(এই গল্প কাল্পনিক। কারো সাথে মিলে গেলে তা নিতান্তই কাকতালীয় ঘটনা)
ক্লাস করে হলে এসে মাত্র বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম, এমন সময় ফোন দিলেন সাফিন ভাই।
-আসসালামুয়ালাইকুম ভাই।
-অয়ালাইকুম আসসালাম। তুই কই জাভেদ?
-ভাই, আমি রুমে।
-একটু আমার রুমে আয় তো।
-কেন ভাই?
-আয়, দরকার আছে।
-ভাই, টায়ার্ড লাগতেছে। মাত্র ক্লাস কইরা আসলাম। কালকে রাতে তো ঘুমাইতে পারি নাই। এখন ঘুম পাইতেছে।
-আরে তুই পাঁচ মিনিটের জন্য রুমে আয়।
-আচ্ছা আসতেছি।
শোয়া থেকে উঠলাম। মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। এখন আবার প্যান্ট পরো, চারতলায় যাও, বড় ভাইয়ের ফাই ফরমাস খাটো। হলে উঠার পর থেকে দুইটা মাস পুরা জীবনটা ভাজা ভাজা করে দিল এই ইমিডিয়েট সিনিয়ররা।
এখনো রুম পাইনি। গণরুমে থাকি প্রায় ২০ জন গাদাগাদি করে। অন্য আরেকটা গণরুমে থাকে ১৮ জন। এই গণরুমকে মোটামুটি একটা শরণার্থী শিবির হিসেবে চালিয়ে দেয়া যায়। সারি সারি বিছানা পাতা মেঝেতে, একটা বিছানাও গুছানো নেই, এখানে সেখানে কাপড় চোপড় ঝুলছে, বিছানার মধ্যে কাপড় চোপড়ের স্তুপ, বইখাতা এদিক সেদিক ছড়ানো। আমাদের অভিভাবকদের কেউ এই রুমে ঢুকলে সাথে সাথে একটা এম্বুলেন্স ডেকে পাঠাতে হবে।
হলে উঠার তিনদিনের মাথায় আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়ররা আমাদের নিয়ে একটা মিটিং করে। যদিও এটাকে মিটিং না বলে আদব লেহাজ শেখানোর সেমিনার বলা যায়। আমাদের আদব লেহাজ শেখানোর মহান দায়িত্ব তারা হাতে নিয়েছেন। হলে কি করা যাবে, কি করা যাবে না, বড় ভাইদের দেখামাত্র সালাম দিতে হবে, রুম থেকে এক মিনিটের জন্য বের হলেও প্যান্ট পরে বেরোতে হবে-কোনো অবস্থাতেই লুঙ্গি পরে বেরোনো যাবে না, রাত দশটার পর টিভি রুমে যাওয়া যাবে না-শুধুমাত্র কোনো বিশেষ খেলা থাকলে যাওয়া যাবে-এরকম আরো হাজারটা নিয়ম। সবগুলো মনে নেই, আগে বললে কাগজ কলম নিয়ে গিয়ে লিখে ফেলা যেত।
লুঙ্গি পরিবর্তন করে প্যান্ট পরে সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠলাম। ৪০৩ নাম্বার রুম। দরজা নক করলাম। -ভাইয়া আসব?
-কে?
-আমি জাভেদ।
-ও জাভেদ, আয় আয়। ভেতরে আয়।
আমি ভিতরে ঢুকলাম। -আসসালামুয়ালাইকুম ভাই।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম। বস।
আমি খাটে বসলাম। সাফিন ভাই তার টেবিল থেকে কিছু প্র্যাক্টিক্যাল খাতা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন-কিছু ছবি এঁকে দিতে হবে।
আমি প্রমাদ গুনলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং, মেজাজ খারাপ করা একটা বিষয়। এর ছবি আঁকা আরো বিরক্তিকর। কত রকম হাবিজাবি ছবি যে আঁকতে হয়!
আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কয়টা ছবি?
