somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ওরা চার জন রুমমেট

২৪ শে এপ্রিল, ২০১৩ দুপুর ১২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিদিনকার মত ক্লান্ত দেহে আজো বাসায় ফেরে ফারিহা। দেখে রুমমেটরা কেউ-ই এখনো ফেরেনি। সারাদিন শেষে সাবলেটের এই রুমটিতে যখন সবাই ফেরে তখন তা হাসি-ঠাট্টা আর কলকলিতে ভরে যায়। এখানে একমাত্র ফারিহা-ই চাকরী করে, একটি স্কুলে। বাকী তিন জন ঢাবি'র স্টুডেন্ট। ছাত্র জীবন থেকেই এই আজিমপুর এলাকাটি ছিলো তার খুব প্রিয়। প্রায়ই ভাবতো এখানেই যদি তার বাসা হতো খুব ভাল হতো। ঢাকায় মা বাবা থাকা সত্বেও সে হোস্টেলে আলাদা থাকে, এটা প্রথমবার শুনলে যে কারো কাছেই খুব অবাক করা বিষয়। কিন্তু এই অবস্থায় আসতে ফারিহাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। অনেক ছোট ছোট চাওয়াকে "পাছে লোকে কিছু বলে" এই ভয়ে পূরণ করতে পারেনি। একটা সময় বুঝতে পারলো পূরণ করাটাই ভাল, যা তার ভাইকে দেখে শিখেছে।
=আরে আপু, তুমি আজ এত তাড়াতাড়ি! রুমমেট নিশাতের কথায় ধ্যান ভাংগে ফারিহার। রুমে ঢুকে কখন যে বেডের উপর বসে পড়েছে মনে পড়ছে না।
~~হ্যা, আজ রাস্তায় ঘোরাঘুরি না করে ভাবলাম তোদের সাথে সময় কাটাবো। স্কুল ছুটির পর বেশির ভাগ সময় ফারিহা এখানে সেখানে একা একা ঘুরে বেড়ায়।
=আরেব্বাশ্‌, তাই নাকি? টুম্পা-পম্পা তো এখনো ফেরেনি। মজা হবে অনেক আজ। ওরা ফিরুক রুমে।
>>আমাদের নামে কি বলা হচ্ছে শুনি বলতে বলতে হাজির হলো জমজ বোন টুম্পা-পম্পা। দুজনেই ঢাবিতে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে পড়ে।
=আমি আজ বাসায় ফিরে দেখি আপু আগেই বাসায় চলে এসেছে আমার সাথে সময় কাটাবে তাই।
~~ চল আমরা আজ রাত দশটা পর্যন্ত সারা আজিমপুর হেটে হেটে ঘুরবো, রাস্তায় যেখানে যা মন চাইবে খেয়ে-দেয়ে বাসায় ফিরবো।

হুররেএএএএএ....চলো চলো তাই হবে। এক সাথে উল্লাস করে ওঠে তিন জনে।

******************************************************
টুম্পা-পম্পার জন্মদিন। ফারিহা কোন মতে আজ স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছে। বিরাট প্ল্যান করেছে যার সমস্তটাই তাকে একা করতে হবে এবং ওরা তিনজন বাসায় ফেরার আগেই। কেক কিনে এনেছে সকালে। ঘর সাজিয়ে এখন রান্নায় বসেছে। রোস্ট, পোলাও, পায়েশ। ব্যাচেলর জীবনে এই অনেক আয়োজন। সাবলেটের খালাম্মা সাহায্য করায় অনেক সুবিধা হয়েছে। সব কাজ শেষ এবার অপেক্ষার পালা। লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়ে ফারিহা।
বিকেলে রুমে আসতে আসতে টুম্পা-পম্পাকে খাওয়ানোর কথা বলছিলো নিশাত। ওদের প্ল্যান রুমে এসে সেজেগুজে ফারিহা আপুকে স্কুল থেকে নিয়ে বের হবে। কিন্তু রুমে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে তিন জনের চক্ষু চড়কগাছ! ঘরের মেঝেতে পেপার বিছিয়ে তআর উপর কেকের প্যাকেট, পোলাও, রোস্ট, পায়েশ সব সাজানো।
~~অ্যাই কিরে বেয়াদবের দল লাইট নেভা, দেখছিস না ঘুমাচ্ছি?
>> তুমি এসব করেছো....কখন...
~~ না আমি করিনি তোদের শ্বাশুড়ি করে দিয়ে গেছে, অসভ্যর দল। যাহ্‌ হাত-মুখ ধুয়ে সেজে-গুজে আয়। ফারিহা ওদের যেমন খুব ভালবাসে আবার কারনে অকারনে ঝাড়ি দিতেও খুব ভালবাসে। ওরাও এটা খুব এনজয় করে।
= আপু সাজগোজের কি দরকার সময় নষ্ট, তার চেয়ে এখনি....
~~ খবরদার....সাজুগুজু ছাড়া কেউ যদি বসিস মাইর আজকে একটাও তোদের পিঠে পড়বেনা, সব হাতে পড়বে! যাতে ঐ হাত দিয়ে খেতে না পারিস।

