শুচি মেয়ের চোখের দিকে আর তাকাতে পারে না। নিজেকে বড় অপরাধি লাগে। কত কষ্টে যে সে এরকম করে, সেটা মেয়েটা কি বুঝবে! টিলি বুক ভরা অভিমান নিয়ে সরে যায়। মায়ের যে কি হয়েছে। কেন যে এত রেগে যায়। সে সবটা জানে না, যতটুকু বোঝে বাবা কিছু একটা বলে যা মা কিছুতেই টলারেট করতে পারে না। বিশেষ করে মামাদের ব্যাপারে। মা কোন কথাই শুনতে চায় না। একবার তো মা রাগ করে প্রায় চলেই যাচ্ছিল। সেবার বাবা কোনমতে হাতে পায়ে ধরে যেতে দেয়নি। না বাবাটাকে নিয়ে আর পারা গেল না। এত কথা বলার কি দরকার! খামোখা। এখন এই রাগ সামলাতে মায়ের কতদিন লাগবে কে জানে। কি যে খালি নাই নাই ঝামেলা। টিলির আর ভাল লাগে না।
সে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে।হঠাৎ করে মনে হয় একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে! বাবা মা কেউই আর তার দিকে বেশি মনযোগ দিবে না।ব্যাপারটা এভাবে সে কখনও ভাবেনি। এখন একটু মনের সুখে সাবুর সাথে চ্যাটিং করতে পারবে! সাবুটা ইদানিং আবার অন্য মেয়ের পিছনে ঘুরছে কিনা সেটা আগে টেস্ট করতে হবে!
অনলাইনে গিয়ে অন্য বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং এর ফাঁকে সাবুকে টেস্ট করা হয়ে যায়। সে একটু নিশ্চিত হয়, তার সাবুতো আছে।
মনের আনন্দে সে স্কুল খুললে কি করবে তার প্ল্যান করা শুরু করে।
দরজায় টোকা পরে। টিলি তোমার ফোন এসেছে।
ধুর এখন আবার কে ফোন করল! একরাশ বিরক্তি নিয়ে টিলি ফোন ধরে।ওর এক চাইনিজ বন্ধু। ফোন করার আর সময় পেলনা। কোনরকমে হু হু করে ফোন রেখে দেয়। এক ফাঁকে ভাবে বাবাকে দেখে আসি। বেচারি বোধহয় খুব মন খারাপ করেছে।
কিসের কি। আব্বুতো ঘুমিয়ে গেছে! ভালই। গন্ডগোল লাগিয়ে দিয়ে কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে। আহা সে যদি বাবার মত হতে পারত। শোয়ার সাথে সাথে ঘুম।কি শান্তি। হঠাৎ করে টিলির খুব রাগ ধরে। অশান্তি লাগিয়ে দিয়ে চুপ করে ঘুমাচ্ছে। ডাক দেয় আব্বু আব্বু ।
রানা উঠে যায়। টিলিকে দেখে একটু অবাক হয়। সাধারনত এরকম ঝগড়ার পর মেয়েটা নিজের ঘরে ঢুকে থাকে, বেশি বেড় টের হয়না। নিজের মত মানিয়ে চলে। আজ কি হলো!
কি বল মামণি!
কাল আমি একটু বন্ধুদের নিয়ে শপিংএ যাব।
তা তোমার মাম্মিকে বল! আমার তো অফিস আছে। আমার সাথে যেতে হলে উইকয়েন্ডে প্রোগ্রাম কর!
টিলির প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম! মাকে এখন বললে তো দাবড়ানি খেতে হবে!আজকেই পুলে নিয়ে গেল।
আব্বু তুমি একটু দেরি করে অফিসে যাও না, আর মাম্মি আমাকে নিয়ে আসুক।ওকে আব্বু! তুমি বুঝনা কেন, আমি কালকে তোমার সাথে যেতে চাই!
আচ্ছা ঠিক আছে। নিয়ে যাব। তাহলে তোমাকে সকালে উঠতে হবে।
উঠব, কোন অসুবিধা নাই। থ্যাংকস আব্বু। ইউ আর দ্য বেস্ট আব্বু।
সবাই সেটা বুঝে না।
টিলি বলে উঠে আমি বলছি বেস্ট আব্বু, নট দ্য বেস্ট হাজবেন্ড!
