আমরা একটি সৌদি বিয়ের দাওয়াত পেলাম।দাওয়াতের কথা শুনে আমার স্ত্রীতো ঘাবড়ে গেল কারন সে ওখানে একাকী করবেটা কি!সেতো আরবী কথা বলাই শিখেনি।আর আমিও স্ত্রীসহ দাওয়াত পেয়ে ভাবনায় পড়লাম কারন ওখানে গিয়ে আমাদেরকে কি করতে হবে না হবে,আমিও খুব একটা জানিনা !
আমার এক পাকিস্তানী কলিগ আমাকে শান্ত করলো এই বলে যে তিনিও ঐ দাওয়াতে স্ত্রীসহ যাচ্ছে।তাই আমার স্ত্রীর সেখানে গিয়ে একাকীত্বের ঝামেলা আর রইলোনা।আর আমি জিজ্ঞেস করে জানলাম তিনি খালি হাতেই যাবেন।কারন এখানে উপহার দেয়ার নিয়ম একটু ভিন্ন।যেমন নিকট আত্মীয়রা আগেরদিন বাড়ীতে গিয়ে বিভিন্ন উপহার দিয়ে আসবে।আর কেঊ কেউ নগদ টাকাও দেবে তবে খুবই গোপনে মুঠো ভরে। যাতে অন্য কারো জানার উপায় না থাকে কে কত দিল!
বিয়ের দিন রাত ন’টায় আমরা নির্দিস্ট কমিউনিটি সেন্টারে পৌছলাম।সারি সারি দামী গাড়ীতে বিয়ের সেন্টারটি ভড়ে গিয়েছে,এক প্রান্তের গেট দিয়ে মহিলারা ঢুকছেন আর অন্য প্রান্তের গেট দিয়ে পুরুষরা।আমি ওদেরকে মহিলাদের গেটে পৌছে দিয়ে আমাদের গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম।দেখলাম বারান্দাতেই বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে অভ্যাগতদের স্বাগত জানাতে।আমাকে যিনি চেনেন তিনি আমাকে মজলিশ রুমের রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেলেন।সে এক বিশাল হল রুম একদম সিনেমা হলের মতো সারি সারি সোফাতে লোকজন বসে গল্প গুজব করছে আর শেষ প্রান্তে স্টেজ় বানিয়ে বর এবং তার বাবা-চাচারা সারিবদ্ভভাবে বসে আছেন।
আমি অন্যান্য আগতদের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে বরের নিকট গেলাম।লক্ষ্য করলাম আমার আগের লোকজন সকলের সঙ্গে হাত ও নাক মিলিয়ে কুশল বিনিময় করছেন আর বর অর্থাৎ জামাইকে বিয়ে করার জন্য শুভেচ্ছা (মবরুক) জানাচ্ছেন।দেখাদেখি আমিও তাই করলাম তবে যেহেতু জামাই আমাকে চিনতো তাই সে নিজেই অন্যান্য মুরুব্বীদেরকে আমার পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছিল।জামাইয়ের সঙ্গে এক সারিতে বসা প্রায় বারোজনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ফিরে গেলাম সারিবদ্ব আসনে।
সেখানে বসার পর পরই আমাদের মুখে শরীরে ধুপের ধোয়া দিয়ে গেলেন এক খাদেম। তারপর এলো গাহওয়া(আরবী কফি),চা এবং খেজুর।এগুলো টুকটাক মুখে দিয়ে সবাই গল্প করে যাচ্ছে।ছোট ছেলেরা দৌড়াদৌড়ি করে খেলা ও দুস্টামী করে যাচ্ছিল ।তাদের কেউ কেউ আবার কাধে বেল্ট লাগানো আসল পিস্টল নিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে।জানলাম এটাও তাদের জাতীয় পোষাক।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই কক্ষে বড় তো দুরের কথা কোন কোলের মেয়ে শিগুও দেখা গেলনা।
বাইরে তখন যুবক বয়সী ছেলেরা লম্বা তরবারী নিয়ে গোল হয়ে হেলেদুলে গান গাইছে আর কেউ কেউ তরবারী উচু করে নেচে যাচ্ছে।
এভাবে বেশ কিছুক্ষন চলার পর এক মুরুব্বী সবাইকে পাশের রুমে খাবারের জন্য আমন্ত্রন জানাতেই সবাই হুরমুর করে ছুটলেন খাবারের রুমে ।ওদিকে জামাইও পেছনের দরজা দিয়ে কনের সঙ্গে একত্রে বসে খাওয়ার জন্য চলে গেলেন।আর আমরাও ঊঠে পাশের রুমে গেলাম।গিয়ে দেখলাম মেঝেতে বড় বড় গোল প্লেটে দুম্বা এবং উটের বিড়িয়ানী (লাহাম মান্দি),সাথে সালাদ,পানি,বিভিন্ন ফল ও পেপসি সাজিয়ে রেখেছ।এক এক প্লেটে প্রায় চার থেকে ছয় জন করে বসা যায়।আমি পাকিস্তানী কলিগ ছেলে-পেলেসহ সাত জন ছিলাম।একটু বড় মাংস দেখে এক প্লেটে বসে গেলাম। এককোয়ার্টার (রোবা)দুম্বা ছিল আমাদের প্লেটে সবাই মিলে আমরা খেয়ে শেষ করতে পারলামনা।লক্ষ্য করলাম প্রায় সবাই আধাপ্লেটও শেষ না করে উঠে যাচ্ছে।আমরাও উঠে ওয়াশরুমে গেলাম।ফিরে এসে আবারো শুরু করলাম হরেক রকমের আরবীয় মিস্টি, কেক,চকোলেট ও আইসক্রীম খাওয়ার পর্ব।
