আমার প্রিয় পোস্ট

প্রেমচাঁদের গল্প--লটারি--২

২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ১২:৩০

শেয়ার করুন:                   Facebook

লটারি - ২য় পর্ব
মূল: মুনশি প্রেমচাঁদ
রূপান্তর(মূল হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী
....
আঙটিটা দশটাকার কম হবে না। অই টাকা দিয়ে সহজেই টিকেট কেনা যায়। যদি কোনোরকম খরচ ছাড়াই টিকেটের অর্ধেক ভাগ পাওয়া যায় তাহলে মন্দ কী! কিন্তু আমার মতলব বোধহয় টের পেয়ে গেলো বিক্রম। বললো,‘পাঁচটাকা তোমাকে টিকেট কেনার আগেই নগদ দিতে হবে। তা না হলে আমি কিন্তু নেই।’
ওর কথা শুনে আমার ভেতর ন্যায়বোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। বললাম,‘ এটা কিন্তু ঠিক হবে না, কেউ যদি বুঝতে পারে যে তুমি আঙটি বেচে দিয়েছো, তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! তোমার সাথে আমাকেও অপমানিত হতে হবে।’
শেষ পর্যন্ত স্থির হলো আমাদের পুরোনো পাঠ্যবই বিক্রি করে সেই টাকায় টিকেট কেনা হবে। এই মুহূর্তে লটারি কেনার চেয়ে দরকারি কাজ আর কিছু নেই। আমি আর বিক্রম একসাথে মেট্রিক পাস করেছি। কিন্তু যখন দেখলাম কষ্ট করে যারা লেখাপড়া করে ডিগ্রি হাসিল করছে, তাদের চেয়ে গন্ডমূর্খরা বেশ ভালো আছে, তখন দু’জনে লেখাপড়া বন্ধ করে দিলাম।
আমি যোগ দিলাম ইস্কুলের শিক্ষক হিসেবে আর বিক্রম গেরস্থালি করতে
লাগলো। আমাদের বইগুলো এখন উইয়ের খাদ্য হওয়া ছাড়া আর কোন্ কাজেই বা আসবে! গোলাঘরের এককোণে বইগুলো ফেলে রেখেছিলাম, বের করে সেগুলো ঝাড়ামোছা করে একটা বড়ো গাঁটরি বাঁধলাম দু’জনের গুলো মিলিয়ে। ইস্কুলমাস্টার হিসেবে সবাই আমাকে চেনে। তাই কোনো দোকানে গিয়ে বইগুলো বেচতে লজ্জা লাগছিলো। বাধ্য হয়ে বিক্রমকেই এই মহৎ কর্মটি সাধনের ভার দেওয়া হলো। আর সে মাত্র আধঘন্টার ভেতর দশটাকার একটা নোট হাতে নাচতে নাচতে আমার কাছে ফিরে এলো। এতো খুশি তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। বইগুলো যদিও চল্লিশটাকার কম হবে না, কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের কাছে মনে হচ্ছিলো দশটাকা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি। এই টাকায় অর্ধেক ভাগ পাওয়া যাবে টিকেটের। দশলাখ টাকার পুরস্কার। পাঁচলাখ আমার, পাঁচলাখ বিক্রমের। এই দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলাম আমরা দু’জন।

‘পাঁচলাখ কিন্তু কম টাকা নয়, বিক্রম,’ প্রসন্নচিত্তে ওকে বললাম।
বিক্রম আমার মতো খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলো না।
বললো, ‘পাঁচলাখ কেন, এই মুহূর্তে পাঁচশো টাকাও আমার জন্যে অনেক। কিন্তু বহুবছরের স্বপ্নÑপরিকল্পনা বাদ দেওয়া কি এতোই সোজা! তবুও প্রোগ্রাম বদলাতে হবে। লাইব্রেরি গড়ার পরিকল্পনা বাদ, কিন্তু বিশ্বভ্রমণ তো আমাকে করতেই হবে।’

আমি আপত্তি করলাম,‘তুমি দু’লাখ টাকায় তো তোমার বিশ্বভ্রমণ শেষ করতে পারো!’
‘জি না, ওটার জন্যে বাজেট হলো সাড়ে তিনলাখ টাকা। বছরে পঞ্চাশ হাজার করে সাত বছরের প্রোগ্রাম।’


