আগের জামানায় কোন 'ঘাড় তেড়া' অধ:স্তনকে শায়েস্তা করতে হলে রাজা-বাদশারা তাকে সুবাদার-টুবাদার কিছু একটা বানিয়ে এমন দুর্গম এলাকার শাসনভার দিয়ে পাঠাতেন যেখানে হয় বিদ্রোহীদের হাতে, নয়তো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে পটল তোলার সম্ভাবনা বিপুল। পদস্থ আমলারা হলেন কলিকালের রাজা-বাদশা, ইচ্ছা হলে কাউকে 'ভালো' এলাকায় পোস্টিং দেবেন, আর একালের নিরীহ-নাদান, যাদের তিন কুলে কোন প্রভাবশালী মামা-খালু নেই, তাদেরকে কলমের এক খোঁচায় এমন এক দুর্গম এলাকায় ইলেকশনের ডিউটি দিয়ে পাঠাবেন এমন সময়ে যখন বিরোধীদল ডেকেছে ইলেকশন বানচালের হরতাল এবং যেখানে প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীরা হুন্ডা-গুন্ডার শিরোমণি হিসেবে কুখ্যাত। ছেলেটাকে প্রিজাইডিং অফিসার বানিয়ে বলা হলো, পরদিন হরতাল, সুতরাং আজ রাতের মধ্যেই ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে কাল সকাল থেকে ভোটগ্রহন শুরুর প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের দেশে রুগীর চে' ডাক্তার বেশী। চাপা কৌতুক জড়ানো ছদ্মমায়ায় সান্তনা দিলো কেউ কেউ, যার মর্মসুর হলো: বাছাধন এইবার টের পাইবা প্রিজাইডিং অফিসার হবার মজা কতো! একজন বললো, খুব গোলমেলে যায়গায় নির্বাচন কর্তে যাচ্ছ, প্রাণটা নিয়ে বেঁচে ফিরতে পারলেই যথেষ্ট। আরেকজন বললো, ইশ, আগে বলোনি কেন, আমার শ্বশুরের অমুক তো তমুক পদে আছেন, তাঁকে ধরলেই তোমাকে অপেক্ষাক্বত নিরাপদ যায়গায় পোস্টিং করিয়ে দেয়া যেতো। একজনের কথা, ইশ, এই শীতের মধ্যে তো লেপের নীচে থেকেও গা কাঁপে, আপনি অমন দুর্গম জায়গার সারারাত কি ক'রে কাটাবেন? একজন বললো, ঐ ভোটকেন্দ্রে কিন্তু ভোট বানচালের চেষ্টা হবে, সাবধানে থাকবেন। আরেকজন বলো, পুলিশের দিকে নজর রাখবেন, অনেক সময় এক পক্ষের দিকে তারা ঝুঁকে যেতে পারে, তাতে আরেক পক্ষ নারাজ হয়ে ঝামেলা বাঁধাবে, কিন্তু সব দোষ এসে পড়বে প্রিজাইডিং অফিসারের উপর।
সূর্য ডোবার পালা আসার ঠিক আগে আগে (বাংলা সাহিত্যে ঠিক এই সময়টাতেই ফোটে কনে দেখা আলো) নির্দিষ্ট কার্যালয়ে দেখা হলো টিম মেম্বারদের সাথে। দুই সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, ঠিক হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা একজন বর্ষীয়ান স্কুল শিক্ষক, নিশ্চয়ই ভালো দাবারু। আরেকজন এক তরুণ এনজিও কর্মী। পুলিশের রিজার্ভ ব্যাটালিয়নের একজন কর্মকর্তার নেত্বত্বে কয়েকজন পুলিশ কনস্টবল। পুলিশের এই কর্মকর্তার এবং বাকি সদস্যদের ভুড়ি-টুরি নেই, মনে হলো বিশেষ ঘুষ খায়না। একটু স্বস্তি এলো মনে। এবার উপকরন বুঝে নেবার পালা। শ পাঁচেক টাকা ( কিছু সুতলি, আঠা, মোমবাতি, হ্যাজাক বাতি ভাড়া, মশার কয়েল, যাতায়াত খরচ ইত্যাদি বাবদ) আর ব্যালট বাক্স এবং ব্যালট পেপার। আমাদের টিমে একমাত্র সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারই (স্থানীয় স্কুল শিক্ষক) সেই নির্বাচনী এলাকার লোক। বাকী আমরা সবাই দুর-দুরান্তের লোক, নেহায়েত চাকরীসূত্রে এই নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পেয়েছি। স্কুল শিক্ষক বল্লেন, তিনি বাসায় চলে যেতে চান তাড়াতাড়ি, কালকের হরতালের পিকেটিং শুরু হয়ে গেলে মুশকিল হবে। আমাদেরকেও বল্লেন তাড়াতাড়ি নির্বাচন কেন্দ্রে পৌঁছে যেতে মধ্যরাত থেকে গাড়ীর চাকা থেমে যাবে, তখন যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আমরা সন্ধ্যার কিছু পরে দল বেঁধে রওনা হলাম। পথে একটা বাজারে খাবার-দাবারের জন্য কয়েক মিনিটের বিরতি। বাস, তারপর রিক্সা, নদী পেরোনো, আবার রিক্সা। একটা জরাজীর্ন স্কুল ভবনের সামনে এসে পৌছলাম আমরা। পল্লী বিদ্যুতও আসেনি এই এলাকায়, অবাক লাগলো, স্বাধীনতার এতো বছর পরেও এই অবস্থা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে দালানটার অবকাঠামোই ঠাওর করা যায় শুধু, কিছু দুরে টিম টিম করে জ্বলছে কিছু আলো, সেদিকে লোকালয়, সেখানে দুই প্রার্থীর একজনের বাড়ী, জেনারেটর চালিত বিদ্যুত রয়েছে সেখানে। হ্যাজাক জ্বালানো হলো, কি অপরিছন্ন স্কুলের কামরাগুলো! এখানেই আমাদেরকে রাত কাটাতে হবে। ভীষন শীত আর ভীষন মশার দ্বৈত কামড় খেতে খেতে ভাবছিলাম, মামা-খালু থাকলে আজ রাতটা লেপের নিচে আরাম করে ঘুমিয়ে পরদিন বাসা থেকে হাঁটা দুরত্বের কোন ভোটকেন্দ্রে আরামছে দায়িত্ব পালন করা যেতো

