এখানে চুড়ি কিনতে পাওয়া যায় না। গত রমজানে একবার এক মার্কেটে চুড়ি দেখেছিলাম।
এখনো মনে পড়ে। খুব বেশী নয়। একটু একটু মনে পড়ে। হয়ত অনেক বড় হয়েছি তাই। হয়ত মনের খাতার অনেক পৃষ্ঠার নিচে চাপা পড়েছে তাই খুব মনে পড়ে না।
তবুও মনে পড়ে.....
সন্ধ্যা বেলায় দেরিতে বাড়ী ফিরলে রাগ করতে।
পাড়ার ছেলেদের সাথে ঝগড়া করলে মারতে। খুব দুষ্টু ছিলাম। হাত দিয়ে থাপ্পড় মারতে। হাতের চুড়ি ভেঙ্গে যেতো। এখন বুঝতে পাড়ি কেন ভাঙ্গত। খুব কষে মারার কারণে নয়। ওই চুড়িগুলো তখন বাবা খুব দাম দিয়ে কিনতে পারে নি। আমার গায়ে খুব গোশত থাকলেও হয়ত ওই শখের চুড়িগুলো ভাঙ্গত না।
আমার গায়ে চুড়ি ভেঙ্গে আবার আমার দ্বারাই দোকান থেকে একই রকম চুড়ি কিনে আনাতে। বাবা যেন হাত খালি দেখে কষ্ট না পায়। তাই বাবা বাড়ী আসার আগেই কিনে আনতাম। ব্যাথা পেতাম না তবুও রাগ হত।
দুপুরের খাবার পড়ে যখন পড়তে বসতাম। খালি গায়ে বসতাম। চুপ করে এসে কাছে বসতে। পিঠে হাত বুলিয়ে মমতা ভরা কন্ঠে জিজ্ঞেস করতে "খুব ব্যাথা পাইছ?" আমি কিছু বলতাম না। চুপ করে অংক করতে থাকতাম। তুমি বুঝতে পারতে। গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলতে " আহা! ফুইল্লা উঠছে। ক্যান যে দুষ্টামি কর?" আমি জানি কোন দিনও আমার পিঠ ফুলে উঠতে না। কিন্তু তুমি ওভাবেই আদর করতে। তোমার ওই হাত বুলানো আমার পূর্বের সব দু:খ ভুলিয়ে দিত। আমার সব ব্যথা যেন ভাল হয়ে যেত।
সারাদিন না পড়লে, বাবা বাড়ী আসলে তার কাছে সব বলে দেয়ার ভয় দেখাতে। কিন্তু কোন দিনই বলনি। রাত্রে ঘুমিয়ে পড়লে পেটে হাত বুলিয়ে দেখতে পেট খালি। আর তখনই উঠিয়ে খাবার খাওয়াতে। তোমার হাতেই খাওয়াতে। জোর করে খাওয়াতে...
মাঝখানে অনেক বছর...
মা! আজ আমি অনেক বড়। হ্যা, তোমাকে চুড়ি কিনে দেওয়ার সামর্থ্য আজ আছে। আরও মজবুত আরও দামী চুড়ি।
কিন্তু, এখন তো তোমার চুড়ি ভাঙ্গে না। এখন তোমার আদুরে চড় খাই না। তাই মমতাময় ওই হাতও বুলিয়ে দেওনা এখন আর।
সারা দিন ক্লাস করে এসে পাক করতে ভাল লাগে না। একা শুয়ে থাকি। বারান্দায় গিয়ে আকাশ দেখি। কিন্তু কেউ এসে খেতে ডাকে না।
লোকান্তা থেকে পিজ্জা, কাবাব এনে খাই। কিন্তু তোমার হাতের ওই মাখা ভাত এখানে নেই।
ফোনে কথা বললেই বল ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করিস। নিজের দিকে খেয়াল রাখিস। কখনও বলিনি তোমাকে তুমি কষ্ট পাবে বলে। কেমন আছ জিজ্ঞেস করলে কখনও অসুখের কথা বলিনি। খাবার খেয়েছ জিজ্ঞেস করলে খাবার সময় হোক বা না হোক সবসময়ই হ্যা বলেছি।
হয়ত সত্য বলিনি। হ্যা, মিথ্যা বলেছি। মিথ্যা বলেছি তুমি ভাল থাকবে বলে। কিন্তু আমি জানি তুমি জানতে পার।
মা! আমি মিথ্যা বললে তুমি তো বুঝতে পার। আমি ভাল না থাকলে তুমিও ভাল থাক না। আর তুমিও জেনে রেখ মা তুমি ভাল না থাকলে আমিও ভাল থাকি না। কারণ আমার নাড়ী তো তোমার সাথেই বাঁধা। তুমি ক্ষমা করো মা। তোমাকে খুব মনে পড়ে মা।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ৭:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


