ্য ঘটেনি, তাদের পলিসি পছন্দ না হলে নীরবে সরে যাওয়াই আমার নীতি।

ইদানিং মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার, পাহাড়ি প্রসঙ্গ নিয়ে ব্লগে যে বিষবাষ্প ছড়ানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আমার প্রতিবাদ আছে, থাকবে। কর্তৃপক্ষ ‘ফেয়ার ডিবেট’ এর ব্যবস্থা
না নিলে সেটা তাদের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে আমার পছন্দমত চলার আব্দার জানাতে পারিনা। জানাইওনি কখনো। আমার পছন্দ না হলে আমি গুডবাই জানাব। সেটা আমার স্বাধীনতা।

যদি প্রয়োজন মনে করি, যদি ভাললাগে তাহলে আবার ব্লগে নিয়মিত হব। আর তা না হলে নীরবেই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াটা স্থায়ী রূপ পাবে। এর সাথে বিদায়,কামব্যাক বা অনুরোধ এর কোন সম্পর্ক নেই।

জনতার কাতারের সাধারণ ব্লগাররা সবাই ভাল থাকুন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29134532 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29134532 2010-04-14 02:10:20
পাহাড়ি নিপীড়িত জনগোষ্ঠির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসন দাবীর প্রশ্নে শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের রঙ বে রঙের জোড়াতালি তত্ত্বের বিপরীতে একটি বিশ্লেষণ।
এই অপার শান্তির বাতাবরণটি গত মাসের ১৯/২০ তারিখে একটু নড়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশপ্রেমিক বীর সেনাদের তপ্ত বুলেটে কিছু পাহাড়ি ‘বেআক্কেলের’ মত মরে গিয়েছিল। অকস্মাৎ এমন বেয়াড়া ঘটনা ধামাচাপা দিতে আমরা মোটেই বিলম্ব করিনি! তাড়াতাড়ি এই মৃত্যুকে কর্পূরের মত উবিয়ে দিয়ে তত্ত-তালাশ করে তত্ত্ব হাজির করেছি। তাদের মৃত্যুকে অনিবার্য করে দিয়েছি বিচ্ছিন্ন হবার স্পর্ধার তকমা আর তিলক এঁকে। এই পোস্টের বিষয়বস্তু সেই ‘তকমা’ আর ‘তিলক চিহ্ন’ পরিয়ে মৃত্যুকে জায়েজ করবার অপচেষ্টাকারিদের বিরুদ্ধে স্বশব্দ প্রতিবাদ।

পাহাড়ে কবে থেকে বিরোধের সূত্রপাত, কেন পাহাড়িরা প্রতিবাদমুখর, সংখ্যাগুরু বাঙালিরা কেন কি উদ্দেশে পাহাড়ে শ্যেন দৃষ্টি ফেলেছে, কেন পাহাড়িরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে, কবে থেকে এই বঞ্চিত মনে করা শুরু সে সব কম-বেশি সকলেই জানেন। জনসমক্ষে আনব না করেও তা ঠেকানো যায়নি। তাই সেই খতিয়ান এখানে টানা হচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে চালানো অত্যাচারের মাসওয়ারি বা বছরওয়ারি পরিসংখ্যানও দেওয়া হচ্ছেনা। শুধু জাতিগত নিপীড়ন করে একটি জাতিস্বত্তার উচ্ছেদের দুরভিসন্ধীই উল্লেখের চেষ্টা করা হচ্ছে।

জাতিগতভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা ও নিশ্চিহ্ন চূড়ান্ত লক্ষ্য।

পাকিস্তানী বড় বুর্জোয়া শ্রেণী যেমন বাঙালিদের উপর জাতিগত নিপীড়ন চালিয়েছিল,( আরো বিভৎস কায়দায়, তখন জাতিগত রিপ্লেসমেন্ট হচ্ছিলনা), ঠিক একই কায়দায় ৭২ সাল থেকে বাঙালি বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী ক্ষুদ্র পাহাড়ি জনগোষ্টির উপর জাতিগত শোষণ-নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। যা আজ গণহত্যা-জ্বালাও-পোড়াও এর সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই নিপীড়ন পরোক্ষ/অঘোষিত সামরিক শাসনরূপে চলছে। পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে বাঙালি পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় এখন পাহাড়িরা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন। ৩০ বছর যাবৎ এই পুনর্বাস প্রক্রিয়া চলছে।আগামি ১০/১৫ বছরের মধ্যে পাহাড়ি জনগণের আর জাতিগত অস্তিত্ব হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তারা জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারেন। এখনই পাহাড়িরা সেটেলাদের চেয়ে সংখ্যায় কমে গেছেন।

এখন প্রশ্ন আসে, কেন এই এথেনিক নির্মূলকরণ? কারণ প্রথমেই পাহাড়িরা বলে ফেলেছে-তারা তাদের নিজস্ব জাতিস্বত্তা নিয়েই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চায়। তারা তাদের ঐতিহ্যগত নিজস্ব সংস্কৃতি, তাদের নিজস্ব আচার, নিজস্ব ভাষাভাষির সংস্কৃতিতে বসবাস করতে চায়। তাদের চিরায়ত ভূমি ব্যবস্থকেই বহাল রাখতে চায়। আর সেই চাওয়া মানেই সেখানে বাঙালি সেটেলারদের তারা স্বাগত জানাবে না। জানায়ওনি। এটাই হচ্ছে শাসকশ্রেণীর সাথে তাদের মূল দ্বন্দ্ব। আর শাসকশ্রেণী সেই দ্বন্দ্ব মোকাবেলা করার জন্য তোপের মুখে ঠেলে দিয়েছে সমতলেরই আর এক হতভাগ্য দরিদ্র চাষাভুষাদের। তাদের টাকা-পয়সা, জমিজিরেতের লোভ দেখিয়ে পাহাড়ে পাঠিয়েছে পাহাড়ি-বাঙালি সমতা আনার জন্য।

এরপর শাসকদের পক্ষে বলা হচ্ছে- ‘পাহাড়িরা পাহাড়ের আদিবাসী নয়’! ‘বাংলাদেশের সংবিধান মানার কারণে পাহাড়েও বাঙালিদের সমান অধিকার’। ‘বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকেই পাহাড়িদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমতলের নাগরিকদেরকেও মেনে নিতে হবে'। অসহায় গরিব সেটেলারদের ধরে ধরে পাহাড়ে পাঠানোর পর বলা হচ্ছে-‘পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা বার্মার আরাকান প্রদেশ থেকে এসে এদেশে বসতি স্থাপন করেছে এবং তারাই বহিরাগত!’

এসব প্রচার চালায় পাহাড়ে বাঙালি গণপরিষদ, আর সমতলে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। এই জাতীয়তাবাদীরা নৃত্বাত্তিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখাতে চায় ‘যেহেতু পাহড়িরা নৃ-জাতিগোষ্ঠি নয়, সেহেতু তারা পাহাড়ের আদিবাসীও নয়। সুতরাং তাদের ‘আদিবাসী’ দাবী ধোপে টেকে না!(যদিও ইতিমধ্যে জাতিসঙ্ঘ এই আদিবাসী বা ইনডিজেনাসদের রক্ষার জন্য একটি ক্লজ করতে বাধ্য হয়েছে। এটির ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। দুনিয়ার বেশির ভাগ স্থানেই বড় জাতির জাতীয়তাবাদের ঠেলায় ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার ক্রমশ নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের ফলেই জাতিসংঘ তাদের এই স্বীকৃতটা দিতে বাধ্য হয়েছে।)

আর এই রকম একটি ব্যাখ্যা তৈরি করে পাহাড়ে একপ্রকার ‘উপনিবেশ’ই গড়ে তুলেছে শাসকগোষ্ঠি। এই ব্যাখ্যা নিয়ে দরিদ্র বাঙালিদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা উষ্কে দিচ্ছে। শাসকশ্রেণীর হাতিয়ার হিসেবে তার সেনাবাহিনীর অফিসার থেকে শুরু করে বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যেকেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে-পাহাড় কেটে, জঙ্গল সাফ করে, জমি লিজ নিয়ে পাহাড়ি জনগণকে স্রেফ লুট-ধর্ষণ করে। এখন নতুন এক ফন্দিফিকির বের করা হয়েছে! বলা হচ্ছে পাহাড়ে চাকমারাই বহিরাগত!