প্রতিদিন ইস্কুল থেকে ফেরার পর আমরা দু’জন একসাথে বসে এভাবে আমাদের স্বপ্ন রচনা করতাম। কথা বলতাম নিচুস্বরে, যাতে কেউ আমাদের কথা শুনতে না পায়। কারণ লটারির টিকেট কেনার রহস্য আমরা গোপন রাাখতে চাইছিলাম। সত্যি সত্যি যদি লটারি লেগে যায় তাহলে লোকজন কী পরিমাণ অবাক হবে সেটা ভেবে ভীষণ আমোদ হতে লাগলো আমাদের। এখন সবাইকে টিকেট কেনার কথা বলে দিলে সেই মজাটা আর পাওয়া যাবে না।
একদিন প্রসঙ্গক্রমে বিয়ের কথা উঠলো। বিক্রম দার্শনিকের মতো ভাব নিয়ে গম্ভীরগলায় বললো,‘ভাই, এসব বিয়ে-শাদির যন্ত্রণা সহ্য করা আমার কম্মো নয়! মেয়েছেলে মানেই ঝামেলা! বউয়ের খাই মেটাতে মেটাতে জীবন শেষ হয়ে যাবে।’
আমি তার সাথে একমত হতে পারলাম না। বললাম,‘বিয়ের পর খরচ একটু বাড়বে তা ঠিক, কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত দুঃখ-কষ্টের ভাগ নেওয়ার জন্যে একজন সঙ্গিনী না আসে তাহলে জীবনের মজাইতো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমি বিয়ে-শাদির বিপক্ষে নই। হ্যাঁ, এটা অবশ্য ঠিক এমন একজন সাথি দরকার যে সারাজীবন সঙ্গে থাকবে। এমন সাথি একমাত্র স্ত্রী ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।’
বিক্রম খেপে গেলো আমার কথায়। ‘তুমি থাকো তোমার মতো! কুকুরের মতো বউয়ের পেছন-পেছন ঘোরো, আর বাচ্চাকাচ্চার ক্যাঁওম্যাঁও কে ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করে খুশিমনে জীবন যাপন করো। তোমাকে অভিনন্দন! আমি থাকবো স্বাধীন, মুক্তবিহঙ্গের মতো। যখন যেখানে মন চায় চলে যাবো, যা মন চায় করবো। ইচ্ছে হলো বাড়ি ফিরবো, নয়তো ফিরবো না। পাহারাদারের মতো সারাক্ষণ একজন খবরদারি করবে এটা আমি সহ্য করতে পারবো না। বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই জবাব চাইবে:‘কোন চুলোয় গিয়েছিলে এতোক্ষণ,অ্যাঁ?’ আর খুশিমনে হয়তো কোথাও যেতে বের হলাম তখন বাধা দিয়ে বলবে:‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে মিনসের শুনি!’ দুর্ভাগ্যক্রমে যদি সেও সঙ্গী হয়, তাহলে তো কেল্লাফতে, পানিতে ডুবে মরা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকবে না!
‘ভাই, তোমার প্রতি আমি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাতে পারছি না। বাচ্চার সামান্য সর্দি-কাশি হলে অস্থির হয়ে দৌড়ে যাও হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে। আর একটু বয়স হয়ে গেলে ছেলেরা মনেমনে চাইবে কখন তুমি পটল তুলছো, যাতে তারা ইচ্ছেমতো চলতে পারে। সুযোগ পেলে তোমাকে বিষ খাইয়ে মারবে, আর প্রচার করবে তোমার কলেরা হয়েছিলো। এই ঝামেলায় আমি নেই, ভাই।’

এমন সময় কুন্তি এলো। বিক্রমের ছোটো বোন। বছর এগারো হবে বয়স, ষষ্ঠশ্রেণিতে পড়ে, আর পরীক্ষায় নিয়মিত ফেল মারে। ভীষণ দুরন্ত আর বেয়াড়া মেয়ে। এতো জোরে সে দরোজা খুললো যে, চমকে গিয়ে আমরা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বিক্রম রেগে গিয়ে বললো,‘অ্যাই বুড়ি শয়তান, কে বলেছে তোকে এখানে আসতে, অ্যাঁ?’
গোয়েন্দা পুলিশের মতো কুন্তি ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বললো, ‘তোমরা সারাক্ষণ কেবাড় বন্ধ করে এই ঘরে করোটা কী? যখনই আসি দেখি এখানে বসে আছো। কোথাও ঘুরতে যাও না, আড্ডা দিতে যাও না। কী মন্ত্র জপতে থাকো সারাক্ষণ দু’জনে মিলে?’
বিক্রম কুন্তির ঘাড় চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো,‘হ্যাঁ, একটা মন্ত্র জপছি, যাতে তাড়াতাড়ি তোর জন্যে একটা বর পাওয়া যায়, যে তোকে প্রতিদিন গুনে গুনে পাঁচটি চাবুক মারবে।’
‘এমন স্বামীকে বিয়ে করতে আমার বয়েই গেছে,’ নাক ফুলিয়ে জবাব দিলো কুন্তি। ‘আমি এমন কাউকে বিয়ে করবো যে আমার সামনে সবসময় মাথা নিচু রাখবে। আমি যা বলবো তা-ই করবে,আমার কথার অবাধ্য হবে না। মা বলেছেন লটারির পুরস্কার থেকে তিনি আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবেন। ব্যস, ঐ টাকায় ফূর্তি করবো। আমি তো দুই বেলা ঠাকুরের কাছে মায়ের জন্যে প্রার্থনা করি। মা বলেছেন, কুমারী মেয়েদের প্রার্থনা কখনো নিষ্ফল হয় না। আমার মন বলছে মা অবশ্যই লটারির পুরস্কারটা পাবেন।’

