১ম পর্ব
Click This Link
আগের পর্বে আমি আমাদের চলমান রাজনৈতিক সমস্যার উপর সামান্য আলোচনা করেছি, আর বাকি সমস্যাগুলোকে পাঠকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে নিতে আবেদন করেছি। এবার আসছি সমস্যার সমাধানের উপর আমার ক্ষুদ্র-জ্ঞান নিয়ে কিছু আলোকপাত করার জন্য।
দেশবাসীকে বর্তমান অবস্থা থেকে উদ্ধার করার একমাত্র উপায় হচ্ছে গতানুগতিক রাজনীতির উর্ধে উঠে সম্পূর্ণ নতুন ধ্যান-ধারণা নিয়ে আধুনিক যুগের উপযোগী একটি নতুন গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা। আর তা করতে হবে যারা বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ডের সাথে সরাসরি অংশীদার নন এমন ধরনের সৎ, শিক্ষিত এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমিক সেই নীরব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যারা দেশের চলমান ধ্বংসাত্বক রাজনীতির একটা গুণগত পরিবর্তন চান, কিন্তু কোনো কিছু করার উপায় দেখছেন না, তাদেরকে সংগঠিত করে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে দাঁড় করিয়ে ৷
আমাদের বুদ্ধিজীবিরা যারা খবরের কাগজের অনেক সাদা পাতাকে কালো করে, গল্প কবিতা লিখে কিংবা সেমিনার-কনফারেন্স কক্ষের চেয়ার-টেবিলকে গরম করেই মনে করেন যে, দেশের প্রতি তাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব শেষ, তাদেরকে বুঝতে এবং বুঝাতে হবে যে তাদের আসল কাজ এখনো বাকি আছে ৷ দেশের মানুষকে এই মরণ-মুখী রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত কারো বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই ৷
অনেকে ড. ইউনুস-এর উদাহরণ টেনে এনে বলেন যে, traditional রাজনীতিবিদ ছাড়া কারো পক্ষে রাজনৈতিক দল গঠন করা সম্ভব নয় ৷ আমি একথা মানতে নারাজ, কারণ ড. ইউনুস-এর উদ্দ্যোগে পদ্ধতিগত ভুল ছিল - গণসংযোগ ছাড়া এক ব্যক্তির পক্ষে একা শুধু ঢাকায় প্রেস কনফারেন্স এর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা যে সফল হবেনা তা আগেই তাঁর বুঝা উচিত ছিল৷ তাছাড়া তিনি দল গঠনের জন্য সত্যিকার অর্থে তেমন কোনো শ্রম দেননি এবং রাজনৈতিক সংকল্পের দৃঢ়তা ও তাঁর ছিলো বলে মনে হয় না৷
সুতরাং একটি সৎ, পরিশ্রমী এবং নিষ্ঠাবান গ্রুপ যদি অসহায় জনগনের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় এবং তাদেরকে ভবিষ্যতের মুক্তির পথ দেখাতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে তাহলে নতুন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উদ্দ্যোগ সফল না হবার কারণ নেই ৷ স্বীকার করছি, এটি একটি অতি কঠিন কাজ, তবে অসম্ভব নয়, বিশেষ করে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণ যেহেতু মারাত্মকভাবে অতিষ্ঠ এবং অসন্তুষ্ট ৷
তবে শুধু দেশের আভ্যন্তরীণ কুন্দলকে পূঁজি করেই একটি দল দাড়াতে কিংবা টিকে থাকতে পারবে না; এজন্য দরকার একটা যুগান্তকারী দূরদৃষ্টি (ভিশন) ৷ কিন্তু বিদেশী, আমদানিকৃত মতবাদ নিয়ে যুগ যুগ ধরে যেসব নামেমাত্র দল রাজনীতির অঙ্গনে চিঁড়া ভাজছে তাদেরকে এবং তাদের মতবাদকে এড়িয়ে চলাই উচিত হবে, বিশেষ করে আগে যারা বিভিন্ন দলের লেবেল-এ জনগনের আস্থা অর্জনে বিফল হয়েছে তাদেরকে প্রথমে দূরে রাখতে হবে ৷ আর নীল-সাদা প্যানেলের বুদ্ধিজীবিরা এপথে নিজেরাই আসবে না - তাতো ভালোই হলো ৷ রাজনীতিতে চেনা মুখগুলোর তো আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা কিংবা আবেদন কোনটাই জনগনের কাছে নেই। তাই একেবারে নতুন মুখ এবং খালি স্লেট নিয়েই শুরু করা ভালো হবে।