ব্যালট বাক্স আর ব্যালটগুলো সব আমার সামনে রাখলাম। এগুলোর একটা খোয়া গেলেই ভোট বাতিল। দু'তিনটে হাইবেন্চ জোড়া দিয়ে সেগুলোর ওপরে বসে আছি আর ক্ষনে ক্ষনে মশা মারছি, কয়েলে কুলাচ্ছে না। এর মধ্যে এক পুলিশ সদস্য এসে বললো, স্হানীয় এক বাড়ি থেকে খবর পাঠানো হয়েছে, আমরা তাদের বাসায় খেতে এবং ঘুমাতে পারি। মাঘ মাসের শীতের রাতে লোভনীয় প্রস্তাব নি:সন্দেহে, কিন্তু চাকরীর নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন হবে ভেবে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলাম, এবং আমার সাথে থাকা পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরকেও যেতে নিরুৎসাহিত করলাম।

তাদেরকে বল্লাম বেশী খেলে ঘুম পাবে, আর ঘুম পেলে কেউ এসে সহজেই ব্যালটপেপার চুরি করতে পারবে।
মধ্যরাতে আবার ক্ষুধা লাগলো

যা হো'ক এই কথা ভেবে ব্যাগের মধ্যে কিছু খাবার আর পানি এনেছিলাম সেগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম। বসে বসে মশা মেরে আর কেন নামী-দামী আত্নীয় নাই, আর থাকলেও কেন তাগো লগে তেমন মিল-মহব্বত নাই

