চমক হচ্ছে এই আমরা এই প্রথম ব্লগে চার কবির রুবাঈ একসাথে দেখতে পাব । আজকের এই পোস্টে থাকছে প্রিয় ব্লগার শাহেদ খান, সুপান্থ সুরাহী, ছাইরাছ হেলাল এবং সবশেষে অধম আমি । ব্লগার গনের রুবাঈগুলো দেবার আগে রুবাঈ এর পরিচয় দিয়ে নেয়া দরকার । না হলে অনেক পাঠকের মনেই প্রশ্ন থেকে যাবে রুবাঈ আবার কি ?
রুবাঈ :
রুবাঈ আরবী শব্দ যার অর্থ-চতুষ্পদী অর্থাৎ চার পঙক্তি বিশিষ্ট কবিতা। চার পঙক্তি বিশিষ্ট বিশেষ চরণাত্বিক মিল এবং ছন্দ বজায় রেখে যে কবিতা রচিত হয় তাকেই রুবাঈ বলে । রুবাঈ এর চার পঙক্তি বিশিষ্ট হওয়া এবং অন্ত্যমিলের উপর বিশেষ জোর দেয়া হলেও এগুলো কোন ছড়া বা শিশুতোষ লেখা নয় । এ গুলোতে কবির গভীর অনুভূতি কিংবা দর্শন ফুটে উঠে ।
ছন্দ :
মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, ফারসি ভাষার সম্ভবত সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং দার্শনিক ওমর খৈয়াম এর হাতের স্পর্শে রুবাঈ জনপ্রিয় হয়ে উঠে । তিনি প্রধানত সুফিবাদের উপরে বেশি গুরুত্ব দিতেন তার রুবাঈগুলোতে । রুবাঈ এ সাধারণত ককখক চরণাত্বিক মিল বা অন্ত্যমিল বজায় রাখা হয় । রুবাঈ এ সাধারণত ১ম, ২য় এবং চতুর্থ লাইনে অন্ত্যমিল থাকে কিন্তু তৃতীয় লাইনটি থাকে মুক্ত ।
রুবাঈ তে সূরা আর সাকীর ব্যবহার খুব বেশি পরিমাণে হয় । এই শূরা বলতে প্রধানত সুফিবাদে ঈশ্বরের সাধনা কিংবা আরাধনাকে বুঝায় । আর সাকি বলতে সাধারণত শূরাপাত্র / পরিবেশন কারী বোঝালেও এখানে খোদ ঈশ্বরের দর্শন বা পথের কথাই বোঝান হয় ।
বাংলা ভাষায় বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকগন রুবাঈ লিখেছেন এবং অনুবাদ করেছেন । এ সব লেখকের লেখায় আধ্যাত্মবাদের সাথে সাথে প্রেম বা রোমান্স এর চেতনা রুবাঈতে এসেছে । আর এখন অন্য অনেক বিষয় রুবাঈতে চলে আসছে যা এই ধারাকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করবে বলেই মনে হয় ।
এবারে আসি রুবাঈ এর আজকের লেখকদের প্রসঙ্গে । প্রথমে লেখক আলোচনা এবং তার পরে তার রুবাঈ ।
শাহেদ খান
ব্লগে খুব কম পরিচিত কারণ উনি খুব লাজুক আর চুপচাপ । মাঝে দীর্ঘদিন ব্লগ থেকে বিরতি নিয়েছিলেন । পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ততায় বোধহয় লেখালেখিতে সময় দিতে পারছেন না । অবশ্য রুবাঈ তাকে ফিরিয়ে এনেছে ব্লগে ভালভাবেই । মাঝে মাঝেই ছাইরাস হেলালের ব্লগে রুবাঈ পোস্ট দিতে দেখা যায় তাকে ।
শাহেদ খানের রুবাঈ
***** ১)
বলরে সাকী, তুলে আঁখি, অনুক্ষণে,
আর কতকাল, করবি এ হাল, পোড়ামনে !