আসুন দেখা যাক ‘বহিরাগত’ প্রশ্নে ইতিহাসের রায়ঃ
সুদূর অতীতে চাকমা বা অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগুলো এখানে ছিলনা। জায়গাটি মনূষ্য বসতিবিহীন ছিল। চাকমারা তখন পার্শ্ববর্তি আরাকান বা অন্য কোন জায়গা থেকে এসে এসেছেন, যেমন একাত্তরের আগে বাঙালি শাসকদেরও অস্তিত্ব ছিলনা। মানুষের ইতিহাসে এরকম সর্বত্র হয়েছে, কারণ পৃথিবীর সব জায়গা প্রথম থেকেই মানুষের বাসপোযোগী ছিলনা। বাইরে থেকে মানুষ গিয়ে এক একটা জায়গাকে বাসপোযোগী করে বসতি স্থাপন করে। এখানে আদিবাসী তারাই যারা প্রথমে একটা জায়গাকে বাসপোযোগী করে বসতি স্থাপন করেন। সেই হিসাবে চাকমা এবং অন্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তাগুলোই পাহাড়ে আদিবাসী।

পার্বত্য জনগণের উপর যে জাতিগত নিপীড়ন ও শোষণ-লুণ্ঠন চলছে এবং এ ক্ষেত্রে বাঙালিরাই হচ্ছে নিপীড়ক জাতি এবং এ নিপীড়ন চলছে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে। সেটি দিবালোকের মত স্পষ্ট হলেও তাকে বিভিন্ন তত্ত্ব-দর্শন-ফেৎনা-সংবিধানের সূত্র দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা হচ্ছে। রাষ্ট্রের অখন্ডতা, বর্হিশত্রু কর্তৃক দেশ দখলের শঙ্কা, বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ খন্ডিত হওয়ার ভীতি মিশিয়ে কার্যত পাহাড়িদের অধিকারকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এই কাজগুলি করা হচ্ছে তিন ভাবে। এক পক্ষের ত্বত্ত্ব হচ্ছে ‘৫৪ হাজার বর্গমাইল পুরোটাই আমার দেশ’, এখানে পাহাড়ি-বাঙালি সহাবস্থান করবে। পাহাড়েও সেটেলারদের থাকার পূর্ণ অধিকারের কথা বলছেন। আর এক পক্ষ একটু নমনীয় হয়ে বলছেন-‘৯৭ সালের শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়িদের কার্যত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়াই হয়েছে। তাই সংবিধানের আলোকেই পাহাড়ে বাঙালি সেটেলার, পাহাড়ি, সেনাবাহিনী থাকবে’। এই দুই পক্ষের সোজাসাপ্টা বক্তব্য না বোঝার কিছু নেই। কিন্তু তৃতীয় আর পক্ষ আছেন যারা মুখে মার্কসবাদের সাম্য এঁটে শ্রমজীবী মানুষের হিতাকাঙ্খী সেজে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দখলিকরণের বিরুদ্ধাচারণের নামে ওয়েলফেয়ার স্টেটের ধুয়ো তুলে কার্যত ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদী সংখ্যাগুরুত্বের অহমিকায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠির আত্মনিয়ন্ত্রেণের অধিকারকে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার দাম্ভিকতা’ বলে দু-ধারী কৃপাণ হাতে ময়দানে নেমে গেছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচন পাহাড় বিষয়ে জানা-বোঝার এবং সিদ্ধান্ত টানার ক্ষেত্রে আশু কর্তব্য।
এই তৃতীয় পক্ষের পুরোধা হিসেবে বন্ধুবর পি মুন্সী বলছেনঃ(এখানে পি মুন্সী একটি নিমিত্ত মাত্র)

(ক)পুরানো সমস্যাটাকে তিনি(শেখ মুজিব) জাতীয়তাবাদের দম্ভে খাটো করে জবরদস্তি করতে গিয়েছিলেন, এবং সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ হলো একাজে তাকে উৎসাহিত করেছিলেন, সংবিধান "বিশারদ", "প্রণেতা" কামাল হোসেন এন্ড গং। কলোনি লর্ড আ্যববুরি ও তাঁর বাংলাদেশী "সুশীল দোসর" চাকরবাকর এবং তাদের সংগঠন সিএইচটি কমিশন"
এই ‌'সংবিধান বিশারদদের' এই পক্ষটি ব্যঙ্গ করে বলেন-‘উকিল-মোক্তারের’ সংবিধান। অথচ দেখুন যে বিশারদদের কানপড়ানি শেখ মুজিব শুনেছেন বলে বলা হচ্ছে তিনিই(মুন্সী) আবার সেই সংবিধানকে বেদবাক্য বলছেন-

১. বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন দাবি করে সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনেই আবার পাহাড়িরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকতে পারে না। ২. শান্তিচুক্তির প্রথম ভিত্তিমূলক একটা কথা লেখা আছে যে, বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশন মেনেই পাহাড়িরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে। ৩. এমনিতেই কনষ্টিটিউশনের বাইরে গিয়ে কোন দুই পক্ষ আঁতাত করে কোন চুক্তি করলেও আমাদের কোর্টে সেই চুক্তিই বাতিল হয়ে যাবে। ৪. বৈধভাবে পাহাড়ি-সমতলীর সহবস্হান যদি পাহাড়িরা নাই চায় তবে পাহাড়িদের সমঝোতা চুক্তি করতে আসার কোন মানে হয়না, দরকারই বা কী?

এখানে আর ফুটনোটের কোন দরকার আছে বলে মনে হয়না, কেননা তিনিই নিজের যুক্তিকে নিজেই খন্ডন করেছেন।

(খ) পার্বত্য চট্টগ্রামের ভুমি সমস্যা আমরা কী করে সমাধান করব সেটা এখন আর মুল ইস্যু নয় - বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করছে যারা সেই হায়নার দলের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। নইলে বাংলাদেশকেও বাঁচানো যাবে না।

অর্থাৎ তিনি মূল সমস্যা নিয়ে ঠেকিয়েছেন "বাংলাদেশ বাঁচানো যাবেনা" তে। এর পরপরই তিনি বলছেন-“ক্ষমতাসীন সরকারের সিরিয়াস রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দিতে পারেন, যিনি হবেন পার্বত্য ইস্যুতে রাষ্ট্রের প্রধান এজেন্ট বা কর্তা। আসলে তিনি হবেন পার্বত্য ইস্যুতে অন্তর্বতীকালীন এই সময়ে রাষ্ট্রের মুল রাজনৈতিক এজেন্ট। ঐ অঞ্চলের সেনা, পুলিশ সহ সব বাহিনী, সিভিল প্রশাসন তার অপারেশনাল অধীনে কাজ করবে। ভুমি কমিশনের সিদ্ধান্তের তিনি তার কাজের সাথে সমন্বয় করবেন এবং বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবেন”।
এই বৈপরীত্য নিয়েও আমাদের ফুটনোট দেওয়ার আবশ্যকতা দেখিনা,কারণ তিনি ধরেই নিয়েছেন যে ভূমি সমস্যা এখন আর মূল সমস্যা নয়! বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সমস্যাই মূল!