এই সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভোরের আলো দেখলাম। সবাই মিলে ভোট কেন্দ্র সাফ-সুতরো করে ৮টা থেকে ভোট গ্রহন শুরু হলো। পুলিশদেরকে সতর্ক থাকতে বলা আছে , ভোট বানচালের যে কোন চেস্টা যথাসম্ভব শান্তিপুর্ন উপায়ে রুখতে।
বেলা বাড়লে ভ্রাম্যমান নির্বাচন পরিদর্শকদের টিম আসলো একাধিক। মাশাল্লা রাতভর আরামছে লেপের নিচে ঘুমিয়ে গাল ফুলিয়ে , মান্জা মেরে আসা সব সুশীল-সুশীলা। দু'একটা সুশীলার বাহারী চেহারার দিকে দু'একবার নজরও গ্যালো, কিন্তু কর্তব্যে বিঘ্ন হতে পারে ভেবে তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিলাম

এক দলের পোলিং এজেন্ট এসে অভিযোগ করলো অন্য পক্ষের বেশী এজেন্ট ঢুকেছে, সেটার ব্যবস্থা করা হলো। কয়েকটা জালভোটার ধরা পড়লো। একবার শোনা গেলো এক পুলিশ এক দলকে সুবিধা দিচ্ছে জালভোট দিতে, তাকে সতর্ক করা হলো

। একবার শোনা গ্যালো প্রচুর হুন্ডা আরোহী গুন্ডা নিয়ে নির্বাচনীকেন্দ্র হামলা করার জন্য কেউ আসছে। রীতিমত সতর্ক তখন সবাই। আমাদেরও পাল্টা সতর্কতা অবলম্বন করতে হলো, পুলিশদেরকে নিয়ে রীতিমতো মিটিং করতে হলো, রক্তপাত এড়িয়ে যা করবার করা হবে এমন আলোচনা হলো, একথাও হলো, গুলি করতে হলে 'নিরাপদ' জায়গায় করতে হবে, প্রানহানি এড়াতে হবে। প্রিজাইডিং অফিসারও যে প্রয়োজনে 'শত্রু এলে অস্ত্র হাতে লড়তে' ভয় পায়না এমন কথাও শোনা গেলো

যা হো'ক। নিরাপদেই ভোটগ্রহন শেয হলো। ভোটগণনা শেষ হ'তে হ'তে অনেক রাত। সারাদিন পেটে দানা-পানি পড়েনি, পেট চোঁ চোঁ করছে। ফেরার পথে ব্যালট বাক্স পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া, সেগুলো বুঝিয়ে দিয়ে স্বাক্ষর করা, তবে ছুটি। গত দেড়দিনে এই ক'জন মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছিলো এক অদ্ভুত বন্ধন-কর্তব্যের টানে। এবার ছাড়াছাড়ির পালা। সুখী নীলগন্জের পিত্বসম শিক্ষক এবার স্বাভাবিকভাবে বললেন: বাবা অনেক বছর ভোট করছি, এই রকম

প্রিজাইডিং এর পাল্লায় পড়ি নাই

। তরুণ এনজিও কর্মী বললো মনে হয় আমরা অনেক বছর ধরে একসাথে কাজ করছি। ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে

পুলিশ কর্তা ম্বদু হেসে বল্লেন: আপনাকে আমার পছন্দ, আবার কোনদিন হ্য়তো একসাথে কাজ করার সুযোগ হবে। কিন্তু বিদায় বেলায় একটা সত্যি কথা বলি: খোদা না করুন, যদি সত্যি ভোটকেন্দ্রে হামলা হতো, আর আপনি গুলী করার নির্দেশ দিতে নিষেধ কিম্বা দেরী করতেন, প্রথম গুলীটা আপনাকেই করতে হতো। পরদিন পেপারে ছাপা হতো: দু:স্ক্বতিকারীদের গুলীতে কর্তব্যরত প্রিজাইডিং অফিসার নিহত হওয়ায় পুলিশ পাল্টা গুলী চালাতে বাধ্য হয়।
(উৎসর্গ: আসছে ডিসেম্বরের নির্বাচনে যাঁরা দেশের দুর্গমতম ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরপেক্ষতা, এবং সাহসের সাথে দায়িত্বপালন করতে ভয় পাবেন না, তাঁদেরকে )
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০২১ সকাল ১১:৩২