১। একজন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক তার অবসরের পরে কি করবেন ভাবছেন। তো আমাকে তিনি বললেন পলাশীতে নির্মীয়মান নতুন বাজারে তিনি দুটো মুদি দোকান দিতে চান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে দোকান পাওয়া নিশ্চয় তার জন্য সহজ হবে। আমি শুনে হতভম্ব। এরপর আমার কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িচালক হিসাবে কর্মরত একজনের সাথে। তিনি অদুরভবিষ্যতে কি করতে চাইছেন, বললেন তিনিও একইরকম ভাবছেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য হিসাবে তারও একটি দোকান পাওয়া সহজ হবে, তিনি সেই চেষ্টাই করছেন। এরপর পলাশী বাজারে একজন পানের দোকানদার যিনি চতুর্থশ্রেনীর কর্মচারী তার সাথে কথা হল। তিনিও ভাবছেন একই কথা।
২। আমার পরিচিত একজন শিক্ষাছুটি শেষে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে তার চাকুরীতে যোগ দিয়েছেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম বিদেশ কেমন লাগল, আর দেশে ফিরে কেমন লাগছে। উত্তর ছিল না বিদেশে চিল্লা দিতে পারতাম না। ছুটি দিতে চায় না। ক্লাস নিব আর একটু ধর্মের কাজ করব। বাংলাদেশে ছাড়া এই সুযোগ আর কোথায় পাব। তাই ফিরে এলাম। এখন ভালো লাগছে। কোন টেনশন নাই। চাইলে প্রতি সপ্তাহে কাকরাইল যেতে পারি, প্রতি সন্ধ্যায় মসজিদে আলোচনায় যোগ দিতে পারি। ছুটি নিয়া তেমন ঝামেলা নাই। আর সময়ে অসময়ে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ বন্ধই থাকে।
৩। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিদেশ ফেরৎ ডিগ্রীধারী শিক্ষকদের বেশ কিছু এখন শেয়ার ব্যবসা করেন। ভাববেন না তারা পেটে ভাতের জন্য করছেন (তা হলে যে কোন কিছু করাই গ্রহনযোগ্য), করছেন তাদের জমে যাওয়া টাকা থেকে কিভাবে বাচ্চা বের করা যায় তার জন্য। কেউ করছেন হাঁসমুরগীর খামার, কেউ করছেন মৌ-মাছির খামার। কেউ ভাবছেন কি করে একটা জমি কেনা যায় যেটার দাম ৫ বছর পরে কয়েক গুন হবে। উপরি উপার্জন। কেউ কেউ রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য শিক্ষক সমিতির কোন পদ পাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিতরেই কোন না কোন লাভজনক পদ বাগানো অথবা সরকারের নেকনজরে বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্তি।
৪। গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়া ইদানিং লাভজনক হয়েছে। সকাল বেলা ক্ষেতে যাওয়া যায় পাজামা-পাঞ্জাবী-ছাতা ব্যাগে ভরে। ক্ষেতের কাজ শেষে সাড়ে নয়টায় পুকুরে গোসল দিয়ে সাথে আনা খাবার খেয়ে দশটায় স্কুলে হাজির। অ আ ক খ পড়াতে তো প্রস্তুতি লাগেনা, এমনকি ৫ম শ্রেনীর গণিত পড়াতেও প্রস্তুতি লাগে না। বিকালে স্কুল শেষ হলে মুদি দোকান। কেউ গ্রাম পর্যায়ের নেতা হওয়ার চেষ্টায় থাকেন। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হতে পারলেও লাভ। অবসরের সময়ে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যাবে একসাথে। সবদিক দিয়ে লাভ। এমন লাভজনক অার সুখের চাকরি অার দ্বিতীয়টি নেই।
৫। আমার জানামতে বাংলাদেশ সরকার বার্ষিক প্রায় ১৫ কোটির মত গবেষনা বরাদ্দ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মাধ্যমেও কিছু টাকা বরাদ্দ থাকে। কিন্তু প্রতিবছর এইটাকা অব্যবহৃত থাকে। কেউ প্রকল্পও জমা দেয় না, টাকাও নেয় না, কাজও করে না। তবে একথা স্বীকার করছি, এই টাকায় নিযুক্ত গবেষক কোন ডিগ্রী পাবেন না বলে স্নাতকোত্তর পর্বের কোন ছাত্রকে এখানে নিয়োগ করা যায় না। আমাদের শিক্ষকমহোদয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগন যদি এই নিয়ম পরিবর্তনে সচেষ্ট হোন তাহলে এটা পরিবর্তন করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এদিকে কারও গরজ নেই। সরকারের তরফ থেকে দেখলে বিষয়টি কিছুটা এরকম যে ১৫ কোটিই তো খরচ হয়না, আর দিয়ে লাভ কি?
৬। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জীবনের লক্ষ্য ও চাহিদা যদি অর্থ উপার্জন হয় তাহলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে রাস্তায় নামা উচিৎ। সেখ সাদী বলেছেন "অর্থ উপার্জনের জন্য পড়াশোনার দরকার হয় না, যদি হত তাহলে মুর্খরা না খেয়ে থাকত।" বাংলাদেশের বড় বড় ধনী ব্যক্তি যাদের অনেকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্টিজের মালিক তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায় মুর্খ আর প্রথম জীবনে বিড়ি বানাতেন, পান বিক্রি করতেন, অথবা কুলি ছিলেন। অর্থ উপার্জন যাদের জীবনের মুল লক্ষ্য তারা আসলে ব্যবসা বা অন্যজাতীয় কাজে যেতে পারেন। যারা সত্যি সত্যি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমানের জীবন যাপন করছেন তাদেরকে কোনভাবে আঘাত করে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ থাকল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

