১.
জাতি হিসাবে আমরা মেধাহীন। আমরা যেখানেই যাই নাকো, যত কথা বলি নাকো, যত কাজ করি নাকো আচার আচরনে ছলে বা কলে, কৌশলে আমাদের মেধাহীনতার স্বাক্ষর রেখে যাওয়া চাইই চাই। নদীর কিনারের মাটিতে বা কচু বনের কাদায় আমাদের যে পায়ের ছাপ পড়ে তা ঠিক মানুষের পদছাপ না। অন্য কারও, অন্য কোন লোমশ প্রানীর। আমাদের দেশ গরুপ্রধান, ছাগলপ্রধান, বানরপ্রধান, কেচোঁপ্রধান সেখানে নয়া প্রাণীর পদছাপ বেশ চিন্তায় ফেলে দেয় আমাদের প্রায়স। ব্লগও এই প্রাণীদের পদছাপে মুখরিত আজ কদিন। এই নয়া প্রাণীদেও দুটো জাত চোখে পড়বে আপনার। একটা দেখতে কালো আর অপরটি সাদা। এই সাদা আর কালো লোমশ প্রাণীকূলের বাসিন্দার প্রাণপণ সংগ্রাম, উচ্চকন্ঠ আর ঘোঁত ঘোঁত শব্দে আমাদের সাধারণ উলখাগড়া প্রাণদের তাল কেটে যাচ্ছে বারবার। তবে তারা মহান, আমারতো সাধারণ ৫ টনের ট্রাক। আমাদের উপর দিয়ে যা ইচ্ছে তা তারা পরিবহন করানোর অধিকার রাখে।
ইদানিং এই লড়াইটা আবার শুরু হয়েছে ব্লগে। সুরের সাথে অসুরের, দেবতার সাথে অপদেবতার, রামের সাথে রাবণের, সাদার সাথে কালোর, আলোর সাথে অন্ধকারের, সাপের সাথে নেউলের সব শেষে ধর্মের সাথে অধর্মের।
২.
আমাদের ব্লগীয় 'আস্তিক' এবং 'নাস্তিক' উভয়েই চারপেয়ে শ্রেণীর। এদের ঘোঁত ঘোঁত একটু বেশি। আস্তিকেরা ধর্মকে বাঁচাতে এমন কোন কম্ম নাই যে করে না। তারা চাঁদের ফাটল থেকে আজকাল কৃষ্ণগহ্বরের দিকেও হেঁটে যাচ্ছে। তবু তাদের প্রমান করা দরকার ঈশ্বর আছে। আর আমাদের নাস্তিক নেতারা এর বিপরীতে নবী রসুল কয়টা বিয়ে করলো আর কি করলো কি করলো না তাই দিয়ে প্রমান করার চেষ্টা করছে ঈশ্বর নেই। নবী ১৪টা বিয়ে না করে একটা বিয়ে করলেই কি প্রমান হয়ে যেতো যে আল্লাহ আছে। ধর্মীয় বক্তিদের যৌন জীবনের আলোচনায় কারও কারও বেশ মজা। এই সমস্ত কটাক্ষ, বাজে ধরনের রসবোধ এবং তাদের নিম্নরুচি দিয়ে এই তথাকথিত নাস্তিক শ্রেণী প্রমান করতে চায় ঈশ্বর নেই। হায়!!
ইসলামবাদ আর জনগনের মুসলিমত্ব এক জিনিস নয়। ইসলামবাদ মানে নয় ইসলাম। ইসলামবাদ হলো একটা রাজনীতি। এর সাথে এখন মিশে যাচ্ছে মৃত গনতন্ত্র আর পচা সমাজতন্ত্রের কঙ্কালের উপর জন্মে ওঠা পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ। ফলে এর মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিক ভাবে, হাস্যরস উৎপাদন করে নিশ্চয়ই নয়।
তথাকথিত নাস্তিক আর আস্তিক, এই উভয় প্রকার যন্ত্রনার হাত থেকে রক্ষা চাই। এ সমস্তে নতুন কিছু নাই আমরা বুঝে গেছি।
২.