লু হাওয়া ফের, শাহেদের শের, হারিয়ে হারায় -
আর কী সাকী, আছে বাকি, তোর যতনে?
(একটু টেনে পড়তে হয় বোধহয়, বলরে সা...কী, তুলে আঁ...খি ইত্যাদি)
*****২)
ঝমঝমাঝম, ছন্দ মাতম, বৃষ্টি নামে ;
ছন্দেতে সেই, খুঁজি নিজেকেই, হৃদয়ধামে ।
শাহেদের শের, বৃষ্টিতে ঢের - ভিজে এক শা,
সেই পুরাতন, আত্মকথন, বৃষ্টিদামে...
*****৩)
কোন এক পাখি উঠল ডেকে, কেউ সেদিকে তাকায় ।
কাজ-কাম ফেলে ব্যস্ত কবি'রা বটতলাতে চা খায়...
ধম্মো বলো, কম্মো বলো, আড্ডাবাজিই সার !
তবু যদি কেউ 'অলস' বলে - অগ্নিদৃষ্টি পাকায় !!
নিশ্চয়ই ভাল লাগল । উনি এখন যতদূর জানি রুবাঈ এই মগ্ন ।
সুপান্থ সুরাহী
কবিতার ছন্দ এবং ব্যকরণ বিষয়ে বিপুল জ্ঞাণের অধিকারী এই ব্লগারকে আপনাদের সামনে পরিচয় করানোর আমার কিছু্ই নেই, কেননা তার লেখনী এবং প্রকাশভঙ্গিতে ইতিমধ্যেই তিনি সবার দৃষ্টি কেড়েছেন ।
সুপান্থ সুরাহীর রুবাঈ :
*****১)
তোমার ভেতর অনেক তুমি, তোমায় খোঁজে ফিরে
তখনো তুমি তোমায় নিয়ে লুকাও নিজের ভীড়ে !
নিজের মাঝে আলোর খনি, ভুল মালিকের হাতে
উদাস পথের পথিক তুমি হারাও তোমার নীড়ে ।
*****২)
ছুটছে সময় প্রহর শেষে, ক্লান্ত আমায় ছেড়ে ।
কমছে জীবন অনায়াসে, যাচ্ছে বয়স বেড়ে!
অমৃত দাও, সব নিয়ে যাও-প্রস্থানে মোর ভয়
আমার ফসল দেখব আমি, নিচ্ছে কারা কেড়ে।
*****৩)
মেঘ জমেছে! কী হয়েছে? নীল আছে তার পিছে-
আসুক ছায়া! জমুক মায়া ভয় কেন তোর মিছে!
মেঘের কায়া টানবে ছায়া সরোদ রবির চোখে-
জোয়ান-বুড়োর জমাট দুপুর কদম তরুর নীচে।
নিশ্চয়ই ভাল লাগল আপনাদের এই কবির তিনটি রুবাঈ পরিবেশনা ।
রেজওয়ান তানিম
নিজেকে আর কি পরিচিত করাবো ? তবে পাঠকদের জানিয়ে রাখি, রুবাঈ লেখায় আমি মোটেই সচ্ছন্দ নই । আসলে কোন ধরণের সংক্ষিপ্ত ফরমেটের কবিতাতেই আমি সচ্ছন্দ নই । আর রুবাঈ লিখছিই মাসখানেক হল । এর আগে আমি জানতামই না রুবাই কি ? কিভাবে লেখে ? তাই পাঠক কিভাবে নেবে জানি না ।
*****১)
পেয়ার দিওয়ানা মেরে দিল, তুমি তার সওদাগর ;
সওদা তোমার কালো যমুনার, প্রেম শরাবি নহর !