রানা পাশ ফিরে শোয় মেয়েও তার সাথে এভাবে কথা বলে।শুচিতো আর
আগামি সাত দিন তার চেহারাই দেখবে না।সে আস্তে করে দরজা টেনে দেয়। রানার কষ্ট শুচি বুঝেনা। রানার ভাই বোনেরা সম্পত্তি এমন ভাগ করেছে যে ঢাকায় গিয়ে তার নিজের থাকার মত কোন জায়গা নাই। শ্বশুরবাড়িতে উঠতে হয়।ওদের সম্পত্তি যা ছিল বিক্রি করে ভাই বোনেরা যার যার ভাগ নিয়ে নিয়েছে।বিক্রির সময় কত মিষ্টি মিষ্টি কথা! তুইতো বিদেশে থাকিস, ঢাকায় বাড়ি দিয়ে তুই কি করবি! যখন আসবি সবার বাসায় ভাগাভাগি করে থাকলেই হবে! আপা দুলাভাইয়েরা,ভাইয়া ভাবিরা সব সরকারি চাকুরি করে।ভাইদের কারো বাচ্চা নাই।সরকারি বাড়িতে থাকে।সুতরাং ওরা রানার সমস্যা বুঝেনা। মুখে বলে ঢাকায় যখন আসবি আমাদের বাসায় থাকবি। একবার উঠে দেখেছে। ভাবিরা ভাল চোখে ব্যাপারটা নেয় না।আপাদের বড় সংসার, তার উপর চাকরি ভীষণ ব্যস্ত সময় দিতে পারে না।অগত্যা শুচিদের বাড়িতে উঠতে হয়। তাছাড়া টিলি মামাদের সাথে খুব এটাচড। চাচাদের সাথে না। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রানাকে অনেক কিছু হজম করতে হয়। টিলির মামারা ভাল ব্যবহারই করে, কিন্তু রানার মনের সন্দেহ যায় না। হাজার হোক সৎ ভাই। যদি শুচিকে কিছু না দেয়!। কি করতে পারে ওরা। শুচিতো বোঝেনা।সবটাতেই ইমোশনাল। এত ইমোশনাল হলে তো ভাইয়েরা কিছু দিবেনা। শুচিকে বোঝাবে তুই বাইরে থাকবি তোর আর কি লাগবে। রানাকে যেমন ওর ভাই বোনেরা বুঝিয়েছিল! রানা এতদুর জীবনে যা কিছু অর্জন করেছে নিজেদের চেষ্টায়, বাড়ি থেকে কোন সাহায্য পায়নি। শুচিও যতদূর সম্ভব ওকে সাহায্য করেছে। দুজনের মিলিত প্রচেষ্টা! কেন এখন সব এলোমেলো হয়ে যায় রানা বুঝেনা। সেতো অন্যায় কিছু বলছে না!।
যখন অবস্হা ছিল না, তখনতো বলেনি। এখন অবস্হা ফিরেছে বলতে অসুবিধা কোথায় রানা বোঝেনা। অভিজাত এলাকায় শুচির বাবার কয়েকটা ফ্ল্যাট আছে।সেগুলির ভাড়া থেকে অনেক টাকা আসে। রানার ইচ্ছে শুচি ওর বাবাকে বলুক ওকে ফ্ল্যাট লিখে দিতে। যাতে পরে কোন গন্ডগোল না হয়। আর ফ্ল্যাটের ভাড়া যা হয় সব শুচির একাউন্টে দিতে হবে।শুচি কিছুতেই বলবে না। এটা তার বিবেকে বাধে।কি ভাবে সে বলে। বাবা বেঁচে থাকতে কিভাবে সে ভাগের কথা বলবে। অসম্ভব মনে হয় শুচির কাছে, বাবা কি মনে করবে! এতটা ছোট সে হতে পারবে না। তাছাড়া রানার সাথে প্রথম যেদিন বেড়াতে যায়, সেদিন অনেক কথা হয় । তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে কথা শুচি বলে সেটা হল তাদের কোন সম্পত্তি নাই!। রানাও বলে আমারও নাই। তারপর দুজনেই হাসে। নিজেই নিজের সম্পত্তি। কোথায় গেল সেই দিন। রানা যখনই সম্পত্তির কথা উঠায় ওর খালি পুরোন স্মৃতি ভাসে। শুচি আর ভাবতে পারেনা। কত কথা রানা সেদিন বলেছিল ।কি ভাবে তার বিয়ে হোল, কেন বিয়েটা টিকলো না।কেন শুচিকে ভাল লাগছে, শুচি তাকে পছন্দ করছে কিনা। আহারে সেদিনগুলি যদি আবার ফিরে পেত।শুচির চোখের পানি আর থামে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

