ইতিহাস গড়লেন এরদোয়ান! তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান তাইয়েপ এরদোয়ান পর পর তিনবার বিজয়ী হলেন। রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেন। তুরস্কের ইতিহাসে তিনি নতুন করে জায়গা করে নিলেন।

শুধু তিন বার জয়লাভই নয়। প্রতি নির্বাচনের তার আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশী ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন তিনি। ২০০২ সালে %৩৪.২৮, ২০০৭ সালে % ৪৬.৪৭ এবং ২০১১ সালে %৪৯.৯। দুনিয়াতে হয়ত এ রকম রেকর্ড নেই। থাকলেও হাতে গোনা দু একটি থাকতে পারে। তবে যে জিনিষটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হল "ভোট বৃদ্ধি"।
প্রতিটি নির্বাচনই ওই দেশ এবং জাতির জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তুরস্কের এবারের নির্বাচনও ছিল জাতীয়, আন্তর্জাতিক এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এবার এরদোয়ানের বিপরীতে বিরোধী দলগুলো যেন আলিখিত ঐক্য গড়েছিল। প্রধান বিরোধী দল CHP এর নেতা কেমাল ক্লিচাদারোউলু পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন। দলের ভিতরেও তিনি অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসছিলেন। তাকে জনগনের ভিতর থেকে উঠে আসার কারনে এবং চেহারায় গান্ধির সাথে মিল থাকার কারণে "গান্ধি কেমাল" বলা হত। তার আগমনের সাথে "social democrat" দের মধ্যে একটি আশার আলো জেগে উঠছিল। মধ্য বাম এবং কট্টর বামপন্থী সব মিডিয়া উঠে পরে লাগছিল তার সাফল্যের জন্য। নির্বাচনী ইশতিহারে তিনি বাজার দর কমানো, পেট্রোলের মূল্যহ্রাস এবং গরীব পরিবারকে অর্থনৈতিক সাহায্যের কথা বলছিলেন। কিন্তু কোন কিছুই তাকে বিজয়ী তো দূরের কথা আক পার্টির ধারে কাছেও নিয়ে আসতে পারে নি। গেল নির্বাচনের চেয়ে এবারে তাদের ভোট এবং সংসদ সদস্য সংখ্যা বাড়লেও এটাকে ক্লিচদারোউলুর সাফাল্য হিসেবে দেখতে নারাজ তার পার্টির অনেকেই।
এরদোয়ান যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তাকে ঠেকাতে পারছে না কেউই। প্রথমে সেনাবাহিনী চেষ্টা করছিল। তারপর সাংবিধানিক আদালত। তারপর মিডিয়া। সর্বশেষ বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলোও তার বিরুদ্ধে প্রচার চালালো কিন্তু এতে তার দৌড়ের গতিতো কমলোই না বরং আরো বাড়ল। একই সাথে তুরস্কের নির্বাচনে বিদেশী সংবাদ মাধ্যমের অভুতপূর্ব ফলাও করে সংবাদ প্রচার করাকে অনেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্ক যে বড় একটা শক্তি হতে যাচ্ছে সে দিকেই ইঙ্গিত করছেন।
নির্বাচনের আগে আক পার্টি, প্রতি দুইজন ভোটার থেকে একজনের ভোট পাবে বলে আশা করেছিল। হয়েছেও তাই। শতকরা ৫০ ভাগ ভোট আক পার্টির।
দেশে এবং বিদেশে আক পার্টির ব্যাপারে অনেক প্রচারনা চলছে। কেউ একে কট্টর ইসলামী বলছে। কেউ আবার এরদোয়ানকে বাদশাহ হতে চায় বলছে। কেউ বলছে যে, তুরস্কে নতুন করে ওসমানী খেলাফত নিয়ে আসবে এই দল। এছাড়াও, ইরান, সৌদি আরব, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মত হয়ে যাবে বলে আসছে। কিন্তু আক পার্টি সব সময়ই বলে আসছে যে তারা কোন ইসলামী দল নয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করাও না। তারা শুধু মাত্র সবার জন্য সম অধিকার, গণতন্ত্র, উন্নতি এবং শান্তির জন্য কাজ করছে। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে এগুলো সবই আসলে ইসলামের কথা, মুসলমানদের কথা।