সাফিন ভাই বই খুলতে খুলতে বললেন- আমি দেখিয়ে দিচ্ছি কি কি আঁকতে হবে।
এরপর সাফিন ভাই একটা একটা করে আমাকে দেখাতে লাগলেন কি কি আঁকতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০টা ছবি। আমার চোখমুখ অন্ধকার হয়ে গেল। কোন কুক্ষণে যে আমি পয়লা বৈশাখের দেয়াল পত্রিকার ডিজাইন করতে গিয়েছিলাম! এই ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িঙের জ্বালায় জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেল!
আমি যখন মুখ কালো করে সাফিন ভাইয়ের রুম থেকে বের হচ্ছি, তখন সাফিন ভাই বললেন- শোন, আজকে রাতের মধ্যেই কিন্তু সব কমপ্লিট করে রাখবি। আমার কালকে সকালেই লাগবে।
মনে মনে সাফিন ভাইকে অসংখ্য গালি দিয়ে গণরুমে ফিরলাম।
[২]
-জাভেদ, আজকে ইপিএলে কার খেলা?
আমি মোবাইলে গেম খেলছিলাম। সামিরের দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলাম- কার জানি খেলা, কার জানি খেলা.........আজকে শনিবার না?
সামির মাথা নাড়ল। -হ্যাঁ।
তারপর হঠাৎ শোয়া অবস্থা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বললাম- আরে আজকে তো চেলসি-আর্সেনাম খেলা। কয়টা বাজে?
সামির ঘড়ি দেখে বলল- ১০টা ২০।
-খেলা শুরু সাড়ে ১০টায়। চল টিভি রুমে যাই।
-এত রাতে যাবি? ভাইরা না মানা করছে ১০টার পর টিভি রুমে যাইতে ?
-খেলা থাকলে তো যাইতে অসুবিধা নাই। ভাইরা না বলছে খেলা থাকলে যাওয়া যাবে।
-চল তাইলে।
আমি বিছানা থেকে উঠে প্যান্ট পড়লাম। তারপর গণরুম থেকে টিভি রুমের দিকে যাওয়া শুরু করলাম।
টিভি রুমে ঢুকে দেখি দুই বড় ভাই ছবি দেখছে। ভারতীয় বাংলা সিনেমা। প্রসেনজিৎ আর ঋতুপর্নার ছবি। মনে হয় রোমান্টিক কমেডি ধাঁচের সামাজিক ছবি। দুই ভাই খুব আগ্রহ নিয়ে ছবি দেখছে। আমরা দুইজন যে টিভি রুমে এসেছি তাঁরা দুইজন টের পায়নি।
আমরা দুইজন চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকলাম। এই ছবি কখন শেষ হবে কে জানে। মনে হচ্ছে ছবির মাঝামাঝি অবস্থায় আছি। নায়ক নায়িকাদের বাসায় গেছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু নায়িকার বাবা নায়ককে অপমান করে বের করে দিয়েছে।
আমি মোবাইলে সময় দেখলাম। ১০টা ৩৫ বাজে। খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। কি করা যায় ভাবছি। যেই দুই ভাই ছবি দেখছে তাঁরা সম্ভবত থার্ড ইয়ারে পড়ে। কিভাবে তাদেরকে বলি আমরা খেলা দেখতে চাই তাই ভাবছি।
এমন সময় বিজ্ঞাপন বিরতি দিল। আমি পিছন থেকে বললাম- ভাই, একটু ইএসপিএন দিবেন? খেলা দেখব।
দুইজনই চমকে পিছনে তাকাল। আমরা যে এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি পিছনে তা ওনারা টের পায়নি।
-তোমরা ফার্স্ট ইয়ার না?
আমরা মাথা নাড়লাম।
-এত রাতে তোমাদের টিভি রুমে আসতে মানা করা হয় নাই? যাও, নিজেদের রুমে যাও।
আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম-কিন্তু ভাই, আমাদের বলা হইছিল যদি খেলা থাকে তাহলে আমরা রাতে ১০টার পরেও টিভি রুমে আসতে পারব।
বড় ভাইরা মনে হয় একটু ক্ষেপে গেলেন আমার কথা শুনে। একজন বললেন-এই তোমার নাম কি? মুখে মুখে তর্ক করছ আবার, নাম কি তোমার?
