তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুলের দক্ষিন এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে আজ দুপুরের পরে বাংলাদেশে আসছেন। এর আগে তিনি ভারতে ৬ দিনের দীর্ঘ এবং সফল রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের এ সফর হবে বর্তমান সরকারের সময়ে বাংলাদেশে অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপতির প্রথম সফর। এছাড়াও বিগত ১৩ বছরের মধ্যে প্রথম কোন তুর্কী রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর এটি। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা সফরে এসেছিলেন তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রপতি সুলেইমান দেমিরেল।
গত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তুরস্ক সফর করেন রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির (কমসেক) ২৫তম অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। এ সময় তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতির এ আমন্ত্রনে সাড়া দিয়ে আব্দুল্লাহ গুল বাংলাদেশে আসছেন।
গত ৭ ফেব্রুয়ারী ভারত ও বাংলাদেশ সফরের শুরুতে ইস্তানবুলের আতাতুর্ক বিমান বন্দরে সফরপূর্ব সংবাদ সম্মেলন করেন। সম্মেলনে তিনি দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক সম্পর্ক সহ সব ধরনের সম্পর্ক উন্নয়নকে তাঁর সফরের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি সফর সঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং প্রায় শ’খানেক ব্যাবসায়ী প্রতিনিধির বিশাল এক বহর।
তুরস্কের বর্তমান অর্থননৈতিক উন্নতি এবং রাজনৈতিক সম্প্রতিকে আরো গতিময় করার জন্য কাজ করছে দেশটির বর্তমান সরকার। তাদের বর্তমান বৈদেশিক নীতির কারণে তারা একদিকে আমেরিকা-ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া অন্যদিকে ইরান ও আরব দেশগুলো সহ মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে সফল হচ্ছে। কয়েক যুগ ধরে চলতে থাকা গ্রীস এবং আর্মেনিয়ার সাথে বিরুপ সম্পর্কের অবসান; সিরিয়া, জর্দান, মিশর, লিবিয়া, লেবানন, আলবেনিয়া সহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভিসামুক্ত অবাধ আচরন চুক্তি করার মাধ্যমে অতি অল্প সময়েই নিজেকে শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গত কয়েক বছর ধরে তুরস্ক নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমান করতে সচেষ্ট। বর্তমানে অর্থনৈতিক অবস্থা, সামরিক শক্তি এবং কুটনৈতিক সম্পর্কের দিক দিয়ে মধ্যপ্রচ্যের সবচেয়ে সফল দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তুরস্ককে।
সুতরাং আব্দুল্লাহ গুলের বর্তমান বাংলাদেশ সফর তুরস্কের পক্ষ থেকে যতটুকু না গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব পূর্ণ বাংলাদেশের জন্য।
তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের ১৫ তম বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশ এবং বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক বাজার। ২০০৯ সালে তুরস্ক ও বাংলাদেশের মাঝে বাণিজ্যের পরিমান ৭০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এবং এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উদৃত্ত্বিও বাংলাদেশের পক্ষে। এটিকে আগামী বছরগুলোতে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নীত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সম্পর্কে তুরস্কের অগ্রহ বরাবরই ছিল। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরকালে আব্দুল্লাহ গুল পররাস্ট্র মন্ত্রী ছিলেন। তিনি তার দেশের ক্রমবর্ধমান মজুরী বৃদ্ধির কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশকে এক সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখতেন। খালেদা জিয়ার তখনকার সফরে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তখন তিনি বাংলাদেশে শ্রমিক মজুরী কম বিধায় বাংলাদেশে একটি ইপিজেড এর জন্য তাকেঁ অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার পর এখনও পর্যন্ত সেটি হয়নি। বরং তুরস্ক সেই ইপিজেড মিশরে তৈরি করে আর আব্দুল্লাহ গুল প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নিজে গিয়ে সেটি উদ্বোধন করেন। বর্তমান সফরেও আব্দুল্লাহ গুল প্রায় ১০০ ব্যবসায়ী এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিয়ে আসছেন।
