এইডস এবং আমাদের ভবিষৎ
আমি মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ নামের একটি সেল্প হেল্প গ্রুপের সাথে কাজ করছি স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে এবং গত জুন মাস থেকে এই সক্রামকব্যধীর বিরুদ্ধে গনসচেতেনতা বৃদ্ধির জন্য সাইকেল নিয়ে আমার বিশ্ব ভ্রমনে সময় সময় এমন অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়েছে যারা সক্রামিত বা আক্রান্ত। আমি তাদের সাথে কথা বলেছি, থেকেছিও। এখন আমরা যতই বলি না কেন আমরা সবাই সমান, সত্যি কথা এটাই আমরা তাদেরকে কখনই অন্য আরেকজন মানুষের মত করে নিতে পারিনি। এই কথাই বিভিন্ন ভাষায় আমি শুনেছি সেটা যেমন বাংলাদেশের মানুষের মুখে কিংবা নিকারাগুয়া বা গায়ানার যে মানুষ তাদেরও কথা একই।
ব্যপারটা যতদিন থামাচাপা অবস্থায় থাকবে, ততদিন আমরাই আমাদের ক্ষতি করব। কারন এর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অধিকর্তা হলাম আমরা নিজেরাই। কথা বলুন, জানতে চেষ্টা করুন, নিজের পার্টনের সাথে বিশ্বাসী হন আর যদি কিনতেই হয় তো আরও কিছু টাকা বেশি খরচ করুন।
এইডস নিয়ে আপনার ছেলে বন্ধু বা মেয়ে বন্ধুর সাথে কথা বলাটাকে টাকে বাড়তি সুজক দেয়া কিংবা তার কাছ থেকে বাড়তি সুজক নেয়া মত যে না হয়ে পরে।
বিশ্বাস করুন ব্যপারটা সত্যিই আরও ভয়াবহ এবং এমনকি বাংলাদেশেও!
দৃশ্যপট: বাংলাদেশ
কিছু দিন থেকে আমরা একটা কথা বেশ করে শুনে আসছি – “বাচতে হলে জানতে হবে”। কিসের থেকে বাচার জন্য কি জানতে হবে? কেনই বা জানতে হবে? না জানলেই বা ক্ষতি কি? সম্মক ভাবে আমাদের অনেকেরই জানা নেই যে এইডস নামক যে রোগটি পৃথিবীতে আছে তার প্রকপ থেকে আমরাও মুক্ত নই। যদিও বাংলাদেশে এর পৃভিলেন্স রেট শতকরা ১ ভাগের ও কম কিন্তু সংখ্যাতত্তের বিবেচনায় একে বারেই কম নয়। ১৫০ মিলিয়ন মানুষের দেশে ১% ও যে বেশ বড় সংখ্যা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও বাংলাদেশে প্রথম কেসটি ধরা পরে ১৯৮৯ সাথে তবে ভয়াবহ ব্যপার হলো ২০০২ সালের মধ্যে সংক্রামিতদের সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১৩০০০ এ (২০০৪ সালের ইউ এন এর এক জড়িপে দেখা যায়্)। কিন্তু মজার ব্যপার হলো আমাদের দেশের স্কিনিং সিসটেম ততটা ভাল না হবার কারনে রেজিস্ট্রাড রোগির সংখ্যা বেশ আসলের চেয়ে অনেক কম। গত বছরের শেষ অবদি এর সংখ্যা গিয়ে দ্বারায় ১২০৭ জন এ।
যৌনকর্মী, এমএসএম (মেন হু হেভ সেক্স ইউথ মেন), মাইগ্রেন্ট, আইডিইউ (ইজ্কেটিং ড্রাগ ইউজার) দের মধ্যে এর প্রকপ সবচেয়ে বেশি। যদি কেবল যৌনকর্মীদের কথাই ধরা হয় তো দেখা গেছে তাদের ক্লায়েন্ট টার্ন ওভার রেট অন্য যেকোন সাউথ এশিয়ার দেশের চেযে অনেক বেশি। এবং শুধু তাই নয় ক্রিয়ার সময় কনডমের ব্যবহার ভয়াবহ রকম কম। ইউএন এইডস এর এক সীমিক্ষায় দেখা গেছে অঞ্চল ভেদে মাত্র ০-১২% যৌনকর্মী নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে কনডম ব্যবহার করে। এছাড়াও প্রায় ১০৫,০০০ পুরুষ (!) এবং মহিলা যৌনকর্মীদের মধ্যে শুধু পতিতালয় ভিত্তিক মহিলাকর্মীরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৮ জনকে সেবা দান করে আর স্ট্রীট এবং হোটেল কেন্দ্রিক যৌনকমীরা প্রায় ১৭-৪৪ জনকে সেবা দান করে!