হৈহুল্লোড় করতে করতে সাজগোজ করে খেতে বসে চারজনে। খেতে খেতে গল্প করে
~~আমার তো বোন নেই, সেই অভাবটা তোরা পূরন করে দিয়েছিসরে
মনযোগ দিয়ে খেতে থাকা নিশাত হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে পায়েশ মুখে দিয়ে
= উমমম...অসাধারন......আপু তুমি এটা রান্না করেছো? সত্যি বলতো আন্টি করেনাইতো?
>> আরে তাই নাকি এই টুম্পা পোলও রাখ, পায়েশ খেয়ে নিই আগে, নয়তো নিশাত শেষ করে দেবে, দ্যাখ যেভাবে খাচ্ছে ও
~~নিশাত তোর কান টাইনা যদি আজকে না ছিড়সি, তোগোরে রাইন্দা খাওয়ামু বইলা স্কুলে যাইনাই আইজ আর কয় কিনা....
আচ্ছা এক কাজ করি, সত্যিই ভাল হইছে নাকি। মিষ্টির মধ্যে কিসব তাবিজ-তুবিজ দিয়া নাকি মানুষ বশ করা যায়। তা এই পায়েশ আন্টির তিন ছেলেকে দিয়ে আসি। তোদের তিন জনের যদি কোন গতি হয়..... বলে দুষ্টুমির হাসি দেয় ফারিহা।
পেটপুরে, মন ভরে খেয়ে চারজনে বের হয় ঘুরতে। যথারিতী আনন্দ-ফুর্তি করতে করতে রুমে ফেরে চার জন। রেহানা বেগম পেছন থেকে দেখে একটু হাসি দিয়ে চাপা একটি শ্বাস ছাড়েন। এক সময় খুব মন খারাপ হতো তাকে আল্লাহ কেনো একটি মেয়ে দেননি, ভেবে। তিন ছেলে তার। মেয়ের অভাব পূরন করতে ফ্ল্যাটের একটি রুমে মেয়েদের ভাড়া দিয়েছেন। এতে তার মনে হয় তার ঘর ভরা মেয়ে আছে।
যে যেভাবে সুখ খুজে নেয়!


*****************************************************
আমার মায়ের আমিই একা। কোন ভাই-বোন নেই আমার। সিক্সে থাকতে মা মারা গেলে বাবা আবার বিয়ে করেন। সৎমা বোঝোই তো। জানো আপু কখনো ভাই-বোনের অভাব বুঝিনি। কিন্তু মা মারা যাবার পরে এত একটা হয়ে গেলাম যে তখন বুঝেছি, একটা ভাই-বোন থাকলে খুব ভাল হতো। আর এখন তোমার এত ভালবাসা পেয়ে আরো কষ্ট হয়। কেন তোমার মত আমার মায়ের পেটের একটা আপু থাকলোন.... বিষন্ন মুখে কথা গুলো বলে থেকে গেলো নিশাত। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে।

আমারো কোন বোন নেইরে, তোদের পেয়ে আমার সে অভাব পূরণ হয়ে গেছে। কিন্তু ভয় হয়। বাস্তবতার চাপে পড়ে আমরা একসময় ছিটকে যাবো। তখন আমি কোথায় পাবো আমার এই ছোট্ট বোন গুলোকে বলে চুপ হয়ে গেলো ফারিহা। গলায় যেনো বড় একটি শক্ত দলা আটকে আছে।

চোখ মুছে আবার কথা বলে নিশাত, জানো যখন ছুটিতে বাড়ী যাই একদম ভাল লাগেনা। সাবলেটের এই জীবনটাই আমার সুখকর। বাড়ীতে যেতে ভাল লাগেনা আপু আমার। আচ্ছা আপু আমাকে কি তোমার মাকে মা ডাকতে দেবে। তোমার মায়ের ভাগ দেবে আমাকে?