(গ)কাজেই সারকথা হলো, পাহাড়ি এলাকায় সমতলী যে কেউ নিজের বৈধ মালিকানা জমিতে অথবা বৈধ মালিক কারও বাসা বা জমি ভাড়া নিয়ে বসবাস, ব্যবসা করতে পারবে। দুনিয়ার কেউ নাই এটা বাধা দিতে পারে; তাতে কোথাও কোন শান্তিচুক্তি একটা হোক আর নাই হোক।

এই কথার পর আর কি বলার থাকতে পারে? এতক্ষণ ধরে তিনি ইনিয়ে-বিনিয়ে যে তত্ত্ব-পলিসি হাজির করলেন তাতে সমাধান নেই টের পেয়েই আসল চেহারায় আবির্ভূত হলেন! “দুনিয়ার কেউ নাই এটা বাধা দিতে পারে; তাতে কোথাও কোন শান্তিচুক্তি একটা হোক আর নাই হোক।” কি ভয়ংকর হুমকি! এইমত হুমকি কেবল মাত্র দিতে পারেন কোন ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক, যে কিনা উগ্র জাতীয়তাবাদী। যার আশু লক্ষ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর সামরিক শক্তি বলে একটি জনগোষ্ঠির অধিকারকে পদদলিত করা। নিপীড়িত জনগোষ্ঠির মুক্তির মন্ত্র মাকর্সবাদ কি এই শিক্ষা দেয়? নিশ্চই না। আসুন দেখি মাকর্সবাদ কি বলে?কারণ এই সব ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার প্রশ্নটির ব্যাখ্যা মাকর্সবাদ ছাড়া আর কোথাও পূর্ণাঙ্গরূপে মেলে না।

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রসঙ্গে স্তালিন বোঝেন-“জাতির ইচ্ছামত জীবন বিন্যাসের অধিকার। অর্থাৎ সে জাতির স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে জীবন বিন্যাসের অধিকার যেমন আছে, আবার তেমনি সম্পূর্ণ পৃথক হবার অধিকারও আছে। মাকর্সবাদী-লেনিনবাদীদের কাছে সব জাতিই সার্বভৌম এবং সব জাতিই সমান অধিকার সম্পন্ন। কমিউনিস্টরা সব দেশেই জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ঘোষণা করে। আর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কথাটির অর্থ হলো, কেবল জাতির নিজের হাতেই তার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে, জাতির জীবনে জবরদস্তি করার অধিকার কারও নেই(জাতি সমস্যা ও স্তালিনের চিন্তা। পৃষ্ঠা ৪)।

এবার এই পক্ষ হয়ত বলবেন-‘ হ্যাঁ, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকতেই পারে, তাতো অস্বীকার করা হচ্ছেনা, তাই বলে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেন থাকবে’?

আমরা আবারও স্তালিনের স্মরণাপন্ন হইঃ “স্বায়ত্তশাসনের ধারায় জাতি মাত্ররই জীবন-বিন্যাসের অধিকার আছে, এমনকি পৃথক হবারও অধিকার আছে। এ ক্ষেত্রে মাকর্সবাদীরা সর্বদা বিচার করে দেখবে-সেই স্বায়ত্তশাসনের দাবী অথবা পৃথক হয়ে যাবার দাবী সেই বিশেষ জাতির বেশিরভাগ লোক তথা মেহনতি মানুষের পক্ষে সুবিধাজনক হবে কি-না”(প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫)

এবার কি তারা বলবেন-‘পাহাড়িদের এইসকল দাবী বেশিরভাগ লোকের নয়? মুষ্টিমেয় কয়েকজনের? তা যেহেতু বলার উপায় নেই, তাই তারা বলছেন-“নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পাহাড়িরা কোন জাতিই নয়, জাতি হয়ে উঠতে পারেনি”।

মাকর্সবাদে এরও উত্তর আছেঃ “একটি জাতি হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে-ওঠা একটি স্থায়ী জনসমষ্টি যা একই ভাষা, অঞ্চল, অর্থনৈতিক জীবন এবং একই সংস্কৃতির মধ্যে অভিব্যক্ত মনস্তাত্ত্বিক গঠনের ভিত্তিতে গঠিত”(প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২)।

সুতারাং চাকমারা বা অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগুলো ১০০০ বিসি তে ছিল কি ছিলনা সেই প্রশ্ন অবান্তর।

এই কথিত রাষ্ট্র-সমাজ বিশ্লেষকদের আরও একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে পাহাড়িরা বর্হিশত্রুর সাথে (এখানে সিএইচটি, যাদের সাথে থাকা লোকজনকে মুন্সীজী ‘চাকার-বাকর’ বলছেন) আঁতাত করে দেশ ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করছে! এ প্রসঙ্গে আমরা যথাযথ উত্তরটি পাই লেনিনের কাছে।

লেনিন বলছেন-“আমরা যদি হাজার ঢঙে ঘোষণা ও পুনরাবৃত্তি করতে থাকি যে, সমস্ত জাতীয় অত্যাচারের আমরা ‘বিরোধী’ আর অন্যদিকে যদি নিপীড়কের বিরুদ্ধে এক নিপীড়িত জাতির কোন কোন শ্রেণীর অতিগতিশীল ও আলোকপ্রাপ্ত অংশের বীরত্বপূর্ণ বিদ্রোহকে ‘যড়যন্ত্র’ আখ্যা দেই, তাহলে আমরা কাউটস্কিপন্থীদের মতো সেই একই নির্বোধ স্তরে নেমে যাব”(জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য,জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার)।

এবার লেনিন এই তথাকথিত মাকর্সবাদীদের (কার্যত: রাষ্ট্রবাদীদের) বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত টেনেছেন এভাবে-

“জাতি ও ভাষাসমূহের সমানাধিকার যে স্বীকার করে না এবং তার স্বপক্ষে দাঁড়ায় না, সর্বপ্রকার জাতীয় নিপীড়ন ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে না, সে মাকর্সবাদী নয়, এমন কি গণতন্ত্রীও নয়।”

এ প্রসঙ্গে আরো পরিষ্কার দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহারে। মাকর্স-এঙ্গেলস বলছেন-
“ব্যক্তির উপর ব্যক্তির শোষণ যে অনুপাতে শেষ করা হয়, এক জাতির উপর অন্য জাতির শোষণও সেই অনুপাতে শেষ করা হবে। জাতির ভিতর বিভিন্ন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব যে অনুপাতে লুপ্ত হবে, সেই অনুপাতে এক জাতির প্রতি অন্য জাতির শত্রুতাও শেষ হবে”(কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার, পিকিং, ১৯৬৫, পৃষ্ঠা ৫৫)

