কী এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের অদ্ভুত সময়ে আমাদের বসবাস। আমাদের দিন যাপন। যেখানে মসনদে আসীন শাসক দল অথবা মসনদ থেকে সদ্য বিতাড়িত শাসস গোষ্ঠী, ক্ষমতার পালবদলে আ’লীগ অথবা বিএনপি, বা চারদলীয় জোট বা মহাজোট যেই সরকার পরিচালনা করুক না কেন, জনসম্মুখে নিজেদের আমলনামার সাফল্যগাঁথার সুচক হিসেবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সামাজিক খাতের উন্নতি নয়, বরং কতটা লাশ বেশি অথবা কম পড়লো তারই গাণিতিক হিসাব সূচক হিসেবে দাঁড় করানো স্বীকৃত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেনবা লাশ ফেলাই এ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেন বা এ রাষ্ট্রে স্বাভাবিক মৃত্যুর ওপর সেন্সরশীপ জারি করা আছে। অথবা অস্বাভাবিক মৃত্যুই খুব খুব প্রত্যাশিত-স্বাভাবিক ঘটনা। অন্তত রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা না থাকা শাসকগোষ্ঠীর কাছে। ফলে মায়ের কোলে থাকা শিশু সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হলে এ রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া দরিদ্র মেধাবী ছাত্র আবু বকর খুন হলে এ রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ পদের মানুষটি হিতাহিত জ্ঞানের তোয়াক্কা না করে অনায়াসে বলতে পারেন 'আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে'। অথবা 'আবু বকরের মৃত্যু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা'। এখানে এখন প্রতিদিন লাশ পড়ে। এখানে ওখানে। স্কুল ফেরত ফুটফুটে শিশুরা মায়ের হাত ধরা থেকেই বাসের চাপায় পিষ্ট হয়। জেলা শহরের চাল ব্যবসায়ী ঢাকায় এলে আর জীবিত ফেরে না আপনজনদের কাছে। ব্যাংক এর কাউন্টার থেকে সদ্যা বিদায় নেয়া মানুষটি চির বিদায় হয়। তার জান-মাল দুটোই লুট হয়। দিনে দুপুরে। বাড়ি ফেরার পথে। তাতে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। কারণ যারা চলে যায়, এভাবে, শাসকের চোখে তারা হয় আল্লাহর মাল, না হয় এগুলো কেবলই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বিচ্ছিন্ন থেকে যায়। শাসকের মন শরীর, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, জবাদিহীতা কোন কিছুকে এত মৃত্যু, এত লাশ একটুও স্পর্শ করতে পারে না। একটুও ভাবায় না। কেবল দু’একটা মোটা মাথার বিবৃতি আর প্রেসনোট প্রসব করা ছাড়া।
এখানে এখন অগনিত লাশ পড়ে। অগণিত মৃত্যু হয়। গোটা জমিনটাই যেন অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটানোর নিরাপদ জায়গা। এ এখন মানে আজকের এখন নয়, গত এক দু’ বছরের এখন নয়। গত কয়েক দশকের এখন। যে সময়ে এ রাষ্ট্রে কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী পাল্টেছে। তত্ত্বাবধায়করা এসেছেন। গেছেন। পাল্টেছে প্রেসিডেন্টও। মন্ত্রী-আমলা সব কিছুতে পালাবদল হয়েছে। শুধু বদল হয়নি শাসকের শ্রেণী চরিত্র। আর তাই মেলেনি অথবা মিলছে না স্বাভাবিক জীবনের গ্যারন্টি। মৃত্যু মানুষের জীবনের চুড়ান্ত অনিবার্য সৌন্দর্য। পাওয়া যাচ্ছে না সে সুন্দর স্বাভাবিক পরিণত মৃত্যুর নিশ্চয়তা। পরিণত মৃত্যুই যেন এখানে এখন দুর্ঘটনা। অতএব এ দুর্ঘটনা যত কম হয় ততই রাষ্ট্রের কৃতিত্ব। আর এ কৃতিত্ব দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়া, হতাশায় নিমজ্জিত হওয়াই যেন নাগরিক হিসেবে আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



