নতুন পাঠক, প্রথমেই আপনাকে স্বাগতম জানাই, ছোট ছোট ছোটগল্পের জগতে। ধারাবাহিকভাবে এখানে ছোট ছোট ছোটগল্প প্রকাশিত হবে। এ্ই পর্বে ৩টি গল্প রইলো। প্রতিটি গল্প ২০০ শব্দে লেখা। প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, এই পরিমাপ নির্ধারণের মূল কারণ গল্পের আকারকে একটা নির্দিষ্ট সীমায় বাঁধা। ছোট ছোট ছোটগল্প ঠিক কী মাপের হবে, কতটুকু আকৃতি হলে একটি গল্পকে ছোটগল্পের চেয়েও ছোট বলবো - এইসব ভাবনা থেকেই ২০০ শব্দের সীমানায় গল্প লেখার প্রয়াস। কবিরা ছন্দের অনেক সীমানায় মেনেও মহত্তম কবিতা লিখেছেন, সনেট তো একদম কঠিন নিয়মেই আঁটা! কাজেই ছোট ছোট ছোটগল্পের ২০০ শব্দের সীমারেখা স্বচেষ্ট নিরীক্ষায় নিজের লেখনীকে যাচাই করার প্রবণতাও বলা যেতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই ‘ছোট ছোট ছোটগল্প’-এর ধ্বণিগত বৈচিত্র আমার ভাল লাগে। তাছাড়া এমন লোভও হয়, একদিন হয়তো এই রকম সহস্র গল্প লিখে ‘ছোট ছোট ছোটগল্প’-এর আঙ্গিকটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। কাজেই, ‘অনুগল্প’, ‘ক্ষুদ্র গল্প’ ইত্যাদি কোন শিরোনাম নয়, আমার এ গল্পগুলোর ‘ছোট ছোট ছোটগল্প’ শিরোনামটি গৃহীত হোক সে আশা করি।
০১. চাকরি
ক’দিন ধরে অফিসে খুব ঝামেলা যাচ্ছে। ফলে প্রায়ই আমার মেজাজ খারাপ থাকে। এ সব যন্ত্রণার মাঝে মিলিই আমার একমাত্র শান্তি । সারাদিন পর ও এলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। কিন্ত সম্প্রতি মিলির কাকার অফিস আমাদের অফিসের কাছে বদল হওয়ায় ও আর আগের মত চট করে আসতে পারেনা।
মিলির কাকার বয়স বেশি নয়, এখনও বিয়ে করেননি। নাটক-ফাটক নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তিনিও একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজে করেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, একদিন একসঙ্গে মদও খেয়েছি। কিন্তু তিনি জানেন না তার ভাতিজির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী!
ক্রমশ অফিসের পরিবেশ জঘন্য হয়ে উঠলো। আমি চাকরি পাল্টানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম। অন্য কোন উপায় না দেখে একদিন হুট করে মিলির কাকাকে ফোন করে বসলাম। আমি তো একদিন তাদের পরিবারের লোকই হবোই কাজেই এই মুহুর্তে এটুকু সাহায্য আশা করতেই পারি। তাছাড়া, আমি জানতাম ওনার প্রতিষ্টানে একটি পদও খালি হয়েছে।
কিন্তু তিনি আমাকে সাহায্য করলেন না। বরং বেশ ক’দিন ঘুরিয়ে একদিন বললেন, এই মুহূর্তে আমাদের কোন লোকের দরকার নেই। আমি জানি উনি মিথ্যে বলছেন। আমি অপমানিত বোধ করলাম। আমার মেজাজ আরো খারাপ হতে লাগলো। আমার ঘুম, খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ হয়ে গেলো। নিজেকে অর্থহীন, অপদার্থ মনে হলো। অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এর শোধ নেবো আমি।
আমি মিলিকে ডেকে বললাম, মিলি, তোমাকে আর আমার দরকার নেই।
০২. আমি ও প্রজাপতি
