আমরা কি এই মহাকাশে একলা? মানুষ ছাড়া এই মহাজগতে আর কি কোন গ্রহে কেউ নেই? এই প্রশ্ন এর মুখোমুখি আমরা সেই প্রাচীনকাল থেকে। এই যে এত বিশাল মহাকাশ, কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র এর মধ্যে একটিতেও কি মানুষের মত কোন বুদ্ধিমান প্রাণী এর আবির্ভাব হয়নি? একলা মানুষ সুদূর আকাশের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে তার নিজের কাছে। মানুষের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত এগিয়েছে মানুষ ততই এই প্রশ্নগুলি উত্তর খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছে।
আমাদের বর্তমান টেকনোলজি দিয়ে মানুষ এর পক্ষে একটা দূরত্বের পরে আর অতিক্রম করা সম্ভব নয়। এর মধ্যে সব থেকে আলোচিত মাধ্যম হল রেডিও তরঙ্গ। যদি অন্য কোন গ্রহ থেকে কেউ মানুষ এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তবে রেডিও তরঙ্গ এর মাধ্যমেই সম্ভব। আর যদি তা হয়ে থাকেই, তবে মহাকাশ থেকে যে রেডিও তরঙ্গ আসছে তা পর্যবেক্ষণ করে দেখা উচিত। এই উদ্দেশ্য কে সামনে রেখে Search for Extraterrestrial Intelligence সংক্ষেপে SETI শুরু হয়। প্রথম SETI নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ১৯৫৯ সনে। Drs. Philip Morrison এবং Guiseppe Coconni সেই সময় Nature পত্রিকাতে প্রথম Searching for Interstellar Communication নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। সেটিই এই SETI এর সূত্রপাত ঘটায়।
Contact সিনেমাতে এইরকমই Ellie Arroway ও তার সঙ্গী গবেষকরা আকাশের রেডিও তরঙ্গ বড় বড় টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে ও পরিশেষে তারা একটি গ্রহ থেকে তরঙ্গ পায় এবং তা দিয়ে তারা মহাকাশযান তৈরী করে। কিন্তু কল্পনার সেই জগত নয় বাস্তবেও ঠিক একই রকম কাজ হচ্ছে।
মহাকাশ থেকে যে রেডিও তরঙ্গ আসছে তার প্রায় সবই Noise এ ভরা থাকে। উপরের চিত্রে এমনি একটি Arecibo রেডিও টেলিস্কোপ এর ছবি। মহাকাশের অন্য কোন গ্রহ থেকে বুদ্ধিমান কেউ যদি রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে কোন তথ্য পাঠায় তবে তা এই তরঙ্গগুলির মধ্যে কোথাও না কোথাও খুঁজলে পাওয়া যাবে। এছাড়া যদি কোন সিগন্যাল কোন গ্রহ থেকে পাঠানও হয় তবে কত চ্যানেলে পাঠাচ্ছে তা জানাও একটি বড় সমস্যা। কেননা অসংখ্য চ্যানেল দিয়ে তা পাঠান সম্ভব। ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের সাধারণ রেডিও এর চ্যানেল এর সাথে মিল আছে। কোন রেডিও স্টেশন ধরবার জন্য রেডিওর নব ঘুরিয়ে আমরা চ্যানেল পরিবর্তন করতে থাকি। কিন্তু মহাকাশের রেডিও তরঙ্গকে পর্যবেক্ষণ করবার জন্য অনেক বড় রেডিও টেলিস্কোপ দরকার এবং সেগুলি পর্যবেক্ষণ করবার জন্য অনেক সুপার কম্পিউটার দিয়ে যাচাই করা দরকার। কিন্তু একক কোন প্রতিষ্ঠান বা গবেষণা কেন্দ্রের পক্ষে এই বিশাল ক্যালকুলেশন করা কঠিন।
১৯৯৯ সনে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে Dan werthimer ও David P. Anderson দুজন বিজ্ঞানী SERENDIP প্রজেক্ট এ কাজ করছিলেন। তারা দেখেন যে Arecibo এন্টিনা থেকে যে তথ্য প্রজেক্ট এ ব্যাবহৃত হয় তার একটা বৃহৎ অংশই পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়না। তা দেখবার জন্য বিশাল বিশাল সুপার কম্পিউটারের প্রয়োজন। কিন্ত যদি সেই তথ্যগুলিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে নেয়া হয় তবে সাধারণ কম্পিউটার এর মাধ্যমে ক্যালকুলেশন করে পর্যবেক্ষণ করে দেখা সম্ভব। সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা যখন তাদের কম্পিউটার ব্যাবহার করে না তখন এই ক্যালকুলেশনের জন্য কম্পিউটারটি ব্যবহার করা যায়। তারা SETI@home নামের একটি স্ক্রিণসেভার (Screensaver) তৈরী করেন। স্ক্রিণসেভার হল একটি সাধারণ প্রোগ্রাম যখন কম্পিউটার দীর্ঘণ ব্যবহার করেন না তখন তা চালু হয় ও স্ক্রীনে বিভিন্ন ছবি দেখা যায়। এই স্ক্রিণসেভারটি বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের SETI হোমপেজ থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
স্ক্রিনসেভারটির লিংক
SETI@home কিভাবে কাজ করে:
