somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... সম্রাট মারা গেছেন! ----
মুমূর্ষু সুন্দরীর মুখের মতো ফ্যাকাসে, বিবর্ণ আকাশটা হাঁ করে আছে মাথার ওপর, শত্রুতায়! এই বহুবিধ ফাঁদে ভরা জঙ্গলে পথ দেখানোর মতো একটিও নক্ষত্র নেই আকাশে; শুধু একাধিক চাঁদ আকাশ দখলের লড়াইয়ে মত্ত মাথার ওপরে। জ্যোৎস্নার বদলে তারা শুধু তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়! এইমাত্র দেহত্যাগ করলেন জ্যোৎস্নাভুক প্রাজ্ঞ সম্রাট।

জঙ্গল পেরিয়ে সাগর, সাগরের ওপারে দুর্গম পাহাড়ি কোনো টানেলে চাপা পড়ে আছে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি! সে-পথ জানা ছিলো শুধু সম্রাটের! সম্রাট মারা গেছেন, এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আর অগাধ জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার আলেকজান্দ্রিয়া। এই শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গলে আমরা ঘুরে মরছি সম্রাটের শব কাঁধে: বেরোবার পথ জানা নেই!

(১৭ অগাস্ট,২০০৬: আবুধাবি)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/29110919 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/29110919 2010-03-06 03:52:44
মান্টো'র অণুগল্প: কামেল

কামেল
মূল: সা'দত হাসান মান্টো
রূপান্তর: মোসতাকিম রাহী
....

লুটের মাল উদ্ধারের জন্যে অভিযান শুরু করেছে পুলিস। একের পর এক তল্লাশি চালাচ্ছে ঘরে ঘরে গিয়ে। লুটেরা লোকজন ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি রাতের আঁধারে লোকচক্ষুর আড়ালে লুটের মাল বাইরে ফেলে আসতে শুরু করলো। কেউ কেউ সাথে নিজের ঘরের জিনিসও ফেলে দিয়ে আসলো পুলিসের হাত থেকে বাঁচার জন্যে; পাছে পুলিস সেগুলোও লুটের মাল বলে তাদের ধরে নিয়ে যায়! এক লুটেরা বড় শঙ্কিত তার দুই বস্তা চিনি নিয়ে। বস্তাগুলো সে মহল্লারই মুদির দোকান থেকে লুট করেছিলো। পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হওয়ার জন্যে সে করলো কী, খোলা জায়গায় না ফেলে মহল্লার একমাত্র কুয়োটাতে সাবধানে গিয়ে একটা বস্তা ফেলে আসলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দ্বিতীয় বস্তাটি ফেলার সময় পা ফসকে সেও পড়ে গেল গভীর কুয়োটির ভেতর। চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে এলো। তাড়াতাড়ি কুয়োর ভেতর রশি ফেলে এক যুবক নেমে পড়লো লোকটাকে উদ্ধার করতে। কুয়ো গভীর হওয়ায় লোকটাকে তুলে আনতে সময় লাগলো বেশ। উপরে তোলার পর দেখা গেল পানি গিলে ডোল হয়ে আছে তার পেট। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো গেল না। পরদিন মহল্লার লোক কুয়ো থেকে পানি উঠিয়ে অবাক হয়ে গেল। কুয়োর পানি বেশ মিষ্টি!

