somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপাঙতেয় ১৭

১৫ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লিচুর মন মরা ভাব বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। কাজের মেয়েটা এসে জানাল নূরী ডাকছে রাতের খাবার খেতে। লিচুর একটু লজ্জা লাগল মা সবাইকে না ডেকে খালি ওকে ডাকছে! রুবাকে বলে তুই যা, আমি মামাদের সাথে খাব।নয়ন আর শফি চোখাচোখি করে। শোন লিচু আমাদের অনেক দেরি হবে খেতে, বুবু আবার রাগ করবে, তুমি খেয়ে নাও, কাল বরং আমাদের সাথে খেও। এখন যাও সবাই বসে আছে।

লিচুর মনে হল ওকে সরাতে পারলে ওরা বাঁচে। সে আর উচ্চবাচ্চ্য না করে বড় বাড়িতে চলে গেল।শফি ইশারা করায় নয়নও পিছু পিছু গেল, লিচুকে পাহারা দেওয়ার জন্য।
লিচু দেখে এলাহি কারবার করে ফেলেছেন রোকেয়া বেগম। বিরাট খাবার ঘরে বসার জায়গা নাই। জাভেদ আর নানাও চলে এসেছেন, সাথে করে সুগার মিলের নতুন ম্যানেজার আর উনার স্ত্রী। ভদ্রলোক বয়ষ্ক অথচ বউটা অল্পবয়সি। ইস আমাদের দেশের কিছু মেয়েদের কেন যে বুড়া হাবড়ালোকদের সাথে বিয়ে হয়, আর মেয়েগুলিই কি বোকা! ওরা রাজি হয় কেন! আবার দেখ না কেমন চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। যেন কত সুখী মানুষ। ন্যাকামো করার জায়গা পায়না! ধুর কি যে যাতা ভাবছে লিচু। মরুক গে।
সে এক কোনায় প্লেট নিয়ে খাবার উঠাতে থাকে। নয়নও যোগ দেয়। নূরীর বন্ধুরাও আছে, তারাও খাবার উঠাচ্ছে। লিচু আর নয়ন নূরীদের ঘরে চলে যায়। নানি অনেক মজা করে রান্না করেছে। নয়ন বলে উঠে। লিচু মাথা নাড়ে। তার হঠাৎ করে চোখে পানি চলে এসেছে। সে মুখটা ঘুরিয়ে নেয়। সে বুঝতে পারে নয়ন তার সাথে খেতে এসেছে বন্ধু হিসেবে নয়, তাকে পাহারা দিতে।তার আবার মন খারাপ করতে শুরু করে। এই লিচু তুই কিছু বলছিস না, আমিই বকবক করছি।
বল তোদেরই কথা বলার দিন।
মানে !
মানে কিছু না।
নয়ন বুঝে লিচুর মন খারাপ হয়েছে। শোন আসলে তুইতো মামাদের সাথে কখনো অত মিশিশনি, সেজন্য ওরা একটু সন্দেহ করে, তার উপর এখন এই রাজনৈতিক অবস্হা, কারো উপর বিশ্বাস রাখা যায় না।
আরে আমি কি টিকটিকি নাকি? এসব কি বলিস তুই নয়ন!
না না তুই টিকটিকি হবি কেন! মানে তুই যদি হঠাৎ বড়দের মাঝে মুখ খুলিস, সেইজন্য মামারা ভয় পায়। তুইতো এখনো ছেলেমানুষ!
আশ্চর্য্য, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, আমি এখনো ছেলেমানুষ। মামারা যে কি ভাবে না আমাকে! যাক বড় মামা কি চলে গেছে?
নয়ন ঘাড় নেড়ে জানায় হ্যাঁ।
লিচুর মনে আবার সেই ফ্ল্যাগটা ভেসে উঠে। ফিসফিস করে বলে কি সুন্দর নারে!
নয়ন প্রথমে বুঝতে পারে না, পরে বুঝে সে বলে খুব সুন্দর, আমার এত ভাল লাগছে তোকে কি বলব! সত্যি যদি এরকম হয়! আমি ভাবতেই পারছিনা।
চল খাওয়ার পরে আবার দেখি।
আচ্ছা দাঁড়া আগে খেয়ে নেই। কি যে মজা হইছে। ওদের কথা শেষ না হতেই নূরী আর বিজু এসে হাজির। দুজনের হাতেই প্লেট, খাচ্ছে বসার জায়গা পাচ্ছেনা। লিচুকে বলে একটু সর, আমরা বসি। লিচু উঠে দাঁড়ায় মা আমার খাওয়া শেষ, এই নয়ন তাড়াতাড়ি খা।
কেন রে কোথায় যাবি?
মামাদের সাথে গল্প করব।
ঠিক আছে যা, তোর বাবা মিষ্টি নিয়ে আসছে, খেয়ে যা।
ওরা মিষ্টি মুখে দিয়েই ছুটে পিছনের বাসায়। কি অমোঘ আকর্ষণে লিচু চলে আসে। সে নিজেই জানেনা।কিন্তু তার আশা পুরণ হয় না। মামারা কিছুতেই আর ফ্ল্যাগটা দেখাতে রাজি হয়না। খালি বলে সময় হোক। লিচুর দীর্ঘশ্বাস পরে, কবে সময় হবে।