অবাক বিস্ময়ে ফারিহা তাকিয়ে থাকে নিশাতের দিকে, বোঝার চেষ্টা করে কতটা কষ্টে, একটু ভালবাসা পাওয়ার আশায় ছোট্ট মেয়েটি এই কথা গুলো বলছে। নিশাতকে আদর করে বুকে টেনে নিতে নিতে বলে, হ্যা দেবো এখন থেকে আমরা তিন ভাইবোন আমরা দুবোন আমার ভাইয়াকে ভাইয়া বলে ডাকবি। আর আমার মায়ের ভাগ পুরোটাই তোকে দিলাম, আমিতো অনেক আদর পেয়েছি এবার থেকে তোর

সত্যি বলছো! তোমার মা মেনে নেবে আমাকে! বিস্ময় চাপা দিতে পারেনা নিশাত। এত সহজেই ভালবাসা পাওয়া যায়!

হা, সত্যি বলছি নেবে। হাসি দিয়ে বলে ফারিহা। আরো একটা কথা হচ্ছে এবারের ছুটি তুই আমাদর সাথে কাটাবি আমাদের বাসায়, তোর মায়ের সাথে। ভাল কথা তোর বাবা কিছু বলবে না.........

নাহ, আমি নতুন মা পেয়েছি শুনলে আব্বু খুশী হবে। ইনফ্যাক্ট আব্বুও আমার সৎমায়ের ব্যাপারটিতে সুখী না।

**************************************************
নিশাত রান্নার তরকারী কাটছে, টুম্পা উপন্যাস আর পম্পা ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত।

এই তোরা আমাকে একটা পরামর্শ দেতো, স্কুল থেকে ফিরে কাপড় বদলে বেড গোছাতে গোছাতে বলছিলো ফারিহা।

তোমার আবার কি পরামর্শের দরকার হলো.....তরকারি কাটতে কাটতেই মাথা দুলিয়ে প্রশ্ন করে নিশাত। মেয়েটির কোন কথা জিজ্ঞেস করার এই ভঙ্গীটি ফারিহার খুব পছন্দ।

টুম্পা বইয়ের ফাঁকে আংগুল দিয়ে বন্ধ করে হাতে রেখে স্বভাবসুলভ ভাবে বলে উঠে, "আরেব্বাশ্‌! আমাদের নেত্রী, বড় আপুর লাগবে পরামর্শ, পয়সা তো আর লাগবে না। বলো বলে ফেলো দেখি"

ফারিহার গলা একটু মিইয়ে গেলো, না বাসা থেকে বলছে এবার বাসায় ফিরে যেতে, বিয়ের কথা বলছে। আমিতো এই জীবনেই বেশ আছি। কিন্তু আমার মতিগতি আমিই বুঝিনা। চাকরী ভাল না লাগলে শেষে কি করবো। শেষে যদি আর বর-ই খুজে না পাওয়া গেলো.....এটাও বুঝি.......। বাবা-মাতো খামোখা চিন্তা করে নারে...........

নিশাত তরকারী কাটা রেখে তাকিয়ে আছে আপুর দিকে, টুম্পা হা করে আর পম্পা ল্যাপটপ থেকে মুখ তুকে চেয়ে আছে অবাক চোখে.....ফারিহাকে ঠিক চিনতে পারছেনা ওরা।

আনমনে নিজেই কথা গুলো বলে ফারিহার হুশ ফিরে এলে তিন জনের মুখের অবস্থা দেখে বলে, আরে তোদের আবার কি হলো, শোন তোরা যে বদের বদ তোদের পরামর্শ-ফরামর্শ লাগবেনা আমার। ঠিক করেছি আরো দু-চার বছের তোদের উপর ছড়ি ঘুরাবো, এর মাঝে আমিও বুড়ি হয়ে যাবো তার পরে বুড়ো কোন প্রফেসরকে বিয়ে করে ফেলবো, কারন তখন আমার জন্যে অন্য কোন পাত্র পাওয়া যাবেনা। ব্যাস সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো!
এ্যাই নিশাত, তরকারী কাটা রাখ। বেতন পেয়েছি চল আজ মিডনাইট সান-এ খেয়ে আছে। সিক্সটি পার্সেন্ট বিল আমি দেবো বাকি ফরটি পার্সেন্ট তোরা।

না না, সেভেন্টি-থার্টি....সমস্বরে প্রতিবাদ করে ওঠে তিন জনে।
অঅইই, বেশী কথা কইলে কইলাম পয়সা-ই দিমুনা। আচ্ছা যা তোদের সব বিল আমিই দেবো, আগে বিয়ে করে নিই। এবার তো হ্যাপী? যাহ্‌ রেডী হয়ে আয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৩ বিকাল ৩:০৬
২৭টি মন্তব্য ২৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×