দেশের ভেতর যেহেতু সমস্যার অন্ত নেই, তাই জনগনের মনে লাগার মত রাজনৈতিক ইস্যুর ও শেষ নেই, যেগুলোকে সামনে রেখে শক্তিশালী রাজনৈতিক কার্যক্রমের উদ্দ্যোগ নেয়া সম্ভব। দেশের মানুষের অন্ন-বস্ত্র-চিকৎসা-বাসস্থান-শিক্ষা-কর্মসংস্থানের ন্যুনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের বাস্তব, বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি দিয়ে এর শুরু হতে পারে।
যে কোনো উন্নয়নের প্রথম শর্ত যে একটি নির্ভরযোগ্য পর্যাপ্ত বিদ্যুতের সরবরাহ, এটা বুঝতে এবং অর্জন করতে একটি জাতির চল্লিশ বছর লাগার কথা নয়, একথা ফলাও করে সামনে আনতে হবে। তাছাড়া একদিকে আমরা বন্যা-প্লাবনের জলে ডুবে মরছি, আর অন্যদিকে চাষাবাদের পানির অভাব, এমনকি খাবারের বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ দিতে সরকার ব্যর্থ কেন, একথা মানুষকে বুঝাতে হবে। শিক্ষা যে একটি জাতির মেরুদন্ড সেকথা আমরা ছোটবেলা থেকে শুধু পুস্তকের পাতায় দেখে আসছি আর নেতাদের কপট ভাষণে শুনতে পাই, কিন্তু জনগনের হাজার হাজার কোটি টাকা খরছ করে সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেখাপড়ার চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্য হাসিলের মাধ্যম হিসাবেই কেন গড়ে তোলা হচ্ছে, সে প্রশ্ন তুলতে হবে জোরালোভাবে।
চীন, মালয়েশিয়া ভারতের মত বেশি মূল্যের আধুনিক পণ্য-সামগ্রীর উৎপাদনশীল কলকারখানা গড়ে না তুলে আমরা শুধু সেলাইয়ের শ্রম বিক্রি করেই তৃপ্ত কেন, এশিয়ার অনেক দেশ যেখানে উচুমানের বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কম্পুটার বিজ্ঞানী তৈরী করে তাদেরকে দিয়ে একাধারে দেশের ভেতর আন্তর্জাতিক মানের লাভজনক সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে, আর অন্যদিকে অতিরিক্ত দক্ষ জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ব্যবস্থা করছে, সেখানে আমরা কেন শুধু অশিক্ষিত জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়েই মনে করি বাহ্ অনেক পেলাম তো?
গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে বেশি কিছু চিন্তা করার সাহস, ধৈর্য্য, দীর্ঘসুত্রের কোনো পরিকল্পনা কিংবা প্রগ্ঘা আমাদের নেই কেন; জাতি হিসাবে আমাদের অবস্থা অনেকটা দিন এনে দিন খাওয়ার মত কেন; আমরা এই দরিদ্র মানসিকতাকে ঝেড়ে ফেলে কিছু করার উদ্দ্যোগ নিই না কেন; আজ থেকে দশ, বিশ, পঞ্চাশ বছর পর আমরা উন্নয়নের কোন পর্যায়ে থাকতে চাই তার দীর্ঘ-মেয়াদী পরিকল্পনা ও দৃষ্টি-ভঙ্গি আমরা গড়ে তুলি না কেন; আমদের প্রশাসনে দক্ষতা অর্জন এবং দুর্নীতি দমনে একাগ্রতা নেই কেন; আমদের রাজনীতির অঙ্গনে পেশা-শক্তি আর দুর্বৃত্তায়নের এত দাপট কেন; সামাজিক সন্ত্রাস নির্মূলে সদিচ্ছার অভাব কেন; শহর-বন্দরে মানুষের যান-মালের নিরপত্তার নিশ্চয়তা নেই কেন; আইনের শাসন শুধু স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ কেন; রাষ্ট্রীয়-যন্ত্রের হাতে মানুষের নিপীড়ন কেন; আইনের প্রয়োগে সরকারী দলের লোক, সাধারণ নিরীহ এবং অন্যদের মাঝে তফাৎ কেন; মৌলিক মানবাধিকার লাঞ্চিত কেন; নারী-নির্যাতন বন্ধের জন্য কার্যকরি পদক্ষেপ নেই কেন?