ধর্ম বিশ্বাসের কোন প্রমান হয় না। ঠিক একই ভাবে অবিশ্বাসেরও কোন প্রমান হয় না। কিন্তু আমাদেও কতিপয় কিছু জ্ঞানী গুনি নানা উপায়ে তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা অবিশ্বাসটাকেই প্রমান করার জন্য সদাব্যস্ত। জীবনের এ এক নিদারুন অপচয়। তারা বুঝেন না পদার্থবিদ্যা কি আর মানবিকবিদ্যাই বা কাকে বলে। পদার্থবিদ্যার সাথে রসায়নের মিল হতে পারে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে উদ্ভিদবিদ্যার সাথে এর মিলন ঘটতে পারে। কিন্তু পদার্থবিদ্যার সাথে সামাজিকবিদ্যার একত্রীকরণ সম্ভব নয়। মানুষের জ্ঞান কান্ডের দুটি শাখা -- একটা বস্তু সম্পর্কিত আর অপরটি মানব সম্পর্কিত। মানবের বিচার বস্তু দিয়ে হয় না। পদার্থবিদ্যা বা বিজ্ঞানের অন্য কোন শাখা দিয়ে মানব, মানবের গভীর মনে লুকানো অস্তিত্ত্ব অনস্তিত্ত্ব ইত্যাকার অন্ধকারময় জটিলতার ব্যাখা সম্ভব নয়। বিজ্ঞান 'হ্যাঁ' এবং 'না', 'গ্রহন' এবং 'বর্জন' তথা যুক্তি নির্ভর। মানবিক বিদ্যা আমাদের অভ্যস্থতাকেই ছকবদ্ধ করে; মানুষকে, সভ্যতাকে পুনরায় আবিস্কার করে নব নব রূপে। এটা সমাজ কাঠামো নির্ভরশীল। যুক্তিতে তেমন কিছু আসে যায় না সমাজবিজ্ঞানের। সমাজের অভ্যস্থ জীবনের বিস্তার সমাজবিজ্ঞান। এই সমাজের সাথেই অন্তভুক্ত ধর্ম। ধর্ম বিরাজমান একটা সামাজিক অবস্থা। একে ফেলে দিলে, মুছে দিলে, অচল হিসাবে ভাগাড়ে ফেলে দিলে যে সময়, যে ইতিহাস আমরা অতিক্রম করে এসেছি তাকে বড় অবহেলা করা হবে। অবহেলার চেয়ে একে নিয়ে ভেবে দেখা দরকার। বিচার করা দরকার এটা এখন আর প্রয়োজনীয় কিনা? আমাদের আর ঈশ্বর বিশ্বাসের প্রয়োজন আছে কিনা তাই ভাবা যেতে পারে। অতীতে ধর্মের উজ্জ্বলতা নিয়ে পড়ে থাকার কিছু নাই। আর ঈশ্বর বিশ্বাসের কোন ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা নেই বলেই মনে হয়। ধর্মের নামে এখন পৃথিবীতে যা হয় তা হলো শোষণ, ক্ষমতার সাথে এর গোপন আতাত। মানুষকে নিপিড়নের অস্ত্র ধর্ম। পুর্ণ জীবন থেকে সে সরে গেছে রাজনীতির দিকে। ধর্মের একবিংশ শতকীয় সংস্করন গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র। এবং ধর্মের দ্বিবিংশ শতকীয় সংস্করণ পুঁজিবাদ, সম্রাজ্যবিরোদীবাদ হতে চলেছে তা বেশ ঠাওর করা যাচ্ছে। গনতন্ত্রের শেষ দশা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং সমাজতন্ত্রের শেষ দশা সাম্রাজ্যবাদবিরোধীতা। গনতন্ত্রের বাঁকা উঠোনে ধর্মের খেমটা নাচ দেখে আমরা সদা হাস্যোজ্জ্বল। ফলে গনতন্ত্রের সাথে ক্রসেডের মিলেমিশে চলাচল করতে কোন সমস্যাই হয় না। ফলে এই শতকের লড়াই যে হবে সম্রাজ্যবাদের বিপরীত সাম্রাজ্যবাদবিরোধীবাদের তা বুঝা যাচ্ছে। আর একটা গোপন স্নায়ু যুদ্ধের দিকে চলে যাবো আমরা। মানুষ চাঁদে গিয়েছিলো, শান্তি মেলেনি। মানুষ হয়তো অন্য কোন গ্রহে এ শতকে বাসা বাধবে তবু আমাদের শান্তি মিলবেনা। গনতন্ত্র আর সমাজতন্ত্র উভয়ের মৃত্য ঘটে গেছে। শুধু এদেরই মৃত দেহের উপর এখনো উড়ে যাচ্ছে ধর্মের শকুন। তার মৃত্যু হয় না। এই চলমান যুদ্ধের ময়দানে ধর্ম-শকুনের ছায়া আবারও দেখা যাচ্ছে।
গনতন্ত্রহীন, সমাজতন্ত্রহীন, ধর্মহীন এক নব রাজনীতির দিকে আমাদের অগ্রসর হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। নতুন দার্শনিক আসবেই আসবে। আবিস্কৃত তত্ত্ব আর তা থেকে উৎপন্ন কোন বাইপ্রোডাক্ট আর বাঁচাবে না পৃথিবী সভ্যতাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

