১. পালকের গল্প
পাখির গায়ে লেগেছিলাম আমি। কেমন করে যেন খসে পড়েছি। পড়তে পড়তে আমি ঠাঁই পাই এক বাঁশ ঝাড়ের পায়ের তলায়। আর পাখি উড়ে গেলো দূরে। আমি পড়ে থাকলাম একা।
অনেকদিন পর একটি বালক আমাকে কুড়িয়ে পেলো। তখন ছিলো শীতকাল। বালকটি দূরবীন হাতে ঘুরছিলো। কুয়াশায় ভেজা আমার শরীর। প্রথমে তার জুতার নীচে চলে গেলাম আমি। বালক পা উঠাতেই আমাকে দেখতে পেলো। দেখতে পেলেই বা কী! অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে আমার সেই রঙ হারিয়ে গেছে। আমি জানতাম কেউ আমাকে নেবে না। সে-ও আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছিলো, কিন্তু কী যেন কি ভেবে আবার ফিরে এলো! আমাকে উঠিয়ে নিলো। তার সরু দুই আঙুলের আদরে পরিষ্কার করলো আমাকে। তারপর তার ডায়রির পাতায় শুইয়ে আমাকে নিয়ে এলো ঘরে।
সেই থেকে আমি এই ঘরে আছি। আরও কয়েকজন ঝরা পালকের সঙ্গে আমি একটা ফুলদানীতে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সারাদিন যায়। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকে। আমরা কয়েকজন পালক সন্ধ্যার অপেক্ষায় দিন কাটিয়ে দেই কোনভাবে। সন্ধ্যায় বালকটি ঘরে ফিরে এসে সব খুলে দেয়। তখন বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই আমি। কিন্তু শান্তি পাই না। কেননা, রাত বাড়তেই আলো নিভিয়ে জোরে গান ছেড়ে বালকটি বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদে, প্রতিরাতে কাঁদে।
আর বালকের কান্নায় আমার মনে পড়ে, পাখির শরীর থেকে খসে গেছি আমি আর পাখি একবার আমার দিকে না-তাকিয়ে উড়ে গেছে দূরে, অনেক দূরে...
২. সন্দেহ
মোমিন ভাই অপলক তাকিয়ে ছিলেন শূন্যে, তার চোখে কোন পানি নেই। আমাকে দেখে খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, পারভিন, তুমি এসেছো, দেখো, মিলি মরে গেছে।
মৃত্যু সত্যিই এতো অনিশ্চিত, অনির্ধারত এবং অবধারিত! এমন তো কোন বয়স হয়নি তার, কোনো রোগ শোকও ছিলো না। হাসি খুশি একটা মানুষ, প্রায় বিনা কারনে হুট করে চলে যাবে! আমি কেঁদে ফেললাম।
কাঁদিস না, কাান্নাকাটি মিলি পছন্দ করে না। দেখ, বাচ্চা দুটোকে কিছু খাওয়াতে পারিস কিনা। রুমা-ঝুমা জড়াজড়ি করে দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি বেড়িয়ে গেলাম ওদেরকে নিয়ে।
ওরা ভালভাবেই খেলো। শুধু রুমা একবার জিজ্ঞেস করলো, আন্টি, মা আর আসবে না?
না আসবে না। তাতে কি, আমি আছি না।
ঝুমা আমাকে আঁকড়ে ধরলো। আমি থাকলাম কয়েকদিন, রুমা-ঝুমার পরীক্ষা চলছিলো।
এমন সময় মোমিন ভাই একদিন রাতের খাবার পর এলেন আমার ঘরে। নিঃশব্দে। আমি চমকে উঠলাম।
পারভিন, এবার তুমি চলে যাও।
বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। আমি বোকার মত তাকিয়ে রইলাম। তাহলে যে কথাটা ক’দিন আমার আড়ালে ঘুরছিলো তাই ঠিক!
আমি দূঃখিত পারভিন, তোমার কাছে আমি ঋণী, কিন্তু কী করবো মিলির মা তোমার থাকাটাকে অন্য চোখে দেখছেন। আমি লজ্জিত। মোমিন ভাই তখন কাঁদলেন অথচ মিলি আপুর মৃত্যূতেও তিনি কাঁদেননি।
পরদিন সকালে আমি কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছি।
সময় পেলে রুমা-ঝুমাকে দেখতে যাই ওদের স্কুলে।
৩. স্বপ্নের বেলুন
বেলুন উড়ালে মনে হয়, লাল নীল হলুদ সবুজ কিছু স্বপ্ন ওড়াচ্ছি।
স্বপ্ন তো ওড়াতে নেই। সবাই বরং তাকে ধরতে চায়।
হু, তা ঠিক। এমনি মনে হলো, তাই বললাম, বেলুন কিনে দেবে আমাকে?
তোমাকে লক্ষ বেলুন দিতে পারি।
এর বেশি কথা হয় না। তখনই স্বপ্নটা ভেঙ্গে যায়। জানি না, কেন মিলিকে নিয়ে এ স্বপ্নটা দেখি বারবার!
একদিন ওকে বলি, চলো তোমাকে কিছু বেলুন কিনে দেই।
ধুরও পাগল, বেলুন দিয়ে আমি কী করবো, বেলুন নিয়ে খেলার বয়স আছে আমার?
কত বয়স তোমার মিলি?
এই বারো কি তেরো!
তাহলে এইটুকু বয়সেই তোমার শরীর এত্তো উত্তাল!
অসভ্যতা করো না।
মিলির চিমটি খেয়ে আমি চুপসে যাই। কিন্তু স্বপ্নের বেলুন গুলো উড়তেই থাকে। তখন মিলিকে আমি স্বপ্নের কথা বলি।
মিলি অবাক হয় না, øেহমাখা গলায় বলে, তুমি এখনও ছেলে মানুষ রয়ে গেছো বাবু, ছেলেবেলায় বেলুন কেনার জন্য জেদ ধরতে?
আমার ছেলেবেলা বলে কিছু নেই। সেই বয়সটা একা ব্রক্ষপুত্রের তীর ধরে হেঁটে কাটিয়ে দিয়েছি আমি।
তখন মিলি আমাকে বুকে চেপে ধরে, পাগলরে, কই ছিলি তুই, খুব কষ্ট করেছিস নারে!
আমার কান্না পায়, কিন্তু কাঁদি না।
শোন, আমাদের বিয়েতে তুুই অনেক বেলুন কিনিস। সেদিন ছাদে উঠে গিয়ে আমরা একসাথে বেলুন ওড়াবো।
হ্যাঁ মিলি, হ্যাঁ। আমি তোকে অনেক ভালবাসবো, দেখিস। বলতে বলতে তাঁর বুকে স্বপ্নের বেলুন খুঁজি, খুঁজতেই থাকি...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

