somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গুন্টার গ্রাসের সাক্ষাৎকার ( দ্বিতীয় পর্ব )

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গুন্টার গ্রাস-এর সাক্ষাৎকার ( প্রথম পর্ব )

এলিজাবেথঃ আপনি কিভাবে 'ফিকশন' আর 'নন-ফিকশন' এর মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন?

গ্রাস : 'ফিকশন বনাম নন-ফিকশন' এই ধারণাটাই অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয়। এটা বই বিক্রেতা প্রাতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। কারণ তারা শিল্পকে নানা ভাগে বিভক্ত করে কেজি দরে বিক্রি করে থাকে। কিন্তু আমি আমার বইয়ের এমন শ্রেণী বিভাজন করতে প্রস্তুত নই। আমার সব সময় মনে হয়েছে বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা রকম সমিতি আছে যারা নির্দিষ্ট করে দেয় এটা ফিকশন আর ওটা নন-ফিকশন।

এলিজাবেথঃ ঠিক আছে। তবে আপনি যখন আপনার প্রবন্ধ নিবন্ধ আর ছোটগল্প বা উপন্যাস নিয়ে কাজ করেন থাকেন কখন নিশ্চয়ই আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করেন। তাহলে আপনি কিভাবে এদের পার্থক্য করে থাকেন?

গ্রাস : হ্যাঁ, এরা পরস্পর থেকে অলাদা কারণ আমি সরাসরি ঘটনার গুলোর মুখোমুখি হই। একে আমি পরিবর্তন করকে পারি না। সাধারণত আমি আমার সাথে কোন ডায়রী রাখি না। কিন্তু From the Dairy of a Snail লেখার জন্য সব সময় আমাকে একটা ডায়রী সাথে সাথে রাখতে হয়েছে। আমার মনে হয় ১৯৬৭ সালটা খুবই গুরত্বপূর্ণ একটা সাল আমার জন্য। তখন সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক পটভূমির একটা বিশাল পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছিলো। ১৯৬৯ এর মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ একটা সময় পথে পথে ক্যাম্পেইন করার সময় আমি একটা ডায়রী রেখেছিলাম নিজের সাথে। কলকাতাতে যখন গেছি তখনও একই কাজ করেছি। আর সেই ডায়রীর একদিন From the Dairy of a Snail রূপান্তরিত হলো।

এলিজাবেথঃ একদিকে রাজনীতি আর অপর দিকে আপনার লেখালেখি। এদুটো ভিন্ন বিষয়কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন?

গ্রাস : লেখক মানে নয় আত্মার গভীরতা সন্ধানী কোন বোদ্ধা। দৈনন্দিন জীবনের চাওয়া পাওয়ার সাথে সে সম্পর্কযুক্ত। আর আমার ক্ষেত্রে আমি বলবো লেখা-লেখি, চিত্রকলা আর রাজনীতি এই তিনটি বিষয় কে আলাদা আলাদা শখ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে প্রত্যেকটিরই আলাদা নিজস্ব গতি ও শক্তি আছে। আমি যে সমাজে বাস করি সে সমাজের কিছু কিছু বিষয় পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি। আমার লেখালেখি বা ছবি সচেতন ভাবে বা অবচেতন ভাবে রাজনীতির সম্পৃক্ত। তবে আমার লেখার জন্য খুব পরিকল্পনা মাফিক আমি রাজনীতিকে টেনে আনতে প্রস্তুত নই। এমন এমন কোন গল্প লিখি না যা খুব সাদামাটা নির্দিষ্ট বাস্তব কোন রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। লেখা লেখি থেকে রাজনীতিকে বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব কারণ আমাদের যাপিত জীবনের উপরই এর একটা বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। এটা জীবনের আশা ভরসাকে নানা দিক থেকে প্রভাবিত করতে পারে।

এলিজাবেথঃ ইতিহাস, পদ্ধতি, গীতি-ভঙ্গিমা -- এমন বিচিত্র বিষয়কে আপানি একত্রিত করেছেন।

গ্রাস : ... চিত্রকলা, কবিতা, সংলাপ, উদ্ধৃতি, বক্তব্য, চিঠি -- তুমি দেখবে যখন আমি পৌরাণিক ঢঙে কাজ করি কখন ভাষার যত রকম সক্রিয় রূপ আছে তাতো ব্যবহার করিই সাথে ভাষার নানা উপকরণ এর সাথে যুক্ত হয়। মনে করে দেখ আমার Cat and Mouse আর The Meeting At Telgte খুবই বিশুদ্ধ ফর্মে করা দুটি কাজ।

