বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে রানার বাসায় বউ নিয়ে যাওয়ার তোরজোর শুরু হয়। কিন্তু মনির বাবা মা এসে তা ভন্ডুল করে দেন। উনাদের মতে পীরসাহেবের ইচ্ছা মনি আর রানার বাসর রাত মনিদের বাসায় হোক! এতে ভবিষ্যতে ওদের ভাল হবে। রানা মনে মনে চিন্তিত হয়ে উঠে। একি উটকো ঝামেলায় পড়ল! এই লোক সব ব্যাপারে নাক গলায় কেন! কেউ কিছু বলে না কি মুসকিল! কি করে এখন। সে সোজা বড় ভাবিকে এক ফাঁকে বলে দেয় মনিকে নিয়ে নিজের বাসায় যাবে। একটু পরে ভাবি এসে মুখ কালো করে বলে মনিও থাকতে চাইছে তুমি আর ঝামেলা কোরনা। এক রাতেরই ব্যাপার কি আর হবে। তাছাড়া উনারা বলছেন খুব সুন্দর করে মনির ঘর সাজিয়ে দিয়েছেন। দেখো তুমি পছন্দ করবে।রানা আর চিন্তা করতে পারেনা। ভীষণ বিরক্ত হয় সে, শ্বশুরবাড়িতে বাসর রাত সে কখনোই ভাবেনি। আচ্ছা ওরা ভেবেছে কি! রানার মতামতের কোন দাম নাই। ওকে কি খেলনা পেয়েছে।মনির জন্য নতুন খেলনা! লোকলজ্জার খাতিরে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। মনে মনে গুমরে মরে। ছি ছি কিসের পাল্লায় পড়ল। তার উদ্ধারের উপায় কি! আপারা বোধহয় বুঝতে পারেন রানার মনের অবস্হা। কাছে এসে ওকে সাহস দেয়। তুই এত ভাবিস না। কাল আমরা সবাই এসে তোর বাসায় তোদের নিয়ে যাব। আজ আর অশান্তি করিস না। এক রাতের মামলা।উনাদের দিকটাও তো তোকে দেখতে হবে।
তাই বলে বাইরের লোকের কথামত চলতে হবে?
উনাদের জীবনটাই ওরকম। ওরা এভাবেই অভস্ত্য। কি করবি বল! এসব আগে ভাবিসনি কেন?
আমিতো জানিনা। কেউ বলেনি আমাকে! উনাদের জীবন উনাদের থাকবে, আমাদেরটা তো আমাদের গড়ে নিতে হবে নাকি!
শোন রানা পরে এসব নিয়ে তুই আর মনি ভাবিস। এখন অনেক রাত হোল আমরা যাই। কাল নিতে আসব।
মনিদের কয়েকজন মহিলা আত্নীয় রানাকে নিয়ে গাড়িতে উঠেন। মনি অনেক কথা বলছে উনাদের সাথে খুব খুশি লাগছে তার। যাক হুজুর বাবা খুব ভাল ছেলে পছন্দ করেছেন তার জন্য! কি ভাল দেখতে। আর সবচে বড় কথা এখনই যা বলছে তাই শুনছে! মনে মনে মনি নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল। আচ্ছা রানা মুখ কালো করে বসে আছে কেন! রাগ করল নাকি। সে আলতো করে রানার হাতে হাত রাখে। অন্ধকারে বুঝতে পারেনা রানা খুশি হোল কিনা। তবে রানা হাতটা সরিয়ে দেয়না। বরং দুহাতে মনির হাত ধরে থাকে। মনিদের বাসার রাস্তা মনে হয় আর ফুরায় না। অস্হির লাগে রানার। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়। হঠাৎ করে লোকজনের কলরবে রানার ঘোর কাটে। মনিদের বাড়ি এসে গেছে। বাহ কি সুন্দর করে পুরো চারতলা বাড়িটা সাজানো হয়েছে।
ওদেরকে নিয়ে তিনতলায় যাওয়া হোল। মনির বাবা মা বড়বোন ভাই সবাই দাঁড়িয়ে রানা মনিকে গ্রহন করলেন। রানার চোখ পীরসাহেবকে খুঁজছে। দেখতে পেল না। আজবতো। কোথায় গেল। সে নিশ্চিত লোকটা আশেপাশেই আছে! মনির ঘরে ঢুকে রানার মনে হোল সে বোধহয় আরব্য রজনীর কোন পর্বে চলে এসেছ। সিনেমার অভিগ্গতা থেকে তার মনে হোল! সব নতুন ফার্ণিচার। খাটের মাথাটায় আবার আয়না লাগানো।দুপাশে ছোট টেবিল। রানাদের কখনোই এত দামি ফার্ণিচার ছিল না।নিশ্চয়ই সেগুন কাঠ
