বাবার ৩০ টার মত ভেড়া আর দুইটা গরু ছিল। এগুলো নিয়ে সারা দিন ব্যস্ত থাকত বাবা। মা গৃহিণী। সবচেয়ে বড় ভাইয়ের বয়স দশ বছর। ওদের গ্রামে কোন স্কুল নেই। দূরের গ্রামে পড়াতে পাঠানোর সাহস দেখায়নি ওর বাবা মা। আর পয়সায়ও কুলিয়ে উঠতে পারে নি।
যা হোক আব্দুসসামাদ জন্মের ৫ বছর আগে থেকে শুরু হয় আল-শাবাবের সাথে সরকারের সংঘর্ষ আর প্রায় একই সাথে শুরু হয় মরণ খড়া । বর্ষাকাল বলতে যে ঋতুটা ছিল তা যেন ইতিহাস হয়ে গেল। একাধারে পাঁচ বছর বৃষ্টি না হওয়ায় আস্তে আস্তে শুকিয়ে যেতে থাকে ডোবা, নালা, নর্দমা, খাল বিল। এমনকি হ্রদগুলোও শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। মাঠে ফসল ফলানো তো দূরের কথা পশুর খাবার পাওয়াও হয়ে উঠেছে অসম্ভব। একে একে মারা যেতে থাকে সবগুলো ভেড়া। শেষ সম্বল হিসেবে একটি গরু ছিল ওদের। সেটিও ওর জন্মের সময় বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
দূর্ভিক্ষের মধ্যে জন্ম ওর। মা-বাবা পুষ্টিহীন। এক বেলা আধা বেলা খেয়ে দিনাতিপাত করা এই মায়ের উদরের আব্দুস সামাদও জন্ম নেই অপুষ্টির মাঝে। জন্মের সময় ওর ওজন ছিল আড়াই কি তিন কেজি। ওর জন্মের দশ দিনের মাথায় পরিবারকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। সহায় সম্বল যা ছিল সবই শেষ। মাঝে মাঝে ত্রানের খাবার পেত সেগুলো দিয়ে কোন মতে দিনাতিপাত করত ওরা। কিছুদিন ধরে ত্রানের খাবারও আসা বন্ধ। আল-শাবাবের অস্ত্রধারী গ্রুপ ত্রাণ আসার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। শেষমেষ একদিন বাড়ি ঘড় ফেলে রেখে সপরিবারে পাড়ি জমায় রাজধানী মোগাদিশুর উদ্দেশ্যে। যে দিন গ্রাম ত্যাগ করে সেদিনে ওর বয়স মাত্র দশ দিন। এতটুকু ছোট বাচ্চাকে নিয়ে পথে বের হতে মায়ের মন একবারও সায় দেয় নি। কিন্তু উপায় যে নেই। একটি বাসে চরে চার দিন চার রাত চলার পর পৌছে মোগাদিশু। কিছুদিন পর ওই গ্রামের ৩০০ লোকের সকলেই গ্রাম ছেড়ে আসে। মোগাদিসুতে ২০ ডলারে একটি বাসা ভাড়া নেয় ওরা। বাসা না একটা রুম মাত্র। বাবা একটি মার্কেটে কুলির কাজ করত। যেদিন কাজ পেত সেদিন খেত। যেদিন পেত না সেদিন না ক্ষেয়ে থাকত। কিছুদিন পর যুদ্ধের রেশ এসে পড়ে মোগাদিশুতেও। ওই মার্কেটও গুড়িয়ে দেয়া হয়। সবাই যে যেখানে পারে পালাতে শুরু করে। কিন্তু ওদের তো আর পালানোর পথ নেই। শরনার্থী শিবিরে গিয়ে থাকে কিছুদিন। কিুন্তু ততদিনে পরিবারের সকলের ছোট সন্তান আবদুস সামাদের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েগেছে। জন্মের পর থেকেই ক্ষুধার সাথে যুদ্ধ করতে করতে ওর শরীর হাল ছেড়ে দিয়েছে। এখন খাবার দিলেও আর খাবার নেয় না ওর শরীর। একই অবস্থা অন্য দুই ভাইয়ের ছোট বোনটি কানে শোনতে পায় না। একদিন বোমা বিস্ফোরনের পর থেকে আর শুনতে পায় না। ডাক্তাররা বলছেন ও আর শুনতে পাবে না কোনদিন। কিন্তু মা বাবার সবচেয়ে বেশী চিন্তা ছোট ছেলে সামাদকে নিয়ে। কোন খাবারই নিতে পারে না। কান্না কাটি করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মা-বাবা মোগাদিশুর দুটি হাসপাতালেও নিয়ে গিয়েছিল ওকে। ডাক্তাররা বলছে তাদের আর কিছু করার নাই। মা-বাবার সন্তানতো। যত কষ্টেই থাক কেউ সন্তানকে হারাতে চায় না। কোথাও থেকে একটু খাবার পেলে সন্তানদেরকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। ছোট ছেলেটিকে নিয়েই সবচেয়ে বেশী দুশ্চিন্তা। হঠাৎ একদিন সংবাদ পায় হাসপাতালে বিদেশ থেকে ডাক্তার আসছে কোন দেশের তা জানে না। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় সন্তানকে নিয়ে। বিদেশী ডাক্তারদের কাছে নিয়ে যায়। বিদেশি ডাক্তাররাও বলে যে ওর চিকিৎসা এখানে সম্ভব না। তবে বিদেশে নিয়ে গেলে সুবিধে হতে পারে। আশার আলো যেটুকু দেখেছিল তাও যেন নিভে গেল দপ করে। পরে ওই বিদেশী ডাক্তাররা ওদেরকে জানালো যে, আবদুস সামাদকে তারা তাদের দেশ তুরস্কে নিয়ে যেতে চাচ্ছে চিকিৎসা করাতে। তুরস্কের নাম তেমন শুনেনি ওরা। তবুও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ডাক্তারদেরকে হ্যা বলে দেয়। শুধু মাকে সহ আবদুস সামাদ চলে আসে তুরস্কের শহর ইস্তানবুলে। ওদেরকে ভর্তি করানো হয় আভিজেন্না (ইবনে সিনা) হাসপাতালে। শুধু আবদুস সামাদ একা নয়। ওর সাথে আরও তেরটি শিশুকেও নিয়ে আসে ডক্টরস ওয়ারল্ড ওয়াইড এর ডাক্তাররা। ইহাহা এর সহায়তায় এখন ওদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভির করছে প্রচুর লোক। ওদের দেখতে আসছে। ওদের জন্য পোশাক, ছুতা, খেলনা, খাবার কতই কিছুই না নিয়ে আসছে সবাই। অন্যান্য ওয়ার্ডের রোগীদের আপনজনরা প্রায়ই ওদের দেখে যাচ্ছে। কোন কিছুর দরকার আছে কিনা জিজ্ঞেস করছে। ওদের ভাষা বোঝে না কিন্তু সে কি আদর। আদর করতে কি আর ভাষা লাগে!
গত এক সপ্তাহ ধরে আছে এই হাসপাতালে। এক সপ্তাহে আবদুস সামাদের সাস্থের অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন হাত পা নাড়াচ্ছে। কান্না-কাটি করতে পারছে। শুধু সামাদই নয় প্রায় সবগুলো শিশুই সুস্থ হয়ে উঠছে। আবদুস সামাদের মা সহ অন্য শিশুদের মা-বাবারাও আরও তরতাজা হয়ে উঠছে। কিন্তু সকলের চোখে একই আতন্ক বারবার খুরপাক খাচ্ছে। এখান থেকে দেশে ফিরে সকলকে সুস্থ পাবেতো। জীবিত থাকবে তো সবাই। এক সন্তানকে সুস্থ করে নিয়ে যেতে যেতে অন্য সন্তান যেন আরও বেশী অসুস্থ না হয়। দেশে গিয়ে একমুঠো খাবার ছোট একটি কাজ যেন পায়। যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় যেন। আগের সেই সুখের দিনগুলো যেন ফিরে আসে। হাসপাতালে সন্তানের বেডের পাশে বসে আব্দুস সামাদের মা একথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ফেলছিলেন আর আমাকে বলছিলেন, "ভাই আমাদেরকে বাঁচান আমাদের সন্তানদেরকে বাঁচান!" আমি কোন উত্তর দিতে পারি নি। শুধু ওই অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। কি উত্তর দেব আমি? আমাদের মানাবতাবোধ ধ্বংস হয়ে গেছে!!
এধরনের এক দু সমাদ নয়। এমনকি ১৪ সামাদও না। লক্ষ লক্ষ সামাদেরা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে সোমালিয়া, ইথিওপিয়া এবং কেনিয়াতে। পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রাসী নীতি আর আমানবিক রাজনৈতিক শিকার পূর্ব আফ্রিকা গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি আজ। খাদ্য সহযোগীতার পাশাপাশি চিকিৎসা, এবং শিক্ষার দিকেও সমভাবে গুরুত্ব দেয়া দরকার। বিশ্ব বিবেক শুধু মাত্র স্বার্থ অনেষ্বণ না করে অবজ্ঞা অবহেলায় ফেলে রাখা এই জনপদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে এই আশায়...
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ২:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