আমি নাম বললাম।
-যাও, নিজের রুমে যাও। খেলা দেখা লাগবে না। যাও।
আমরা দুইজন চুপচাপ গণরুমে ফিরে এলাম।
পরদিন রাতে সাফিন ভাইয়ের রুমে আমাদের দুজনের ডাক পড়ল। গেলাম দুইজন। ওখানে সাফিন ভাই, তার দুই রুমমেট ছাড়াও আরো অনেক বড় ভাই উপস্থিত আছেন।
-তোরা দুইজন কালকে রাতে টিভি রুমে কি জন্য গেছস? রুমে ঢুকার সাথে সাথেই জাফর ভাই প্রশ্ন করল।
আমি বললাম- ভাই, খেলা দেখতে গেছিলাম।
-কি খেলা? সাদেক ভাই জিজ্ঞেস করল।
-ইপিএল, চেলসি আর আর্সেনালের খেলা, সামির জবাব দিল।
-তোরা দেখস নাই যে সিনিয়র ভাইরা টিভি দেখতেছে?
আমরা মাথা নাড়লাম।
-তাইলে আবার বলছস কেন যে খেলা দেন? হুঙ্কার দিলেন খালেদ ভাই।
-আসলে ভাই তখন এড শুরু হইছিল, তাই বলছিলাম যে একটু খেলাটা দিতে, আমি মিনমিন করে বললাম।
সাফিন ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- দ্যাখ জাভেদ, তোর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। তুই এর আগেও কিছু ফল্ট করছস। ঠিকমত বড় ভাইদের সালাম দেস না। সেদিন শুনলাম পেপার পড়তে আসছিল ফোর্থ ইয়ারের এক ভাই, আর তুই ওনারে জায়গাই দিতেছিলি না। পেপার পইড়াই যাইতেছিলি।
আমি কিছু না বলে চুপচাপ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাফিন ভাই বললেন- জাফর, তোর জন্য এটাই লাস্ট চান্স। তোর নামে আর কোনো রিপোর্ট আসলে তোর কপালে দুঃখ আছে। যা তোরা এখন।
আমরা দুইজন চুপচাপ বেড়িয়ে আসলাম।
[৩]
রাতে খাওয়ার জন্য ডাইনিং এ যাওয়ার পথে হলের নোটিশ বোর্ডে চোখ পড়ল। ইনডোর গেমসের একটা পোস্টার টানানো সেখানে। হলের বাৎসরিক ইনডোর গেমস। দাবা, ক্যারাম, তাস, টেবিল টেনিস-এই চার ধরণের খেলা হবে। হলের যে কেউ অংশগ্রহন করতে পারবে। নাম এন্ট্রি চলছে। টুর্নামেন্ট শুরু এক সাপ্তাহ পর।
পুরা হলের মধ্যে একটা উৎসব উৎসব আবহ চলে এল। কমনরুম সারাক্ষণ ভর্তি থাকে। সবাই টিটি, ক্যারাম প্র্যাকটিস করছে। সব ইয়ারের সবাই মিলে খেলাধুলা করছে।
আমি টিটিতে নাম দিলাম। কিন্তু প্র্যাকটিস করার সুযোগ পাচ্ছি না। টিটির বোর্ড আছে মাত্র দুইটা। এদের মধ্যে একটা আবার নষ্ট। সারাক্ষণই বাকিটায় ভিড় লেগে থাকে। আর সিনিয়রদের জন্য ঠিকমত খেলাও যায় না। দেখা গেল প্রায় দুই-তিন ঘন্টা ধরে বসে আছি। ওনারা খেলেই যাচ্ছেন, খেলেই যাচ্ছেন।
মাঝে মাঝে যখন সুযোগ পাই, তখন আমাদের ইয়ারের কিছু উৎসাহী ছেলেদের সাথে খেলি। এদের অনেকেই টিটি ব্যাট এর আগে কখনো ধরেও দেখেনি। নির্দোষ সব বলেও তারা ছক্কা মারে। প্র্যাকটিস করে খুব একটা মজা পাই না।
টিটিতে মোট ৭০টার মত নাম জমা পরেছে। খেলা হবে নক আউট সিস্টেমে। তিন সেটের খেলা। প্রতি সেটে ২১ পয়েন্ট। গ্রুপিং করা হল। এবং প্রথম রাউন্ডেই আমার খেলা পড়ল গত বছর হল চ্যাম্পিয়ন সাফিন ভাইয়ের সাথে।
