খাওয়া শেষ করে রানা টিলিকে টুকিটাকি উপদেশ দেওয়া শুরু করে। টিলির কিছু ভাল লাগে না। খালি বলে আমার ঘুম পাচ্ছে। রানা ওর কাছ থেকে কোন কথাই বের করতে পারে না।
আচ্ছা ঘুমাতে যাও।
শুচিকে আস্তে করে বলে রাত অনেক হোল আমিও ঘুমাতে যাচ্ছি।থাক টিলিকে আর কিছু বলতে যেওনা। কাল ঘুরে আসুক। দুদিন পরে স্কুল খুলে গেলে ঠিক হয়ে যাবে। ছোট মানুষ একটু আধটু এরকম করবেই। একা একা বড় হচ্ছে। সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানে তো এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবেনা। উল্টা আরো বেয়াড়া হয়ে যেতে পারে।
শুচি কোন কথা বলে না। নিজের কিশোরি জীবনের কথা মনে হয়। ওটা একটা জীবন ছিল নাকি! কোন স্বাধীনতা ছিল না। কুকুরেরও অধম।
রান্নাঘর গুছিয়ে শুচি টিভি চালায়। টিলিকে ডাকে। কোন সাড়া দেয় না।মেয়েটা চুপ করে পরে থাকে বিছানায়। আবোল তাবোল চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যায়। শুচির ঘুম আসে না।আহারে মেয়েটা নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ করেছে।
সে বেশ রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। অতীতে ফিরে যায়। এখনও স্পষ্ট মনে আছে রানার সাথে প্রথম যেদিন বাইরে গিয়েছিল। ঠিক করা ছিল অফিস ছুটির পর দেখা করবে এক নির্দিষ্ট স্হানে।রানা আগে এসে হাজির, শুচির দেখা নাই।শহরে কি নিয়ে তুলকানাম, অনেক ঘুরে আসতে গিয়ে দেরি হয়েছে।যাইহোক ফুটপাতে চায়ের দোকান থেকে ওরা চা নেয়, দোকানি এত ভাল খদ্দের দেখে ভাল প্যকেটের বিস্কিট বের করে দেয়।দাম নেয় না। সে খুব খুশি হয় তার দোকানের চা ওরা খাচ্ছে! রানা আর শুচি পরেও ঐ দোকানে কয়েকবার গিয়েছে। আচ্ছা লোকটা কি বেঁচে আছে! কতদিন হয়ে গেল।তখনিতো বেশ বয়ষ্ক ছিল।
রানাই কথা শুরু করে। বাবা মা ভাই বোনেদের কথা। বাবা খুব সামান্য চাকুরি করে সাধারণ ভাবে ওদের মানুষ করেছেন। খুবই সার্থক মানুষ। ছেলেমেয়েরা প্রত্যেকেই সরকারি চাকুরি করে। মেয়ের জামাইরাও সব বড় অফিসার। রানার ভাবিরাও তাই। বড় ভাবি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন রানা পাশ করে চাকুরিতে ঢোকার দুই বছর পর। উনার বসের মেয়ে। বাবা বিরাট আমলা। দুই মেয়ে এক ছেলে। ছোট মেয়ের সাথে রানার বিয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়নি আর ছেলেটা ছোট। বড়টার বিয়ে না দিয়ে ছোট মেয়ের কেন বিয়ে দিচ্ছে, রানা জানতে চেয়েছিল। উত্তরে ভাবি বলেছিলেন, রানার মধ্যবিত্ত মানসিকতা ছাড়া উচিৎ। তাছাড়া ওরা অনেক বড়লোক, রানার কোন অভাব থাকবে না। বাড়ি গাড়ি যা চায় সব পাবে। চাইতেও হবে না। উনারা মেয়েকে সব দিয়ে দিবেন। এক বাড়িতে থাকবে, আরেকটা ভাড়া দিবে।গাড়িও থাকবে। রানা বলেছিল আমরা তো খুব সাধারণ ফ্যামিলির লোক, এত হাই ফাই ঘরের মেয়ে কি ভাবে আমার সাথে এডজাস্ট করবে। ভাবির উত্তর ছিল মেয়েটা খুব ভাল, সব পরিস্হিতিতে মানিয়ে চলতে পারে।