গণতন্ত্র শুধু হাক-ডাক করে একটি নির্বাচন করার পরেই মৃত-প্রায় কেন? আর সর্বোপরি দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সরকার প্রধানের পদ শুধু দুই পরিবারের মধ্যে অনিবার্য্যভাবে নির্ধারিত কেন ? আমরা পরিবারতন্ত্রকে পিছু হটিয়ে সত্যিকারের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্যতম নেতৃত্বকে দেশ চালানোর সুযোগ না দেয়ার কারণে যে রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্য সকল সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, সে যুক্তি অতি জোরালোভাবে উত্থাপন কতে হবে - একেবারে আঙ্গুলে গুনে গুনে এক, দুই, তিন, এভাবে বানান করে করে সাধারণের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে। এই পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে যে আমদের সকল সমস্যার পথ খোলাসা হবে, এবং জাতি হিসাবে নির্মোহ, যোগ্য নেতৃত্ব যে আমাদেরকে উন্নয়নের পথে অগ্রসর করতে পারবে এই চিন্তা নাগরিকদের মনে ভালোভাবে ঢুকাতে পারলেই আমাদের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক মুক্তি সম্ভব।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অতি দূরদর্শী ও দুঃসাহসিক নেতৃত্ব দিয়ে এবং অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে ভৌগলিকভাবে আমাদেরকে স্বাধীন করে, একটি মানচিত্র ও পতাকার গৌরবে গৌরবান্বিত করে দেশবাসীর কাছে অমর হয়ে আছেন এবং চিরদিন থাকবেন। আর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কেন এবং কিভাবে ক্ষমতায় আসলেন সেই বিতর্ক নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা না করে শুধু এটুকুই বলব যে, তিনি গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত হিসাবে আবার আমাদের হারানো বহু-দলীয় গণতন্ত্রের পথ খুলে দিয়ে এবং ৭২-৭৫ সময়ের শ্বাস-রুন্ধকর, হতাশাব্যঞ্জক রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে দেশবাসীকে টেনে তুলে জাতির কাছে চিরদিন সম্মানের আসনে আসীন হয়ে থাকবেন।
এখন দেশ গড়ার বাকি কাজটুকু নিঃস্বার্থভাবে আমাদেরকেই করতে হবে প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুসারে, যেন এদেশের প্রতিটি সন্তান জীবনে প্রতিষ্ঠালাভের সুযোগ পায়, যেন তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন শিশুকালে অথবা যৌবনে ঝরে না যায়, যেন কারো করুনার পত্র না হয়ে নিজ যোগ্যতা বলে সে সমাজে তার স্থান করে নিতে পারে, যেন কোনো কৃত্রিম দেয়াল তাকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌছতে কিংবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে (প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট) আসীন হতে কোনো বাধার সৃষ্টি করতে না পারে। এটা জাতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা, এবং তা এড়িয়ে যাওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব-বোধের অভাবই প্রমান করবে।
শেষ কথা: রাজনৈতিক বক্তব্য (message) যত চৌকস-ই হোক না কেন, বক্তা (নেতা) যদি charismatic না হোন এবং জনগনের মনে একটি দূর্বার আলোড়ন সৃষ্টি করতে না পারেন তাহলে সবকিছুই মাঠে মারা যাবে - জনগণ তা কানে নেবেনা - এটা রাজনীতির বাস্তব, কঠিন সত্য। তাই সে নেতা কবে আসবে, কোথায় পাবো, এখন সে চেষ্টাই আমদেরকে চালাতে হবে। অবশ্য একাধিক নেতা পাওয়া গেলে আরো ভালো হয়। আর হ্যাঁ, এই রাজনৈতিক উদ্যোগের সাথে জড়িত সবাই হবেন একেকজন নেতা, তাই সবাইকেই নেতার মত মাথা উঁচু করে সামনে এগূতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে কাঁধে তুলে। এরকম সম্মিলিত নেতৃত্বই এখন সময়ের প্রয়োজন।
অনেকে এরকম চিন্তাকে কল্পনা-প্রসূত ইউটোপিয়া বলে হাসবে; হাসুক, তাতে ভ্রুক্ষেপ করার কারণ নেই। আর কিছু না হলেও জনগনকে সুস্থ রাজনীতির পথে কিছুটা সচেতন করতে পারলেও তো একটা মস্ত বড় কাজ হলো। চেষ্টা না করেই পরাজয় বরণ করার চেয়ে চেষ্টা করা অনেক শ্রেয়, ফল যাই হোক না কেন।
[আপনারা অনেক কষ্ট করে আমার এই এলোপাথাড়ি লেখার প্রতি যে নজর দিয়েছেন, সেজন্য আপনাদেরকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ। বাংলা type করা আমার পক্ষে কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ ব্যাপার ---- তাই হয়ত বানান এবং ভাষার অনেক ভুল আছে; ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন সে আশা করছি। --- আবারো ধন্যবাদ --- ]
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