SETI এর ক্ষেত্রে বড় বড় রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের রেডিও তরঙ্গগুলিকে SETI এর কম্পিউটারে রেকর্ড করে রাখা হয়। সেই তথ্যগুলিকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিটে ভাগ করে রাখ হয়। যখন কেউ এই SETI প্রোগ্রাম তার কম্পিউটারে ইন্সটল করে, তখন তার কম্পিউটার না ব্যবহার করবার সময় স্ক্রিণসেভারটি অটোমেটিক চালু হয় এবং তা SETI এর কম্পিউটার থেকে একটি করে কাজের ইউনিট ইন্টারনেটের মাধ্যমে ডাউনলোড করে নিয়ে আসে। SETI এর কম্পিউটার প্রোগ্রামটি সেই তরঙ্গের ভিতর কোন গুরুত্বপূর্ণ ডাটা আছে কিনা তা যাচাই করে। একটি ইউনিট এর কাজ শেষ করতে প্রায় ১২ ঘন্টা লাগে। অবশ্য তা কম্পিউটারের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে৷ একটি ইউনিট এর কাজ যাচাই করে শেষ করার পর, সেই ফলাফল SETI এর মূল কেন্দ্রে আবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। এইভাবে সারা পৃথিবীতে অসংখ্য প্রোগ্রাম সব সময তথ্য বিশ্লেষন করে দেখছে। যদিও এইসব বড় বড় ক্যালকুলেশন এর কাজ করবার জন্য সাধারণ কম্পিউটারের পরিবর্তে সুপার কম্পিউটার ব্যবহৃত হয় কিন্তু কাজগুলিকে ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ করে নেবার কারণে সাধারন কম্পিউটার দিয়েও মহাকাশ থেকে আসা তথ্য বিশ্লেষন করা সম্ভব। যেখানে সুপার কম্পিউটার দিয়ে করার ফলে অনেক খরচ হয় সেখানে এই পদ্ধতিতে প্রায় বিনা মূল্যে করা সম্ভব। SETI@home এর বর্তমান ব্যাবহারকারীর সংখ্যা এর ৪৫,৭৬,১১৫ (এই প্রবন্ধটি লিখবার সময়)। ৪৫ কোটি লোকজন তাদের কম্পিউটার যখন ব্যবহার করে না তখন এইভাবে বিজ্ঞানের জন্য তারা তাদের কম্পিউটারটি ব্যবহার করে। আর এখন পর্যন্ত সবাই মিলে যে ১৫৩১০৯৫.৭৮৬ বছরের সমান কম্পিউটার ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মোট ৩১৯ জন এই SETI@home প্রজেক্টে অংশ নিয়েছে। তবে SETI@home এর কাজ সফল করবার জন্য আরো সচেতনতার প্রয়োজন। আপনি খুব সহজে প্রোগ্রামটি ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিয়ে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে এই প্রজেক্টে অংশ নিতে পারেন।
SETI@home এর ১০০,০০০; ৭৫,০০০; ৫০,০০০; ২৫,০০০; ১০,০০০; ৭,৫০০; ৫,০০০; ২,৫০০; ১,০০০; ৭৫০; ৫০০; ২৫০ ও ১০০ টি ইউনিট কাজ শেষ করলে SETI@home থেকে একটি সার্টিফিকেট দেয়। যেটি আপনার একটি ব্যক্তিগত ক্রেডিট হিসাবে বিবেচিত হবে।
বর্তমানে প্রতিবছরই কম্পিউটারের দাম কমছে। আমরা খুব অল্প সময়ের জন্য আমাদের কম্পিউটার ব্যবহার করি, কিন্তু যখন কম্পিউটারটি ব্যবহার করিনা, তখন এই প্রজেক্ট এ অংশ নিয়ে আমাদের কম্পিউটারের একটি সুন্দর ব্যবহার করতে পারি। ফলে যখন কম্পিউটারের দাম কমে যাবে তখন অন্তত এই বলে সান্তনা পেতে পারি যে আমাদের কম্পিউটারটি বিজ্ঞান এর জন্য কিছু কাজ করছে।
অবশ্য এর বিপরীতে অনেকই এই SETI@home কে অর্থ ও সময়ের অপচয় বলে মনে করেন। কেননা আজ পর্যন্ত এই প্রজেক্টের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কোন আশার আলো দেখা যায়নি। আজ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাতে শুধু মাত্র কিছু Noise পাওয়া গেছে। অন্য কোন গ্রহের কোন পাঠান তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে, যদিও তাতে কারো পাঠান কোন তথ্য নাও পাই তবুও এটা তো অন্তত আমরা সুষ্পষ্ট ভাবে বলতে পারবো যে সেখানে কারো পাঠান কোন তথ্য নেই। যদি তা না দেখতাম তবে তা অজানাই থেকে যেত। ব্যাপারটা অনেক অন্ধকার ঘরের মত। যদি আপনার পাশে কোন অন্ধকার ঘর থাকে আর যদি তা আলো জ্বেলে দেখেন যে, সেই ঘরে কিছুই নেই। তবে সেই আলো জ্বেলে দেখার হয়তো কোন মূল্য নেই। কিন্তু যদি সেই অন্ধকার ঘরটি না দেখতেন, তবে জানতে পারতেননা যে তাতে কি আছে। আলো জ্বেলে পরখ করে দেখলে, এইটুকু অন্তত সন্দেহাতিত ভাবে বলতে পারেন যে, ওই ঘরে কিছু নেই। SETI@home এর ব্যাপারটাও সেইরকম।
লেখক: ড: মশিউর রহমান। আমেরিকার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞানিক হিসাবে কর্মরত।
স্পেশালিস্ট: ন্যানোপ্রযুক্তি, বায়োসেন্সর, সিলিকন ডিভাইস, LSI, STM, AFM, SEM, Fabrication

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

