শুচির সংসার শুরু হোল। কি যে অসহ্য মানসিক অশান্তি। আল্লাহ যেন কাউকে এত বড় শাস্তি না দেন। দুতাবাসের চাকরি সুবাদে লোকমান দোতলা বাড়ি ভাড়া নেয়। শুচির ভাল লাগে বাড়িটা। কি সুন্দর সাজানো গোছান। আফসোস লাগে ভাই দুটো শুচির বাড়ি দেখতে পেল না। সপ্তাহ বাদে ঢাকায় একদিন ফোন করে লোকমান। শুচির বাসায়ও করা হয়। ভদ্রতা করে করা, ওদের জানানো শুচি জামাই নিয়ে ভাল আছে! কিছুদিন বাদে লোকমানের এক সিনিয়র কলিগের বাসায় দাওয়াত। শুচি একটা হালকা সবুজ জামদানি পড়ল। নতুন বউ হাতে গলায় কোন গয়না নাই। লোকমান বলে আজকাল কেউ ভারী গয়না পরে দাওয়াতে যায় না। হালকা একটা চেন,পাতলা চুড়ি সে বের করে দেয়। কোন কথা না বলে শুচি পরে নেয়।
দাওয়াতে গিয়ে দেখে মহিলারা মনে হয় প্রতিযোগিতা করছে কার কত গয়না আছে। সব পরে বসে আছে! দুতাবাসের মোটামুটি সবাই এসেছে।আর দেশ থেকে যারা পড়তে এসেছে তারা কয়েকজন আর তাদের সংগীনিরা। নতুন বউ বলে সবাই শুচির সুখ সুবিধার দিকে বেশী খেয়াল রাখছে। হঠাৎ করে সে খেয়াল করে লোকমান তারদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। শুচির ভাল লাগে না। কারণ লোকমানের দৃষ্টিতে কোন রোমান্সের চিন্হ নাই। বরং শুচি যে সবার সাথে কথা বলছে এটা সে পছন্দ করছে না! কিছুক্ষণ পরে ওরা বাসায় চলে আসে। সারা রাস্তা লোকমান কোন কথা বলে না। শুচি বুঝেনা তার দোষ কোথায়।বাড়িতে ঢুকেই লোকমান অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ শুরু করে, কুৎসিত অঙভংগি করে জানতে চায় কেন সে অন্য পুরুষের সাথে কথা বললো। শুচি ঘরের মাঝখানে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এত বিরক্ত লাগে শুচির যে বিশ্বাস হতে চায় না এই লোকের পরিবার এত শিক্ষিত, এত বড় হয়েছে নিজের চেষ্টায় সে এত নীচ, কর্কশ হয় কি করে! তার চেয়েও বড় কথা এত দারুণ একটা চাকুরি করে কিভাবে এই নিচু মন নিয়ে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকমানের নাস্তা তৈরি করতে রান্নাঘরে যায়। লোকমান চা খায় না তাই বাসায় কোন চায়ের সরন্জাম নাই। শুচি একটু চায়ের জন্য হা পিত্যেস করে। বার কয়েক সে বলেছে চায়ের কথা। লোকমান উত্তর দিয়েছে চা খাওয়া ভাল না। গায়ের রং কালো হয়ে যায়।
লোকমানের এই মধ্যযুগের বর্বর মানসিকতার আরো প্রমাণ পায় অফিস যাওয়ার সময়। দরজায় তালা লাগিয়ে সে চলে যায়। ভিতরে শুচি। লোকমানের যুক্তি হোল তালা দেখলে কোন বাজে লোক চোর চোট্টা আসবে না! শুচি বলে হঠাৎ কোন বিপদ হলে কি করব! তুমি বাইরে যাবে না, ব্যস সাফ কথা! বাসায় থাকো। শুচি জানে প্রতিবাদ করে কোন লাভ নেই। সে চুপ হয়ে যায়। দুপুরের রান্না শেষ হয় এক ঘন্টাতেই। কি আর রান্না। ভাত আর মাছ ভাজি।ব্যস। কোন গোস্ত না কারণ হালাল না। তাই বলে লোকমান যে খুব ধর্ম মানে তাও না। কেবল জুম্মার নামাজের সময় তার যত তোরজোর।কারণ অফিসের সবাই জামাতে নামাজ পড়েন। রান্না শেষ হলে তারপর ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, শুখানোর ব্যবস্হা ভিতরের ঘরেই দড়ি বেঁধে!