জাফরানি সুবাস আতর মেখে, আছি অধীর হয়ে -
আসবে সাকি, শূরা পিয়ে, হব যে আমি বিভোর ।
*****২)
রক্তে রাঙা হাতখানি মোর, কেটেছে গুলাব কাটায়
ভাবিনি গরল পূর্ণ ছিল, পেয়ালা ভরা এ শূরায় !
যা ভেবেছি আপন, তাই আমায় করে গেল অঙ্গার-
তৃষিত হৃদয়ে ছিল যত আশা, সব নি:শেষ হল হায় ।
*****৩)
দেখেছি স্বপন, বুনেছি বুনন, ছোট ছোট কত আশা
তুমি যে আমার, শুধু কল্পনার, এতটুকু ভালবাসা !
মনে ঝড় তোল, আনমনা করো, তুমি যদি গাও গান
যেন লাল শূরা, আমি বাকহারা, যত শুনি বাড়ে তৃষা !
*****৪)
আজকে আহা মাতুক না মন, ভোলা দিনের আগুন গানে !
শুকিয়ে মরা গাঙের জলে, আসুক জোয়ার ঘোর তুফানে ।
দম দেড়ে সব জীবন নায়ে, ছোটরে সবাই ব্যাকুল ধেয়ে ;
পূর্ণ যে প্রাণ যৌবণেতে, তাই খুঁজে যাই, জীবন মানে ।
*****৫)
ভেবোনা এসেছি, তোমার এ রঙ্গশালায়-
আবার দেখাতে কোন নতুন অভিনয় ।
আমি ক্লান্ত, প্রশ্ন আমার, তোমার পানে-
কবে দেবে ক্ষ্যান্ত, হবে তব বোধদয় ?
*****৬)
তোমার রূপ দেখে অবাক স্বর্গপরীরা,
ভুলেছিল তাদের স্বর্গত কাম ক্রীড়া ।
ভেবেছিল, এ নশ্বর জগতের নয়-
জান্নাতী হুর, কিংবা বেহেশতি সূরা !
*****৭)
হায় বরষা, তুমি ঝরোনা এমন করুন হয়ে !
কাজল ধুয়ে যায় প্রিয়ার আমার দেখো না চেয়ে
আকাশের বুকে মেঘ হয়ে তুমি কতই সুন্দর ছিলে;
প্রিয়ার অবাক চাউনিতে ছিলে, কী যে দৃষ্টিসুখ নিয়ে !
*****৮)
তোমার হাসির মাঝে আজ বিষাদ খুজে পাই
তোমার চোখের ভাষায় যে আভা দেখতে চাই,
হারিয়ে গেছে সে, হয়তবা বিষাদ নীলিমার প্রান্তে !
নির্মল হাসি আনব ফিরায়ে, ডিঙাব চড়াই-উৎরাই ।
ছাইরাছ হেলাল
উনাকে আর কি পরিচয় করাবো । উনি আমাকে করালেই ভাল হত । তবু পাঠকদের জন্য বলি । ব্লগে খুব কম বিদগ্ধ পাঠক আছেন । উনি তাদের মধ্যে একজন । এত বিপুল পড়াশোনার অর্ধেকের অর্ধেক আমার থাকলে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম । তো উনি রুবাঈ আগে থেকেই পড়েছেন । ইদানিং লিখতেও শুরু করেছেন ।
ছাইরাছ হেলালের রুবাঈ :
*****১ )
আমিও আধুনিক হব যুগ থেকে যুগান্তরে ।
রাখলিয়ার বাশীও শুনব মাঠের তেপান্তরে,
উত্তরাধুনিকতাকে ছুড়ে ফেলে আমি বিদ্রোহী হব...
প্রানের জ্যোৎস্নায় ছুটে যাব সবুজের গ্রামান্তরে।
*****২)
আমায় আমি অনেক খুঁজি আমার ই মাঝে ।
হঠাৎ আমি পেয়েও যাই খুঁজছি এত যাকে,
পাওয়া না পাওয়ার, এই পাওয়ায় নাচতে ইচ্ছে করে...
