somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই নিওলিথিক্যাল শহরে মাঝি আর তার দুধভাই

০১ লা নভেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি ছিলাম কুমার নদীর তীরে, সে পনের ষোল বছর আগে। ফুড়িং ধরা বিকেল, উঁচু উঁচু রেনট্রির ছায়া কাঁঠাল পাতার আড়ালে গোল পূর্ণিমার রূপার ডিম, উঁই ঢিবি, বেত বনের গুইশাপ, শেয়ালের কথপোকথোন, হাত কাটলে জঙ্গলের হৃদপিন্ডে লুকানো ঔষধি বৃরে সবুজ রক্ত, পাখি, সুতানলি সাপ, শশ্শু মন্ডিত দাদা, বিকেল, সুপার বিস্কুট, হসপিটাল, উঁচু টাওয়ার, বন্যা, স্রোত - আর কে যেনো ভেসে গিয়েছিলো। তার লাশ আর ফেরেনি। তার মাংশ, চুল, হলুদ মগজ, চোখ, ফুসফুস, আঙ্গুল আর বিস্ময় মাখা শৈশব মন বরফের মত কুমারের জলে মিশে গিয়েছিলো। গলে যাওয়া সেই জল-মানব আজ হয়ত নাফ নদী পার হয়ে, মোহনার সাদা আর নীল জল পার হয়ে, সেন্ট মার্টিন পার হয়ে, বহু বহু স্রোতের জাল টপকে দূর এক গভীর সমুদ্রে আমারই সমান বয়স নিয়ে সামুদ্রিক মাছের দেহের কোষ- কণিকায় চড়ে পার হচ্ছে নীল স্বচ্ছতা। ও আজ এখনও অস্তিত্বশীল। এই ভাবনাই আমাকে ভালো রাখে। হয়তো কোন সমুদ্র শিকারি সেই মাছ ধরে শুকাচ্ছে বালু আর সূর্য মধ্যবর্তী এই ব্রহ্মান্ডের যে কোন দেশ-কাল-স্থানে। আমিই হয়তো আমার সেই শৈশব বন্ধুকে কিনে আনবো আমার এই নিওলিথিক্যাল শহরে, শুটকি গন্ধের ডাইরিং টেবিলে। মৃত বন্ধু তুই আজ এই দেহেই থাক; থাকি আমি আর তুই আমার, আমাদের শরীরে।


আজ আমার নিবাস নবগঙ্গার তীর, এখন থাকি কৌশল-নগরে এখানে, একা একা, পশ্মিমের বাথরুমে রোজ স্নান করি আর রোজ একটা করে স্মৃতি ভুলে যাই। যেনো আরব্য রজনীর সেই রানী যে প্রতি রাত শেষে ভোরের লাল আলোয় উন্মুক্ত করে এক একজন পুরুষের ঘাড়ের আড়ালে লুকানো অন্ধকার। আমার স্মৃতিকে এক অসুস্থতা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত কোন গোপনীয়তায় যে নিয়ে চলে যায়। এই ভুলতে থাকা স্মৃতির রাজ্যে যে নাবিক এলো তার সোলেমানি কবিতা নিয়ে তিনি ইমরান মাঝি, হস্তে তার দুধভাই-এর বাহুবল। আমি আবার হাঁটতে থাকি নবগঙ্গা থেকে কুমার নদীর দিকে আমার অবশিষ্ট স্মৃতি অংশে।

মাঝি মূলত তার দেখা এক আঞ্চলিক শৈশব বিশ্বাসকেই নির্মাণ করেছেন তার দুধভাই এ। কোন রকম বিনির্মাণের কারসাজিতে তিনি নেই। ফলে হয় কি আমাদের অধিকাংশের হরানো ভূগোলটাকে যখন মারমার কাটকাট দুধভাই এর পৃষ্টায় পৃষ্টায় পেয়ে যাই তখন এক স্মৃতির বিষন্নতা ছেয়ে ফেলে আমাদের। স্মৃতি হারানো রোগের ঔষধ তার এই বহিখানি। সোডিয়ামের ঝার লন্ঠনে সাজানো এই শহরে আমার দেখা হয় সেই হারানো জলে ডোবা বন্ধুর সাথে। আমার এই রোগের নাম হয়তো ‘অর্ধনাগরিকিশ্বরতা’। রাক্ষসের ঘন্টা বাজানো শহরে আমরাতো সব ভুলতে ভুলতে মাত্র বিবেকী মানুষের মত বেঁচে আছি কয়েক লক্ষ অবদমন, মুখ আর মুখোশ নিয়ে। এই রোগ থেকে মুক্তির জন্য দরকার ‘স্মৃতির ঘোর’ নামক এক সাইকোথেরাপি। মাঝি হয়তো কিছুটা হলেও সফল এই স্মৃতি জাগাতে। কেননা তার আছে সাদামাটা চোখ, যা ইচ্ছে তাই দেখার প্রবনতা, আছে এই ব-দ্বীপের আশি পার্সেন্ট লোক যে ভাবে জীবন দেখে এবং বোঝে সেই কলাকৌশল। সে মাত্র বর্ণণাকারী, নবী নয়, নবীর সাহাবী - দক্ষিনের মানুষের জীবনাচরণই মুখ্য তার কাব্যে। বিশেষ কোন দৃষ্টিকোন না থাকাটাই তার কাব্যে জরুরী। এবং তিনি চেয়েছেন হয়তো তাই। হয়তোবা এটাই মাঝির নব পন্থা।