পাহাড়ে যে বাঙালি জাতিস্বত্তা কর্তৃক পাহাড়ি জাতিস্বত্তা নিপীড়িত-নির্যাতিত হচ্ছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন সমতলের সাধারণ মানুষকে যারা বুদ্ধি-চেতনা দিয়ে শাণিত করেন সেই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকারীরা পাহাড়িদের ন্যায্য দাবীকে পাশ কাটানো, খন্ডন করা এমন কি তীব্র বাক্যবাণে প্রতিহত করার জন্য বিভিন্ন ইস্যুকে জোড়াতালি দিয়ে একটি নির্ঘন্ট বানিয়ে অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাইছেন। সেই সিদ্ধান্ত টানার সময় তারা এই রাষ্ট্রের অখন্ডতাও হুমকির মুখে এমনটিও প্রচার করছেন। প্রচারের প্রধান বিষয়
(১)কলোনি লর্ড আ্যববুরি ও তাঁর বাংলাদেশী "সুশীল দোসর" চাকরবাকর এবং তাদের সংগঠন "সিএইচটি কমিশন"।(২) ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ কর্তৃক পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করে করদ রাজ্য বানানো।(৩) সেনাবাহিনী প্রত্যাহার হলেই পাড়াড়িরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।(৪) পাহাড়িরাও বাঙালিদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে।(৫) বাংলাদেশের ভূখন্ডকে কিছুতেই আলাদা হতে দেওয়া হবেনা।

এই প্রচারের স্বপক্ষে আছে আওয়ামী লীগের একাংশ, কুখ্যাত লংদু হত্যাকান্ড চালানো ফ্যাসিস্ট জিয়ার বিএনপি, স্বৈরাচারী এরশাদের দল, কুখ্যাত জামাত এবং অপরাপর ইসলাম পছন্দ দল। গিয়াস কামাল চৌধুরীর সম্পাদনায় বিএনপি’র ‘রাজদরবারের নবরত্ন’ এমাজ উদ্দীন আহমদ, ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন, এবনে গোলাম সামাদ, মুনশী আব্দুল মান্নান প্রমূখরা ‘আহা পর্বত আহা চট্টগ্রাম’ নামে ২৮৮ পৃষ্ঠার একখানা ‘ইশতেহার’ সম্পাদনা করে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন। তারা সেনাবাহিনী দিয়ে বল প্রয়োগ করে পাহাড়িদের দমনের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে আসছেন। অপর দিকে নূহ আলম লেনিন এর সম্পাদনায় ডা.এস এ মালেক, আবু সাইয়িদ, ড.হারুন-অর-রশিদ প্রমূখরা ‘জুম পাহাড়ে শান্তির ঝরনাধারা ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’ প্রণয়ন করে সেই শান্তিচুক্তিকেই পাহাড়ের একমাত্র সমাধান বলছেন(এ বিষয়টি পরের পর্বে আলোচিত হবে)।

এই সমস্ত বিষয়গুলি মাথায় রেখেই পাহাড়ের হানাহানির অবসানের চিন্তা করতে হবে। উপরে উল্লেখিত কল্পিত জুজুসমূহের ভয়ে ভীত হতে চাইলে ভীত হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবেনা। ‘জেএসএস’ বা ‘ইউপিডিএফ’ই যে সমগ্র পাহাড়ি জাতিস্বত্তার মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টার সেটাও ভ্রান্ত ধারণা। তারা এইক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমানে প্রস্তুত নয় তাও সত্যি। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের প্রশ্নে তাদের পরিষ্কার কোন বক্তব্যও নেই। তাতে করে কি চোদ্দটি ছোট-বড় জাতিস্বত্তার মুক্তি আকাঙ্খা ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে? মোটেই তা নয়। গাছের ফলটি পেঁকে উঠলে তা আপনাতেই খসে পড়বে। পাহাড়ে সেনা উপস্থতি যে পাহাড়িদের রক্ষা করার জন্য নয় সেটি বুঝতে পাহাড়িদের খুব বেশি জ্ঞানী হবার দরকার করেনা।

শেখ হাসিনা যেভাবেই বুঝুন শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে তার সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেই গাছটিতে পাকতে থাকা ফল যেন ধুয়ো দিয়ে পাকানো না হয়। সেনা উপস্থিতি মানেই ফলটিকে পাকতে উদ্বুদ্ধ করা। এখন যারা বলছেন-সেনা প্রত্যাহার মানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া! তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৯৬’র নির্বাচনের আগে মাতম তুলেছিলেন-আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে আজানের বদলে উলুধ্বনি শোনা যাবে, ফেনী পর্যন্ত ভারত দখল করে নেবে! এখনো সেই ভাঙ্গা রেকর্ড ঘসে ঘসে বাজানো হচ্ছে।

এদের সাথে জায়ানবাদী ইজরাইলীদের কোন তফাৎ নেই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুলিশী রাষ্ট্র ইজরাইলী ইহুদীবাদীরা যেমন যুক্তি দেয়, তারাই ফিলিস্তিনের আদি নাগরিক, লক্ষ লক্ষ বছর আগে ইহুদীরাই এখানে ছিল। বাংলাদেশী মুসলমান সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদীদের ‘শত শত বছর আগে বাঙালিরাই পাহাড়ে সেখানে ছিল’ কথাটি কি অদ্ভুতভাবে মিলে যায় ইজরায়েলী ইহুদীদের সাথে! ভিয়েতনামেও এই একই ঘৃণ্য কাজ করেছিল আমেরিকানরা। সেখানে সামরিক অভিযান চালানোর সময় যেমন ক্লাস্টার ভিলেজ বানানো হয়েছিল, তেমনি এখানে বানানো হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেখানে পুণর্বাসন দেয়া হয়েছে, সেখানে খুঁটি গেঁড়ে চিহ্নিত করেই এর আশেপাশে মিলিটারী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। তারপর পুণর্বাসন শিবির খোলা হয়েছে। এইভাবে দেশের এক দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর এক অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর করা হয়েছে । সমতল ভূমির ভূমিহীনেরা জানেনা শাসকদের উদ্দেশ্য কী ? জমি আর টাকার প্রলোভনই তাদের কাছে মূল বিষয়। তারা দুমুঠো খেতে পেয়ে বড় মাছ শিকারের ছোট মাছ হয়ে বড়শিতে গেঁথে ঝুলছে। চূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশের বড় বুর্জোয়া দলসমূহ (ঠিক এই মুহূর্তে বিএনপি,জামাত, জাতীয় পার্টি, বুর্জোয়া লেজুড় বাম), সামরিক-বেসামরিক আমলা সহ পুরো শাসক সামন্ত শ্রেণীই পাহাড়িদের শত্রু, পাহাড়ি জনগণ এটা ভালভাবেই বোঝেন। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ সমূহের সাধারণ শত্রু ভারত তো আছেই ওৎ পেতে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা, পাহাড়ি জনগণের অধিকার আদায় কিভাবে হবে সেটা সেখানকার অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব, তার বিকাশ, দ্বন্দ্বের গতিমুখ নির্ধারণ আর ইতিহাসই নির্ণয় করে দেবে।


[এই পোস্টটি কাউকে আক্রমনের উদ্দেশ্যে নয়। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের গায়ে যেন পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের কালিমা না লাগে, নিজের সেনাবাহিনীর হাত যেন নিজেরই জনগণের রক্তে রঞ্জিত না হয় সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জাতীয়তাবাদের ভেতরে থেকেও কিভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবা যেতে পারে তা-ই দেখানোর চেষ্টা। আর যেহেতু নিপীড়িত জাতিস্বত্তার মুক্তি, ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার টিকে থাকার বিষয়গুলি নিয়ে মাকর্সবাদ-লেনিনবাদের চেয়েও ভাল কোন তত্ত্ব এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে নেই বলে মাকর্সবাদের ব্যাখ্যা ব্যবহৃত হয়েছে]



