somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাছিমের গ্রাম

২৮ শে জানুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত বছর শীতে সেন্ট. মার্টিন গিয়েছিলাম। সেই ভ্রমনে একটা দৃশ্য আমাকে আজও ভাবায়। ভোর বেলা একা একা উপকূল ধরে হাটচ্ছি , হোটেল থেকে বেশ দূরে চলে এসেছি। দেখলাম একটা মৃত কাছিম বালির উপর পরে আছে, আর তাকে ঘিরে ঘিরে ছিড়ে খাচ্ছে ৬ টি ককুর। আর কিছু কাক এসে নেমেছে পাশে ভোরের শীত শীত আবহাওয়ায়। একটা কাছিমের আয়ু শুনেছি প্রায় কয়েক শত বছর। আমি সেই আয়ুকে অন্তত জ্ঞান করি। ভাকলাম এই ভাবেই মহাকাল খেয়ে যায় কুকুর আর কাকে। এখনও ভাবায় আমায়। গত এক বছরের সেই ঘোরের ভেতর থেকে বের হতে পানিনি এখনও। পারবো কিনা কোনদিন জানি না। একটা মৃত কাছিম, ৬ টা কুকুর আর কয়েকটি কাক।
কাছিমের গ্রাম সিরিজের ৪ টি কবিতা বিচ্ছিন্ন ভাবে আগেই ব্লগে প্রকাশ করেছি। বাকি ২টি সহ পুনঃপোষ্ট করা হলো। কবিতাগুলো গত শীতের শেষ থেকে কাল শীতের মধ্য রাত পর্যন্ত লেখা। আমার এই এক বছরের ৬ টি জার্নি শেয়ার করলাম আপনাদের সাথে। ৭ টি কবিতা থাকা উচিত ছিলো। কিন্তু রাখা গেলো না।

১.

অনুকম্পাহীন হে সময়, আমি তোমার গভীরে দেখি মুক্ত আশা আর বিফল বিষাদ।

ভাবি চলে যাই কোন পরিচয়হীন নিরক্ষর মহিলার পিছু পিছু ; মাইল মাইল জাফরান বন আর ছত্রাক বাগান পার হয়ে তাঁর যে বিস্মরণের মুগ্ধ লীথি -- সেই কিনারায় দাড়িয়েছি আজ একা। স্রোতে ভেসে যাচ্ছে অগনন লাল রাজহাঁস, সবুজ গোলাপ আর পাতার প্রাসাদ।

সেই প্রাসাদের গভীর গোপন ঘরে সাধনার সুর ধূলো হয়ে পড়ে আছে, মাত্র এই হলো পূর্বজন্মস্মৃতি। পাথরের বাটির ভেতর তোমার আমার রক্তের না মেশা বিহ্বলতা -- তার পাশে বসে আছে বনেদী লাজুক অলস বিড়াল, আর্ত ঘুম। দেয়ালে ঝোলনো আয়নার ভেতর আমার অমর বিম্ব ফেলে চলে যাচ্ছি যৌন-গন্ধি পাহাড়ের শানুদেশে, সেখানে ঘুমন্ত অজগরের পিঠে লিখে যাবো -- এই ভুল ভূগোলের শেষে অন্ধকারে নিভে আছে দিগন্ত-উজ্জ্বল ছায়া।


২.

হে ধূলোট তাতকল -- নেই আর কোন অন্ধকার, স্মৃতিবোধ্য।

মাত্র গুন গুন মেশিনের প্রাণ জেগে আছে দিবাসারারাত্রি। আত্মার ফাঁপানো বেলুনের সাথে উড়ে যায় অদৃশ্য কপোত; পড়ে আছে শুধু কর্মদক্ষ মানুষ-চাতুরী -- এক হাতের তালির ইচ্ছা, হলাহল ।

শব্দ সে হলো হাওয়া সমুদ্রের ভাঙা ঢেউ, অগনন, নোনা। মাইল মাইল খুলি আর হাড়-পাথরের অনুর্বর দেশ পার হতে হতে সে আর কোথায় হারাবে এ হতাশ বেদনা দেহ।

যে শরীর থেকে খসে গেছে লজ্জা-বর্ম, রক্ত, হলুদ মগজ; সেই সব পিতলের গল-কম্পন উত্থিত নব নব হাওয়া সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে আরও আরও হতাশ নিঃশ্বাস; পিপাসার ঢেউ-এ ভাঙা সফেন-যানে কে তুমি ভেসে যাচ্ছে প্রাণ হে, কার পিছু পিছু --

বসন্ত প্রহরী চলে গেছে বনের গভীরে, তবু ফুল ফুটলো আজও আমাদের টবে।


৩.

ময়ূরের রং দেখে ভুল হয়।

ছ'পাওয়ালা ঘোড়ার দেশ হতে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি নভোছক; মর্মবীনা ভুল সুরে বেজে যাও এই সংগীত সন্ধ্যার বিদ্যালয়ে। চিরসূর্যহীন অনন্ত নক্ষত্র আলোয় গান গাইছে বধির।

ফেলে গেছি আমার বন্দুক, অব্যর্থ মুদ্রন যন্ত্র, টেলিস্কোপ, ধাতুবিদ্যা আর পুষ্প বাজারের স্যাঁতস্যাঁতে কামার্ত নিরালা-গন্ধ চাবি রিং। পাথরের মূর্তির পেটের ভেতর কেনবা রেখে এলাম গুপ্ত পথ সংকেত। আপেল নিজেই আজ কেটে পরে আছে তোমার রসুইঘরে একা, এ হলো আশ্চার্য নিবার্ণ উপহার -- ঐ সূর্যের মত ইশারাইঙ্গিতময়, ধূর্ত।

