টিলি মামণি আমি গোসলে যাই, তুমি শুয়ে পর।
এত রাতে গোসল করবে? তোমার তো আবার মাথা ব্যথা করবে!
না হলে ঘুমাতে পারব না! বেশী ভিজব না।
শাওয়ার করার পর ওর বেশ ফ্রেশ লাগে। চুল শুকিয়ে নাইটি পরে শোওয়ার ঘরে যেতেই রানার নাক ডাকার বিকট আওয়াজে মনটা তেতো হয়ে যায়। শুচির ঘুম ভীষণ পাতলা, সামান্য শব্দেই সে জেগে যায়। আর একবার জাগলে সহজে ঘুম আসে না! বিছানা থেকে তার বালিশটা নিয়ে পাশের ছোট রুমে যায়। ছোট সিংগল খাট আছে, সেখানে শুয়ে পরে।
পুরান কথা মনে পরে যায়।ফেলে আসা জীবন,সব চোখের সামনে ভাসতে থাকে।মাকে মনে পরে না।খুব ছোট বেলায় মা মারা যায়। ঘরে সৎ মা।এই পক্ষে ছোট দুই ভাই। ভাইদুটো পিঠাপিঠি। সজল আর কাজল।ছোট থেকেই দুজনে শুচির খুব ভক্ত।শুচির কাজ ছিল ওদের দেখাশোনা করা।ছোটবেলায় ওদের পড়াশোনাও শুচি করাত।বিশেষ করে কাজল। খেতে বসলে সে শুচিকে আব্দার করত বুবু খাইয়ে দে। কারণ তাহলে শুচির প্লেটেও ভাল তরকারি দিতে বাধ্য হত সৎ মা। শুচি কাজলের এই আব্দার রাখতে গিয়ে পরে চোখের পানিতে ভেসে যেত।ছেলেটা কেন এত তাকে ভালবাসে! নিজের আপন ভাই না হলেও সৎ বোনের জন্য দরদ কাজলের কম ছিল না।সজল কাজলের জন্মদিন খুব ঘটা করে হত। সৎ মা সবসময়ই কোন অছিলা করে শুচিকে সরিয়ে দিত বাসা থেকে।পরে দুভাই তাকে জেরা শুরু করে দিত।কেন সে ছিল না? শুচি কি ভাইদের পছন্দ করে না?এমন কি জরুরী কাজ যে শুচিরই যেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাবা সবসময় সৎ মায়ের কথা বিশ্বাস করত। কখনই কোন ঘটনা তলিয়ে দেখত না।সৎ মা ছেলেদের বোঝাত শুচির হয়ত ভাল লাগেনা এসব।সে জন্য শুচি অনুপস্হিত থাকে! পুরো ঘটনার উল্টা ব্যাখ্যা।শুচি বরাবরই মুখচোরা।কখনই মুখ খোলেনা। সজল কাজলের জেরার হাত থেকে বাঁচার জন্য শুচি বলত আচ্ছা তোরা কি কি পেলি দেখা! দুজনেই তখন হুরমুর করে জিনিশপাতি, খেলনা, কাপড়চোপর দেখানো শুরু করত।শুচি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল সে বছর থেকে এসব নাটক বন্ধ হয়ে গেল, দুভাই কলেজে উঠল। কাজল আর বাড়িতে জন্মদিন করার পক্ষপাতি না।বাইরে বন্ধুদের সাথে খাবে, সিনেমায় যাবে। শুচি ক্লাশ শেষ করে রিক্সার জন্য দাড়িয়ে ছিল একবার কাজলের জন্মদিন সেদিন।হঠাৎ করে মোটরসাইকেল কাছ ঘেঁশে দাড়ায়। চমকে উঠে শুচি। আরেকটু হলে পরেই যাচ্ছিল।হো হো করে হেসে উঠে সজল আর কাজল। বাবা ওদেরকে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছে, জন্মদিনের উপহার।দুজনে পালা করে চালাবে! শুচির কোনদিন জন্মদিন করা হয়নি ।তাকে কেউ কোনদিন উপহার দেয়নি।বুকটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়।মনে হয় মাটি ফাঁক হয়ে যাক শুচি ভিতরে ঢুকে যাক।
বুবু চল তোকে মোটরসাইকেলে করে চাইনিজে নিয়ে যাই।আমার জন্মদিন তোকে নিয়ে খাব, চল জলদি।শুচি দোটানায় পরে।সে শুনেছে চাইনিজ খেতে অনেক টাকা লাগে! তার কাছে টাকা পয়সা তেমন নাই। কাজলের জন্মদিন, বড় বোন হিসেবে তার তো খাওয়ার পয়সা দেওয়া উচিৎ! কি যে করে।সজল বোধহয় বুঝে ব্যাপারটা। বুবু তুই ভাবিস না, আমি মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসেছি।তুই চল।এই প্রথম মোটরসাইকেলে শুচি উঠল।সজল চালাবে, কাজল রিক্সা নিয়ে আসবে।নিজেকে রাজকণ্যার মত মনে হচ্ছে!