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29114542 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29114542 2010-03-11 23:24:36
জাহাজভাঙ্গার ভাগাড়ে নতুন খেলা > শ্রমিকরাই নিজেদের মৃত্যু দাবি করছে ! গত সপ্তাহে জাহাজভাঙ্গা নিয়ে লেখায় বলেছিলামঃ "মাত্র এক মাস আগে জারি করা আমদানি-নীতি অনুযায়ী(বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতি আদেশ ৪০ নম্বর বিধান) বাংলাদেশের কোনো আমদানিকারক বিদেশ থেকে পুরোনো জাহাজ আমদানি করতে চাইলে যে দেশ থেকে আমদানি করা হবে, সেই দেশের সরকার অনুমোদিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের(সার্ভেয়ার) প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে। এতে উল্লেখ থাকতে হবে, ‘জাহাজটি বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত’। আমদানি-নীতি শিথিলের জন্য পরিত্যক্ত জাহাজ ব্যবসায়ীরা অবশ্য দুই সপ্তাহ ধরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) তদবির করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকার যে এই বিশেষ মহলের সুপারিশে আমদানিনীতি শিথিল করতে চাইছে তার পেছনে কারণ কি? কেন দেশের স্বর্থের কথা বিবেচনায় না এনে একটি বিশেষ মহলের আবেদন বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে? "

ওখানে যেটিকে শঙ্কা হিসেবে দেখিয়েছিলাম আজ সেটি আর শঙ্কা নয়, বাস্তবতা। সেই ১০টি আমদানি করা জাহাজ না ছাড়ার কারণে জাহাজ মালিকরা এক অভিনব পন্থা আবিষ্কার করেছে! কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা! শ্রমিকদের জান-মালের নিরাপত্তা আর উপকূলের মানুষদের বিষের ছোবল থেকে বাঁচানোর জন্য সরকার আইন জারি করেছেন, সেই শ্রমিকদেরকেই সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন তারা। শ্রমিকদের মহাসড়কে নামিয়ে বিক্ষোভ সংগঠিত করেছেন। শ্রমিকরা এটা করতে বাধ্য, কারণ তাকে বলা হয়েছে- সরকার জাহাজ আমদানি করতে বাধা দিয়েছে, সে কারণে ইয়ার্ড বন্ধ, এবং তোমাদেরও মজুরি বন্ধ! প্রায় ৪৫ হাজার দিনমজুর মনে করেছে ইয়ার্ড বন্ধ মানে মজুরি বন্ধ! তাহলে খাব কি? বাঁচব কিভাবে? এই অসহায় শ্রমিকদের এখন অবস্থা এমন যে তারা বিষের ছোবলে ক্ষয়ে যেতে পারে, সেকেলে ব্যবস্থায় জাহাজ ভাঙ্গতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মরতে পারে জেনেও শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে মালিক সমিতির প্ররোচণায় রাজপথে নেমে এসেছে! এইরকম খেটে খাওয়া গরিব মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের নজির এর আগে বাংলাদেশে ছিলনা। এবারই প্রথম দেখাল পুরোনো জাহাজ আমদানিকারকরা।

সরকার এখন পড়েছে উভয় সংকটে! যে শ্রমিকদের জানমাল আর নিরাপত্তার কথা ভেবে আইন করা হলো, তারাই দেখি রাজপথ অবরোধ করে বসে আছে! সরকার এখন কি করতে পারে? বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাফর আলম বলেছেন, "আমরা দুই মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আবেদন জানিয়েছি, নতুন সিদ্ধান্তের কারণে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের জাহাজ ভাঙা শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। এই খাতে কর্মরত প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। সরকারের বার্ষিক ৬০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন সিদ্ধান্তের কারণে পাইপলাইনে থাকা দুই লাখ টনের আরো ১০টি পুরনো জাহাজ আমদানিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, চীন, তুরস্কসহ পৃথিবীর কোনো দেশে পুরনো জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক দেশের এ ধরনের সার্টিফিকেটের দরকার হয় না। হয়তো কারো প্ররোচনায় নতুন এ আমদানি নীতি প্রণয়ন করেছে আমাদের সরকার। তাছাড়া বিষাক্ত অর্থাৎ কোনো ধরনের যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশ কখনো আমদানি করেনি। যেসব বর্জ্যের (তেলের খাদ) কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো আমরা কখনোই সমুদ্রে ফেলি না। আমাদের দেশের ব্রিকফিল্ডে এগুলো ব্যবহৃত হয়”

তাহলে এগুলো কি?

এসব কি তেলের খাদ আর নাম না জানা হরেক কিসিমের টক্সিক নয় ?


তারা বলছেন তারা কোন বিষাক্ত জাহাজ আমদানি করেননি! ভাল কথা, এই কথাটিই তারা নিজেরা কেন বলছেন? তারা কি বিশেষজ্ঞ? এই কথাটিই তারা সেই দেশের যথাযথ সার্ভেয়ার বা যথাযথ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বলাচ্ছেন না কেন? সার্টিফিকেট হাজির করছেন না কেন? তারা যেভাবে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করছেন তাতে সরকার তাদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির নিরাপত্তা আর জীবনের নিশ্চয়তা বিধানের গুরু দায়িত্ব থেকে সরকার মাত্র কয়েকজন হোমড়া-চোমড়ার হুমকিতে সরে আসবে? সরকারের নীতি বাস্তবায়ন হলে এই শিল্প কি কি ক্ষতির সম্মূখিন হবে সেই বিবরণ ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কোন উদ্দেশ্যে সেটা পরিষ্কার। এটা কোন যুক্তিই হতে পারেনা যে অন্যান্য দেশে সার্টিফিকেট লাগেনা বলে আমাদের দেশেও লাগতে পারবে না!
সরকারের সমালোচনাকে ধরে নেওয়া হয় গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যিক ব্যাপার। যৌক্তিক সমালোচনা সরকারকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। একটা শক্তিশালী বিরোধীদল সংসদে থাকলে তারা সরকারকে ডিরেইলড হওয়া থেকে উদ্ধার করে। এসবই কেতাবি কথাবার্তা এবং কেতাবেই সীমাবদ্ধ। বলাবাহুল্য আমাদের দেশে এই সব গণতান্ত্রিক প্রাকটিস নেই বললেই চলে। বিরোধীদলের অবস্থান থেকে কিংবা অবহেলিত-নিপীড়িত সাধারণ মানুষের অবস্থান থেকে সরকারের কাজে সমর্থন বা সহযোগীতার উপমা দূরবীনদৃষ্টি স্বাপেক্ষ। তেমন রেওয়াজও নেই। ধরেই নেওয়া হয় সরকার যা করেন তা আখেরে জনগণের অকল্যাণই বয়ে আনে। সাধারণ নাগরিকদের অবশ্যি এক্ষেত্রে দোষও দেওয়া যাবেনা, কেননা অতীতে এই ধরণের নজিরই বেশি। এমন একটি নেতিবাঁচক ধারণা থাকার পরও আমরা দেখি এই সরকার কিছুদিন আগে একটি জনহিতকর আইন করেছিলেন। সেই আইনটি বাস্তবায়নের আগেই সরকারকে সেই অবস্থান থেকে সরিয়ে আনার জন্য আবার পায়তারা শুরু হয়েছে। যেখানে জনহিতকর পদক্ষেপ বা আইন নেই বললেই চলে, সেখানে সরকার যখন একটা ভাল কাজ করেন বা করতে উদ্যোগী হন তাতেও আমাদের সন্দেহ আর অবিশ্বাস দাপাদাপি করে!

