কত বছর হয়ে গেল, এখনও সেদিনের কথা মনে হলে রাগে, লজ্জায়, হতাশায় শুচির মনটা কুঁকড়ে উঠে।কি সুন্দর লাগছিল শুচিকে। বিয়ে পড়ানো হয়ে গেল। ইশরে লোকটা কি বেঁটে! শা'নজরের সময় শুচি একবার দেখেই চোখ ফিরিয়ে নেয়।
তার নতুন স্বামী কেমন ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে আছে।যেন কোন কিছুই পছন্দ হচ্ছে না! তার যেন অনেক কাজ পরে আছে শুধু শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে এখানে! সে যে সরকারের এত বড় কূটনৈতিক কর্মকর্তা বিয়ে বাড়ির লোকজন মনে হয় বুঝতে পারছে না!
বউয়ের ভাইদুটো তো ফাজিলের হদ্দ! গেট ধরার সময় কিনা দশ হাজার টাকা চায়! যেখানে কাবিন নামা হোল পন্চাশ হাজার টাকা! টাকা যেন ছেলে হাতের মোয়া,ঝাড়া দিলেই পরে! লোকমানের ভাইবোনের সংখা এগারো জন। পাঁচ ভাই, ছয় বোন। বোনেদের খুব ভাল বিয়ে দিয়েছে। চার ভাইএর বিয়েও খুব দেখে শুনে দিয়েছে। আজ তার বিয়ে।সংসারের ঘানি টানতে টানতে তার অবস্হা শোচনীয়। যাক এতদিনে তার নিজের দিকে নজর দেয়ার সময় হয়েছে। তাও হয়ত করত না। সিনিয়র কলিগদের তাড়ায় তার আর উপায় ছিল না। কারণ এর পরে ওকে হয়ত কেও বিয়ে করতে রাজি হবে না! এই মেয়েটার জীবন স্বাভাবিক হলে হয়ত সেও রাজি হত না বিয়েতে।ছোট বোনের জামাইটা তাকে খুব মানে।সে এই বিয়ের ঘটকালি করেছে। আচ্ছা মেয়েটার মাথায় কোন গন্ডগোল নেই তো!সৎ মায়ের অত্যাচারে জর্জরিত হতে হতে বউটার নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়নিতো!
হঠাৎ করে লোকমানের অস্হির লাগতে থাকে।
শুচির হাতে আলতো করে টোকা দেয়, দেরী হয়ে যাচ্ছে সবাইকে তাড়াতাড়ি করতে বল।
লোকমানের ছোটভাই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।বিয়ের পর তার বাড়িতেই শুচি উঠল। উনি যখন শুচির পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন সে তখন জড়সড় হয়ে পরে।বাড়ীর বড় বউ হিসেবে এটা তার প্রাপ্য! একে একে বাকি সব দেওর জা, ননদ ননদের জামাইরা সালাম করতে থাকে।তাকে কেউ কোনদিন পায়ে ধরে সালাম করেনি! কি যে বলবে শুচি! চুপ করে থাকে।দেওর জা ভাল মানুষ।কিন্তু কেমন জানি মনে হয় মুখোশ পরে আছে। শুচির গা শির শির করতে থাকে।হঠাৎ করে তীব্র মাথা ব্যাথা শুরু হয় তার। বাথরুমে গিয়ে মুখে মাথায় পানি দিয়ে একটু শান্তি পায়। রাতে সে কিছু খেতে পারে না। অজানা আশংকায় শুচির মাথা ঘুরতে থাকে। জবুথবু হয়ে খাটের উপর বসে বালিশে একটু হেলান দেয়। লোকমান এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে। শুচি সোজা হয়ে বসে।
লোকমান কাছে এসে কথা বার্তা শুরু করে। বিয়ের দু সপ্তাহ পরেই তার নতুন পোস্টিংএ যেতে হবে,দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ছোট সুন্দর দেশ। দেশটিতে রাজনৈতিক গোলযোগ লেগেই থাকে।শুচি কোনদিন বিদেশে যায়নি। তার পাসপোর্ট করতে বেশী দিন লাগবে না লোকমান অভয় দেয়। অনেক উপদেশ শুনতে হোল। যেমন শুচি যেন কখনও লোকমান বাড়িতে না থাকলে একলা বাইরে যাবে না, কেউ আসলে দরজা খুলবে না, টেলিফোন করবে না বা ধরবে না। বিশেষ একটা সময়ে লোকমান ফোন করবে, তার আগে সে দুটো রিং দিবে, ফোন কেটে দিয়ে আবার ফোন করবে সেই ফোনটা শুচি ধরবে! বাড়িতে কাজের লোক রাখা যাবে না, কারণ টাকা জমাতে হবে।মানুষ জন জানতে চাইলে কি বলতে হবে তাও বলে দিল লোকমান। কারণ লোকজনের কৌতুহলের শেষ নাই! শুধু শুধু প্রশ্ন করে! লোকমান অযাচিত কৌতুহল পছন্দ করে না। শুচির খুব জানতে ইচ্ছা করছিল আসলে কি পছন্দ কর! কিছুক্ষণ পরে লোকমান শুয়ে পরে শুচিকে বলে রাত অনেক হয়েছে। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাই।
শুচি বেশ অবাক হয়। বিয়ে নিয়ে লোকজনের কাছে যা শুনেছে তার সাথে সে কিছুতেই লোকমানের ব্যাবহার মেলাতে পারছে না।সাতপাঁচ চিন্তা করতে করতে শুচির ঘুম চলে আসে। সকালে ঘুম ভাঙে অনেক বেলায়।মাথা কেমন তাল গোল পাকিয়ে যায়, সব চিন্তা করে।
একটু ভয়ই পায় সে।সারা বাড়ির লোকজন তটস্হ। শুচি কিছু বুঝতে পারে না। পরে শোনে পাশের বাড়িতে রাতে চোর এসেছিল। সুতরাং শুচির খুব সাবধানে থাকতে হবে। গয়না গাঁটি যা আছে সব লোকমানের বড় সুটকেসে তোলা হোল।সেই শেষ দেখা শুচির মায়ের গয়না,সৎ মা যত হিংসা করুক, বিয়ের সময় ওর মায়ের গয়না গুলি শুচিকে দিয়েছিল। যখন শুচি বিদেশে রওনা দিবে, বাবা এসেছিল এয়ারপোর্টে সজল আর কাজলকে নিয়ে। শুচির আসলেই মন খারাপ হয়েছিল সেদিন! তার পরিচিত গন্ডি, পরিচিত শহর সব ফেলে কোথায় চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল আর কোনদিন কারো সাথে দেখা হবে না! বাবার সংসারে অপাংতেয় শুচি এখন বিদেশে স্বামীর ঘর করতে যাচ্ছে!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০০৮ রাত ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


