বাসায় এসে শুচি আর টিলি থমকে যায়। আবার কে এল! রানার গলা শোনা যাচ্ছে, আরো কেউ কথা বলছেন। বুঝতে পারলো না কে উনারা! ওদের সাড়া পেয়ে রানা কাছে এসে বলে, বুঝছ তো এবার লোকজন তাড়াতাড়ি ভোটের জন্য আসতে শুরু করেছে। তোমরা বাসায় নাই, সেজন্য অপেক্ষা করছে। এসো কথা শুন কি বলতে চায়।
শুচি ঘরে ঢুকে দেখে দাঁড়ানোর জায়গা নাই! এত লোক! সবাই ওকে দেখে সালাম দেয়। প্রেসিডেন্ট পদপার্থি শফিক ভাই বলেন ভাবি আমরা এসেছি আপনাদের ভোটের জন্য, আমাদের দিকে খেয়াল রাখবেন। অবশ্যই ভোট দিতে যাবেন। এইটুকু বলার জন্য এসেছি, আবার দেখা হবে।
শুচি বলে আপনারা বসেন, চা দিচ্ছি।
না ভাবি আরো অনেক বাসায় যেতে হবে, অন্য দিন এসে চা খাব। আজ আসি বলে বের হয়ে গেলেন। প্রায় পনেরজন মানুষ।শুচির মাথা ঘুরে যায়।লোকজনের ধৈর্য দেখে। শফিক ভাইকে এখানকার বাঙালিরা কেউ পছন্দ করে না। পর পর তিন বার ইলেকশনে উনি হেরেছেন। তাতে কি! উনার উৎসাহে ভাটা পরে না। আবার দাঁড়িয়েছেন। শুচিও উনাকে ভোট দেয় না। গতবার ইলেকশনের সময় ঘোষণা দিলেন বিজয়ী হলে সব মহিলাকে শাড়ি দেয়া হবে! সব মহিলারা রেগে গিয়ে কেউ উনাকে ভোট দেয়নি।ওরা কেন বাইরের লোকের কাছ থেকে শাড়ি নেবে! মহিলাদের স্বামীরা কি শাড়ি কিনে দিতে পারে না! এবার জানি কি ঘোষণা দিবেন!
ভদ্রলোকের কোন লজ্জা শরম নাই। আবার দাঁড়িয়েছেন। নতুন কাউকে দিলে হত শুচি মন্তব্য করে।
কি যে বল। তাহলে তো সে প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না।
আমারতো মনে হয় উনি এবারও ভোট পাবেন না!
না পাক আমাদের কি!
আমরা কিন্তু ভোট দিতে যাব।
ঠিক আছে।বাঙালিদের সংস্হার ইলেকশনে ওরা সবার মত ভোট দিতে যায়। কত লোকের সাথে দেখা হয়। কি রকম উৎসব উৎসব ভাব।হঠাৎ করে মনে হয় দেশেই আছি! পরক্ষণেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। কোথায় দেশ আর কোথায় ওরা !
টিলি আর রানা কি নিয়ে খুব কথা বলছে। শুচি চা বানানো শুরু করে। রানাকে চা দিয়ে টিলিকে বলে তুমি গোসল করে নাও। পুল থেকে এসেছ।
আচ্ছা বলে টিলি চলে গেল। শুচি চায়ে চুমুক দেয়। রানার দিকে তাকিয়ে দেখে। ও কেমন বদলে গেছে। আগের মানুষটা কেমন ছিল জানার জন্য ফটো দেখতে হয়।এত পরিবর্তন হয়েছে শুচির কষ্ট লাগে।
কি দেখছ!
তোমার আমুল পরিবর্তন। এমন হলে কেন!
কি জানি।তুমি খাওয়াতে খাওয়াতে এমন বানিয়েছ, অনুযোগ করে রানাও উদাস হয়।
জান জমির ভাবি দেশে যাচ্ছেন, চুমকিকে নিয়ে। ওদের বোধহয় কোন গন্ডগোল হয়েছে।
বাদ দাও মানুষের গন্ডগোল দিয়ে কি হবে। নিজেদের ঝামেলায় বাঁচি না। তাছাড়া বেশি টাকা পয়সা হলে মানুষের আলগা ঝামেলা শুরু হয়। জমির ভাইতো মনে হয় টাকার উপর শুয়ে আছে!
তুমিতো পুরোটা না শুনেই কথা বলা শুরু কর। দূর তোমার সাথে কথা বলাই যায় না।
আচ্ছা বল শুনি।
আমার আর বলার মুড নাই।শুচি উঠতে যায়, পারে না।রানা হাত ধরে ফেলে। আরে ওদের কথা বলবে তো এত ভনিতা করার কি আছে? বলে ফেল।
টিলি বলছিল ভাবি নাকি থাকতে চান না। কাকে উনি পছন্দ করেছেন। চুমকি ওকে বলেছে।
এসব কথা তুমি টিলির সাথে আলাপ কর! আচ্ছা মেয়েটা কি মনে করল।
মহা মুশকিল, টিলিইতো যা শুনেছে তা আমাকে বললো। আমিতো ওর কাছেই শুনলাম। তাছাড়া মেয়েটা বড় হচ্ছে, ওর যদি কিছু জানার থাকে আমার কাছে জানতে চাইলে অসুবিধা কোথায়?