দেখতে দেখতে টুর্নামেন্ট শুরু হয়ে গেল। সাফিন ভাইয়ের খেলা এখনো দেখিনি। যেহেতু হল চ্যাম্পিয়ন, নিশ্চয়ই খুব ভাল খেলে। প্রথমদিনই রাত সাড়ে নয়টায় আমার আর সাফিন ভাইয়ের খেলা। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত আছি ওনার হাতে আরেক প্রস্থ অপমান হতে। হলের চ্যাম্পিয়ন আমাকে উড়িয়ে দেয়ার কথা।
সাড়ে নয়টার কিছু আগে আমি রুম থেকে বের হলাম। কমনরুম দোতালায়। ধীরে ধীরে আমি কমনরুমের দিকে এগিয়ে চলেছি। কমনরুমের বাইরে পশ্চিম দিকে টানা বারান্দা। বারান্দাটা অন্ধকার। আমি দেখলাম সাফিন ভাই আরেকজন ভাইয়ের সাথে ঐ অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে কথা বলছে। ঐ ভাই সম্ভবত থার্ড ইয়ারে পড়েন। আমাকে তারা দেখতে পায়নি। আমি শুনলাম থার্ড ইয়ারে পড়ুয়া ভাই সাফিন ভাইকে বলছে-শোন সাফিন, খেলা তাড়াতাড়ি শেষ করবা। জাভেদের খেলা দেখছি। খুব একটা ভাল খেলে না। হুদাই খেলা লম্বা করবা না। তোমার আবার স্বভাব খারাপ। প্লেয়ার ভাল না হইলে তুমি খেলা টাইনা লম্বা করো। পারলে নীলে গেম দিয়া খেলা শেষ করবা। এইবার টিটিতে ম্যালা পোলাপান নাম এন্ট্রি করছে। সো কুইক গেম শেষ করবা।
ঐ অন্ধকারের মধ্যেও আমি দেখলাম সাফিন ভাই হাসিমুখে বলছে-দেখি।
-দেখাদেখি নাই। খেলা কুইক শেষ করবা।
মেজাজ খুবই খারাপ হয়ে গেল কথা শুনে। আমি আর যাই হোক এত খারাপ খেলি না যে আমাকে নীলে গেম দিয়ে দিবে। আল্লাহ্র কাছে মনে মনে দোয়া করলাম যেভাবেই হোক অন্তত এই ম্যাচটা যেন জিতে যাই। আর কিছু চাই না।
ম্যাচ শুরু হল। সাফিন ভাই আসলেই ভাল খেলে। আমি খুব সাধারণভাবে খেলছি। সেকেন্ড ইয়ারের ভাইয়ারা প্রচুর চিৎকার চেঁচামেচি করছে সাফিন ভাইয়ের নাম ধরে। আমার বন্ধুরা সব চুপচাপ দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে। মাঝে মাঝে একটা পয়েন্ট পেলে ওরা চিৎকার করে কমনরুম কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সাফিন ভাই ১৫-৩ ব্যাবধানে এগিয়ে গেল। আমি খুব একটা বিচলিত হলাম না। আমি শুধু ওনার খেলার ধরণটা জানতে চাচ্ছি। এই সেট হেরে গেলেও সমস্যা নেই। আরো দুই সেট বাকি আছে।
সাফিন ভাই ২১-৭ এ প্রথম সেট জিতে গেলেন। দ্বিতীয় সেটের আগে দুই মিনিটের ব্রেক। আমি বসে বসে আমার প্ল্যান ঠিক করলাম। তারপর ধীরে ধীরে আমি টিটি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম।
সাফিন ভাই সার্ভ করলেন। আমি ফোরহ্যান্ড স্ম্যাশ করলাম। সাফিন ভাই পুরা হতভম্ব হয়ে গেলেন। উনি আমার কাছ থেকে এটা আশা করেন নি।
বল কুড়িয়ে এনে সাফিন ভাই আবার সার্ভ করলেন। এবার আমি ব্যাকহ্যান্ড স্ম্যাশ করলাম। সাফিন ভাই আবার হতভম্ব হলেন। উনি কল্পনাও করেন নি যে ওনাকে আমি পর পর দুইটা স্ম্যাশ করব।
সাফিন ভাই আরো তিনটা সার্ভ করলেন। আমি প্রত্যেকবারই স্ম্যাশ করলাম। ৫-০ ব্যবধানে আমি এগিয়ে গেলাম। পর পর পাঁচটা স্ম্যাশ খাওয়ার পর ওনার মুখটা হয়েছিল দেখার মত। আমি পারলে একটা ছবি তুলে রাখি ঐ মুখটার! কতদিন এই মুখটার কথা মনে মনে ভেবেছি!