সে-রাত থেকেই লুটেরা মৃতের কবরে দেখা গেল মোমবাতি আর আগরবাতি জ্বলছে।
.......
(দেবনাগরী লিপিতে প্রকাশিত মূল উর্দু থেকে রূপান্তরিত)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/29098774 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/29098774 2010-02-16 06:06:42
শুভ জন্মদিন,পোকা ভাই!
আজ ৩১ জানুয়ারি 'পোকা মানব' আলী মাহমেদের জন্মদিন! "কনক পুরুষ'এর স্রষ্টা সত্যিকার একজন কনকপুরুষ এই মানুষটিকে অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে শুভেচ্ছা!!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28904646 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28904646 2009-01-31 03:12:44
ক্ষুধা উৎসর্গ ১: ফারহান দাউদ, মামুন রাশেদ, রাজ্জাক শিপন, শারফুদ্দীন । যাদের খোঁচাখুঁচিতে মড়াও বোধ করি কবর ছেড়ে উঠে হেঁটে চলে বেড়াতে বাধ্য ! উৎসর্গ ২: এই ব্লগে আমার একজন গ্রান্ডমা আছেন। বয়সের ভারে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসায় অন্য ব্লগারদের দীর্ঘ লেখা তিনি পড়তে পারেন না, কিন্তু নিজে তিন-চার মাইল লম্বা আকর্ষক,দরকারি পোস্ট দিয়ে আমাদের পড়তে বাধ্য করেন! গ্রান্ডমা "মানবী"কে। আশা করি, এই ক্ষুদে গল্পটি পড়তে তাঁর কষ্ট হবে না!
-----
রাস্তার পাশের একটা ছাপড়া হোটেলের সামনে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে চারটি ক্ষুধার্ত কুকুর। হোটেলের ভেতর থেকে কেউ রুটি কিংবা বিস্কুটের টুকরো ছুঁড়ে দেবে এই আশায় ওরা অপেক্ষা করছে সকাল থেকে । কিন্তু ভাগ্যদেবি বোধহয় আজ ওদের প্রতি খুব একটা সদয় নয়। দুপুর হতে চললো কিন্তু ওদের ভাগ্যে এখনো জোটেনি কিছুই। তারপরও তাদের ধৈর্যে কমতি নেই, ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ নীতিতে বিশ্বাসী ওরা।
মেওয়া উড়ে এলো একেবারে হঠাত্ করে। হাওয়ায় ভর করে ফ্লাইং সসারের মতো একটা রুটি উড়ে এসে পড়লো ওদের মাঝখানে। মুহূর্তের মধ্যে রাগবি খেলোয়াড়দের মতো গোল হয়ে দাঁড়ালো ওরা রুটিটাকে ঘিরে। একে অপরকে মাপছে শঙ্কিত দৃষ্টিতে। চারজনেরই লক্ষ একমাত্র রুটিটার উপর।
সহসা একটা কুকুর সাহসের পরিচয় দিলো। বাকি তিন কুকুরের অস্তিত্ত্ব পুরোপুরি উপেক্ষা করে ঝাঁপ দিলো রুটি লক্ষ করে। কিন্তু ততোক্ষণে বাকি কুকুরদের মধ্যে একতা চলে এসেছে : তিন কুকুর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো কুকুরটার উপর। এই যৌথ আক্রমণ সহ্য করতে পরলো না কুকুরটা। কুঁইকুঁই করে নিজেকে প্রতিযোগিতা থেকে প্রত্যাহার করে নিলো সে।
এখন লড়াই তিন কুকুরের মধ্যে। একটা কালো,দ্বিতীয়টা লাল এবং তৃতীয়টা সাদাকালোর মিশেল। তিন কুকুরই লোভী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রুটিটার দিকে। কিছুক্ষণ আগের সেই একতাভাব এখন উদাও।
পেটে ক্ষুধা,চোখের সামনে খাবার; ধৈর্যের লাগাম বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পরলো না কালো কুকুরটা। আস্তেআস্তে অগ্রসর হতে শুরু সে করলো রুটির দিকে। কিন্তু বাকি দুই কুকুর টের পেয়ে গেছে তার মতলব। দু’জনের মধ্যে আবারো সঞ্চারিত হলো মৈত্রীভাবঃ ফলাফল - কেলে আউট ।
এখন প্রতিযোগী মাত্র দুজন। এই দু’জনের যে-কোনো একজনের ভাগ্যে জুটবে রুটিটা ।
গরর-গরর আওয়াজ করছে দুটোই। একে অপরের শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে লাফ দেওয়ার আগে। এবার সাদাকালো কুকুরটিই লাফ দিলো সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে। লড়াই চললো বেশ কিছুক্ষণ। কামড়াকামড়িতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষ পর্যন্ত ধরাশায়ী হলো লাল কুকুরটা।
খুশিতে আকাশের দিকে মুখ তুলে বিকট এক চিত্কার দিলো সাদাকালো। তারপর রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলেদুলে এগিয়ে গেলো রুটির দিকে। মুখ নামিয়ে যেই রুটিটা তুলে নিতে যাবে, এমন সময় কোথা থেকে সাঁই করে উড়ে এলো একটা কাক। সাদাকালো কুকুরটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুটিটা ঠোঁটে তুলে উড়াল দিলো কাকটা।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় কুকুরটি অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো উড়ে যাওয়া কাকটির গমনপথের দিকে।
----------------
পুনশ্চ: ব্লগজীবনের একেবারে শুরুর দিকে লেখাটি একবার পোস্ট করা হয়েছিলো; কিন্তু চোখ এড়িয়ে গেছে অনেক প্রিয় মানুষের। ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়ায় নতুন লেখা বেরোচ্ছে না, তাই পুন:প্রকাশ!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28894257 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28894257 2009-01-07 15:59:29
দুই জামাতি গেছে রে!!!!