লোকমান বিকেলে অফিস থেকে এসে ভাত খেয়ে আধ ঘন্টা পরে হাটতে বের হয়।ফিরে রাত নয়টায়। তারপর আবার খেয়ে ঘুমাতে যায়। সারাদিন শুচি একা, সারা বিকেল সন্ধাএকা।রাতে মাঝে সাঝে শারীরিক মিলন। যেটা শুচির কাছে মনে হয় পশুর চেয়েও অধম।
টেলিভিশন কিনে নাই। অনেক দাম।তিন বছর পর যখন ঢাকায় যাবে তখন কিনবে।কোন রেডিও ক্যাসেট নাই। মোট কথা বাইরের দিন দুনিয়ার কোন খবরই শুচির নাই।
মাস কয়েক পরে শহরে ভূমিকম্প হয়।শুচি বাড়ির ভিতরে। হঠাৎ করে ঘরের জানালা দরজা সহ পুরো বাড়িটা নড়তে থাকে।শুচির সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। সে বাইরে বের হতে পারে না। টেবিলের তলায় গিয়ে বসে থাকে। লোকমান আসলে শুচি এত ভয় পেয়ে যায়, সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে।আর ঠিক তখনই তার উপর দিয়ে কেয়ামত বয়ে যায়।তার তলপেটে প্রচন্ড মোচরানো দিয়ে রক্ত গংগা বইতে থাকে।কোনরকমে সে লোকমানকে ডাকে। লোকমান আসে না। সে ভীষণ ব্যস্ত।অফিসের কাকে চালবাজের মত বলছে তার বউয়ের কতটা অসুবিধা হয়েছে ভূমিকম্পের সময়।শুচি কোনরকমে বাথরুমে যায়। লোকমান ঘরে আসলে বলে
আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল।
কাল অফিসে গিয়ে দেখি মহিলা ডাক্তার কোথায় পাওয়া যায়, তারপর নিয়ে যাব!
সারারাত শুচি ঘুমাতে পারে না। মনে হয় ঘুমিয়ে পরলেই মরে যাবে! পরদিন লোকমান অফিস থেকে ফিরে অনেক রাতে। সে ঢুকতেই শুচি বলে
আমাকে কখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে?
ওহ আমিতো ভুলেই গেছি খোঁজ নিতে, আচ্ছা কালকে খোঁজ নিব।এখন ভাত দাও।
শুচি সারাদিন শুয়ে ছিল। শরীরে তার অসম্ভব যন্ত্রণা।
আমি তো রান্না করিনি।
লোকমান খেপে যায় । তোমার এমন কি হয়েছে যে ঢং করে শুয়ে আছ! আমাদের দেশের বস্তির মেয়েরা কি করে। ওদের তো গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা হয়,ওরা আর কয়জন ডাক্তার দেখায়?
শুচি লোকমানের নীচতায় হতবাক হয়ে যায়।তুমি কি আমাকে বস্তি থেকে নিয়ে আসছ? তুমি কি চাও আমি মরে যাই!
আরে দূর মরবা না! তোমাদের হোল কই মাছের জান! এত সহজে মেয়েমানুষ মরে না! শুচি আর কথা বলতে পারে না। যার এই মানসিকতা তার সাথে কথা বলে কি হবে। লোকমান বের হয়ে যায় হোটেলে খাবে। অনেক রাত করে ফিরেই শুয়ে পড়ে। শুচির জন্য কোন খাবার আনে নাই। সে উঠে একটু পানি খেয়ে শুয়ে থাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