অসুবিধা নাই। খালি গুম মেরে না থাকলেই হয়। ও হয়ত মনে করবে বড়রা সবাই এরকম করে!
অনেকেই করে, আরো অনেক কিছুই করে।
শোন জীবনের এত কিছু ওর এখনই জানার দরকার নাই।
তুমি চোখ কান বন্ধ রাখলেই তো জীবন থেমে থাকবে না।
তা থাকবে না। রানা চুপ করে যায়। শুচি অবাক হয়। উঁহু কোন ব্যাপার আছে, এত তাড়াতাড়ি কথা বন্ধ করার মানুষ রানা না। কি হতে পারে! ওকে যে এখনও চিনে না সে মায়ের পেটে আছে!
ওর চুপ করে থাকার মানে হল আরো যুক্তি খুঁজছে।তোমার কি অবস্হা বল? দেশের খবর টবর কি?
শুচি বুঝে গেল রানার প্রিয় বিষয়টা অবধারিত ভাবে এসে গেল। ভালই আছে সবাই।
কি কিছু বলে টলে? কোন আওয়াজ দিচ্ছেনা? কবে সব করবে বলতো?
তোমাকে আগেই বলেছি এসব নিয়ে আমি কিছু জানিনা। আমাকে বলে কি লাভ?
তুমি কিছু না বললে তো তোমাকে কাণাকড়িও দিবেনা! সেটা বুঝনা কেন?
সবাই মেরে ধরে খাচ্ছে, খালি তোমার বেলায় হাত খালি!
কি যে বল না।মেরে আর কে খাচ্ছে! আমার বাবা মা ভাইরা। কেন মেরে খাবে? আমরা যখন দেশে যাই মাস খানেক থাকি,তুমি তো এক পয়সা বের করনা, পুরোটা বাবা খরচ করে, তারপরও বলতে তোমার লজ্জা করে না।
প্লেন ভাড়া দেয় না।
বাহ দেশে যাবা প্লেন ভাড়া বাবা দিবে? কোন টাকা খরচ করবা না তো বিদেশে আসছ কেন? টাকা নিয়ে কবরে যাওয়ার জন্য!
শুচির গলা চড়তে থাকে। সে সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু বাবা মা ভাইদের নিয়ে বাজে কথা ওকে পাগল বানিয়ে দেয়। ওর জন্য বাবা নিঃশেষ হয়ে গেছে। রানাকে সে সব কিছু জানিয়ে দিয়েছিল। তারপরও কেন যে রানা শুধু শুধু ওর দূর্বলতায় আঘাত করে, বুঝে না। আস্তে আস্তে ওর শরীর কাঁপা শুরু করে, মনে হয়, পরে যাবে!
তোমাকে আমি হাজার বার বলছি বাবা মা বেঁচে থাকতে আমি কিছুতেই সম্পত্তির ভাগ নিয়ে কথা বলব না। তুমি কি করতে বল আমাকে! তাছাড়া সজল কাজলের বড় সংসার ওদের টাকা লাগবে না। আমাদের আর কত লাগে! একটাই বাচ্চা। ওদেরতো দুজনেরই তিনটা বাচ্চা। দেশে কত খরচ!
ওহ তো এখানে আমাদেরও অনেক খরচ। তোমাকে তো সব নিতে বলছি না। খালি তোমার নায্য যা প্রাপ্য তা নিতে বলছি।
আমি বলব না। সোজা কথা।
তাহলে ওরাই সারাজীবন বসে বসে খাক। তোমাকে কিছু না দিয়ে সব মেরে দিক!
তুমি আবার উল্টা পাল্টা কথা শুরু করছ! তুমি তাহলে এই জন্য আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলে, সম্পত্তির জন্য! শুচির কষ্টে কথা বের হয়না।সে ফোঁপাতে শুরু করে।
যতসব পাগলের পাল্লায় পরছি। সোজা কথা সোজা ভাবে নিবে না।
ওহ আমি পাগল! সবাই জানে কে পাগল বানাচ্ছে! আর তোমারতো ফ্যামিলি হিস্ট্রির জন্য বিয়ে করাই উচিৎ হয়নি। ভাবিরা এই জন্য বাচ্চা নেয়না। শুচি চুপ হয়ে যায়। ছি ছি সে কি ভাবে এত ছোটলোকের মত কথা বলছে। তাও শ্বশুর শ্বাশুড়িকে নিয়ে। কেন সে নিজেকে এত ছোট করছে!
রানাও অবাক হয়ে গেছে। কোনদিন শুচি তাকে এভাবে জবাব দেয়নি। ওর সবচেয়ে দূর্বল জায়গায় আঘাত করেছে! রানা উঠে বেডরুমে চলে যায়। শুচি দেখে করিডোরে টিলি দাড়িয়ে আছে। চোখে অবিশ্বাস।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