এলিজাবেথঃ আপনার শব্দ আর ছবি নিয়ে একত্রিত যে কাজগুলো আছে সেগুলো অনবদ্য।

গ্রাস : ছবি আর লেখা এদুটো আমার কাজের প্রাথমিক উপাদান, তবে একমাত্র উপাদান বলা যাবে না। আমার যখন সময় থাকে তখন আমি ভাস্কর্য তৈরি করি। আমার ক্ষেত্রে চিত্রকলা আর লেখালেখি এদুটোর মধ্যে খুব দেওয়া নেওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। কখনও কখনও এই সম্পর্ক খুব গভীর হয়ে ওঠে। তবে কখনও কখনও দুর্বলও হতে পারে। গত কয়েক বছর আমি এদের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক যে আছে তা অনুভব করছি। Show Your Tongue, এমনই একটা উদাহরণ, এটা আমি কলকাতাতে শুরু করি। ড্রয়িং ছাড়া এই বইয়ের অস্তিত্ত্ব ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিলো না। কলকাতায় অবিশ্বাস্য দারিদ্রতা, ভাষায় একে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একমাত্র ড্রয়িং একে ফুটিয়ে তুলেছে নর্দ্বিধায়।


এলিজাবেথঃ এই বইটিতে শুধু কবিতাই ছাপা হয়নি, হাতের লেখাও ড্রয়িংয়ের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এই হাতের লেখা শব্দগুলো কে কি আপনার ড্রয়িংয়ের অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে?

গ্রাস : কবিতার কিছু কিছু উপাদান এই ড্রয়িংগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত। কবিতা যখন আসা শুরু করে তখন আমি এই ড্রয়িংগুলোর উপর তা লিথতে শুরু করি। ড্রয়িং আর কবিতা একসাথে মিশে এশাকার হয়ে যায়। যদি তুমি ড্রুয়িংয়ের ভেতরের লেখাগুলো পড়তে পারো তবে ভালো, কেননা তা লেখা হয়েছে পড়তে পারার জন্যই। ড্রয়িংগুলো সাধারণত এঁকে থাকি প্রথম খসড়া তৈরির আগে টাইপরাইটারে বসার আগে। এর কারণ অবশ্য জানা নেই। এই বইটা কলকাতা বিষয়ক। আমি সেখানে দুই বার গিয়েছি। Show Your Tongue শুরু করার বারো বছর আগে একবার গিয়েছিলাম। সেটাই প্রথম ভারত ভ্রমণ। মাত্র কয়েকদিন কলকাতায় ছিলাম। আমি ফেরার সময় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনই ইচ্ছা ছিলো সেখানে আবার যাবো, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে থাকবো, অনেক কিছু দেখবো আর লিখবো। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশে আমি গিয়েছি -- কিন্তু যখনই আমি হংকং, ম্যানিলা বা জাকার্তার বস্তিগুলো দেখি, তখন আমার কলকাতার কথা মনে পড়ে। প্রথম বিশ্বের সমস্যা তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এভাবে মিশে একাকার হয়ে আছে -- এমন দৃশ্য আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।

তাই আমি আবার কলকাতায় ফিরে গেলাম। আর আমি আমার ভাষা দক্ষতা হারিয়ে ফেললাম। আমি একটা অক্ষরও লিখতে পারিনি। সেই মুহূর্তে ড্রয়িং খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো আমার কাছে। ভারতের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার অন্য রকম প্রচেষ্টা ছিলো এটা। এই ড্রয়িংগুলোর সাহায্যে আমি আমার গদ্য লেখার শক্তি পুনরায় ফিরে পেতে থাকলাম। এটাই হলো এই বইয়ের প্রথম অংশ, খানিকটা নিবন্ধের মত। এরপর তৃতীয় অংশ -- বারো ভাগে বিভক্ত একটা দীর্ঘ কবিতা। এটা ছিলো কলকাতা বিষয়ক একটা নাগরিক কবিতা। তুমি যদি নাগরিক গদ্য, পদ্য আর ড্রয়িংগুলো দেখো তবে দেখবে এর সব কয়টিই কলকাতা বিষয়ক। তবে তারা পরস্পরের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে যুক্ত। এদের মধ্যে এক রকম গোপন কথোপোকথন আছে, তবে ব্যাপারটা বেশ একটু জটিল।

(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১:০৯
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×