কাচের এ প্রান্তে আমি, ও প্রান্তে প্রজাপতি। ঢাকা শহরে এমন রঙিন প্রজাপতি সহজে চোখে পড়ে না। বেগুনী, লাল, নীল, কালো রঙের বন্যা বইছে প্রজাপতিটার শরীরে। শুধু পাখাতে নয়, প্রজাপতিটির গায়েও দারূণ কারুকাজ, এমন কারুকাজের বর্ণনা দেয়াও জটিল। অতিবড় ডিজাইনারও এমন কম্পোজিসন আর কম্বিনিসনে মুগ্ধ হতে বাধ্য।
বহুতলভবনের একটা দিক কাচে ঘেরা। বাইরের রাস্তায় একঘেয়ে গাড়ি চলাচল দেখা যায়। রাস্তার পাশে জারুল আর কৃষ্ণচূড়া হাওয়ার সঙ্গে লাল-বেগুনীর খেলা জমিয়েছে। দৃষ্টিসীমানার একমাত্র রাধাচূড়া গাছটিতে কাকের বাসা, ডিম বা বাচ্চা দেখা যায় না, শুধু ঝাকড়া বাসাটির খড় দেখা যায়।
উত্তরার এই অফিসে এসেছি দিনদশেক হবে। এই নিয়ে এটা আমার সপ্তম চাকরী। সবাই বলে, সাত নাকি লাকি সংখ্যা। হয়তো সেই অজুহাতেই, এই চাকরীটা করতে পারবো। করা উচিতও; কারণ, চাকরী ছাড়তে ছাড়তে আমার বিশেষ বদনামও হয়ে গেছে। কিন্তু কী করবো! নেহাতই মাসিক কিছু টাকার জন্যে কতো আর সহ্য করা যায়! দশদিনেই এই চাকরীটার উপরও কেমন ঘেন্না ধরে গেছে!
প্রজাপতিটা মনে হয়, কাচের ঘেরা ভেদ করে এ ঘরে ঢুকতে চাইছে। যেন কাচের এ দেয়াল ভাঙার জন্যে প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আমি কাচের উপর আমার নাক রাখলাম, প্রজাপতিটা একটু দূরে উড়ে গেলো, আবার উড়ে এসে ঠিক আমার নাকে বসলো! আর তক্ষনি আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রজাপতিটাকে এ ঘরে ঢুকতে দেবো আমি। অতএব, পেপারওয়েটটা হাতে তুলে নিলাম।
০৩. কবি যে কারণে আবারও চাকরী ছাড়লেন
তাদের অফিসটা এসি। সিগারেট খেতে হলে তাঁকে বাইরে যেতে হতো; আর তিনদিন অফিস করেই তাঁর ঠাণ্ডা লেগে গেলো। অফিসে অবশ্য তাঁর কাজ তেমন কিছু নয়। দু’য়েকটা মূল কপি দেখে দেয়া, মাঝে মাঝে কম্পিউটারে বসা। চাকরীটা নিয়ে তিনি সন্তুষ্টই হলেন। তবে এটাও ঠিক সবাই খুব বিস্মিত হলো যে কবি এবার সত্যি সত্যিই চাকরী করছেন। করতেনও। কিন্তু সামান্য একটা সমস্যা দেখা দিলো।
অতি সামান্য, এতো সামান্য যে বলে বিশ্বাস করানোও কঠিন।
আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি, অফিসে যাওয়ার পথে একটা আবর্জনার স্তুপ পরে। নগরীর অভিজাত, ব্যস্ততম এলাকায় কেমন করে এই আবর্জনার স্তুপটা ঠাঁই পেলো তাই নিয়ে তিনি নয়দিন ভাবলেন। যত ভাবলেন ততই তার মাথায় আবর্জনার স্তুপ জমতে লাগলো। তাতেও কোন সমস্যা হতো না, কিন্তু সমস্যা হলো, সেইখানে গড়ে উঠেছে এক গণমূত্রালয়। দেয়ালে ভুল বানানে লেখা আছে ‘এখানে পরসাব করিবেননা, করিলে জরিমাণা ১০ টাকা।’ সেই বানানের দিকে লোকজন প্রবল বেগে মূত্র ত্যাগ করে। এই দৃশ্যটা তাঁকে প্রতিদিন দেখতে হয়, অথবা তাঁকে ঘুরপথে অন্যদিক দিয়ে অফিসে আসতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন যেমন ঘুরপথে আসা কঠিন, তেমনি এই আবর্জনা ও মূত্রের গন্ধ স্বীকার করাও কঠিন।
তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন, কেন আমি এমন চাকরী করবো যে চাকরীস্থলে যাবার দুটো মাত্র পথ, যার একটি হচ্ছে ঘুরপথ আর অন্যটি দূর্গন্ধযুক্ত পথ।
কী আর করা, তিনি এবারের চাকরীটাও ছেড়ে দিলেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