কি সুন্দর, কি চমৎকার করে খাট সাজান হয়েছে। সিলিং থেকে গোলাপ আর বেলী ফুলের ঝাড় নেমেছে। ফুলের গন্ধে সারা ঘর মৌ মৌ করছে। খাটের উপর সাটিনের লাল হলুদ বেড কভার। একটা টেবিলে পানির জগ আর দুটো গ্লাস রাখা, সাথে কিছু মিষ্টি।
রানাকে সবাই ধরে খাটে বসিয়ে দিল। মনি তারপাশে। রানার মনে হোল এসে ভালই করেছে। না হলে এত সুন্দর সাজ দেখা হত না। মেয়েলি আচার অনুষ্ঠান শেষ হলে সবাই চলে গেল। রানা উঠে দরজা লাগিয়ে দেয়।মনি চুপ করে ঘোমটা টেনে বসে আছে। আস্তে করে রানা বলে এসে ভালই করেছি। না আস্লে এত সুন্দর ঘর সাজানো মিস করতাম।
সত্যি বলছ!
হ্যা। রানা চুপ করে যায়। কি বলবে কথা খুঁজে পায়না।মনি উশখুশ করতে থাক।মনিই নীরবতা ভাঙে। আমার একটা স্কলারশিপ হয়েছে।
রানার মনে হয় কথা বুঝতে কষ্ট হয়। স্কলারশিপ? কবে হোল?
আজ সকালেই খবর এসেছে। সেইজন্য ভাবলাম খামোখা আবার ছুটাছুটি করে কি লাভ। খুব তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
রানা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মনি কি বলে এসব! কোথায় যাবে। তার সংসার শুরু হবে না।!
তুমি যাবেই ঠিক করেছ! আমাকে তো কিছু জানাওনি। আমার একটা মতামত নাই।
অবশ্যই আছে। কিন্তু তুমিই বল এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করব। কয়জনে এরকম সুযোগ পায়।ছেলেরাই পায় না সেখানে আমি মেয়েমানুষ।
এটা একটু পিছিয়ে দেয়া যায় না!
না, দিন দশেকের মধ্যে যেতে হবে।
রানার মাথা থেকে রোমান্টিক মুড চলে গেছে। বাস্তবের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে জানতে চায়, তুমি তাহলে এখন বিয়ে করতে গেলে কেন? বিয়ের আগেতো এসব বলনি, তাহলে তো তোমাকে আমি বিয়েই করতাম না। এসব প্রতারণার কোন মানে হয়? আমার কি হবে? তুমিতো বাইরে থেকে পড়া শেষ করে তারপর বিয়ে করতে পারতে? নাকি ভেবেছিলে আর পাত্র পাওয়া যাবে না?উত্তেজনায় রানার গলা চড়ে যায়।দরজায় টোকা পরে। রানা দরজা খুলে দেয়। মনির বাবা মা ঢুকে পরেন।
বাবা মনির কোন দোষ নাই। ও বিয়ে করতে চায়নি। আমরাই জোর করে বিয়ে দিয়েছি। ও আগে পড়া শেষ করতেই চেয়েছিল। বিদেশে ওকে একা যেতে দিবনা। তুমিও যাবে। আমরা সব ব্যবস্হা করব। তুমি কোন চিন্তা করনা। রাগের চোটে রানা আর কথা বলতে পারেনা। একটু দম নিয়ে বলে আপনারা আগে এসব বলেন নি কেন? আমাকে কি ভেবেছেন যা বলবেন সব শুনে যাব, কোন উচ্চবাচ্চ্য করবনা?
মনির বাবা আমলা মানুষ। উনি জানেন পরিস্হিতি কিভাবে সামাল দিতে হয়।বাবা তুমি উত্তেজিত হয়ে আছ। শান্ত হও। ঠিক আছে তোমার যখন অমত মনি যাবেনা। এখন খুশিতো। রানার মগজে কোন কিছুই ঢোকেনা। কিভাবে এরা তাকে প্রতারণা করল! সে কার কি ক্ষতি করছে! বাবা কোথায় যাও?
দুঃখিত আমি আর থাকতে পারছিনা। আমি চলে যাচ্ছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

