তা সুমন, পড়াশুনার অবস্থা কি? কেমন চলছে? খুউবই ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করতে হবে কিন্তু। তা না হলে আমার গার্জেনগিরির বারোটা বেজে যাবে। স্বর্ণ'র ভালো রেজাল্ট করার পেছনেও তোমার অবদান থাকতে হবে। ওকে লেখা-পড়ায় এনকারেজ করতে হবে। জীবনটাতো পড়ে রইলোই। অনেক এনজয় করা যাবে। বাট রেজাল্ট একবার খারাপ হয়ে গেলে আর শোধরানো যাবেনা।
কিন্তু দাদা আমাকেতো লেখাপড়া, বিয়ে, সংসার এরকম সীমাবদ্ধতায় টানেনা। আমার মন ছুটে চলে দেশ থেকে দেশান্তরে, নদীর তীরে, পাল খাটানো নৌকায়, কখনো বেদে সম্প্রদায়ের দলে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। কখনো আবার দিগন্ত পেরিয়ে খোলা আকাশের নীচে তাবু খাটিয়ে যাযাবর জীবন যাপন করা। গলা ছেড়ে নিজের মতো কবরে গান করা। সুরে সুরে ডুবে থাকা। কোন ছোট্ট গন্ডিতে বাঁধা জীবন আমার ভালো লাগেনা।
সর্ব্বনাস.... তোমার এই প্ল্যানের কথা কি স্বর্ণ জানে? ওতো তোমাকে নিয়ে অ....নেক দূর এগিয়েছে।
নাহ্, স্বর্ণ জানেনা। ও একটা ইন্নোসেন্ট মেয়ে। আমি ওকে অসম্ভব ভালোবাসি। ওকে আঘাত দিতেও চাইনা। স্বর্ণ খুউব ভালো মেয়ে দাদা। ওকে কিভাবে সামলাবো, সেটিও বুঝতে পারছিনা।
এরি মধ্যে স্বর্ণ হাতে মুখে পানি ছিটিয়ে ফ্রেস হয়ে আমাদের কথায় জয়েন করেছে।
কি বুঝতে পারছোনা মন?
নাহ্ মানে দাদা বলছিলেন দুজনের রেজাল্ট যাতে ব্রিলিয়ান্ট হয়।
আমিওতো তাই ভাবছি। আমাদের রেজাল্ট ভালো করতেই হবে। অনিন্দ্যর মতো একজন অ্যাতো ভালো বন্ধু কাম গার্জেন পাশে থাকলে ভালো রেজাল্ট করা মোটেই কঠিন নয়।
এরি মধ্যে অর্ডার অনুযায়ী সব খাবার চলে এসেছে। ৩/৪ রকমের ভর্তাসহ চিংড়ী মাছের দোপিয়াজি, ইলিশ ভুনা। খাবারের মান এবং স্বাদ খুউব চমৎকার। আমরা যে টেবিলটাতে বসেছি, তার পাশের কাঁচের জানালাটার পর্দা সরানো। আলো আঁধারী এই পরিবেশে চাদের আলো এসে একটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। খাবার শেষ করে ¯প্রাইটের গ্লাস নিয়ে চুমুক দিতেই আমি সুমনকে বললাম, সবইতো হলো কিছুটা অপূর্ণতা রয়ে গেল। হয়ে যাক তোমার একটা গান। সুমন একটু আপত্তি করতে চাইলেও স্বর্ণ আমার প্রস্তাব সমর্থন করে বললো, তুমি ঠিকই বলেছো অনিন্দ্য। মনের গান ছাড়া আজকের আসর অপূর্ণই থেকে যাবে।
কিন্তু দাদা আপনিতো একটা বিষয় জানেননা, স্বর্ণও খুউব চমৎকার গায়।
তাই নাকি? তাহলে স্বর্ণের গান দিয়েই আজকের আসর শুরু করা যাক।
স্বর্ণ আপত্তি জানিয়ে বললো, একদম বাজে কথা, অনিন্দ্য। আমি তেমন ভালো গাইতে পারিনা। যা গাই তা মনের তুলে দেয়া কিছু অপচেষ্টা। সুরের ভুবনে একদম আনাড়ি আমি। গাইতে শুরু করলে তোমরা পালাবে। সুর একবার যাত্রাবাড়ি ছুটেতো একবার গাবতলী দৌড়ে পালায়। সো এরকম অপচেষ্টা না করাই ভালো।
সুমন মানতে পালোনা স্বর্ণের কথা। 'বাজে কথা বলবেনা স্বর্ণ। ঐযে ঐ গানটা, ঐ যে জোছনার গানটা? এই মন জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসোনা গল্প করি... কি যে ভালো গাও, তা তুমি নিজেই জানোনা'।
অনিন্দ্যের কাছে আমাকে তুমি পঁচাচ্ছো মন।
ওদের তর্ক থামাই আমি। 'প্লিজ স্বর্ণ তুমিই শুরু করো। সুরের কোন সমস্যা হলেও আমার অসুবিধে নেই।'
এরপর স্বর্ণ শুরু করে....।
এই মন জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসোনা গল্প করি।
দ্যাখো ওই ঝিলিমিলি চাঁদ সারারাত আকাশে শলমাজুরি..।
এই রূপসী রাত আর ঐ রূপালী চাঁদ, বলে জেগে থাকো-
এ লগন আর কখনো ফিরে পাবে নাকো।
মখমলের ঐ সজনে ঘাসে
বসলে না হয় একটু পাশে
মনে হয় মহুয়ারই আতর মেখে তোমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ি-
দ্যাখো ওই ঝিলিমিলি চাঁদ সারারাত আকাশে শলমাজুরি..।
চমৎকার গাইলো স্বর্ণ। আমার শুষ্ক মনটা যেন ভিজিয়ে দিয়েছে।
এর পর সুমনের পালা। সুমন জানালো, স্বর্ণকে উদ্দেশ্য করে আজই একটা গান বেঁধেছি। গানের কথা, সুর সবই কাঁচা। আজই তোলা হলো। তো সেটাই শোনাতে পারি তোমরা অভয় দিলে।
তুমি আমার মেঘলা আকাশ রঙধনুটার সৃষ্টি
তুমি আমার খাঁখাঁ রোদে একটু খানি বৃষ্টি।
তুমি আমার তপ্তরোদে রপ্তকরা ক্লান্তি
তুমি আমার স্বপ্নে দেখা লক্ষ-কোটি ভ্রান্তি।
তুমি আমার বৈশাখী ঝড় আম-কাঁঠালের গন্ধ
তুমি আমার বৃষ্টির সুরে দাদরা তালের ছন্দ।
তুমি আমার দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা-
তুমি আমার পাড়া পড়শি, বন্ধু-শত্রু নিন্দুকেরা।
আমি শুধু ভালোবাসা ভালোবাসা খুঁজি
ভালোবাসা বলতে আমি তোমাকেই বুঝি।
তবুও সারাক্ষণ তোমাকেই ভাবছি।
আবেগের তাড়ণায় এই আমি কাঁপছি।
আবেগের তাড়ণায় এই আমি কাঁপছি।।
আবেগের তাড়ণায় এই আমি কাঁপছি।।।
সুমন অসম্ভব মিষ্টি সুরে গানটি গেয়ে শোনালো। স্বর্ণের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখ ভিজে উঠেছে। আবেগের তাড়নায় সুমনের সাথে যেন সেও কেঁপে ওঠছে। বারবার ওড়নার আঁচলে চোখ মুছছে। আর আমি ওদের ভালোবাসার গভীর বন্ধন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি।
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): বড় গল্প ;
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

