'ওরা ঢাকায় নতুন এসেছে', কৌশিক নিশ্চিত সত্য বলার সুরে কথা বলতে থাকে, 'ওদের গায়ে ধানের তুষ এখনো লেগে আছে।' কৌশিকের দৃষ্টি রেখা বরাবর অন্যরাও তাকায়। একটি রিক্সায় পাঁচজনের একটি দল- একজন পুরুষ, একজন নারী, তিনটি শিশু- যাদের দু'জন কোলে, শেষজন পাদানিতে বসে। 'আমাদের মতো ওরাও এ নগরের বাসিন্দা হবে। ভীড় বাড়াবে। এখানে সেখানে মলমূত্র ছিটিয়ে রাখবে', কৌশিক কথা শেষ করে।
'পুরুষটি গায়ের জোরে রিক্সা টানতে টানতে চৌকস রিক্সাওয়ালা হয়ে উঠবে একদিন', কুশল অব্যর্থ ভিবিষ্যতবানী করে। 'আর ওদের মেয়ে দুটো শরীরের আঁশটে গন্ধ দূর না হতেই কারো বাড়ীতে ঝি-গিরি শুরু করবে, গরম খুন্তির ছ্যাঁকা খাবে, আর দুপুরে বাড়ীর গিন্নি ভাতঘুমে গেলে টিভিতে বাংলা ছবি দেখবে, কাঁদবে, আর কাঁদতে কাঁদতে ভালোবাসার কথা ভাববে।' কুশল থামে। কৌশিকের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে টান দেয়। চোখ সরু করে কি যেন ভাবে।
'ছেলেটি ডাস্টবিনের ময়লা কুড়াবে, নিউমার্কেটে মিন্তিগিরি করবে- নিজের ওজনের দ্বিগুন বোঝা টানবে, আর একটু বড় হলেই-' , কমল কথাটি শেষ করেনা। তারপর ভালবাসাহীন হাঁপরে আরো একটু দীর্ঘশ্বাস জমা করতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের গেটের দিকে তাকায়, যেখানে সুবেশী তরুণীরা বুকের কাছে ভারী বই চেপে ধরে পুরুষ সঙ্গীর কোন কথায় হাসিতে ভেঙ্গে পড়ছে।
'মেয়েটিকে আমি চিনি, রোকেয়া হলের।' কুশলের কথায় ওরা তরুনীটিকে আপাদমস্তক মেপে নেয়, ব্যবচ্ছেদ করে। কমল সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, 'এইসব রাজকন্যাগুলো কেন যে একটা করে খাটাশ সাথে নিয়ে ঘোরে!' কথা শেষ হলেও ধোঁয়ার একটি সরু রেখা কমলের নাক থেকে গড়িয়ে নামতে থাকে।
'তুই জেলাস।'
'তুই কি জেলাস না?'
'এইসব রাজকন্যাগুলো কোথায় হারিয়ে যায় একদিন!'
'এদের তুচ্ছ ভ্রুকুটিতে আজকে যারা খুন হচ্ছে, যারা তোর খাটাশ-পুরুষ- তারা রাজকন্যা লাভের পাত্র-দৌড়ে অংশ নেয়না, কেউকাটা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর দায়গ্রস্ত পিতারা মহারাণী বানানোর আশায় রাজকন্যাদের তুলে দেন নতুন কোন বনবিড়ালদের হাতে। সেই সব মহারাণীরা সন্তান জন্ম দেন, উঠতি বয়সী সন্তানের চোখ এড়িয়ে জন্ম-নিয়ন্ত্রনের বড়ি সেবন করেন, ঘরে বসে বসে প্রস্থে বেড়ে ওঠেন, কাজের মেয়েকে খুন্তির ছ্যাঁকা দেন, গাউছিয়ার ভীড় বাড়ান, উপটান মাখেন', কৌশিক থামে। কমল সিগারেটে শেষ টান দেয়, ধোঁয়া ছাড়ে, ফুটপাতের কোণ ঘেঁষে একদলা থুতু ফেলে।
'ওরা কেন আসে এ শহরে?'
'খুন হতে', কমল জবাব দেয়; তারপর কি যেন ভাবে।
'আমরা কেন এসেছি?'
'আমরা চলে যাব।'
কমল হাসে। মাথা ঝাঁকায়। তারপর আবারো জোর দিয়ে ঘোষনা করে, 'শিগগির চলে যাব, কাউকে খুন করে ফেলার আগেই।'
'এ শহরে ঢোকার রাস্তা আছে, বের হওয়ার পথ নেই। আমরাও জঞ্জাল বাড়াব, হাসপাতালের দেয়ালে লেপ্টে থাকা দুষিত কফের মতো ঝুলে থাকব এখানে।'
ওদের গল্পগুলো ধীরে ধীরে বিষন্ন হয়ে ওঠে। এরই এক ফাঁকে টুপ করে রাত নামে ফুলার রোডে। জারুল গাছতলায় অন্ধকার জমাট বাঁধে। কী একটা পাখি ঝটপট শব্দে উড়ে যায়। অন্ধকারে সিগারেটের আগুন ওঠা-নাম করে, হাত বদল হয়। কমল শব্দ করে থুতু ফেলে। দু' একটা রিক্সা চলে যায়। রাস্তার সোডিয়াম-আলোতে ফুলার রোড মরা মাছের আঁশটের মতো ভেসে থাকে। ওরা উঠে পড়ে, স্যান্ডেলগুলো পায়ে গলিয়ে নেয়।
'এই রিক্সা! যাবে?' একটি খালি রিক্সা ওদের কাছে এসে দাঁড়ায়। কুশল লাফ দিয়ে সিটে উঠে বসে। কৌশিক হতভম্ব রিক্সাওয়ালার কণ্ঠা বরাবর একটা ছুরি ধরে। কমল দ্রুতহাতে রিক্সাওয়ালার শার্টের পকেট আর লুঙ্গীর গাঁট থেকে টাকা বের করে আনে, বিড়বিড় করে বলে, 'শালা ফকির'। তারপর ওদের কেউ একজন রিক্সাওয়ালাকে ধমক দেয়, 'যা ভাগ!' রিক্সাটি দ্রুত চলে যায়, এ যেন শুধু ফুলার রোড নয়- এ শহর ছেড়েই চলে যেতে উন্মুক্ত গতি ভর করে যানটিতে।
টাকাগুলো ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হলে, আবার দেখা হবে বলে ওরা উঠে পড়ে। পা বাড়ায় পথে- যে পথে হুমায়ূন আজাদ হেঁটেছেন বিস্তর।
_______________________________________
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ব্লগার সারওয়ার জামান চন্দন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

