somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নদী মরে গেলে...

২৩ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১২:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শুক্রবারের খুব ভোরে সদরঘাট টার্মিনালের সামনের রাস্তায় গাড়ী-ঘোড়া তেমন নাই, লোকজনের চলাচল কম, চারদিক প্রায় ফাঁকা ফাঁকা। ড্রাইভার গাড়ীটা খুব সহজেই ঘাটে নাও ভিড়াবার মত করে ফুটপাতের পাশ ঘেষে দাঁড় করায়। রাঁজহাসের ডানা মেলে ছড়িয়ে পড়ার ভঙ্গিতে দু’পাশের চারটা দরজা প্রায় একসাথে খুলে যায়। প্রথমে জুতা সহ পা, তারপর তাকে অনুসরন করে পুরা শরীরটা, গাড়ী থেকে নেমে দাড়ায় চারজন যুবক। দুজনের গলায় চওড়া ফিতার বেল্ট, তাতে ঝুলছে কালো চকচকে ক্যামেরা, আধুনিক মারণাস্ত্রের মত লম্বা লম্বা তার লেন্স।

আমাদের চারজনের এই অপেশাদার দল ফি সপ্তাহে ছবি তোলার অভিযানে সামিল হয়, ভ্রমন এবং ছবি তোলা একসাথে। ভ্রমন কখনও রাজসিক, কখনো দুর্গম, কিন্ত ছবি তোলার মান নিয়ে কোন আপোষ নাই। ফেসবুকে একটা গ্রুপও খোলা হয়েছে, অনলাইন ওয়েব এ্যালবাম এ একাউন্টও খুলেছি।

এ সব উদ্দ্যোগে, আমার উদ্দীপনায় কখনও ঘাটতি দেখা যায় না... কিন্ত আজ গাড়ীতে বসে আমি এতক্ষন ঝিমাচ্ছিলাম, প্রায় জনশুন্য রাস্তায় নেমে আড়মোড়া ভাঙতে গিয়ে টের পেলাম নদী পথে যাত্রার নাম শুনে আমার সারা মুখ বিস্বাদ—বেশ অরুচি, ব্যাপক ক্ষুধামান্দ্র আর পিত্তের আধিক্য। পানির সাথে বাড়তি সখ্যতা আমার কোনকালেই ছিল না। তার উপর জানি না হাউ টু সুইম... নৌভ্রমনের পুরা বিষয়টাই আমার কাছে সর্বদা জলবৎ তরলং ষড়যন্ত্র বলে মালুম হয়। পানিকে আমার মনে হয় বিশাল এক ফেরেববাজ, আমি আস্থা পাই না। ঢাকার ’৮৮ সালের মহা প্লাবনের এক সন্ধ্যায় বিনা প্ররোচনা এবং উস্কানীতে ছোট এক চিলতে কিস্তি নৌকা শ্যামলীর মোড়ে কিভাবে আমাকে গলা সমান পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিল... সে ষড়যন্ত্র আমি কোনদিন ভুলি নাই। অথচ যাত্রী ছিলাম শুধু একা আমি আর নৌকার কিশোর মাঝিটি আমাকে কেবল বলেছিল নড়াচড়া না করতে। আমার ধারনা স্রেফ নড়াচড়া না করার জন্য সেদিন ঐ ঘটনাটি ঘটেছিল।

এতক্ষন ঝিমাতে ঝিমাতে মনে মনে আশা করছিলাম শেষ মুহুর্তের কোন এক দৈব দুর্বিপাকে আজকের আমাদের সফর বাতিল হয়ে যাবে। এইমাত্র জানা যাবে, আজ সকাল থেকে চাঁদপুরে অর্ধদিবস হরতাল ডাকা হয়েছে, (আহা, আগের মতো আর হরতাল কেন হয় না?), কিংবা সকাল বেলা চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে যে একমাত্র লঞ্চটির ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল, তার সারেংকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

টার্মিনালের টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকি, কিন্ত চোখে দর্শন যোগ্য কোন উদ্দীপকের খোঁজ পাওয়ার আগেই আমাদের ঘ্রানেন্দ্রিয় কাজ শুরু করে দেয়। কোন কিছু পঁচে যাওয়ার তীব্র জোরালো গন্ধ আমাদের নাকে ঝাপ্টা মারে। যেন একসাথে কয়েক’শ ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে দেওয়া হয়েছে, কোথাও। নদীর পানির দিকে তাকিয়ে সেই গন্ধের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, বুড়িগঙ্গায় তরল বস্তু হিসাবে যা দেখা যাচ্ছে, তা কিছুতেই পানি হতে পারে না। আদতে তা তরল বর্জ্য।

