somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ ফুলার রোড

০৬ ই জুন, ২০০৮ রাত ১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিগন্তরেখায় সূর্য ডোবার পর, সন্ধ্যার মিহি-আলোতে ফুলার রোডে স্যান্ডেল বিছিয়ে ওরা তিনজন- তিন বন্ধু বসে আছে। তখন কায়েস আহমেদের লাশকাটা ঘর পেরিয়ে মোনাজাত উদদিনের পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ নিয়ে ওরা ব্যস্ত। এক সময় মোনাজাত উদদিনও আলাপ থেকে খসে পড়েন। ছোট ছোট চুমুকে ফ্লাস্কের চা, হাত বদল হওয়া সিগারেট, আর কথার তুবরিতে জারুল গাছতলার সব রাজা-উজির মারা শেষ হলে হতভাগার মতো ব্রিটিশ কাউন্সিলের গেটের দিকে ওরা তাকায়- যেখানে মায়াবী রাজকন্যারা তুচ্ছ রিক্সা ভাড়ার দরদস্তুর নিয়ে ব্যস্ত। তিনজনের বুকের ভেতর হাপরের দীর্ঘশ্বাস জমতে থাকে, প্রতিদিনই যেমন জমে।

'ওরা ঢাকায় নতুন এসেছে', কৌশিক নিশ্চিত সত্য বলার সুরে কথা বলতে থাকে, 'ওদের গায়ে ধানের তুষ এখনো লেগে আছে।' কৌশিকের দৃষ্টি রেখা বরাবর অন্যরাও তাকায়। একটি রিক্সায় পাঁচজনের একটি দল- একজন পুরুষ, একজন নারী, তিনটি শিশু- যাদের দু'জন কোলে, শেষজন পাদানিতে বসে। 'আমাদের মতো ওরাও এ নগরের বাসিন্দা হবে। ভীড় বাড়াবে। এখানে সেখানে মলমূত্র ছিটিয়ে রাখবে', কৌশিক কথা শেষ করে।

'পুরুষটি গায়ের জোরে রিক্সা টানতে টানতে চৌকস রিক্সাওয়ালা হয়ে উঠবে একদিন', কুশল অব্যর্থ ভিবিষ্যতবানী করে। 'আর ওদের মেয়ে দুটো শরীরের আঁশটে গন্ধ দূর না হতেই কারো বাড়ীতে ঝি-গিরি শুরু করবে, গরম খুন্তির ছ্যাঁকা খাবে, আর দুপুরে বাড়ীর গিন্নি ভাতঘুমে গেলে টিভিতে বাংলা ছবি দেখবে, কাঁদবে, আর কাঁদতে কাঁদতে ভালোবাসার কথা ভাববে।' কুশল থামে। কৌশিকের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে টান দেয়। চোখ সরু করে কি যেন ভাবে।

'ছেলেটি ডাস্টবিনের ময়লা কুড়াবে, নিউমার্কেটে মিন্তিগিরি করবে- নিজের ওজনের দ্বিগুন বোঝা টানবে, আর একটু বড় হলেই-' , কমল কথাটি শেষ করেনা। তারপর ভালবাসাহীন হাঁপরে আরো একটু দীর্ঘশ্বাস জমা করতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের গেটের দিকে তাকায়, যেখানে সুবেশী তরুণীরা বুকের কাছে ভারী বই চেপে ধরে পুরুষ সঙ্গীর কোন কথায় হাসিতে ভেঙ্গে পড়ছে।

