প্রথম ভাবনা, দ্বিতীয় প্রস্তাবনা
১.
এক চোরা পথের নাম কবিতা। কিংবা কবিতা এক জাদুকর সৃষ্ট এমন এক পথ যে পথে পথিক হারিয়ে যায় ক্ষণিকের তরে, তবে ফিরে এসে তার ভিতর সেই অদ্ভুত পথের কিছু স্মৃতি থেকেই যায়; যদিও শেষ পর্যন্ত সেই পথ পৃথিবীর কোন খানেই নেই; থাকে না। কবিতা উপলব্ধি প্রত্যাশা ছাড়া আর কিছু নয়। এই পথে যা কিছু এসে গোপনে প্রবেশ করে, তা কবিতায় খুঁজে পেতে হলে পাঠকের বেশ ঋদ্ধ অনুসন্ধানের দিকে চলে যেতে হয়, এবং তা প্রয়োজন। কেননা কবিতা একই সাথে ধারণ করে সমাজ, দর্শন, ভূগোল, প্রেম অপ্রেম, উষ্ণতা, মানব মগজের অন্ধকার, প্রগতির উচ্ছ্বাসা, সজ্জা, সামঞ্জস্যতা, অনুপাত, হারমোনি বা এর ঠিক উল্টেটাও সে বহন করে আপন রক্তের লসিকায়। ফলে কবিতাকে দেখতে হয় সামগ্রিকতা দিয়ে। পুরো বিশ্বের সমান দুটো চোখে আর ব্রহ্মাণ্ডের মত একটা মগজ নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে হয় পাঠককে। কবিতার বিচার আচার পাঠক জ্ঞানের উপর সীমাবদ্ধ। এবং একই ভাবে কবিতার উপস্থাপন কবি-দক্ষতার উপর সমানুপাতিক ভাবে নির্ভরশীল। একারণে কবি এবং পাঠকের আদান প্রদান বেশ কঠিন এক মস্তিষ্ক রসায়ন, কোন কোন অর্থে ব্যর্থও বটে। কবিতার বর্ণিল উপাদান, এর রং ঢং, সজীবতা যেমন ধারন করতে হয় কবিতা পাঠককে তেমনি এই রং তামাশার আলকেমি কবিকেও বেশ আয়ত্বে নিয়ে আসতে হয়। আজকের কবিতা দ্বিমুখী এক সীমান্তে দাড়ানো। আদান প্রদানের দরজায় সে দাঁড়ানো। কবি দক্ষতার সাথে পাঠকের উপলব্ধি জ্ঞান এখানে সরাসরি জড়িত। কবি এবং পাঠক আরও বেশি অন্তঃসম্পর্ক যুক্ত আমাদের এই সময়ের কবিতায়। কেননা তাকে আর সহজেই চিনে ফেলা যাচ্ছে না। ফলে এখন আর সমস্ত লেখাই, যে কোন বাণীই আর কবিতা হয়ে উঠতে পারে না পাঠকের গুনে, পাঠকের উন্নাসিতকায়। এই বৈরী হাওয়ায় বসে কবি যখন লিখতে বসেন তখন তাকে মাথায় রাখতে হয় সমস্ত কবিতার পথরেখার একটা ম্যাপ। আর তারপর কলম ছোঁয়াতে হয় কাগজে। কারণ তাকে এমন এক ভূগোলের উন্মোচন করতে হয় যা কিনা অপরিচিত, অযাচিত; তবে সহজ উপলব্ধ, কষ্ট-কল্পনাহীন। এই বিকল্প পথই কবিকে বাঁচিয়ে নেয়। ভালো বা মন্দ কবিতার সমস্ত দায় কবিকে নিতে হয়। আর একই সাথে কবিতাকে খারিজ করার দুঃসাহসও পাঠকেই নিতে হয়। দুঃসাহস! কেননা পাঠককে উত্তর তৈরি করতে হয় কেন তিনি কবিতাটি বর্জন করছেন। ভালো লাগার যুক্তি বরং সহজ, ভালো না লাগার যুক্তি বড় কঠিন এবং প্রশ্ন সাপেক্ষ। ফলে এই দায় বোধহীন পাঠকের জন্য কবিতা আর নয় আজ, অন্তত আজকের কবিতা।
২.