রানাকে দেখে ওরা খুবই পছন্দ করেছে। সুতরাং রানার এখন মেয়ে দেখার পালা। একদিন ভাবির অফিসে গিয়ে মেয়ে দেখে আসলো। কি সুন্দর দেখতে। নামটাও সুন্দর। মনি।আর মনি বেশ মেধাবি। তার ইচ্ছে ভার্সির্টির টিচার হবে। এই মেয়ে তার বউ হবে! রানা খুশি হয়ে উঠল। সে নিজে দ্বিতীয় কাতারের ছাত্র। ভাবিকে হাজার বার থ্যাংকস দিল।বিয়ের দিন ঠিক করার জন্য আপাদের সাথে যোগাযোগ করে। সবাই খুশি। কারও কোন অমত নাই। বাবা মা রানার সাথে থাকেন। বড় ভাইয়েরা সবাই ব্যস্ত, সময় নাই। ওদের বাসায় গিয়ে বাবা মা স্বস্তি পায় না। সেজন্য রানা আর উনাদেরকে যেতে দেয়না। রানা একটু লজ্জায় পরে। ওর বাসাটা খুবই ছোট। ছোট দুই রুম। বারান্দা নাই। এই বাসায় এত বড় বাড়ির মেয়ে কিভাবে এসে থাকবে! তার উপরে বাবা মাকে কোথায় রাখবে। উনারাতো মেয়েদের বাসায়ও যাবেন না। রানা যে কি করে! আবার মায়ের অসুস্হতা আরো বেড়েছে। ভাবিরাতো শুনলে এখনই মাকে দূরে সরিয়ে দিবে। রানা আর থাকতে না পেরে বড় আপার বাসায় যায়। যত যাই হোক মা অসুস্হ হওয়ার পর আপারাই তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। ওদের কাছে পরামর্শ চায়। ভাগ্য ভাল ছোট আপাও বেড়াতে এসেছে। বড় আপা বলেন তুই এত চিন্তা করিস না। বিয়ের সময়টা না হয় বাবা মা আমার বাসায় এসে থাকবে। তারপর ঝামেলা চুকে গেলে আবার যাবে। রানার মাথা থেকে বিরাট বোঝা নামে।
শুচি কথার ফাঁকে জানতে চায় কি অসুখ হয়েছিল উনার?
রানার হওয়ার পর উনার শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়। অনেক চিকিৎসা করা হয়েছে ভাল হয়নি। এখন বয়সের সাথে সাথে শরীর ভেন্গে গেছে। অন্য আরো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে!
দুলাভাইয়েরা ঠাট্টা শুরু করেন। কি রাজত্ব আর রাজকন্যা একবারেই পেয়ে যাচ্ছ কি ভাগ্য করে এসেছ শালাবাবু! আমাদেরকে পরে চিনবে তো!
রানা লজ্জা পায়। কি যে বলেন দুলাভাই। আপনারা যেন রাজকন্যা পান নি!
আরে শালাবাবু আমরা রাজকন্যা পেয়েছি কিন্তু রাজত্ব পাইনি। তুমিতো টেক্কা মেরে দিচ্ছ!
বড় হোটেলে মহা ধুমধামে বিয়ে হোল। সেদিনের কিছু ঘটনা রানার মনে খটকার জন্ম দেয়।বিয়েতে এক পীর সাহেব আসলেন। মনির পুরো পরিবার পীরের মুরিদ।এই পীর সাহেবরই পছন্দের পাত্র রানা! উনার কথা ছাড়া মনির বাবা মা নড়াচড়া করেন না।তার হুকুমেই রানার সাথে ওনারা মনির বিয়ে দিচ্ছেন। রানার খুব বিরক্ত লাগে কথাটা শুনে।তার যোগ্যতার কোন মূল্যই নাই! রানার শ্বশুর শ্বাশুড়ি তাকে নিয়ে মহা ব্যস্ততা শুরু করলেন। রানার বাবা মায়ের দিকে খেয়াল করলেন না। বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানটাই কেমন নাটক মনে হোল ওর কাছে। আর তাতেই মনটা তেতো হয়ে গেল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