হায়, আজকাল আমাদের বুড়িগঙ্গার সাথে প্রথম মোলাকাত হয় চোখ দিয়ে নয়- নিঃশ্বাস আটকে আসা দুর্গন্ধ দিয়ে। বদ্ধ ঘরের মধ্যে আটকে থাকা অক্সিজেন বিহীন ভারী বায়ুর চাপ, এক মুহুর্ত বুক ভরে শ্বাস টানার মওকা দেয় না। মরে যাওয়া এমন নদীর ঘ্রান-মানুষের পচা লাশের চেয়েও কটু গন্ধ যুক্ত হবে, এটাই তো সঙ্গত।

আধুনিক কালের পিশাচ কাহিনী গুলোতে (দুঃ)গন্ধের একটা জোরালো ভুমিকা থাকে। প্রায়ই ঘটনার বর্ণনার হাত ধরে আসে দুর্গন্ধের বিবরন। চাঁদনি রাতে তাদের আস্তানার কাছাকাছি গেলে টের পাওয়া যায়, নাড়িভুড়ি উলটে আসতে চাওয়া সে সব দুর্গন্ধের বিশদ বিবরন। যে প্রেত প্রাপ্ত হয়, তার নাক এ সব গন্ধে ক্রমশঃ অকেজো হয়ে যেতে থাকে...

নদীর বুকে হালকা কুয়াশাময় রহস্যের ঘেরাটোপ, তার সাথে লাগাতার দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস, সব মিলিয়ে ভোরের সদরঘাটে এক ভুতুড়ে পরিবেশ। কে মানুষ আর কে যে তেনারা(!), বোঝার কোন উপায় নাই। আলো আধারিতে সার বেধে দাঁড়িয়ে থাকা লঞ্চগুলোর সুচালো নাক এর নিচ দিয়ে আমরা হাটছিলাম জেটিতে। লঞ্চের ফাকফোকড় দিয়ে যতটুকু নদীর পানি দেখা যায়, তা বর্নে কালো, প্রকৃতিতেও তা কালো আলকাতরার মতো ভারী। প্রাণবাচক কোন কিছুর অস্ত্বিত্ত্ব সেই পানিতে নাই, থাকার কথাও না। ফাঁকে ফাঁকে দু’ একটা ডিঙি নৌকা, হাঁক ডাক পারে যাত্রীদের নদীর ওপারে নিতে। চারদিকে লঞ্চ কর্মচারীদের মৃদু কোলাহল-এর মধ্যে আমার বন্ধুরা একটা লঞ্চকে নির্বাচন করে, কিসের ভিত্তিতে তা অবশ্য আমার জানা হয় না, তবে আমি বেশ খুটিয়ে লঞ্চটাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। আগামীকাল সকালের প্রথমআলোতে নদীর চরে সম্ভাব্য ঘাতক এই লঞ্চটির কাত হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থার ছবি প্রথম পৃষ্ঠায় কেমন মানাবে, মনে মনে কল্পনা করতে থাকি—

আজকে আমার কোন রেহাই নাই...

সুবেহ সাদেকের প্রায় ঘন্টা খানেক পরে—প্রভাতের নরম আলোয়, পবিত্র মন নিয়ে রাব্বুল আলামিন কে স্মরণ করে, বিপদ থেকে জান বাঁচানোর যাবতীয় দোয়াগুলো আমি পড়তে শুরু করলাম। ডেকের পাশ থেকে বেরিয়ে এল এক কিশোর কর্মচারী, আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ওপর তলায়। আকাশে ধুসর কালচে মেঘ, নীচে ভাসমান ছেড়া ছেড়া কুয়াসা-চারদিক নিস্প্রভ আলোর মায়াপুরী।

হয় আমার ঘুম কাটেনি-খোয়ারি ভাঙ্গেনি, অথবা আমার ইন্দ্রিয় সমুহ কাজ করছে না—চারপাশের ঘিরে থাকা অপার্থিব সময়, আমার পরাবাস্তবিক সকাল—বিষন্নতার চাদর হয়ে দুলতে থাকে। মাটি থেকে অনেক উচুতে এ মুহুর্তে আমার শারিরীক উপস্থিতি, আমি জানি না কতটুকু ঝুঁকি আমি নিলাম, নিয়ত যে ঝুঁকির মাঝে গড়পড়তা বাংলাদেশের মানুষ দিন যাপন করে- এ ঝুঁকি তা অতিক্রম করে যায় কিনা।

লঞ্চের ধাতব শরীরের কম্পন আমার শরীরে এক ধরনের সংবেদ সৃস্টি করে‌, মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে যাত্রা শুরু করলো লঞ্চ, নিউ মেঘনা রানী- চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে...








সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ৩:২৯
১৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×