তবে বাংলাদেশ এখন তুরস্ক সম্পর্কে অনেক বেশী ওয়াকিবহাল। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে চায় বাংলাদেশ। বানিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিপু মনি তুরস্ক সফর করে একে বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক বাজার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান কমসেক সম্মলনের সময় তুরস্ক সফর করেন এবং তুরস্কের সাথে অর্থনৈতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ গুলের সাথে আলোচনা করেন। তাই আব্দুল্লাহ গুলের বর্তমান সফরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশে উচ্চপর্যায়ের তুর্কী প্রতিনিধিদলের সফর অনুষ্ঠিত না হওয়ায় এবং বিগত সরকারের সময়ে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সভাপতি পদে নির্বাচনের সময় দুই দেশের মধ্যের সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটলেও বর্তমান সরকার তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্ট। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় মনোযোগ দেয়া দরকার।
রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক এবং কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছিলেন। ভারতের সাথে বর্তমানে তুরস্কের যে সম্পর্ক তাতে ভারতের সাথে অদূর ভবিষ্যতে মুক্ত বানিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তাই তুরস্কের বিশাল বাজারটি ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশের উচিত হবে খুব শীঘ্রই মুক্ত বানিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা। বাংলাদেশ একটু চেষ্টা করলেই দুই দেশের এ চুক্তিটি করা সম্ভব। এছাড়াও বাংলাদেশের ওষুধ এবং চামড়া বা চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানির জন্য তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার।
তুরস্ক বাংলাদেশের সফটওয়ার রপ্তানি এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি উজ্জল সম্ভাবনময় একটি দেশ। অনেক সময় বাংলাদেশের প্রোকেৌশলীরা ওখানকার বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজকরতে গেলেও কাজের অনুমতি না পাওয়ায় ভিসা না পাওয়ায় তাদেরকে ট্যুরিস্ট ভিসায় কাজ করতে হয়। এ সমস্যার কুটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় হচ্ছে:
তুরস্কের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ইউরোপীয়ান ধাচেঁ হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে ছাত্র-বিনিময় যুক্তিটি নবায়ন করে এচুক্তির আওতায় ছাত্র বৃত্তির সংখ্যা দিগুণ করা।
তুরস্ক ন্যাটোর অন্যতম সদস্য দেশ। তাই এদেশের সাথে সামরিক সম্পর্ক আরো জোরদার করা। সামরিক চুক্তির আওতায় প্রতিবছর যে সদস্য সামরিক ট্রেনিংয়ের জন্য তুরস্কে যায় তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
দু দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।
বর্তমানে বাংলাদেশের কোন রাষ্ট্রদূত নেই তুরস্কে। বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল ইশতিয়াক আহমেদ চলে গেলে পদটিম শূণ্য হয়। যথা শীঘ্র একজন ডাইনামিক দেশপ্রেমী রাষ্ট্রদূত পাঠানো ।
বাংলাদেশ এবং তুরস্কের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান অন্তরায় সরাসরি কোন বিমান ফ্লাইট না থাকা। বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত দুদেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান। তার্কিশ এয়ার লাইনস এক্ষেত্রে অনেক আগেই পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিষয়টি বার বার পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে এ বিষয়টিকে তড়ান্বিত করা।
এছাড়াও বাংলাদেশের পর্যটন খাত বিমান বন্দর, গভীর সমুদ্র বন্দর, জাহাজ শিল্প, ভারি যন্ত্র শিল্প, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ নির্মাণখাতে তুরস্কের উদ্যোক্তাগণের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এক্ষেত্রে তুরস্ক ভারত সহ অনেকগুলো দেশে কাজ করছে এবং গত কয়েক বছরে যথেষ্ট সফলতার প্রমান দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে মুম্বাই, নতুন দিল্লী এবং হায়দারাবাদের বিমান বন্দরগুলোর অধুনিকায়নের ক্ষেত্রে তুর্কির এসটিএফএ (STFA), লিমাক (LIMAK), এবং চেলেবি (CELEBI) গ্রুপগুলো কাজ করেছে। বর্তমানে ভারতের অবকাঠামো গত উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে । ভারত তুরস্ককে ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যাবহার করছে।
সূতরাং আব্দুল্লাহ গুলের বর্তমান বাংলাদেশ সফর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করছে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৮:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


