আমার প্রিয় পোস্ট

নাম শুনেই যার প্রেমে পড়ি

এবারের ঈদের তিন অনুষঙ্গ : মায়ের বেঁচে থাকা...বৃষ্টি...ব্লগিং...

১৬ ই অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১১:৩৯

শেয়ার করুন:                   Facebook

ঈদ নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনো পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছা কেন হলো তা বলতে পারব না। তবে এবারের ঈদটা যে এতটা নির্ভার আর আনন্দে পালন করতে পারব তা অন্তত একমাস আগেও চিন্তা করতে পারিনি। জুলাই এর কোন এক সন্ধ্যায় লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. মবিন খান জানিয়ে দিয়েছিলেন মায়ের অসুখ ভালো হবার নয়, খুবই জটিলতর অবস্থায় -যেকোনো দিনই মারা যেতে পারেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান নাকি এখনো এই রোগের কোনো কার্যকর কিছু আবিষ্কার করতে পারেনি। সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিয়ে যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায় আরকি। ক্রমাগত পাড় ভাঙার এক অনুভূতি টের পাচ্ছিলাম তখন। গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছিল না। লোমশ দুটি হাত যেন শক্ত করে আমার টুটি চেপে ধরেছিল। বাষ্পরুদ্ধ হয়ে উঠেছিল দু'চোখ। ডাক্তারের অপারগতার কথা শুনেও দীর্ঘ দেড়মাস ক্লিনিকে রেখে চিকিৎসা চলল। ক্রমাগত রাতজাগা, ক্লিনিক-শাহবাগ-মিটফোর্ট-নারায়ণগঞ্জ দৌড়াদৌড়ি; বারডেম, ঢাকা-চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পরিচিত ডাক্তারদের সাথে নানান শলা-পরামর্শ চলছিল নিয়মিত। ক্লিনিকে আমরা যে কেবিনের নিয়েছি তার আশপাশের কেবিন-ওয়ার্ডে প্রায় প্রতিদিনই একই সমস্যাক্রান্ত (লিভার সিরোসিস) রোগী মরছে একটা-দুইটা। হতাশা যেন গ্রাস করে ফেলতে চাইছিল আমাদের সকলকে। মাকে আর বেশিদিন দুনিয়াতে ধরে রাখতে পারব না এমন নিশ্চিত ধরে নিয়েও পরিবারের সবার মনোভাব একই রকম, যতটুকু সামর্থ আছে তার সবটা দিয়েই আমরা চেষ্টা করে যাব। মায়ের বেঁচে থাকাকে যদি একমূহুর্তও বাড়ানোর কোনো উপায় থাকে আমরা তাই করব। না, আমরা বাবা-ভাই-বোনেরা কষ্ট চেপে রেখেছি বুকের মাঝে, ভেঙে পরিনি, মাঝে মাঝে সামান্য মচকালেও আবার সোজা হয়েছি। বা বলতে পারেন আমাদের চারপাশের মানুষজনই আমাদের ভেঙে পড়তে দেয়নি। আমার মা অতি সাধারণ একজন মানুষ। ছোট একটা সরকারি চাকুরির কল্যাণে এলাকার প্রতিটি পরিবারের সাথেই ছিল তার ঘনিষ্ট যোগাযোগ। সুস্থ থাকাকালীন মা প্রায়ই বলতেন- "আমি মারা গেলে যখন মৃত্যূ সংবাদ মাইকিং করবি, তখন দেখবি এত মানুষজন আসব যে বাড়িতে জায়গা দিতে পারবি না"। মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে আশপাশসহ কত দূর-দূরান্ত থেকে কত নারী-পুরুষ বাড়িতে আসত প্রতিদিন খোঁজ নিতে! নিজের বাড়িতে-মসজিদে যে যার মত কত খতম, দোয়া-মাহফিলের আয়াজন করেছে! মায়ের সুস্থতা কামনা করে কত জন কত কিছু মানত করে রেখেছে! নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে কত জন কত গাছগাছড়ার ওষুদ নিয়ে এসেছে দূর-দূরান্ত থেকে! জেলে পাড়ার যে লক্ষীর মা পূজো এলেই তার খালার (মাকে তিনি খালা বলে ডাকতেন) কাছে ছুঁটে আসতেন দাওয়াত দিতে আর কিছু সাহায্যের জন্য উনিও খোঁজ নিতে আসতেন বয়সের ভার টানতে টানতে। রাত জেগে ভোরে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন এলাকার দোকানদার, দিনমজুর সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার পরিচিত লোকজনকে মায়ের সর্বশেষ অবস্থা জানাতে জানাতে বাড়ি পৌঁছোতে হত। মায়ের প্রতি মানুষজনের ভালবাসা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি, সাহস পেয়েছি, লড়ে যাবার প্রেরণা পেয়েছি। আমার চাকমা, মারমা, মান্দি, মাংতাসহ বিভিন্ন আদিবাসী-বাঙালি বন্ধু-বান্ধবদের নিয়মিত যোগাযোগ নিজেকে কখনো একা মনে হতে দেয়নি। বরং এত এত মানুষের ভালবাসাই হয়ত মাকে ফিরিয়ে আনবে -একটা বিশ্বাস যেন তিল তিল করে বেড়ে উঠছিল নিজের ভেতরের কোন এক জায়গায়। হ্যাঁ, সকল মানুষের ভালবাসাকে পুঁজি করেই মা ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। নিষেধ করা সত্ত্বেও অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রতিবারের ন্যায় এবারও ঈদ সকালে আমার ঘুম ভাঙার আগেই সেমাই সহ অন্যান্য খাবার-দাবার তৈরি করে ফেলেছেন। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের আবহের মধ্যেই গোসল সেরে বরাবরে ন্যায় প্রথমে মাকে সালাম করলাম। সালামি দিল মা। সেমাই দিল প্লেটে করে। জুলাইয়ের এক সন্ধ্যায় যেভাবে পাড় ভাঙার কষ্ট উপলব্ধি করেছিলাম যেন তার কয়েক গুণিতক বিপরীত ভালোলাগাটা টের পেলাম এবার। হ্যাঁ, মা বেঁচে আছেন, মায়ের রান্না করা সেমাই খাচ্ছি ঈদের সকালে-এর চাইতে বড় ঈদ উপহার কিছু হতে পারে কিনা এর আগে কখনো এভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। মার দিকে তাকিয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। আনন্দে কান্না পাচ্ছিল। চোখ ফিরিয়ে নিলাম। মা জানে ভাইবোনদের মধ্যে আমি একটু শক্ত টাইপের মানুষ। কারণ মা তো দেখে নি ডাক্তারের কথা শুনে বাড়ি ফেরার পর তার এই ছেলেকে বাচ্চাদের মত হাউমাউ করে কাঁদতে। সেমাই খেয়ে আমার রুমে চলে এলাম। বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছিল। যাহোক, কম্পিউটার অন করে সা.হো,ইন ব্লগে ঢুকে পড়লাম। সাথে আরো কয়েকটি সাইটে। এর আগে ঈদের দিন গুলোতে সাধারণত বইপড়ে আর খাওয়া-দাওয়ার ভেতরেই আমার দিন পার হতো; মাঝে মাঝে ঘর থেকে বেরিয়ে মজা লুটতাম পিচ্চিদের দলবেঁধে আনন্দ প্রকাশের বিচিত্র সব ধরণ দেখে। যদিও বৃষ্টি এবার তাদের কিছুটা সময় ঘরবন্দী করে রেখেছে। বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দ কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছিল তাদের চিরনতুন-চিরসবুজ উচ্ছাসকে। তো, বৃষ্টিস্নাত ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা পোস্ট করলাম ব্লগে। নিজের পোস্টের মন্তব্যের প্রতিমন্তব্য, অন্যের পোষ্টে মনখোলে মন্তব্য করতে লাগলাম একের পর এক। ঈদের সারাদিন ব্লগার খুব বেশি ছিলেন না, লগডইন ছিলেন গড়ে ৮/১০ জনের মত করে। পোস্ট হচ্ছিল ধীর লয়ে, নতুন পোস্ট পেলেই সাথে সাথে পুরোটা পড়ে ফেলার সুযোগ পাচ্ছি। অন্যদিনতো পড়ার গতির সাথে পোস্টের গতির তাল মেলাতে পারি না। 'আমি' নিকের এক ব্লগার একটা পোস্ট দিয়েছিলেন। বিষণ্ন ঈদ নিয়ে। উনার পোস্ট পড়ে উনার বিষণ্নতা কাটাতে টোটকা হিসেবে আমার বাড়িতে চলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তখন দুপুর হবে। আমি ভেবেছিলাম ব্লগারটি হয়ত ঢাকা বা আশেপাশের কোনো জেলার হবেন, তাই উনাকে বিকেলের আগেই চলে আসতে বলেছিলাম, যাতে উনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি। উনার মন্তব্যের জের ধরে আমার ঠিকানা-মোবাইল নম্বরও দিয়েছিলাম মন্তব্যের ঘরে। সাড়ে তিনটা বা পৌনে চারটার দিকে একটা রেসট্রিক্টেড নাম্বার থেকে কল আসল। হ্যাঁ, ব্লগার 'আমি'র ফোন। ব্যক্তিগত ভাবে অপরিচিত কোনো ব্লগারের সাথে ঈদের দিন এভাবে ফোনে কথা হবে তা ব্লগে ঢোকার আগে চিন্তাই করিনি। ভেবেছিলাম উনি হয়ত আমাদের বাড়ির আশেপাশে চলে এসেছেন তাই ফোন দিয়েছেন। না, ব্লগার 'আমি' আমার বাড়ি থেকে অনেক অনেক দূরে। উনি আছেন সিলেটে। কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল। উনার নিকের আড়ালের আসল পরিচয় জানতে পারলাম। সত্যিই বেশ ভালো লেগেছে উনার সাথে কথা বলতে পেরে, আলাদা একটা মাত্রা দিয়েছে আমার ঈদ দিনের ব্লগিং-এ। আর মায়ের উপস্থিতি, বৃষ্টি, ব্লগিং সব মিলিয়ে এই তিন অনুষঙ্গই আমার এবারের ঈদকে অনেকটা আলাদা করে রাখবে অন্যান্য ঈদ থেকে।