দুদিন কেটে যায়। লিচুরা খালি খায় ঘুমায় নদীর পাড়ে বেড়াতে যায়। কোন ঝুটঝামেলা নাই। জাভেদ ইতিমধ্যে ভাবতে থাকে সে একা হয়ত শহরে ফিরে যাবে। তার কাজের জন্যই তাকে যেতে হবে। হাত পা গুটিয়ে কতদিন বসে থাকা যায়! কয়দিন পরে তো হাতে টাকাপয়সার টান ধরবে! তখন কি করবে! নাহ একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।

সাতই মার্চ বিকালে নয়ন আর লিচু রেডিও ধরে বসে থাকে। তারা আশা করছিল, এত বড় মিটিং হচ্ছে, হয়ত রেডিওতে তা প্রচার করবে। কিন্তু ওদের হতাশ হতে হয়। ওরা হাল ছাড়ে না। রাতে বিবিসি শোনে। লিচুর মনে হয় চোখের সামনে সে সব দেখতে পাচ্ছে। হাজার হাজার লোকের করতালির মধ্যে শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ভাষন দিচ্ছেন। খালি মনে হয় আহা যদি দেখতে পারতাম!বিবিসিতে শোনে স্মরণকালের ইতিহাসে কোন মিটিংএ এত লোক সমাগম হয়নি। রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারে না।

সকালে উঠে নাস্তা খাচ্ছে সবাই। হঠাৎ করে হুড়মুড় করে নয়ন এসে হাজির। সাইকেল জোড়ে চালিয়ে সে হাঁপাচ্ছে।তাড়াতাড়ি রেডিও ধরেন, ভাষন শোনাবে, সে চিৎকার করে উঠে। লিচু হাত ঝেড়ে উঠে পরে। রেডিও অন করে। ঢাকা কেন্দ্র। ভেসে আসে জলদ গম্ভীর স্বর। ভায়েরা আমার .......
লিচু কখনো শেখ মুজিবর রহমানের বক্তৃতা শুনে নাই। পারতপক্ষে সে কখনো কোন রাজনৈতিক বক্তব্যই শুনে নাই। তার কোন অভিজ্ঞতা নাই, রাজনৈতিক বক্তব্য কেমন হয়। সে খালি বুঝতে পারল আজ যা সে শুনল সারা জীবনে আর কখনো এরকম কিছু সে শুনবে না। তার বুকের ভিতর কাঁপন ধরে, হাঁতুড়ির বাড়ি শুরু হয়। সে সবার মুখের দিকে তাকায়।সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শেখ মুজিবের কথা শুনছে। "ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল।এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম"।

লিচু মনে হচ্ছে আনন্দে সে ভেসে যাচ্ছে, তার চোখে পানি। সে তাকিয়ে দেখে সবার মুখ উদ্ভাসিত অজানা আশায়। রোকেয়া বেগম আর নূরী আঁচলে চোখ মুছে। তালুকদার সাহেব আর জাভেদ চুপ করে থাকে। লিচুর মামারা সবাই উত্তেজিত, বাবার সামনে মুখ খোলে না। নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করে, যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, ট্রেনিং শুরু করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। লিচুর কানে কিছুই ঢোকে না। তার মষ্তিষ্কের কোষে কোষে বাঁজতে থাকে এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

কি যে গন্ডগোল একটা লাগবে এইবার। এইভাবে সাধারন মানুষদের উত্তেজিত করার কোন দরকার ছিল! তালুকদার সাহেব বলে উঠেন।
লিচুর মামারা সবাই একসাথে কথা বলে উঠে। অবশ্যই দরকার ছিল আব্বা। আমরা আর কত সহ্য করব? আপনি দেখছেন না ওরা কিভাবে টালবাহানা করে সময় নষ্ট করছে? ইলেকশন হয়ে গেছে সেই কবে এখনো পার্লামেন্ট ডাকছে না, আর কবে ডাকবে?এতেই বুঝা যায় ওদের মতলব ভাল না। কিছুতেই ক্ষমতা ছাড়বে না। সময় এসেছে ওদের কে উচিৎ শিক্ষা দিবার।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:৫০
১৮টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×