"একটা রাইস মিলের মালিক হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে বড় হয় কৃষকের ছেলে। বাড়িতে / মেহমান এলে ঝাই জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে দুপুর বেলায়। জগ নিয়ে/
ছোট ভাই তার পিছু পিছু যায়। আগে ভাগে চাড়া দিতে হয় খালের মোড়ে মোড়ে।/

যেখানে খালের পাড়... লম্বা টিনের ঘর... সামনে ধান শুকানো ইট অথবা মাটির/
উঠোন... পাশেই সিদ্ধ করার চুলা আর তরাফ...বিরাট তুসের ঘর... আর মস্ত/
চাকাওয়ালা একটি ইঞ্জিন থাকলে সেই স্থানকে বলা হয় রাইস মিল।"
(কল )

তার কবিতায় যেটা চোখে পরার মত তা হলো তার এক বিশেষ টেকনিক তা হলো তিনি শুধু বর্ণণা করে যান। বহু কথা বলেন হয়ত একটা বিশেষ অঞ্চলের মানুষ নিয়ে, তবে সে কথায় কোন সার বস্তু নেই। যেন কবি এখানে নিরব আর কথা বলছে একদল মাটিবর্তী দক্ষিনাংশের মানুষ আর তাদের ভূগোল। কবি মূলত ভূ-গোলের বোবা পর্যটক, সে শুনছে আর লিখে ফেলছে সব জীবন-গাথঁ। তার কবিতা অন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী, কেননা সে কবিতা সংঘের কানুন মানে না, বিচ্ছিন্নতাবাদী, গেরিলা ভঙ্গিমায় সে তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। কবিতার গভীর বিষণ্ণ চিত্রকল্পের উড়ন্ত চিলের দিকে সে ঢিল ছুড়ে দিলো, হয়তোবা তা গ্রেনেড। এটাই মাঝির সাহস কবিতা সন্ত্রাসে। নাকি সে আত্নঘাতী- নিজেকে নিজিই হারিয়ে দিবে এ অর্থহীন খেলার ভিতর। পথিক হাঁটলেই কি আর পথ হয়! চলতে চলতে পথচিহ্ন হয়ে ধূলা উড়লেই তবে না পথ। সে পথে বর্ষায় কাঁদা জমে, অন্ধকার নত্রের আলোয় মলিন জেগে থাকে অজগরের পিঠের মত। মাঝি তার পথে প্রথম হাটলেন। হয়তো সে এক পথচিহ্ন এঁকে যাবেন। আশা রাখি। অথবা এই পরিচিত পথ আর লোকালয়ের বাইরে বহুদূর কোন বাদাবনের ভিতর শুয়ে থাকবে আড়ালে ব্যর্থ মাতাল গবেষকের মত। এ ভাবনায় মাঝির কিছু এসে যায় না। বিকল্প-কবিতা-বিজ্ঞানের খোঁজই হয়তো তার এই মাত্রহীন পরিশ্রমী যাত্রা। এই খোঁজাটাই কবি জীবন। কবিতার দার্শনিক চোখ সে লোহিত তপ্ত লিখন ভঙ্গিমার ব্যক্তি প্রকাশ দ্বারা ফুটো করে দিয়েছে। মঝি যে জীবনের সাথে তার কাব্য ভুবন হাঁটার তা এক অভ্যস্থ উচ্চারণ ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে আনন্দ বেদনা উচ্ছ্বাস ব্যথা কষ্ট কাম কামনায় কোন পোপনীয়তার মালিকনা-বোধ নেই। কোন বিষাদ আর বিষণœতার খোঁজ আমি তার দুধভাই রাজ্যে পেলাম না। হ্যাঁ, ঠিকইতো এই লোকরাজ্যে কোন বিষাদ নেই। সবাই বেশ দুধে ভাতে আছে।

