নাম বদলানোর নষ্ট খেলা চলছে দেশে। খেলাটি কোন ভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়। কিন্তু এটি নিয়ে খুব বেশী বিচলিত হওয়ারও দেখি না। এটিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দৈনন্দিন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হিসাবে দেখাই ভাল বলে মনে করি। নাম করন বা বদলানোর জন্য এখন পর্যন্ত কোন সরকারের পতন হয়েছেন এটি ভাবার কোন কারন নেই।
সাত্তার সরকার ঢাকা বা কুর্মিটোলা বিমান বন্দরের নাম জিয়ার নামে দিয়ে ছিলেন। তার পতন এ কারনে হয় নাই। এরশাদের আমলেও বিভিন্ন জায়গায় আমরা এরশাদের নাম দেখেছি। তার পতন সেই কারনে হয় নি। তার সময়ে ভৌত কাঠামোর উন্নয়ন হয়েছিল যথেষ্ট, আর এর সাথে যেহেতু টাকা পয়সা জড়িত তাই দূর্নীতিও হয়েছিল। কিন্তু তার পতন হয়েছিল মূলত ভোট নিয়ে ছেলেখেলা করার জন্য।
খালেদা সরকার এসে এরশাদের নাম সবজায়গা থেকে বাদ দিয়েছিল, জিয়া/খালেদার নাম বিভিন্ন জায়গায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল, আর মুজিবের নাম ইতিহাস সহ সবখান থেকে মুছে দিয়েছিল। তখন দেশের ইতিহাস বিষয়ে বলা হত দেশে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, তারপর সবাই ২৪ বছর পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। এই ধারাবাহিকতায় ২৭শে মার্চ জিয়া কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন, নয়মাস যুদ্ধ হয়, আর ১৬ই ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আমার এই বর্ণনা বিশ্বাস না হলে সেই সময়ের সরকারের পক্ষ থেকে বাণীগুলো দেখুন। কিন্তু সার কেলেংকারী আর ভোট কেলেংকারীর কারনে তাদের বিদায় ঘন্টা বেজেছিল।
হাসিনা এসে ইতিহাস সহ সব জায়গায় মুজিব ও আওয়ামীলীগের নাম বসানোর উদ্যেগ নেয়। ইতিহাসের বিষয় ছাড়া অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই এই উদ্যেগ সমুহে বেশ বাড়াবাড়ি ছিল। তবে জিয়ার কবর ঢাকায় রাখা, জিয়ার নামে জাতীয় বিমান বন্দর সহ বিভিন্ন স্থাপনা থাকার রাজনীতির বিপরীতে মুজিবের নাম জাতীয়ভাবে উচ্চারনের রাজনীতির কারনে এই উদ্যেগ সমুহের বেশ কিছুকে খুব বেশী অগ্রহনযোগ্য বলা যায় না। তবে হাসিনা সেই সময় জিয়া বা খালেদার নাম জাতীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য কোন স্থাপনা থেকে বাদ দিয়ে ছিলেন সেটি মনে করতে পারছিনা (কারো জানা থাকলে জানাবেন)। যাই হোক ২০০১ এ হাসিনার পরাজয় অবশ্যই এইসব নামকরন বা বদলের মাধ্যমে ঘটে নি। ঘটেছিল হাজারী, শামীম ওসমান, তাহেরদের কারনে, আর গ্যাস রাজনীতির কারনে।
২০০১ এ খালেদা এসে যে নাম করন/বদল শুরু করেন তা যে কোন ব্যাখ্যার বাইরে। তারা ইতিহাসে মুজিবের জায়গায় জিয়ার নাম বদলিয়ে দেন -- ২৬শে মার্চ জিয়া স্বাধীনতা ঘোষনা দিয়েছে বলে, ধারনকৃত সেই ঘোষনার পরিবর্তন করে "মুজিবের নামে" অংশটুকু বাদ দেন। মুজিবের মৃত্যু দিবসকে পরিবর্তন করে খালেদার জিয়ার জন্মদিবস করেন অবশ্য ক্ষমতায় আসার আগেই। মুজিবের নাম সব জায়গা থেকে বাদ দেয়া হয় -- যমুনা নদীর উপরে সেতু, সম্মেলন কেন্দ্র, নভো থিয়েটার সব জায়গা থেকে তবে চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া। সৈয়দ নজরুলের সেতুর নাম বদলাতে গিয়ে সাইফুর রহমান বলেছিলেন