সরকার এখন কি করতে পারে তা আমাদের পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি। স্ক্র্যাপ দিয়ে হাজার হাজার টন এমএস, বিলেট ইত্যাদি তৈরি করে দেশের নির্মাণ শিল্পকে চালু রাখার নামে, সস্তায় এমএস পাওয়ার নামে এবং বার্ষিক ৬০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের নামে আমদানি নীতি সংশোধন করবেন। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হবে-"দেশের এবং দেশের মানুষের বৃহত্তর মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে আমদানিনীতি অধিকতর গ্রহনযোগ্যরূপে সংশোধন করা হলো"

আর আমরাও আবার বিষাক্ত জাহাজে কর্মরত শ্রমিকের ক্ষয়ে যাওয়া হাত-পা, মৃত শ্রমিকের কদাকার মুখচ্ছবি, অসহায় সেই সব শ্রমিকের বউ-বাচ্চার আহাজারীর চিত্র সম্বলিত ওয়েভ লিঙ্কে এবং পত্র-পত্রিকায় দেখে আগামী লেখার উপকরণ খুঁজে নেব???!!!








]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29108256 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29108256 2010-03-02 01:47:32
উপমা চিকিৎসা আপডেট < ৯ > অপারেশনের জন্য নিয়েও ফেরৎ আসা

গত ২৩ নভেম্বরের পর এ বিষয়ে আর আপডেট দিতে পারিনি। ধারাবাহিক ক্লান্তিকর চিকিৎসা চলছিল। এর মধ্যে তেমন কোন অগ্রগতি বা অবনতি কোনটিই হয়নি বলে আপডেট দেওয়ার কাজটা পিছিয়ে পড়েছে। তার উপর নিজের কিছু কিছু ব্যস্ততাও ছিল।

উপমার চিকিৎসা চলছিল ডা.সুমন নাজমুল হোসাইন এর কাছে। তার সাথে আগেই কথা হয়েছিল এনআইসিভিডি তে বছরে একবার আমেরিকা থেকে একটা ডাক্তারদের টিম আসে। তারা এনআইসিভিডি তে দিন পনের থেকে অনেকগুলো অপারেশন করে। বাংলাদেশের ডাক্তাররা শুধু ভাল্ব রিপ্লেস করতে পারেন, রিপেয়ার করতে পারেন না। এই আমেরিকার টিম এসে কিছু রিপেয়ারের কাজ করে।

ওদের আসার সময় হয়ে এলে উপমাকে ভর্তি করানোর জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি এনআইসিভিডি তে নেওয়া হয়। ওই দিন ডা: কাজী আবুল হাসান তাকে দেখে দশম বারের মত ইকো টেস্ট করতে বলেন। কথা মত টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯ টায় তাকে দেখানো হয়। ইতিমধ্যে আমেরিকার সেই টিম এসেছে ২০ তারিখে। ২৫ তারিখ উপমাকে এনআইসিভিডি তে ভর্তি করানো হয়। দুপুরের পর সেই টিম এবং এবিএম সালাম, কাজী আবুল হাসান সহ আবারো ইকো করান। বিকেল ৪ টা পর্যন্ত বোর্ড মত বসিয়ে তারা সিদ্ধান্ত দেন- এখন অপারেশন করলেও তিন মাস পর আবার একটা অপারেশন করাতে হবে! আমাদের সিদ্ধান্ত কি জানতে চাইলে আমরা জানাই "আপনারা যা ভাল মনে করেন"। এর পর সিদ্ধান্ত আসে- তিন মাস পর আবার দেখা করুন। ততদিন নতুন দেওয়া ওষুধ চলবে। আবার ফিরে এলাম। এখন তাদের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ চলছে।

গত আপডেট পর্যন্ত একাউন্টের স্থিতি ছিলঃ..................... ৩,১৭,০০০/-
১৯.১০.২০০৯ চিকিৎসা বাবদ দেওয়া হয়েছে.................... ৫,০০০/-
২৬.১১.২০০৯......................................................... ২,০০০/-
০৪.০১.২০১০......................................................... ৩,০০০/-
২৮.০১.২০১০......................................................... ৩,০০০/-
০৭.০২.২০১০......................................................... ৫,০০০/-
২৫.০২.২০১০......................................................... ৪,০০০/-
__________________________________________
স্থিতি------------------------------------------------------ ২,৯৫,০০০/-
৩১.১২.২০০৯ তারিখে একজনের টাকা ফেরৎ দেওয়া হয়েছে.. ২০,০০০/-***
___________________________________________
একাউন্টে বর্তমান স্থিতি টাকা ---------------------------- ২,৭৫,০০০/-

উপমার একাউন্ট নং 105-101-142123 Dutch-Bangla Bank Limited Motijheel Foreign Exchange Branch

*** অনিবার্য কারণে যাকে ২০ হাজার টাকা ফেরৎ দেওয়া হয়েছে গ্রহণের সময় যেহেতু তার নাম বলা হয়নি তাই ফেরতের সময়ও তার নাম বলা হচ্ছে না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29106182 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29106182 2010-02-26 23:34:53
বিষাক্ত বর্জ্যযুক্ত জাহাজ আমদানিকারকদের কাছে সরকারের নতিস্বীকার > পেছনে কোন পাকা মাথা?
জাতীয় সংবাদপত্রে, ব্লগে এবং অন্যান্য মাধমে লাগাতার জাহাজভাঙ্গা কাজে শ্রমিকদের মানবেতর জীবন-যাপন, তাদের নির্মম মৃত্যু, তাদের নূন্যতম মজুরি, তাদের প্রটেকশন নিয়ে লেখালেখি এবং একর পর এক বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকের মৃত্যুর সংবাদ ছাপা হতে দেখে অবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে এই শিল্প নিয়ে নীতিমালা তৈরি করা, আমদানি নীতি কঠোর করার ঘোষণা আসে। তিন-চার মাস টানাপোড়েনের পর অবশেষে মাত্র এক মাস আগে সেই পুরোনো জাহাজ বা স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির নীতিমালা তৈরি হয়।

সেই নীতিমালায় যে যে শর্ত দেওয়া ছিল তা পুরণে ব্যর্থ হওয়ায় চট্টগ্রাম বর্হিনঙ্গরে ১০ টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আটকে যায়। আমদানিকারকের প্রধান শর্ত ছিল তাকে সার্ভেয়ার নিয়োগ দিয়ে এই মর্মে সার্টিফিকেট দিতে হবে যে, আমদানিকৃত জাহাজে কোন বিষাক্ত বর্জ্য নেই( যদিও এটা খুব যৌক্তিক ব্যবস্থা নয়, কারণ আমদানিকারকের নিয়োগকুত প্রতিষ্ঠান তার পক্ষেই মত দেবে। এটা করানো উচিৎ রপ্তানিকারক দেশের সরকারি পর্যায়ের সার্ভেয়ার দিয়ে)। কিন্তু আমদানিকারকদের সমিতি দেশের আর দশটা সমিতির মত বেঁকে বসেছে! তারা বিভিন্ন পর্য়ায়ে দৌড়ঝাঁপ করে এখন এই নীতি বাতিলের জন্য তদ্বির করে যাচ্ছেন। এবং যথারীতি সরকার তাদের সেই দাবি মেনেও নিচ্ছেন! তাহলে কি দাঁড়াল? সেই নিরাপদে আবার বিষাক্ত বর্জ্য আছে এমন জাহাজ অবাধে দেশে এসে ভিড়বে। সেই বিষের মরণ ছোবলে আবার শ্রমিকের জীবন নাশ হবে। আবার সমগ্র উপকূলজুড়ে মরণ বিষের নীল ছোবল অশিক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষকে খুবলে খাবে। তাহলে কেন সরকার "জনকল্যাণে নীতিমালা প্রণয়ন" নামক মূলো ঝুলিয়ে দিয়েছিল? এই প্রশ্নের কোন উত্তর নাই।