 

 

  • ১৩ টি মন্তব্য
  • ২১০ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৬ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ ভোর ৬:১১
comment by: মানবী বলেছেন: অসাধারন পোস্ট!

আপনার মা'র অসুস্থতার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত, তবে তাঁকে জানান ওনার অসুস্থতায় আপনি কতোখানি কষ্ট পাচ্ছেন। উনি হয়তো জানেন সন্তান হিসেবে আপনি তাঁকে কতোখানি ভালোবাসেন, তারপরও এই কষ্টটুকু জানালে হয়তো ভালো করবেন। আমার পরিচিত একাধিক মানুষ, আমি তাঁদের কতোটুকু পছন্দ করি তা প্রকাশ করার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, খুব অসময়েই চলে গেছেন। এই না বলার কারনে প্রচন্ড গ্লানি নিয়ে বাকি জীবনটুকু পার করতে হয়.. তা এভাবে বলা।

চমৎকার পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।

২. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ ভোর ৬:১৩
comment by: রাশেদ বলেছেন: ভালো লাগল।
৩. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ ভোর ৬:১৭
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: ভাই আপনার মাকে সালাম দিবেন। ঐ মানুষটা না থাকলে দুনিয়া অন্ধকার।
৪. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ১০:১২
comment by: চির সবুজ বলেছেন: যেহেতু অনেক মানুষের দোয়া আছে আপনার মায়ের জন্য অবশ্যই আপনার মা সুস্থ্য হয়ে উঠবেন খুব তাড়াতাড়ি। আমি দোয়া করি আল্লাহ আপনার আম্মার হায়াত বাড়েয়ে দিক।
৫. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ১০:১২
comment by: জুয়েল বিন জহির বলেছেন: মানবী, রাশেদ. ফারহান দাউদ আপনাদেরকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
৬. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ১০:১৩
comment by: জুয়েল বিন জহির বলেছেন: তেমনটাই যেন হয় @ চির সবুজ
৭. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ২:১৫
comment by: শিলা বলেছেন: আপনার মা শতায়ু হোক--এই শুভ কামনায়।
৮. ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১২:২০
comment by: মাহমুদ মামূন বলেছেন: জুয়েল ভাই,
যে ছেলের মায়ের প্রতি এতো ভালোবাসা সেই মা এতো তাড়াতাড়ি ছেলেকে ফেলে চলে যেতে পারেন না। আপনার মা সত্যিই খুব ভাগ্যবান কারন আপনার মত একটি ছেলে আছে। দোয়া করি আপনার মা দীর্ঘজীবি হোন।

অসাধারন পোষ্ট। অবশ্যই ৫

আর হ্যা, অসাধারন এই লেখাটি আমার প্রিয় পোষ্ট এর তালিকায় যুক্ত হলো।
৯. ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১২:১১
comment by: জুয়েল বিন জহির বলেছেন: শিলা: শুভকামনার জন্য ধন্যবাদ।
মামূন: মায়ের সাথে সন্তানদের সম্পর্কগুলো আসলে এমনই হয়। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তোমাকেও।
১০. ১০ ই নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ৯:০৩
comment by: মানবী বলেছেন: পনার মা এখন কেমন আছেন?
১১. ১০ ই নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৫৩
comment by: জুয়েল বিন জহির বলেছেন: আপনাকে ধন্যবাদ খবর নেয়ার জন্য। একদিন ভাল বোধ করেনতো ছয় দিন খারাপ। ডাক্তারের তত্ত্ববধানে আছেন। যতদিন বাচবেন এভাবেই চলবে। এটা আসলে সুস্থ হবার রোগ নয়।@মানবী
১২. ১০ ই নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৪:০৭
comment by: আরণ্যক যাযাবর বলেছেন: খুব খারাপ লাগলো, জুয়েল।
আপনার মা যতোদিন বেঁচে আছেন, মায়ের পাশে থাকুন। ভালো থাকুন তিনি।

অনেক দেরিতে পড়লাম এরকম লেখা। সেজন্যে ক্ষমাপ্রার্থী।
১৩. ১১ ই নভেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১:৩২
comment by: জুয়েল বিন জহির বলেছেন: আরণ্যক যাযাবর আপনাকে ধন্যবাদ।

 



 


বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে সূর্যের হাসি ফুটবেই
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৭৯৩৮