কোথাকার কোন নজরুল, অথচ তিনি ছিলেন বাংলাদেশর প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। সম্মানীয় ব্যক্তিদের প্রতি নিম্নমানের বিদ্বেষ এই সময় থেকেই চরম পর্যায়ে শুরু হয়ে যায়। নাম পরিবর্তনের কৌশল হিসাবে পীর/সাধুদের নামে নাম করন শুরু করা হয়। ইতিহাসে পরিবর্তন রাজনৈতিক হলেও এই সব স্থাপনা পরিবর্তন সবসময়ই একেবারে নিম্নরুচির পরিচয় বহন করে। যাইহোক, ২০০৮ এ খালেদার পরাজয় এই সব কারনে ঘটেনি -- ঘটেছে নির্বাচনকে কলুষিত করার চেষ্টা থেকে আর তার দল/ছেলেদের দূর্নীতির অভিযোগের কারনে।
২০০৮ এ হাসিনা এসে বিএনপির দেখিয়ে দেয়া পথে চলছে। পীর/সাধু দের নাম দিয়ে একই নিম্নমানের কৌশল প্রয়োগ করছে। তবে সাথে স্ববিরোধীতাও করছে। একদিকে জিয়ার নাম বাদ যাচ্ছে বিমান বন্দরের নাম থেকে আর অন্য দিকে মুজিবের নামে দেয়া হচ্ছে নতুন বিমান বন্দরের।
ইতিহাস বিষয়ে মুজিবের নাম পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আদালতকে পাশে পাওয়ায় নাম বদলের খেলায় তারা একটু বেশীই উৎসাহী হয়ে উঠেছেন বলে মনে হয়। দেখা যাক তারা আর কি কি নামকরনের খেলা দেখাতে পারেন। পরের নির্বাচনে যদি হাসিনা পরাজিত হয় সেটি অবশ্যই এই নামকরনের জন্যে হবে না -- এটি নিশ্চিত বলা যায়। অন্য বড় কোন কারন অবশ্যই চলে আসবে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে নামকরন বা বদলানো আমাদের ক্ষমতার পালা বদলে তেমন গুরুত্বপূর্ন নয়। এটির কারনে আমাদের সাধারন জনগনের জীবনে তেমন কোন প্রভাব নেই। সরকারের ভালো মন্দ বিবেচনা হবে অন্য কোন গুরু গম্ভীর বিষয় দিয়ে। এখনা সবাই জানি এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা তাদের মত করে সব নাম করবেন, পরে যারা আসবে তারা আবার খুব সহজেই তাদের পছন্দের নাম দিয়ে নিতে পারবেন। এ নিয়ে তাই উৎকন্ঠার কি আছে? আমাদের অনেককেই দাদা ডাকে এক নামে, নানা ডাকে আরেক নামে। আমাদের প্রতিটা জিনিসের নাম না হয় দুটি করে থাকল -- একটি আওয়ামী লীগের দেয়া আরেকটি বিএনপির দেয়া। তবে সুবিধার্থে আমরা অবশ্য একটি করে নাম্বারও দিয়ে দিতে পারি। নামটি পরিবর্তন হবে কিন্তু নাম্বারটি হবে না।
এখন আসি আমাদের বিএনপি দলীয় যারা এখন নামকরন নিয়ে সরব হয়ে উঠেছেন তাদের কথায়। আমরাও এই নামকরনের দোষে সমান দোষী। কাজেই আমাদের কি এর বিরুদ্ধে বলার মত নৈতিক জোর আদৌ আছে। একদম নেই। আর বাকী যেটুকু উৎকন্ঠা সেটি দুর হতে পারে এই ভেবে যে আমরা ক্ষমতায় আসলে তো আগের মতই আমাদের পছন্দের নাম আবার দিতে পারব। কাজেই এ নিয়ে এত কথা চালাচালির কি আছে, আর জাতীয় পর্যায়ে আন্দোলন করার হুমকি দেয়ারই কি আছে। এই আন্দোলনে জনগনের জীবনযাত্রার কোন উন্নতি সাধিত হবে না।
গ্রহন যোগ্য নামকরন নীতিঃ প্রতিষ্ঠা কালীন কোন নাম বদলানো যাবে না। নতুন কিছু করে তার নাম ইচ্ছেমত দেয়া যাবে।
পরিশেষে আমাদের নামকরন বিষয়ে একটি তুচ্ছ ঘটনা বলি। নতুন নতুন কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখে এ রকম যে কেউ প্রতিটি চলকের নাম নিজের নাম বা প্রেমিকার নাম বা কোন পছন্দের নামে দিতে পছন্দ করে। বাঙ্গালীর নাম প্রীতি একটু বেশীই।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সকাল ১০:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