Toxic chemicals in our environment threaten our rivers and lakes, our air, land, and oceans, and ultimately ourselves and our future. The production, trade, use, and release of many synthetic chemicals is now widely recognised as a global threat to human health and the environment.
এই ভীতিকর টক্সিক ওইসব স্ক্র্যাপ জাহাজে করেই এদেশে চলে আসছে। আরো জানতে এখানে দেখুন

ট্যারিফ কমিশন, মূসক, রাজস্ব বিষয়ক নীতিনির্ধারণী কমিটি, রাজস্ব বোর্ড, এই নামগুলি সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই অচেনা,অপরিচিত। এখানে কখন কে কি করেন, কি ভাবে কোথাকার নীতি কোথায় গিয়ে ‘নীতিহীন’ হয়ে যায়, কবে কি ভাবে কোন পণ্যের উপর আরোপিত শুল্ক কমে যায়-বেড়ে যায়, কোন পণ্য কাদের ইশারায় আমদানি নিষিদ্ধ থেকে ‘অবাধ আমদানি যোগ্য’ হয়ে যায় তার খোঁজ সাধারণ মানুষ পায় না, রাখে না। আর এই না পাওয়া বা না রাখার ভেতরেই রাতারাতি রিতিনীতি বদলে যায়। পরে কোন একদিন ‘দেশের স্বাথে’ সেই খবর সংবাদপত্রে ছাপা হলেই কেবল সাধারণ মানুষের নজরে আসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জাতীয় ট্যারিফ কমিশন, বিনিয়োগ বোর্ড প্রমূখ সরকারি দপ্তরগুলো প্রচন্ড ক্ষমতাবান। তাদের জবাবদিহিতাও আছে, তবে তা কার কাছে সে এক কোটি টাকার প্রশ্ন!

ব্যাপারটি হচ্ছে মাত্র কিছুদিন আগেই জাতীয় আমদানিনীতি পাশ হয়েছে। এই আমদানিনীতি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে কোন কোন পন্য অবাধে আমদানি করা যাবে বা কোন কোন পণ্য আমদানি যোগ্য নয়, অর্থাৎ আমদানি নিষিদ্ধ। সেই আমদানিনীতি বলে পুরোনো বর্জ্যযুক্ত জাহাজ আমদানিযোগ্য নয়। আমদানি হলেও বিশেষ বিশেষ শর্ত পালন স্বাপেক্ষে। এটি একারণেই করা হয়েছে যাতে করে বাংলাদেশে কোন বর্জ্যযুক্ত জাহাজ আসতে না পারে। বিষাক্ত বর্জ্যযুক্ত জাহাজ আসলে কি কি ক্ষতি তা কম-বেশি সকলেরই জানা আছে। তেমনি সরকারেরও জানা আছে বলেই পুরোনো বর্জ্যযুক্ত জাহাজ আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। এখন একটি স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের প্ররোচনায় সেই আমদানিনীতি পরিবর্তনের কথা উঠেছে। পুরোনো বা স্ক্র্যাপ জাহাজ আনার জন্য আমদানি-নীতি আদেশ শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘পুরোনো জাহাজে বিষাক্ত বর্জ্য আছে কি না, তা বাংলাদেশের আমদানিকারকের নিযুক্ত সার্ভেয়ার কোম্পানি প্রত্যয়নপত্র দেবে।’ আমদানি-নীতিতে এই ধারাটি যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

মাত্র এক মাস আগে জারি করা আমদানি-নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের কোনো আমদানিকারক বিদেশ থেকে পুরোনো জাহাজ আমদানি করতে চাইলে যে দেশ থেকে আমদানি করা হবে, সেই দেশের সরকার বা সরকার অনুমোদিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে। এতে উল্লেখ থাকতে হবে, ‘জাহাজটি বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত’।
আমদানি-নীতি শিথিলের জন্য পরিত্যক্ত জাহাজ ব্যবসায়ীরা অবশ্য দুই সপ্তাহ ধরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) তদবির করছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকার যে এই বিশেষ মহলের সুপারিশে আমদানিনীতি শিথিল করতে চাইছে তার পেছনে কারণ কি? কেন দেশের স্বর্থের কথা বিবেচনায় না এনে একটি বিশেষ মহলের আবেদন বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে? এইসব পুরোনো জাহাজ কোথা থেকে আসে, তাতে কি কি বর্জ্য থাকে, তা আমাদের দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কি কি ভয়ংকর ক্ষতি করতে পারে তা নিয়ে আগেও লেখালেখি হয়েছে। পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে পরিবেশ বিজ্ঞানি, পরিবেশ আইনজীবী সমিতি সহ অনেকেই এ নিয়ে তাদের আপত্তি জানিয়েছেন। এই ধরণের জাহাজ সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া যাকঃ

ইউরোপিয়ান দেশগুলো যেমন, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর কেন আমাদের দেশে জাহাজ নির্মাণে আগ্রহ দেখাচ্ছে? ইউরোপিয়ান দেশগুলো তো নিজেরাই বছরের পর বছর জাহাজ নির্মাণ শিল্পে পৃথিবীর সেরা। গত প্রায় এক শতাব্দীধরেই তো তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাহাজ, ফেরি বোর্ট, টাগ বোট রপ্তানি করে আসছে, এখন কি এমন হলো যে তারা আমদানী করতে চাইছে? তারা তাদের দেশের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দায়বদ্ধ। তাই তাদের নিজের দেশের মানুষদের দিয়ে যে অমানবিক এবং বিপজ্জনক কাজ করাতে পারে না তা-ই আমাদের মত লেস ডেভেলপ্ড দেশে করিয়ে নেয়। তাদের পারমানবিক বর্জ্য জাহাজে ভরে সারা ইউরোপের কোথাও ফেলতে পারেনা। গ্রীণপিস কর্মীরা তেড়ে আসে। সেই সব জাহাজ একসময় এসে ভেড়ে এই বাংলাদেশে। মারাত্মক বিষাক্ত পারমানবিক বর্জ্য, বিষাক্ত রাসায়নিক,টক্সিন, প্রাণঘাতি যৌগ ডাম্প এবং রিসাইক্লিং করার মোক্ষম জায়গা এই বাংলাদেশ,

কেননা এখানে সস্তায় মানুষ মেলে! নামমাত্র দামে এই যুগেও দাস পাওয়া যায়! এরা ঝাঁকে ঝাঁকে মরলেও তেমন কোন সামাজিক প্রতিবাদের মুখোমুখি হতে হয়না।বড় অংকের ক্ষতিপুরণ দিতে হয়না। উন্নত দেশগুলোর যে সব বিষাক্ত পরিত্যাক্ত জাহাজ তাদের কোন বন্দরে ভেড়ার সুযোগ পায় না সেই সব হ্যাজার্ড কার্গো চলে আসে বাংলাদেশে। এইসব জাহাজ পুড়িয়ে ফেলাও যাবেনা। তাই তাকে সেটা ভাঙ্গতেই হবে। আর ভাঙ্গার জন্য বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রেভইয়ার্ড।
জাহাজভাঙ্গা শিল্পের নামে হেল অব আর্থ বা বিশ্বের নরক!