এরদোয়ান এবং আক পার্টি নির্বাচনের রেকর্ড সংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও দুই তৃতীয়াংশের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলছিল তা আর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তাদের অর্জিত আসন সংখ্য ৩২৫। আক পার্টি সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের যে ওয়াদা দিয়েছিল জনগনকে তা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে এখন। যদি ৩৩০ এর উপরে আসন পেত তবে সংবিধান প্রণয়েনর পর গণভোটে যেতে আর কোন দলের কাছে যেতে হত না। আর যদি দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩৬৭ আসন পেত তাহলে সংবিধান পাশ করাতে গণভোটেও যেতে হত না। সুতরাং বলা যায় যে আক পার্টির জন্য কঠিন এক সময় অপেক্ষা করছে।
গত কাল ফল হাতে আসার পরেই কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে CHP প্রধান কেমাল ক্লিচদারোউলু নির্বাচনে তাদের আনেক বড় অর্জনের কথা বলেছেন। তিনি গেল নির্বাচনের চেয়ে বেশী ভোট পাওয়া বেশী আসন পাওয়াকে বিজয় হিসেবে দেখছেন। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই কাজ শুরুর কথা বলেছেন।

এর কিছুক্ষন পরে আক পার্টি প্রধান এরদোয়ান দলের কেন্দ্রীয় কার্যলয়ের ব্যালকনি থেকে হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশ্যে বিজয়ী ভাষণ দেন। তিনি তার এই বার্তায় এই বিজয়কে আক পার্টির বিজয় নয় বরং তুরস্কের বিজয় হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনি তার এই "ব্যালকনি ভাষনে" শুধু মাত্র জাতীয় নয় আন্তর্জাতিক অনেক ম্যাসেজও দিয়েছেন। তিনি বলেন এই বিজয় শুধু তুরস্কের বিজয় নয় এই বিজয় পুরো মধ্য প্রাচ্যের বিজয়। শুধু মধ্য প্রাচ্য বলেই ক্ষ্যান্ত হননি এই বিজয়কে তিনি ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার বিজয় বলেছেন। তিনি সবার সাথে একত্রে কাজ করার ঘোষণা দেন। নির্বাচনের মাঠে যে বাক বিতণ্ডা হয়েছে তিনি সবাইকে তা ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "আজকের এই দিন প্রতিশোধের দিন নয়, ক্ষমা করার দিন।" "যারা আমাদেরকে ভোট দেননি তাদেরকে আমরা দূরে সরিয়ে দিবনা বরং তাদের আরো কাছে যাব। তাদেরকে কাছে টেনে নিতে হবে।" তিনি নতুন সংবিধানের জন্য সবার সাথে আলোচনা করারও ঘোষণা দেন। নতুন তুরস্কের জন্য, তুরস্কের গণতন্ত্রের জন্য, অগ্রগতির জন্য তিনি সকলের সাথে একত্রে কাজ করার উপর জোর দেন।
তুরস্কের এবারের নির্বাচনে পশ্চিমা বিশ্বের মত মধ্য প্রাচ্যও খুব কাছে থেকে নজর রাখছিল। আল-জাজিরা এবং সি এন এন এরদোয়ানের "ব্যালকোনি ভাষনকে" সরাসরি সম্প্রচার করে। আক পার্টিকে বিজয়ী ঘোষনার সাথে সাথে লিবিয়া, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিজয়ী মিছিল দেয়। "ধন্যবাদ এরদোয়ান, আমরা তোমায় ভালবাসি" স্লোগান দেয়।
সর্বশেষ, তুরস্কের এই নির্বাচন যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সামনের দিনগুলো। দেশের ভিতরে এবং বাইরে থেকে আক পার্টির প্রতি চাপ যেমন আছে, প্রত্যাশা তার চেয়েও বেশী। দেশের জন্য নতুন একটি সংবিধান, মধ্য প্রাচ্যের জন্য নতুন একটা মুক্তি। আক পার্টি সরকার এবং এরদোয়ান এই চাপের বিপরীতে কতটুকু প্রত্যাশা পুরণ করতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