শুচি এই প্রথম চাইনিজে আসল। আড়ষ্ট ভাবে বসে থাকে।কি করবে দিশা পায়না। কি পরিষ্কার পরিচ্ছন্য। শুচির খুব ভাল লাগে। এত সুন্দর জায়গা! ওমা কত লোক খাচ্ছে। কি সুন্দর পরিবেশ।ভাই দুটো অনেকবারই এসেছে। কি সব খাবার আসল। কি মজার খাওয়া। শুচির মনে হল সে প্রত্যেক দিন চাইনিজ খেতে পারবে, তার কাছে এত মজা লাগছিল।খাওয়া শেষ করে কাজল বললো ,বাড়িতে গিয়ে কিছু বলিস না। আমি তোর সাথে খেয়েছি বললে মা খেপে যাবে! শুচি সেটা জানে। শুচির সাথে জন্মদিন পালন করেছে শুনলেই হয়ে যাবে একচোট! বুবু তোর জন্মদিনেও আমরা আবার চাইনিজ খাব আচ্ছা! শুচি কোনরকমে মাথা নাড়ে। তার আবার জন্মদিন!
শুচি বাবার কাছে পারতপক্ষে ঘেঁসত না। তার আর বাবার মাঝে বিরাট দেয়াল ছিল। সৎ মায়ের উপর যত রাগ থাক তাকে অবশ্য পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছিল, যেটা অনেকই পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ধাপও সে পার করে এসেছে। কিন্তু অসম্ভব সন্দেহ পরায়ন মহিলা ছিল সৎ মা। কি যে সব যা তা সন্দেহ করত! কত সময় লজ্জায় মাথা কাটা যেত শুচির! সৎ মা হিংসার বশে এক বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করে। বিরাট অফিসার, বিদেশে পোস্টিং, শুচি সুখে থাকবে!হায়রে সুখ, শুচি যখনই সুখ ধরতে চায়,পালিয়ে যায়।
হঠাৎ করে খুব ঘুম পায়,ঘুমিয়ে যায় শুচি।
সকালে অফিস যাবার সময় রানা ডেকে তোলে তাকে। আমি যাই, গেট কি খোলা রেখে যাব?
যাও, চোখ না খুলেই উত্তর দেয়। আমি পরে লাগিয়ে দিব।
ইদানিং শুচি সকালে উঠেও না। রানা নিজের চা করে নেয়।সকালে সে বেশী কিছু খায় না। শরীর মোটা হওয়াতে সকালে সে সব্জির স্যূপ খায়, শুচি যেটা বেশী করে সারা সপ্তাহের জন্য উইকয়েন্ডে বানিয়ে রাখে। রানাই বলে তোমার উঠার দরকার নাই, আমি গরম করে নিতে পারব।সকালে উঠার ঝামেলা থেকে বেঁচে যাওয়াতে শুচি আর কথা বাড়ায়নি! এর জন্য সে রানার প্রতি কৃতগ্গ। অবশ্য টিলির স্কুল থাকলে অন্য কথা। সকাল উঠে যায়, মেয়ের নাস্তা, টিফিন তারপর টিলিকে স্কুলে আনা নেওয়া সব সে করে। রানাকে বিরক্ত করে না।
আজ রানা চলে গেলে শুচি বিছানা ছেড়ে উঠে পরে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