এরই মধ্যে লক্ষ্য করলাম অনেকেই চলে যাওয়া শুরু করেছেন।আমিও চলে যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার আমার স্ত্রীকে মোবাইল করলাম ।কিন্তু সে রিসিভ না করায় আমি একটু চিন্তিত হয়েই হোস্টের নিকট গেলাম। তিনি বললেন মহিলাদের এখনো খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করেননি।আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম তাহলে সবাই যে চলে যাচ্ছে?তিনি হেসে বললেন তারা আবারো ফিরে আসবে তাদের ফ্যামিলীদের নিয়ে যেতে।আর আমি কথা বলতে চাইলে মহিলাদের গেটে গিয়ে মাইক দিয়ে নাম ডাকতে পারি।কারন ভেতরে কোন মোবাইল নিয়ে যেতে নিষেধ আছে।আমি বুঝলামনা কেন মোবাইল নিয়ে যেতে নিষেধ আছে, যতোক্ষননা আমার স্ত্রী আমার নিকট ফিরে আসলেন।
রাত প্রায় দেড়টার দিকে আমি মহিলাদের গেটে গিয়ে মাইক্রফোন হাতে নিয়ে ওর নাম ধরে ডাক দিলাম।তখন আরো অনেকেই ডাকাডাকি করছিলেন।ওদিকে বাইরে থেকে আমরা মহিলাদের গানের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।।আমার স্ত্রী বাইরে এসেই মিটিমটি হাসতে শুরু করলো,ব্যাপার বুজলামনা।সঙ্গে বাচ্চা ছিল তাই ঘটনা জানতে অপেক্ষা করতে হলো বাড়ী পৌছা পর্যন্ত।
বাড়ীতে ফিরেই আমার স্ত্রী বলতে শুরু করলো ওর অভিজ্ঞতার কথা।অন্দর মহলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরাযুক্ত সব মোবাইল ফোনগুলো সিকিঊরিটিতে থাকা মহিলারা নাকি নিয়ে নেয় যাতে কেউ সেখানকার ছবি তুলে না নেয়! জিজ্ঞেস করলাম কেন ছবি তুলতে অসুবিদা কোথায় ? সে মুচকি হেসে বললো,আরবীয় মেয়েদের যা ড্রেস দেখেছে তা ছিল কল্পনাতীত রকমের স্বল্প ,তাদের অর্ধনগ্ন বুক,বগল ও পায়ের বেশিরভাগই অংশ দেখে মেয়ে হয়েও নাকি তাদের লজ্জা লাগছিল।তবে কোন কোন মহিলা মুখে নেকাব দিয়েও ছিল বটে।
ভেতরে আমাদের মতো লম্বা সারিতে তাদের না বসিয়ে গোল টেবিলের ব্যাবস্থা ছিল।অন্যদিকে স্টেজ বানিয়ে ভাড়াটে গায়িকা দিয়ে গান শুনিয়েছে আর আত্মীয় মেয়েরা স্টেজে উঠে হাত উঠিয়ে পালাক্রমে নেচেছে আর গেয়েছে।ওদিকে খাবারে ব্যবস্থা ছিল বুফে স্টাইলে।সারি সারি সাজানো মিস্টি,কেক,চকোলেট,আইস্ক্রীম,নানান রকম ফল,জুস প্রায় ৬০টি পদের ছিল প্রথম থেকেই।তাই সেখানে প্রবেসের পর থেকেই যে যার ইচ্ছে মতো খাবার উঠিয়ে নিয়ে খেয়েছে।যা আমাদের পুরষদের ওখানে এতোটা ব্যপক খাবার ছিলনা! এছাড়া মুল খাবারের আয়োজনেও নাকি সব মিলিয়ে ৩০টির মতো আইটেম ছিল যার নামই সে জানেনা!
কনের রুম ছিল ভিন্নস্থানে।সে ফুল দিয়ে সাজানো খাটে বসে ছিল একাকী একটি ধবধবে সাদা পোষাকে।আর সবাই তাকেও শুভেচ্ছা জানিয়েছে।তবে খাবারের সময় জামাই এসে গেলে সেই রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়।আর খাবারের পরপরই আমার স্ত্রী চলে আসে।তাই শেষ পর্যন্ত আর কি কি হয়ে ছিল আমরা আর জানতে পারলামনা।
তবে শুনেছি ঐ পার্টি হল থেকে নুতন দম্পতি তাদের বাড়ীতে না গিয়ে সোজা হোটেলে উঠবে।
পুনশ্চঃ এখানে ব্যবহার করা ছবিগুলো নেট থেকে নেয়া।
আগে কিছু লেখা পর্ব
Click This Link
Click This Link
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

