somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালোবাসা এবং ভালো বাসা-১

১৫ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

০১

মেধা আর মেঘ এর অনেক গুলো অভিযোগের প্রধান একটি হলো বাবা হিসেবে আমি ওদের একেবারেই সময় দিইনা। মেধার ৫ আর মেঘের ৩ বছর চলছে। ওদের যা আবদার তা রুপোন্তিই পূরণ করে। রুপোন্তি একটা মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে বাংলা পড়ায়। স্কুলের যাবতীয় দায়িত্ব সেরে বাসায় এসে ছেলে মেয়েদের সামলে রাখে। সন্তানের পাশাপাশি রুপোন্তিরও অভিযোগের অন্ত নেই। বাজার সদাইও ওকেই করতে হয়। সকাল আটটায় বাসা থেকে বেরুবার সময় ওদের বিছানায় ঘুমানো অবস্থায় দেখে আসি। রাত এগারটা অথবা সাড়ে এগারোটায় যখন বাসায় ফিরি, ততক্ষণে ওরা ঘুমিয়ে পড়ে। বাসায় ফিরেই রুপোন্তির রোষানলে পড়তে হয়। এমনিতেই সারাদিনের ব্যস্ততা আর যাতায়াতের বিড়ম্বনায় আমি একেবারে ক্লান্ত এবং শরীরটা যেন নেতিয়ে পড়েছে। তার ওপর বউয়ের মিষ্টি কথাও তিতো ওষুধের মতো লাগে। আর কথাগুলো যদি হয় আরো তিতো এবং বিরক্তিকর, তবেতো আর মেজাজটাও ঠিক থাকেনা। তবুও ওর অভিযোগগুলো মন দিয়ে শুনি। কোন কথা বলিনা। বলতে ভালো লাগেনা। ওর অভিযোগ খন্ডন করারও চেষ্টা করিনা। এতে ওর রাগ আরো বাড়তে থাকে। রাগে রুপোন্তি ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। ওর কথা শুনতে শুনতে কাপড় পাল্টাই। ওর কথা শেষ হলে গামছা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যাই ফ্রেস হতে। ওয়াশরুমে চলে যাই মানে ওর প্যান-প্যানানী, ঘ্যান-ঘ্যানানী থেকে পালাই। শাওয়ার ছেড়ে কিছুটাসময় নিয়ে গোসল সারি। যেন আবার নতুন করে শরীরটা সতেজ হয়। ফ্রেসরুম থেকে বেরিয়ে দেখি রুপোন্তির রাগ নেমে গেছে। টেবিলে খাবার দিয়ে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। খাওয়া শুরু করলে, ওর কথাও আবার শুরু হয়। তবে কথার মাত্রা চরম থেকে নরমে। 'ছেলে-মেয়ে গুলো তোমার চেহারাও ভুলতে বসেছে। মেঘকে কোন রকম সামলে রাখতে পারলেও মেধাটার যেন বাবার জন্য প্রাণটা যায় যায় অবস্থা। আমাকে সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারে।' এই পর্যন্ত বলে একটু থামে। খাওয়ার ফাঁকে একবার ওর দিকে তাকাই। আবার শুরু করে, 'সপ্তাহে একদিনও তো ছেলে মেয়েদের একটু সময় দিতে পারো। আমার কথা না হয় ভুলেই গেলে। ওদের যখন জন্ম হয়নি, তখনোতো আমাকে তোমার পথের দিকে চেয়ে থাকতে হতো। অনেক অবহেলা করেছো আমাকে। তখনো তুমি আমাকে পর্যাপ্ত সময় দাওনি। অনেক অনুরোধের পর হয়তো ছুটির দিনগুলোতে ২/১ দিন কোথাও নিয়ে যেতে। স্কুল আর তোমার সংসার সামলানো! এটাকি জীবন, বলো? আমার আর কোন চাওয়া-পাওয়া থাকতে নেই? কোনো চাহিদা?'
রুপোন্তির কথায় যুক্তি আছে। আমারোকি এমন জীবন ভালো লাগে? সপ্তাহের সাত দিনই কাজ। কোন সাপ্তাহিক ছুটি নেই। মাঝে মাঝে সরকারী ছুটি মিললে, তখন আর বাইরে বেরুতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু ছেলে-মেয়েগুলো তো এখন একটু বড় হয়েছে। মেধাকে রুপোন্তির স্কুলেই ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি করানো হয়েছে। ওর মা'র সাথেই স্কুলে আসা-যাওয়া করে। মেঘকে দেখে রাখে রাবুরমা। ওরা আসলে বোর হয়ে পড়েছে। ওদের একটু চেঞ্জ দরকার। কোথাও গিয়ে দুই-চারদিন কাটিয়ে আসতে হবে। সবার মধ্যেই একটা অসুখী-অতৃপ্তি ভাব। এই অবস্থা থেকে বেরুতে না পারলে হয়তো যেকোনো সময় মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমি যে ওদের সমস্যা বুঝি, ওরা তা বোঝেনা।