শুধু তাই নয় প্রায় ৯.৭ ভাগ যৌনকমীদের মধ্যে সিফিলিস এবং এজাতীয় রোগের লক্ষন দেখা গেছে। তাদের তুলনামুলক কম কনডমের ব্যবহারই সিফিলিস এবং অন্যান্য এসটিডি (সেক্সসুয়ালী ট্রান্সমিটেড ডিজিজেস) গুলোর কারন এবং যারা ফলাফল হলো এইডস এর সংখ্যাবৃদ্ধী। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে এমন অনেক এসটিআই (সেক্সসুয়ালী ট্রান্সমিটেড ইনফেকশন) নিয়েই বেচে থাকি এবং পার্টনারকে সক্রামিত করি। শুধু মাত্র অপ্রতুল জ্ঞান এবং সামাজিক/ পারিবারিক লজ্জার কারনে হয় আমরা ব্যপারটা এড়িয়ে যাই নয়তো কেয়ার করি না।
আবার ড্রাগ ইউজারদের মধ্যে এইচআইভি রেট ২০০১ এর দিকে হঠাৎ করে বেড়ে ১.৮% থেকে ৪% দাড়ায়। শুধু ঢাকাতেই এর পৃভিলেন্স রেট হলো ৯%। যা বিপদসীমার অনেক উপরে। দেখা গেছে ঢাকা শহরের আইডিইউদের ৭০% একই নিডল বার বার ব্যবহার করে এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৮৩ জনের হেপাটাইটিস-সি আছে। আর তথ্যগুলো এটাই প্রমান করে সেই দেশের এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি তা মহামারীর আকার ধারন করবে খুব শীঘ্রই। প্রতিটি ক্ষত্রেই দেখা গেছে আইডিইউ রা গৃহহীন এবং কর্মাক্ষম সে কারনে নতুন করে ড্রাগ নেয়ার জন্য তারা নিজের রক্ত বিক্রিকেই আয়ের একমাত্র অবলম্বন মনে করে এবং তা ফলে জাতীয় রক্ত সরবরাহ (national blood supply) হয়ে পরে ঝুকিপূর্ন।
আবার সেই ড্রাগ ইউজারদের মধ্যে (প্রায় পাচ জনে একজন) পতিতাগামী হয় এবং যাদের মধ্যে মাত্র দশজনে একজন কনডম ব্যবহার করে। এতে করে সরারসী এইচআইভি সংক্রামনের সম্ভবনা বেড়ে যায় মারাত্নক ভাবে।
দৃশ্যপট: পৃথিবী
এবছরের শুরুর দিকে পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৩৯.৫ মিলিয়ন (প্রায় ৪ কোটি) মানুষ এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং যা কিনা ২০০১ সালেও ছিল ৩২.৯ মিলিয়ন (৩ কোটি ২০ লখ্য)। প্রতিবছর নতুন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ মিলিয়ন এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২.৯ মিলিয়ন যা ২০০১ এ ছিল ২.২ মিলিয়ন।
সামগ্রিক ভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গুলো মূলত কার্যক্রমহীন হয়ে পরার কারনে মহামারীর ব্যপকতা যে নিশ্চিত সে দিক বিবেচনায় ইউগান্ডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ইউরোপের দেশ গুলোর অবস্থা বেশ ভয়াবহ। এছাড়াও অন্যান্য দেশ গুলোতে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ব্যপক তাদের মধ্যে এখনও এইডস বিষয়ক জ্ঞান এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহনে অবহেলা প্রকাশ করে।
আর এই সক্রামকব্যধীর প্রত্যক্ষ শিকার হলো মহিলারা।জেনডার ইনইক্যুয়ালিটি এই ব্যধীকে “Feminization” মহামারীর রূপদান করেছে। যদিও পরিসংখ্যানে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে এভাবে যে কম বয়স্ক নারীর তুলনায় বেশি মাত্রায় আক্রান্ত হচ্ছেন বিবাহীত মহিলারা। সামগ্রীক ভাবে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪৮% মহিলা আক্রান্ত হয়ে পরেছেন এবং নতুন আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪০% হলো প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলা।
আইডিইউ, যৌনকর্মী, প্রিজনার, মাইগ্রেন্টস এবং এমএসএম (গে’)রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সবধরনের স্বাস্থ্য সেবা থেকে নিজেদের বিরত রাখেন বা রাখার চেস্টা করেন। যেকারনে শুধু মাত্র এমএসএমদের মধ্যে এখনই এটা বিশাল আকারের মহামারী রুপ ধারন করেছে। এবং সে দেশ গুলোর মধ্যে প্রথম দিকে আছে কম্বোডিয়া, চীন, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম।
বিগত ২৫ বছরের এই মহামারী আকারের এই রোগের বিরুদ্ধে বাস্তবিক কিছু করার জন্য সম্মোনিত ভাবে কাজ করা যেমন জরুরী তেমনি দীর্ঘ স্থায়ী, সাসটেনএবল মাঠ পর্যায়ের কাজ কে বেশি মাত্রায় প্রাধন্য দিতে হবে। এটাকে শুধু সরকারের একার কাজ কিংবা তাদের ঠিক করা ইন্ফ্রাস্ট্রাকচারের খাচায় নিজেদের আটতে রেখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বরঞ্চ আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে জেন্ডার ইনইক্যুয়ালিটি, স্টিগমা, ডিসকৃমিনেশ এবং মানবাধীকারের লঙ্ঘনের মত সব বিষয় নিয়ে। কেননা ভবিষৎ আমাদের হাতে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