"আমি জানি ইতোমধ্যে আমাকে কিছুটা পঁচিয়ে দিয়েছে জ্ঞান। পঁচে গন্ধ বের হবার আগেই শিড়দাঁড় সোজা করে দাঁড়িয়েছি আর সারিয়ে নিচ্ছি আমার ক্ষত।"
( দেহ )

আর কবিতাকে যারা চিত্রকল্পের বাগানের শুভ্র বর্ণের বরফের ফুল ভাবে, যারা কবিতার রক্তে পরিমিত দর্শনের সুগার চান তাদের কাছে মাঝির কবিতা বড় আলগোছা ঠেকবে। কেননা মাঝিকে বরাবার বর্ণণা আক্রান্ত, কোথওবা আদি রসাত্নক, সহজ, কারুকার্যহীন বলে ঠেকতে পারে। এটাই তার পদ্ধতি। তিনি এ পদ্ধতির জনম-জনক হতে যাচ্ছেন বোধ করি। জনপদের মানুষ, যারা এই শিল্প নামক দুগন্ধ আর খেস্তিখিউর খেকে বহুদূরে, তারা যে ভাষায় ভাবে, যে ভাষায় ছেলে মেয়ে মানুষ করে, দুঃখ পায়, হাসে কিংবা কাদে, অনর্থক একটা গর্ব নিয়ে বাঁচে, লোক ঠকায়, সব শেষে বলা যায় যারা ঠিক ওভার-ম্যান না তাদের নিয়েই ইমরান মাঝির কারবার। হযতো বা পুঁজি বেশ কম। মাঝি এই শরীর চুলকানো দার্শনিক লোক জীবনের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে একটু একটু ঐ জীবনকে কেমন যেনো প্রশ্রয় দেয়। তার কবিতায় কোথাও যেনো মাঝির ব্যাটা অনার্স পড়া ইমরান মাঝিকে পাওয়া যায় না। তিনি বহুদূরে বসে ঐ ভূগোলের অতি পরিচিত শ্লোক আওড়ান। এটাই মাঝির নিজস্ব চরিত্র। তথাকথিত কাব্য শক্তিকে অস্বীকার করার মতা তিনি দেখিয়েছেন। এটাই কি তবে তার সন্মুখী ঝোঁক? ফলে কবিতা বলতে আমার যে নৈব্যক্তিব জ্ঞান তার সাথে মাঝির কবিতা এক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। এই কি তবে কবিতার আরেক নব-আবিস্কৃত ভাষা। নাকি এ আমার মাত্র মায়-মরিচিকা বোধ।

"নির্জন সন্ধ্যায় কাঁঠাল ডালে আমি দোয়েল গান গাই। মগ্ন শ্রোতা ছিলো বিষণ্ন বধূ/ খেজুর গাছের ঘাটে। বাঁশের সাজিতে চাল নিলে পর কখনও খাই দেয়। ফেলে/ রাখা চাল খেয়ে গান... আমার রসিক হবার ইচ্ছে ছিলো।
( সন্ধ্যার দোয়েল )

দুধভাই এর যদি কিছু উজ্জ্বলতা থেকে থাকে তবে তা এর সরলতা আর বর্ণণা ভঙ্গিমা। মাঝির সাহসীকতা মৃত প্রায় উত্তরাধুনিককে অস্বীকার করা, তত্ত্বের বারান্দায় থুথু ফেলা। কবিতার দাবার বোর্ডের নব নব কুটিল চালের পাশে মাঝি মাত্র একটা নীল সহজ মার্বেল ছড়িয়ে দিলো। তার গুটি মাত্র গড়াতে জানে। আর কোন আশা যেনো তার নেই। এটাই কি সব!

আমার শৈশব ঘোর কেটে গেলে ভাবনা আমার পুনরায় মগজের ভেতর এসে বসে। তখন মনে হয় গভীর কোন আশাহীন তার এই হতাশ জীবনবোধ, প্রতি-কবিতা প্রবন ঝোঁক, ত্রিভুজের তিন কোনায় বসানো বদ্বীপ, আশি পার্সেন্ট আমজনতার জীবনবীক্ষা, আর আত্নকথন; আমার এই পরিচিত নিওলিথিক্যাল শহরের সোডিয়ামের ঝার লন্ঠনের নিচে ম্লান হতে থাকে। বইটি সেলফে তোলা থাক, আমি এর জীবনীশক্তি দেখতে চাই; হোক আজ অথবা বহু বছর পর আবার।

যা হোক আমার মৃত বন্ধু এখনো আমার সাথেই এই দেহের ভেতর আছে। ধন্যবাদ মাঝির ব্যাটাকে। এটাই বা কম কি!
১৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×