কখনো দিনের বেলা ঘুমোলে মেধা জেগে থাকে অনেক রাত পর্যন্ত, আমার সাথে দেখা হয়ে যায়। এটুকুন একটা মেয়েকে আমি ভয় পাই। ওর অভিযোগ, যুক্তিনির্ভর কথার কাছে আমি পরাস্ত হই। তোপের মুখে পড়ি ওর।
বাবা, আমি কি তোমার মেয়ে নাকি আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছো?
কেনো মামনি, এরকম কথা বলছো কেনো?
অন্যভাবেও বলতে পারি? তুমি কি আমাদের বাবা, নাকি আমাদের বাবা অন্য কেউ?
তোমার এরকম মনে হওয়ার কারণটা জানতে পারি মামনি?
তুমি আমাদের বাবা নও। বাবা হলে তোমার সাথে দেখা হতো। তোমার আদর পেতাম। সত্যির বাবা সত্যিকে কতো আদর করে। কতো জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায়। কতো কিছু কিনে দেয়। প্রতিদিন ক্লাসে সত্যি ওর বাবার গল্প করে। তুমি আমাদের একটু আদর করোনা। কিচ্ছু কিনে দাওনা। তুমি আমাদের বাবা নও। আমাদের বাবা অন্য কেউ। আমাদের বাবা হারিয়ে গেছে।
কথাগুলো বলতে বলতে মেধা হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। ওর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মেঘও ঘুম থেকে ওঠে পড়েছে। অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ওর মা'র গা ঘেসে। কি হয়েছে তা বুঝতে পারছেনা মেঘ। মেধার এরকম অগ্নি মূর্তি আমি আর কখনো দেখিনি। রুপোন্তি ওকে থামানোর চেষ্টা করছে। ওর এই অবস্থা দেখে আমার চোখও ঝাপসা হয়ে আসে। আমি তোয়ালে গামছা নিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে যাই। আসলে মেধার নিকট থেকে পালাই। ফ্রেসরুম থেকে বেরিয়ে দেখি তখনো মেধা ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাদছে। তবে আগের চেয়ে কিছুটা শান্ত। আমি ওর কাছে আসি। ওকে ধরতে চেষ্টা করি। মেধা আমার হাত সরিয়ে নেয়। আমি সরে আসিনা। এক সময় আমি জোর করে ওকে আমার কাছে টেনে আনি। আমার শক্তির কাছে আর পেরে ওঠেনা। ওকে বুকের মধ্যে মিশিয়ে রাখি অনেকক্ষণ। আরেক হাতে মেঘকে টানি। দুজনই অনেকক্ষণ মিশে থাকে আমার বুকে। ওদের দুজনকেই কপালে, চোখে, মুখে, নাকে বিরতিহীন আদর করতে থাকি। রুপোন্তিও আমার পিঠের দিকে ঘেসে ওদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে। ওদের শান্ত করে বলি, 'তোমাদের আমি অনেক ভালোবাসি। আমিও তোমাদের সময় দিতে চাই, কিন্তু পারিনা। এইবার দেখো, ঠিকই ছুটি নিয়ে নেবো, টানা এক সপ্তাহের। ছুটিতে আমরা কোথায় যাচ্ছি বলোতো মামনি? দাদুর বাড়ি নাকি নানুর বাড়ি?'
মেধাঃ দাদুর বাড়ি যাবো। যশোরে। কতোদিন দাদুকে দেখিনা?
মেঘঃ না বাবা, নানুমনির কাছে যাবো। দিনাজপুরে।
রুপোন্তিঃ ঠিক আছে বাবা, আমরা কাউকেই বঞ্চিত করতে চাইনা। যশোরেও যাবো, দিনাজপুরেও। তোমরা বরং তোমাদের রোবট পঁচা বাবাকে বলো ছুটিটা বাড়িয়ে নিতে। কমপক্ষে দশ দিন। যশোরে চারদিন আর দিনাজপুরে চারদিন। মাঝখানে দুদিন পথেপথে। ঠিক আছে?
মেধাঃ ঠিক আছে মা, তবে আমাদের বাবা মোটেই রোবট আর পঁচা বাবা নয়। আমাদের বাবা অনেক সুইট ভালো বাবা। সত্যির বাবা সত্যিকে এতো আদর করে? আমাদের বাবা পৃথিবীর সেরা বাবা।
মেঘঃ হ্যা আমাদের বাবা অনেক ভালো বাবা।
রুপোন্তিঃ হুম। এখন তোমাদের বাবাই সব। আমি কিছুনা, নাহ? সারাদিন খেটে মরি আর বাবাকে পেয়ে ভুলে গেলে? ছ'মাস-ন'মাস পর একবার একটু আদর করলো তো সব মিটে গেলো? স...ব অকৃতজ্ঞ, বুঝলে সব বেঈমান?
আমি রুপোন্তিকে থামাই। 'তুমিই ওদের সব। ওরা জানে। আমিও জানি। তুমি যে কতোটা ভালো এবং দায়িত্বসম্পন্ন, তা আমার চেয়ে কে ভালো জানে রুপো? তুমি আমার লক্ষী সোনাবউ।'
রুপোন্তিঃ থাক হয়েছে। আমাকে আর ইমোশন্যাল করতে হবেনা। এমনিতেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। চলো, ওদের নিয়ে খাবার টেবিলে। মেধাকে খাইয়ে দিবে। ও আজ কিচ্ছু খায়নি। খুউব জেদ ধরেছে, বাবার হাতে খাবে।
মেঘঃ আমিও বাবার হাতে খাবো।
'ঠিক আছে চলো, সবাই আজ একসাথে খাবো।'

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৪
৯টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×