Chittagong, Bangladesh, Some 45,000 workers of the ship-breaking industry in Chittagong are now working in hazardous atmosphere risking life in handling of old equipment used to break ships and dealing with toxic chemicals in their daily routine work. In the absence of any protective measures at least 300 workers of the yards had so far died and about 550 were handicapped in accidents in harness in the last 18 years. At present the workers of 30 ship-breaking yards in Chittagong are working at high risk of accident particularly explosion of gas cylinder and oil tanker.
Asbestos in the Ship-breaking industry of Bangladesh: Action for Ban


জাহাজভাঙ্গা এই কাজে দেশের মানুষের কি কি ক্ষতি হচ্ছে, পরিবেশের কি কি ক্ষতি হচ্ছে, সত্যিকার অর্থে জাতীয় অর্থনীতিতে কতটুকু অবদান রাখতে পারছে সেই খতিয়ান কোথাও পাওয়া যাবেনা। এবার দেখি কি কি ডিজাস্টার ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে, এবং এখনো ঘটে চলেছেঃ


এই ধরণের বিষাক্ত জাহাজগুলি রেখে যাবে বছরের পর বছর ধরে বিষাক্ত কেমিক্যালসের মরণ ব্যাধি। চেরনোবিল পারমানবিক বিষাক্ততার পাশ্বপ্রতিক্রিয়ায় এখনো সেখানে বিকলাঙ্গ শিশু আর প্রাণীর জন্ম হয়। আর এখানে জন্ম হবে বিশ্বের অভূতপূর্ব সব রোগব্যাধী আর ভাইরাস!!
toxicswatch-alliance against pollution & corporate crimes

ToxicsWatch keeps track of callousness, corporate crimes, military-industrial complex & their impact on humans & ecosystem. It is concerned about public health impacts from companies of all ilk and related public and corporate policies. It is an ally of WaterWatch Alliance.

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ আটকে আছে। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদীয়মান জাহাজ নির্মাণ শিল্পও। সুতরাং আমদানি-নীতি আদেশের সংশ্লিষ্ট শর্ত শিথিল করা না হলে জাহাজ ভাঙা শিল্পটি সামনের দিকে এগোতে পারবে না।
একই ধারার ৪০ উপধারায় বলা আছে, ‘পরিত্যক্ত জাহাজ (স্ক্যাপ ভ্যাসেল) আমদানির ক্ষেত্রে তা বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত এই মর্মে রপ্তানিকারক দেশের সরকার বা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র শিপিং ডকুমেন্টসের সঙ্গে অবশ্যই দাখিল করতে হবে।’
এদিকে আমদানি-নীতি আদেশের শর্ত শিথিলের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আবেদনের এক দিন পর এনবিআর একই সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, আমদানি করা জাহাজ বর্জ্যমুক্ত কি না, তা আমদানিকারকেরাই বলবেন। আর তা যাচাই করবে বেসরকারি জরিপ প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর আমদানিকারকেরা সরকারকে এমন অঙ্গীকারনামা দেবেন যে, বিষাক্ত বর্জ্যযুক্ত জাহাজ আনা হলে যেন বিধি অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

কি বিভ্রান্তিকর কথা! আমদানিকারক অঙ্গীকার দিলেই যেন সাত খুন মাফ! যে আমদানিকারকরা বিষাক্ত বর্জ্য বিষয়ে সামান্যতম জ্ঞাত নন, যাদের কাছে এই দেশের মানুষের বিষাক্ত টক্সিক প্রভাবে মৃত্যুঝুঁকি কোন ভাববার বিষয় নয়, যাদের কাছে মোটাদাগে ‘কর্ম সংস্থান করে দিচ্ছি’ টাইপ দাতাগিরিই প্রধান, যারা টাকার জন্য গ্রীণপিস বর্ণিত বিষাক্ত জাহাজ এনে শত শত মানুষকে বিষে নীল করতেও দ্বিধা করেন না তাদেরই কাছে চাওয়া হচ্ছে ‘অঙ্গীকারনামা’! এ যেন শিয়ালে কাছে কুমিরের বাচ্চা রেখে শিয়ালকে না খেতে অনুরোধ করা!

জাহাজ ভাঙা সমিতির সভাপতি জাফর আলম বলেন, ‘আমদানি নীতি আদেশের ওই শর্তের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। এরই মধ্যে অনেক জাহাজ এসে গেছে। তবে বাংলাদেশে যেসব জাহাজ আসে, সেগুলোতে বিষাক্ত বর্জ্য বলতে কিছু থাকে না।’ এই যে সমিতি প্রধান নির্দিধায় সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন তার কি কোন গ্রহণযোগ্যতা আছে? তিনি কি নিশ্চিত যে আসলেই সেই জাহাজে কোন ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্য নেই? তা কেন? তিনি তো বলেই দিলেন-‘থাকে না’। তার মানে আছে কি নেই সেই প্রশ্নও ওঠে না! এখন এই ‘সার্টিফিকেট’ যদি একটি সমিতি প্রধান দিতে পারেন, আর তা যদি সরকারের একাধিক দপ্তরের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পরিবেশ-টরিবেশ আর বিষাক্ত বর্জ্যটর্জ্য নিয়ে মাতামাতির কিছু থাকেনা। এই সব তুঘলকি আইন-কানুনের ট্যুইস্ট দেখে জনমনে গভীরভাবে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এই বিশেষ মহল কি সরকারকেও প্রভাবিত করতে পারে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে-পারে! তাহলে আর কে রইল এই দেশের অশিক্ষিত সরল সোজা মানুষদের বিষের দংশন থেকে বাঁচানোর?

বিষ নিয়ে হেলাফেলা করে বিষের দংশনে গরিব খেটে খাওয়া মানুষকে ছুঁড়ে ফেলার এই মরণ খেলা অবিলম্বে বন্ধ করুন। সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই এটা বন্ধ করুন। মনে হতে পারে, এতে সামান্যই সমস্যা হবে। মনে হতে পারে-এতে কি-ই বা আসে-যায়? কিন্তু বিষের ছোবল শুধুই যে এর সাথে জড়িত সাধারণ শ্রমিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা।






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29103563 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29103563 2010-02-23 00:34:45
একুশের প্রথম প্রহরে ব্লগে এ কী দেখছি? এমনটি কী হওয়া উচিৎ? যদিও এই মাসে কর্পোরেট দালালরা টাকা দিয়ে ভাষার ভালবাসা খরিদ করে নিয়েছে।
যদিও বাঙ্গালীর শোক, কান্না, আত্মত্যাগ এখন চড়া দামে উৎসবের কাছে বিক্রি হয়েছে।
যদিও এই উৎসবের সাথে আপামর সাধারণ মানুষের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।


তবুও আজ একুশে ফেব্রুয়ারি।
আজ আমার ভাইয়ের রক্ত ছুঁয়ে শপথ নেওয়ার দিন।
আজ আমার ভাইয়ের লাশের উপর থেকে দুখিনী বর্ণমালাকে বরণ করার দিন।
আজ আমার সারা বিশ্বময় গর্ব করার দিন।



আর সেই দিনে এখানে দুজন ব্লগারের দুএকটা মন্তব্য নিয়ে ব্লগে ঘোলা জল ঢেলে একুশকে স্মরণ করার কাজটিতে কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে! ভাষাটা রাজনৈতিক মনে হতে পারে, তবে এটা খুব সচেতন ভাবে একটা গ্রুপ করে যাচ্ছে। তাদের একমাত্র পাশার দান খেলার হাতিয়ার বানিয়ে আল্লাকে বিকৃতভাবে হাজির করা হচ্ছে। আর আমরা সেই পাতা ফাঁদে পা দিয়ে শোকের দিনে আর এক জনের মৃত্যু(ব্যান) দাবী করছি!


কর্তৃপক্ষের কাছে সনিবন্ধ অনুরোধ এই মুহূর্তে এই সংক্রান্ত সকল পোস্ট ডিলিট করে ফ্লাডিং করা বন্ধ করুন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29102093 http://www.somewhereinblog.net/blog/monjuraul/29102093 2010-02-21 01:10:50