শুধু সাফিন ভাই না, দর্শক হিসেবে যারা খেলা দেখছিল, সবাই চমকে গেছে। এরকম কিছু ঘটবে তারা সেটা আশাই করেনি। আমার ইয়ারমেটরা চিল্লাচিল্লি করে কমনরুম ফাটিয়ে ফেলছে। হলে উঠার পর এত আনন্দের উপলক্ষ্য আর আসেনি আমাদের।
আমি আমার প্ল্যানের প্রথম অংশটা খুব সফলভাবেই সম্পন্ন করেছি। প্ল্যান ছিল ওনাকে পুরোপুরি চমকে দিব। সাফিন ভাইকে চমকে গেছে। ওনার মাথা হ্যাং করেছে বুঝা যাচ্ছে। উল্টাপাল্টা শর্ট খেলছেন। আমিও খুব সিরিয়াসলি খেলছি। আমাকে উনি যতটা হালকাভাবে নিয়েছিলেন, আমি ততটা খারাপ খেলি না।
দ্বিতীয় সেট আমি জিতে গেলাম ২১-৮ এ। আমার সহপাঠিরা হইচই করে আমার আত্মবিশ্বাস শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাফিন ভাইয়ের অবস্থা ঠিক উল্টো। ওনার আত্মবিশ্বাস একেবারে তলানিতে ঠেকেছে বলে মনে হল। হল চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়ার লজ্জা, তাও এক জুনিয়রের কাছে, যাকে উনি অনেকভাবেই হেনস্তা করেছেন।
তৃতীয় সেটে উনি পর পর তিনটা সার্ভিসে ফল্ট করলেন। নিজের উপরও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারালেন। ব্যাট ছুড়ে মারলেন ফ্লোরে। তারপর আবার তা তুলে খেলা শুরু করলেন। আমি প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করেছি। গত চার মাসের মধ্যে আজকে আমার শ্রেষ্ঠ দিন।
শেষ সেটটাও যখন আমি ২১-১২ তে জিতে গেলাম, সাফিন ভাই কোনো কথা না বলে সোজা কমনরুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন। আমার বন্ধুরা ততক্ষণে আমাকে কাঁধে উঠিয়ে ফেলেছে। আমাকে কাঁধে নিয়েই মিছিল করতে করতে দুই তালা পুরোটা চক্কর দিল একবার। আমি তখন আকাশে উড়ছি। হলে উঠার পর থেকে এত আনন্দ আর কখনোই পাইনি।
আমি শেষ পর্যন্ত টিটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। পুরো ভার্সিটিতেই ব্যাপারটা ছড়িয়ে পরে। ভার্সিটিতে ছোটখাট একজন সেলিব্রেটি হয়ে যাই। সেলিব্রেটি হওয়ার সবচেয়ে আনন্দের দিক হচ্ছে মাঝে মাঝে কিছু বড় আপু আমার সাথে এসে কথা বলে। সাফিন ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ডও একদিন নিজে থেকে এসে আমার সাথে কথা বলেছে। আমাকে আর পায় কে!
©Muhit Alam

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