'মেয়েটিকে আমি চিনি, রোকেয়া হলের।' কুশলের কথায় ওরা তরুনীটিকে আপাদমস্তক মেপে নেয়, ব্যবচ্ছেদ করে। কমল সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, 'এইসব রাজকন্যাগুলো কেন যে একটা করে খাটাশ সাথে নিয়ে ঘোরে!' কথা শেষ হলেও ধোঁয়ার একটি সরু রেখা কমলের নাক থেকে গড়িয়ে নামতে থাকে।
'তুই জেলাস।'
'তুই কি জেলাস না?'
'এইসব রাজকন্যাগুলো কোথায় হারিয়ে যায় একদিন!'
'এদের তুচ্ছ ভ্রুকুটিতে আজকে যারা খুন হচ্ছে, যারা তোর খাটাশ-পুরুষ- তারা রাজকন্যা লাভের পাত্র-দৌড়ে অংশ নেয়না, কেউকাটা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর দায়গ্রস্ত পিতারা মহারাণী বানানোর আশায় রাজকন্যাদের তুলে দেন নতুন কোন বনবিড়ালদের হাতে। সেই সব মহারাণীরা সন্তান জন্ম দেন, উঠতি বয়সী সন্তানের চোখ এড়িয়ে জন্ম-নিয়ন্ত্রনের বড়ি সেবন করেন, ঘরে বসে বসে প্রস্থে বেড়ে ওঠেন, কাজের মেয়েকে খুন্তির ছ্যাঁকা দেন, গাউছিয়ার ভীড় বাড়ান, উপটান মাখেন', কৌশিক থামে। কমল সিগারেটে শেষ টান দেয়, ধোঁয়া ছাড়ে, ফুটপাতের কোণ ঘেঁষে একদলা থুতু ফেলে।

'ওরা কেন আসে এ শহরে?'
'খুন হতে', কমল জবাব দেয়; তারপর কি যেন ভাবে।
'আমরা কেন এসেছি?'
'আমরা চলে যাব।'
কমল হাসে। মাথা ঝাঁকায়। তারপর আবারো জোর দিয়ে ঘোষনা করে, 'শিগগির চলে যাব, কাউকে খুন করে ফেলার আগেই।'
'এ শহরে ঢোকার রাস্তা আছে, বের হওয়ার পথ নেই। আমরাও জঞ্জাল বাড়াব, হাসপাতালের দেয়ালে লেপ্টে থাকা দুষিত কফের মতো ঝুলে থাকব এখানে।'

ওদের গল্পগুলো ধীরে ধীরে বিষন্ন হয়ে ওঠে। এরই এক ফাঁকে টুপ করে রাত নামে ফুলার রোডে। জারুল গাছতলায় অন্ধকার জমাট বাঁধে। কী একটা পাখি ঝটপট শব্দে উড়ে যায়। অন্ধকারে সিগারেটের আগুন ওঠা-নাম করে, হাত বদল হয়। কমল শব্দ করে থুতু ফেলে। দু' একটা রিক্সা চলে যায়। রাস্তার সোডিয়াম-আলোতে ফুলার রোড মরা মাছের আঁশটের মতো ভেসে থাকে। ওরা উঠে পড়ে, স্যান্ডেলগুলো পায়ে গলিয়ে নেয়।

'এই রিক্সা! যাবে?' একটি খালি রিক্সা ওদের কাছে এসে দাঁড়ায়। কুশল লাফ দিয়ে সিটে উঠে বসে। কৌশিক হতভম্ব রিক্সাওয়ালার কণ্ঠা বরাবর একটা ছুরি ধরে। কমল দ্রুতহাতে রিক্সাওয়ালার শার্টের পকেট আর লুঙ্গীর গাঁট থেকে টাকা বের করে আনে, বিড়বিড় করে বলে, 'শালা ফকির'। তারপর ওদের কেউ একজন রিক্সাওয়ালাকে ধমক দেয়, 'যা ভাগ!' রিক্সাটি দ্রুত চলে যায়, এ যেন শুধু ফুলার রোড নয়- এ শহর ছেড়েই চলে যেতে উন্মুক্ত গতি ভর করে যানটিতে।

টাকাগুলো ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হলে, আবার দেখা হবে বলে ওরা উঠে পড়ে। পা বাড়ায় পথে- যে পথে হুমায়ূন আজাদ হেঁটেছেন বিস্তর।



_______________________________________
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ব্লগার সারওয়ার জামান চন্দন
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০০৮ রাত ৮:৪৫
৪২টি মন্তব্য ৪৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×