এমন করেই পৌছে যাব সেই আমারই মাঝে।
*****৩)
বৃষ্টি এসে হাতছানিতে ডেকে নিয়ে যায় ঐ দূরে
কানে কানে গান শুনিয়ে প্রান ভরিয়ে দেয় সুরে।
বৃষ্টি আসে বজ্র নিয়ে তাও তো জানি
প্রানের ডাকে হারাতে যে চাই ওই সুদূরে।
*****৪)
তা বাড়ুক না আরো বেশি ব্যাথা
নীল হয়ে শুনব সে অরূপ গাথা।
গোধূলির বিষণ্ন মূর্ছনায় বিষাদিত হব
সুধার পেয়ালায় কেটে যাবে সব ব্যাথা।
*****৫)
ঝমঝমাঝম, ছন্দ মাতম, বৃষ্টি আসে ।
ছন্দেতে সেই, খুঁজি নিজেকেই, হৃদয়াবেশে !
শাহেদের শের, বৃষ্টিতে ঢের - ভিজে এক শা ;
সেই পুরাতন, আত্মকথন, বৃষ্টিমাসে...
*****৬)
বলরে সাকী,তুলে আঁখি,শাহেদের পানে,
আর কতকাল,করবি এ হাল,শাহেদের মনে,
লূ হাওয়া ফের,শাহেদের শের, উচিয়েই রয়-
আর কী সাকী,আছে বাকি,তোর এ ছলনে?
*****৭)
ছুটছে সময় - নিয়ম মেনে - সময়েরই পানে
ছুটছি আমি - আপন মনে - নিজেরই টানে,
পিছু ফেলে - সময়ের যাতি - এগিয়ে আমি যাবই-
নিজেকে আমি - পাব খুঁজে - এই মহেন্দ্রক্ষণে।
*****৮)
খুনে রাঙা এ হাত কেটেছে গুলাব কাটায়
ভাবিনি গরল ছিল তোমারই শূরার ছায়ায়,
ভালবাসার অগ্নিমশাল দিয়েছি হৃদয়ে ঠাই-
দগ্ধ দহনে পূর্ণ এ প্রান তোমারই মায়ায়।
বি.দ্র : ছাইরাস হেলালের প্রথম চারটি রুবাঈ ছিল উনার নিজের মৌলিক । এর পরের দুটো শাহেদ এর গুলোকে ঘুরিয়ে, ৭ নাম্বার টা সুপান্থর টা ঘুড়িয়ে এবং সর্বশেষের টা আমার একটা লেখাকে ঘুড়িয়ে লেখা ।
আমারতো মনে হয়, আমাদের যে লেখা গুলো উনি বদলেছেন সেগুলো ভিন্নমাত্রা লাভ করেছে । আপনারা কি বলেন ??
পোস্ট শেষ । আশা করি ভাল লাগল । এবারে উৎসর্গ ।
উৎসর্গ : বাংলা ব্লগিঙ এ রুবাঈ কে জনপ্রিয় করার একক কৃতিত্ব এ টি এম মোস্তফা কামাল এর। তাই উনাকে এই চার কবির যৌথ পোস্ট রুবাঈয়াৎ উৎসর্গ করা হল । আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ উনার কাছে উনি আমাকে একটা অপ্রকাশিত রুবাঈ দিয়ে ধন্য করেছেন ।
উনার রুবাঈটি আপনাদের জন্য বোনাস -
নীলের ছোঁয়ায় চোখ ভেসে যায় মন পড়ে রয় লালে !
জামের লালে ঠোঁট ডুবে যায় চোখটা সাকীর গালে !
রঙের নানা রঙিন খেলায় দিন কেটে যায় আমার-
তুমুল খুশীর বাতাস খেলে মন পবনের পালে !
সবাইকে আবারো ধন্যবাদ রুবাঈগুলো পড়বার জন্য ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