কুন্তির কথা মিছে নয়। আমার মনে পড়লো একবার নানাবাড়ি গিয়েছিলাম গ্রামে। তীব্র দাবদাহে চারিদিক শুকিয়ে মরুভূমি প্রায়। সামান্য বৃষ্টির জন্যে হাহাকার করছে সবাই। তখন গ্রামের সবাই চাঁদা তুলে একটা ভোজের আয়োজন করে যতো কুমারী মেয়ে আছে সবাইকে নিমন্ত্রণ করলো। আর ঠিক তিনদিনের মাথায় নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। কুমারী মেয়েদের আশীর্বাদে যে কাজ হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
(ক্রমশ...)

 

 

  • ১৯ টি মন্তব্য
  • ২৩৭ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ১২:৪২
comment by: সুমি বলেছেন: ভাইয়া কি ভাষা থেকে রূপান্তর করেছেন---৫
২. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ১২:৪৯
comment by: ভাস্কর চৌধুরী বলেছেন: দ‌ারুন রূপান্তর। ৫
৩. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ১২:৫৮
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: সুমি, মূল হিন্দি থেকে রূপান্তর করেছি। প্রকাশিত হয়েছিলো আজকের কাগজে। গত পর্ব পড়লে বুঝতে পারবেন। ধন্যবাদ।
ভাস্করদা, আপনাকে মিস করছিলাম। ধন্যবাদ।
৪. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:০৫
comment by: "বাংলাভাষী" বলেছেন: প্রাঞ্জল অনুবাদের জন্য ধন্যবাদ, রাহী। গত মন্তব্যে নামের বানান ভুল করেছি, সেজন্য দুঃখিত। বাকি পর্বের অপেক্ষায়।
৫. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:২০
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: ধন্যবাদ, বাংলাভাষী।
৬. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:২২
comment by: ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন: খারাপ না চলুক
৭. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:২৪
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: ধন্যবাদ, ড.।
মুরুব্বি যখন বললেন, তাহলে চলুক!
৮. ২৯ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ১১:৫৫
comment by: সোনার বাংলা বলেছেন: ভালো খুব ভালো।
চালাইতে পারেন পিছে পিছে আছি।
৯. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ১২:৪৩
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: ধন্যবাদ, সোনার বাংলা।
১০. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৭ সকাল ১১:১৮
comment by: ভাস্কর চৌধুরী বলেছেন: রাহী ভাই,
আপনার মেইল দেখুন!!!
১১. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৫৪
comment by: সারওয়ারচৌধুরী বলেছেন: @ মোসতাকিম, আমি তো ওটা আগে পড়েছি। এখন শুধু তোমাকে পঞ্চায়িত করবার জন্য আসলাম।
১২. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:৫৭
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: পঞ্চায়িত করার জন্যে ধন্যবাদ,সারওয়ার ভাই!!
১৩. ৩০ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ১১:৫০
comment by: বইপাগল বলেছেন: ৫ দিয়ে গেলাম, অর্ধেকটা পড়লাম, বাকিটা পরে পড়বো।
১৪. ৩১ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ১২:৫৩
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: ধন্যবাদ, বপা। খুশি হলাম, সময় করে পড়ুন।
১৫. ৩১ শে আগস্ট, ২০০৭ ভোর ৪:২২
comment by: আবদুর রাজ্জাক শিপন বলেছেন: ৫
১৬. ৩১ শে আগস্ট, ২০০৭ ভোর ৪:২৯
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন: ধন্যবাদ,শিপন।
১৭. ৩১ শে আগস্ট, ২০০৭ ভোর ৪:৪৫
comment by: আবদুর রাজ্জাক শিপন বলেছেন: রাহী ভাই,আপনার ই-মেইল আইডি পেলে কখনও অবসরে মেইল করতাম। সমস্যা থাকলে আমার আইডি দিতে পারি ।
১৮. ৩১ শে আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ২:০২
comment by: মোসতাকিম রাহী বলেছেন:
১৯. ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ৩:৩৭
comment by: আবদুর রাজ্জাক শিপন বলেছেন: ধন্যবাদ,মোসতাকিম ভাই । লিখবো যে কোনদিন ।

 



 


যা বলেছি তা, যা বলি নি তা-ও; যা বলবো সেইসব--
কাঁধে তিনটি ঘুড়ি, ঊর্ধ্বে একটি রামধনু
এই প্রবাসী ভোর,শীত,কুয়াশার বস্ত্রশিল্প¬
সমস্ত কিছু ছিন্ন...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ১৪৫৩৬