: আছিস??
পেছন থেকে ফিসফিসিয়ে উত্তর আসে, ”জ্বি হুজুর।”
: কতক্ষণ লাগব?”
নিশ্চুপ। কোন উত্তর আসে না।
হাজী সাহেব পেছনে ফিরে তাকানোরও প্রযোজন মনে করেন না। তিনি জানেন, কাজ হবে। এবং তিনি যতক্ষণ বলে দেবেন, ততক্ষণেই সে কাজটা করবে। একচুল নড়চড় হবে না। এমনকি, খুব অসম্ভব একটা সময় নির্ধারণ করে দিলেও কিছু যায়-আসে না। কাজ ঠিক নির্ধারিত সময়েই হবে। হতে বাধ্য। তবু, প্রতিবার তিনি এমন করেন। তার মজা লাগে। একধরনের খেলা। প্রতিবার নতুন শিকার, কিন্তু, একই শিকারী। সময়ের ব্যবধান কমতে থাকে!!
: ঐ.. তোমারে না বলছি টেবিলডা আস্তে নামাইতে। দিলা তো দাগ ফালাইয়া। এখন জরিমানা কে দিবো??
- আপনে বেশি কতা কইয়েন না। কইছেন দুই ঠেলা। এখন দুই-দুই চাইর ঠেলা দিয়া আইছি। যা দেখতাছি আরো একবার যাওয়ন লাগব। ট্যাকা দিবোনি??
: না দিবোনা। এমনে এমনে খাটাইতাছে তো!!
- হ, আপনেই নিয়েন ট্যাকা!! সকালে ঘুম থেইকা তুইলা নিয়া আইছেন এক কথা কইয়া.. এখন আরেকরকম।
: যা.. তুই যা। ঐ হোসেন, ওরে যাইতে গা ক তো। লাগব না তোরে। যা গা তুই।
- হ, যামুই তো।
: যা। তোর টাকা বিকালে আইয়া নিয়া যাইস। যা.. জবান দিছি। যতক্ষণ লাগে সব নিয়া বাসায় ফিট কইরা তার পরে যামু। তুই যা। বাসায় গিয়া ঘুমা।
- হ, দুই ঠেলা নিছি। টাকার হিসাব রাইখেন। বিকালে আসুম নে।
: যা। চোখের সামনে থেইকা যা।
মাঘি পূর্ণিমার রাত। চারদিকে উৎসব মত। অনেক জায়গায় ফানুস ওড়ানো হচ্ছে। আর, চারপাশ ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। চুপ করে বসে আছে ইসমাইল। একটু দূরে বিড়ি ফুঁকছে তার ”বস”!! একটা মাত্র তৈরি হচ্ছে-হচ্ছে এমন এক বিল্ডিং-র সিড়িতে বসে চোখ আধবোঁজা। প্রশান্তির একটা আভা সারা মুখে-চোখে। ইসমাইল ভেবেই পায় না আর পাঁচ-সাত মিনিটের মাঝে যা ঘটাবে ঐ লোক তার আগে কিভাবে এত শান্ত থাকতে পারে?? দূর থেকে তিন-চারজনের কথা শোনা যায়। হুট করে দাঁড়িয়ে যায় সে। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে দেখতে চায় কারা এল।
পেছন থেকে ডাক আসে ”ইসমাইল। এখানে নাই।”
থেমে গিয়ে ফিরে আসতে থাকে আগের জায়গায়। এতদিন ধরে তার সাথে আছে, তাও প্রতিবার ভুল করে, আর প্রতিবারই ”বস”-র এই আগে থেকেই বুঝে ফেলার ক্ষমতাকে একই সাথে ভয় আর ঈর্ষা করে।
লোকগুলো যেতে যেতে কি ভেবে একবার এদিকে তাকায়। তাদের দেখেই কয়েকজন চমকে ওঠে। কথা থামিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
: ওস্তাদ। হেয় তো গেল গা। কি করুম??
- কি করবি মানে কি?? সাবধানে বাকি টেবিল-চেয়ারগুলা নামা। দেখিস যেন আর বারি-টারি না লাগে। তাইলে কিন্তু সাবে মন খারাপ করব। সাবধানে।
একটু পর আবারও কিছু মানুষের কথা শোনা যায়। এবার ইসমাইলকে উঠে দেখতে হয় না। সে উঠতে উঠতেই দেখে তার পাশে কখন যেন নি:শব্দে চলে এসেছে তার ”বস”।
দৃপ্ত পায়ে দু’জনে এগিয়ে চলে। ঘড়ি দেখে। এখনো ৩০ মিনিট মত বাকি। ইসমাইল ভাবতে থাকে। এতগুলো লোক। এরা না সরলে তো কিছুই করা যাবে না। ভাবতে ভাবতে একটু পিছিয়ে পরে সে। ততক্ষণে তার ”বস” মুখোমুখি। তাকে দেখেই লোকগুলো একটু যেন ভয় পায়। তবু, একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, ”কি চাও?”
- সালাম। ভালো আছেন?
: হুম। তুমি ভালো??
- জ্বি। আপনাদের দোয়া।
: কি দরকার??
- এই তো, একটু কাজ ছিল। আপনের বাবুরা ভালো তো?
: হ্যা। চল। বাসায় চল। আজ আমাদের সাথে খাবে চল।
- নাহ, থাক। আপাতত যাই। সালাম।
ইসমাল একটু অবাক হয়। এমন তো হবার কথা না। কাজ না সেরেই ফিরে যাচ্ছে তারা?? হঠাৎ বিদ্যুতাড়িতের মত চমকে ওঠে গুলির শব্দে। মানুষের হুটো-পুটি, চিৎকারের মাঝে একটা কথা, ”গিয়াস”!!!
সন্ধ্যা। সারাদিন পরিশ্রম। সবাই ক্লান্ত। টুং করে ডোরবেল বাজে। আনিস সাহেব নিজেই দরজা খুলে দেন।
: আসেন, আসেন।
- সব বসানো হইছে নি??
: আরে কি বলেন? আজ নতুন বাসায় উঠলাম, আজই কি সব গুছানো হবে নাকি??
- হ, ঠিক কইছেন। আস্তে আস্তে গুছান। সব ঠিক-ঠাক আছে তো?
: হুম। আছে। কিন্তু, এই দেখেন এই যে টেবিলটা দেখেন.. দাগ ফেলে দিছেন। মাত্র ১ মাসও হয় নি রং করিয়েছে ছেলে।
- স্যার। ভুল হইছে স্যার। আমি দেখছি। হেরে ধমকও দিছি। কি করমু কন। কইছিলাম আস্তে আস্তে কর। কিন্তু..
: আপনার থেকে তো টাকা কাটা উচিত।
- কাটেন স্যার। এইটা তো আমাদের দোষ।
: কত দিব?
- স্যার ৩ গাড়ি হওয়ার কথা। লাগছে ৫ গাড়ি। হিসাব কইরা দেন।
: না। আপনে বলেন, কত দিব?
কথায় কথা রফা হয় একটা অংকে।
- স্যার উঠি। স্লামালেকুম।
: আরে, গিয়াস মিঞা। বসেন। আপনে আমাদের নতুন বাসার প্রথম অতিথি। বসেন। চা খেয়ে যান। আমি চা দিতে বলছি..
[একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। গল্পের আকার বড় হওয়ায় দু:খিত।]
[ব্যস্ত। তাই, লেখা পড়া হয়, কিন্তু মন্তব্যানো হচ্ছে না। আন্তরিকভাবে দু:খিত সকলের কাছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