আকাশ ঘুমন্ত মানুষের মত আবহাওয়া সংবাদহীন, বার্তাবহ -- ত্বকে এঁকে দিচ্ছে মাকড়সা জালের যুদ্ধ পোষাক, বিবেক ব্যথা। ময়ুর হে, কোন দেশে আপেল বনে পিতল-কুঠার কেটে গেলো সহস্র বিথীকা শব্দ।

প্রিয় সমুদ্র আজ নীল, শান্ত; উপকূলে লবণ ফেনার দু'টো সাদা খরগোস ছিড়ে খাচ্ছে স্বচ্ছ আলো-গন্ধ বাতাসের মিষ্টি ঘাস। অনাবিস্কৃত ঐ দ্বীপে গোধূলী বেলায় উঠে আসছে হাজারো কাছিমের রহস্যতাড়িত কালো বর্ম।

৪.

'ঘোড়া' এ শব্দটি বহু বহু হিমযুগ ঘুমিয়ে কাটালো পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।

প্যাপিরাস পাতার উপর মজ্জাহীন শব্দবোধক 'ঘোড়া'কে খেয়ে গেছে আরশোলা, উঁইপোকা সমবায়; সৌরযুগের এমন অন্ধকারে তাকে ঠিক চিনে রেখেছিলো ন্যাপথলিন চোখ।

সে আজ হঠাৎ মিথ্যা মিথ্যা শব্দ-অল্পনার ভেতর থেকে সত্যি সত্যি উঠে দাঁড়ালো জ্যান্ত ঘোড়ার মত। বহু আলোক-যুগের জমানো লাফে পাড় হয়ে গেলো ডানাওয়ালা উড়ন্ত বরফের নীল নদী।

আর আমি তোমার শ্বাসমূলের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছি সরু বাতাসের দড়ি, লাইলন গিট, বাঁকা চন্দ্র বর্শি, ব্যথা, উঢ়াটন মন, পরিতাপ। সোনার সুতোয় বোনা জোছনা চাদরে পড়ে থাকা এই মধ্যরাতের আস্তাবলে একা শুয়ে আছে সহিসের কথাবলা মুখহীন বাঁশি-দন্ড আর সময় হারানো বিকল ঘড়ি। এই ব্যর্থ যন্ত্র, নিস্ফলতা, গোপন বাজনা জ্ঞান, পড়ে থাকা হাহাকার , বিদ্যাভাস সমুদ্র ঢেউএর মত অতিরঞ্জিত, সশব্দ -- এই সচল ঘড়ির দেশে।

ঘোড়া মুত্রের গন্ধে ভরা এই নৈশ্য স্কুলে, তোমার ফোঁটানো শরীর ছাতায়, জীব থেকে বস্তু হয়ে বৃষ্টি-শাবলের ছদ্ম পতনের ভারে ঝরে মিশে যাই গভীর নিরর্থ রসাতলে।


৫.

মানুষ, কবর থেকে কেন লিখে পাঠালে মিতালী-পত্র

আমি সম্ভাবনাহীন। তোমার পড়ার ঘর থেকে কাঠ পেন্সিল চুরির দায়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলে পচা গাজরের স্বাদে ভরা পৃথিবীর পথে। আর পানি খেতে গিয়ে গিলে ফেলেছি অজান্তে প্লাস্টিকের নীল ব্যথার বোতল, জলতাপ; এমন তৃষ্ণার জন্য কার কাছে ক্ষমা চাবো বলো। জানালায় এসে গেছে লটারি বিক্রেতা আর ভাগ্যের দাস্তানা পরা নীল হাত। নদীকেই ভেবো যৌনসঙ্গী, না হলে এ তোমার নিলজ্জ অপচয়।
]
৬.

টেবিলের ওপাশে তুমি বসে ছিলেনা এমন কোনদিন

সম্ভাব্যতার অদৃশ্য চোখ যেনো দেখে ফেলি -- দৃশ্যের বাইরে জন্ম নিচ্ছি প্রতিদিন, সরে সরে যাচ্ছি প্রাণ হতে দূরে আর ভাবি কেন্দ্রহীন বৃত্তের জ্যামিতি কেমন নির্দোষ হতে পারে। বনের ভেতর থেকে কে তুমি বেরিয়ে এলে অন্ধকারের তুলোর বল হাতে, বোঝা গেলো না এমন সংকেত চাতুর্য, রক্তজঙ্ঘা, অনুগ্রহ -- এই কি মঙ্গলদীপ? দৃশ্য অদৃশ্যের বিকল্প-বিজ্ঞান ভবনে আমার কঙ্কাল পুড়িয়ে দিয়ে, মাত্র মাংশ-মগজ-কামনা-চামড়ার লোমশ কিম্ভুত একজন বুকে হাঁটা মানুষের ছদ্মবেশে চলে যাচ্ছি সুনীল সমুদ্র হতাশার দিকে। এখানে অনন্ত স্বপ্নের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে জেগে উঠে ডাক দিবো, হেকে যাবো, 'কুহকী বাস্তব।' সংখ্যাহীন কাছিমের ঠান্ডা পা আমার বুক টপকে নিশ্চুপ চলে যাচ্ছে ঐ আঁধার গ্রামের দিকে -- যেনো আমি কেউ নই, ছিলাম না কোনদিন যেনো টেবিলের ওপাশে আমার চোখই দেখছে আমার পিচ্ছিল নবজন্ম, নতুন অধ্যায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:৪৩
১৫টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×