নতুন কবিতা আসলে ভুল ব্যাকরণেই লেখা হয়ে থাকে সম্ভবত। আশার কথা মহৎ কবিতায় এই ব্যাকরণগত কোন ভুলের দেখা মেলে না। এ কথা সর্বগামী নয় অবশ্যয়ই; তবে বলা যায় কবির আক্রমন "পদ্ধতি"র দিকে না হয়ে প্রবাহমান "ব্যাকরণ"এর দিকে হওয়াই ভালো। তবে এটাও শেষ কথা নয় কারণ এই আক্রমনের জায়গা কবিই নির্বাচন করেন। পাঠক তাকে মাত্র খুঁজে নেয়।
৩.
নান রকম কবিতাকে কি আমরা গ্রহনে সক্ষম? কবিতা গ্রহন বর্জন পাঠক রুচি নির্ভর। এ কথায় আরও সুক্ষ্ণতা আনলে বলা যায় কবিতা উপলব্ধি নিতান্তই পাঠকের "শিল্প-অভিজ্ঞতা" নির্ভর। এই স্বাধীনতা তার আছে। তেমনি কোন স্বাধীনতা নেই কবির! পাঠক যা কিছু পড়েছে এবং যা সে পড়তে চায় এর সাথে কবিতা উপলব্ধি জড়িত। একই ভাবে কবির যে অনুভূত জগৎ, আত্মদৃষ্টি, ট্যাজিক মন তাই তাকে লিখতে বাধ্য করে। বিরহী মনটা থাকে লুপ্ত হয়ে কবিতার ভেতর। পাঠ মাত্রই তাকে চিনে ফেলা যায়। আত্মার লুমে যখন স্নায়ুর সুতোয় তৈরি হয় মনোস্তত্ত্বের পরিধান, তখন সে কাব্য পোষাকের উজ্জ্বলতা নির্ভর করে তার নতুনত্বের উপর, দৃঢ়তা নির্ভর করে উপকরণ বাছায়ের উপর আর আয়ষ্কাল নির্ভর করে কবির "শিল্প-অভিজ্ঞতা"র উপর। নতুনত্ব, উপকরণ আর শিল্প-অভিজ্ঞতা এর বুননে তৈরি হয় কবিতার শরীর। আর যখন একে পাঠ করা হয়, শরীরের চোখ দিয়ে অনুভব করা হয় তখন মসলিন পরা রূপসীর দিকে যেভাবে আমাদের চোখ যায়, কবিতাকেও আমরা সেই ভাবে দেখে ফেলি। কবিতার শরীরটাই তখন চোখে পড়ে। এটাকেই পাঠক উপভোগ করে। এর ভেতরের সব কারুকাজ, কবির পরিশ্রম সমস্ত লুপ্ত হয়ে যায়। তখন কবিতা ঠিক কবিতা হিসাবেই দাড়িয়ে থাকে। আর কিছু থাকে না দৃশ্যমান। তবে কবিতা পাঠকের কারাগারে প্রতিস্থাপিত হয়, সেখানেই চলে পাপী কবিতার প্রশ্নোত্তর পর্ব; সেখানে প্রতিটা কবিতার কাছ থেকে পাঠক কিছু উত্তর আশা করে। তবে তার এই প্রশ্নের ধরন নির্ভর করে পাঠকের "শিল্প-অভিজ্ঞতা" উপর। ফলে কবিতাকে বোঝার বা বোঝানোর যে বাসনা পাঠক এবং কবি উভয়েরই আছে, তা নির্ভর করে দুজনের অভিজ্ঞতার উপর। পাঠককে কবির সমান্তরালে চলতে হয়। আর যারা বোঝানোর দায় রাখেন তাদের চলতে হয় পাঠকের সমান্তরালে। তবে সেটা বেশি ভালো কথা নয়। ফলে সমকালীন এই "প্রান্ত-আধুনিক" কবিতার পাঠক বরাবরই কম। এবং শেষ পর্যন্ত কবি নিজেই নিজের পাঠক। এর বাইরে যারা এর র্চ্চা করে তারা মেধাবী, রুচির শাসনহীন, বহু বৈচিত্র্য ধারনে সক্ষম। তারাই ভাবি কালের পাঠক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