*****সংযোজন: রাউজানের দুই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সাকা এবং গিকা চৌধুরী রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াতে ধরা খেয়েছে! এতো আনন্দ রাখি কোথায়!!!!!! মিছিল করো, মিছিল! আনন্দ মিছিল!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28889966 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28889966 2008-12-29 21:34:57
অ্যাই গাধা, শুভ জন্মদিন!!! পুরোপুরি যান্ত্রিক এখনো হই নি রে,গাধা। তোর জন্মদিন আমার মনে আছে। অনেকদূর এগিয়ে যা, সফল একজন মানুষ হিসেবে!!

শুভ জন্মদিন!!!!!!!!!!!!!

(ইউএই তে এখনো ৩১ অগাস্ট)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28837244 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28837244 2008-09-01 01:46:10
কর্তৃপক্ষের প্রতি: সারওয়ার চৌধুরীকে সচল করুন অবাক হয়েছি একারণে যে, তাঁর লেখা নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ব্লগার তাঁকে নিষিদ্ধ করার আবেদন জানান নি। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তাঁর অনেক লেখা এবং মতের সাথে আমি নিজেও সহমত পোষণ করি না। কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে দাবি করা যায় যে, ব্লগে তাঁর ভালো লেখার পরিমাণ বেশি। তাঁর পাঠকসংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
ফোনে তিনি আরও জানালেন, "নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন ব্লগ সামনে নিয়ে বসে থাকি, ব্লগের সব লেখা পড়ি। ভালো লাগে, ছোট্ট এই বাংলাদেশের স্পর্শ নিতে। নিজ দেশের ভাষার মানুষগুলোর সান্নিধ্যে আসতে।"
সামহয়্যারইনে আমিই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। প্রথমে তিনি অনীহা প্রকাশ করলেও এই ব্লগের চেহারা এবং মূলধারার কিছু সাহিত্যিককে ব্লগে দেখে আগ্রহী হন লেখালেখি করতে। গত নয়মাসে তিনি যা লিখেছেন হলফ করে বলা যায় তার মধ্যে মানসম্পন্ন ভালো লেখার পরিমাণ প্রচুর।
দীর্ঘ সাতবছর ধরে জানি, দেখে আসছি এই সারওয়ার চৌধুরীকে। আপাদমস্তক সৎ, নিরপেক্ষ একজন মানুষ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, একজন শক্তিশালী লেখক। আর তাই, তাঁর প্রতি আমার পক্ষপাত। তাঁর জন্যে কর্তৃপক্ষের প্রতি আমার এই পোস্ট, আমার অনুরোধ, আমার বিনীত দাবি:
সারওয়ার চৌধুরীকে পুনরায় সচল করা হোক!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28804179 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28804179 2008-05-29 15:35:20
বিষণ্ণতায় কাটে সারাবেলা http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28798969 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28798969 2008-05-17 16:14:39 হিন্দি গল্প: নেকড়ে - ২ মূল: ভুবনেশ্বর (भूवनेश्वर)
রূপান্তর(হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী


প্রশংসা শুনে বুকের ছাতি বড়ো হয়ে গেল আমার। যাক, যা বলছিলাম, নেকড়ের দল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। কারণ তারা সঙ্গীদের লাশগুলো পেয়ে গিয়েছিলো খাবার হিসেবে।
হঠাৎ করে গরুগুলোর গতি বেড়ে যাওয়ায় বুঝতে পারলাম নেকড়েগুলো আবার কাছে এসে পড়েছে।
দুশো গজের মতো আসার পর বাবা বললেন,‘‘ জিনিসপত্র বের করে ফেলে দে,গাড়ি হালকা কর।’’
বেদেদের মধ্যে আমাদের গাড়িটি ছিলো সবচে’ সেরা। গৃহস্থালি জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে গাড়িটি হালকা করার পর আরো দ্রুত ছুটতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে মনে হলো নেকড়ের দল পিছু ফেলে আমরা অনেকদূর চলে এসেছি। কিন্তু একটু পরই সেই ভুল ধারণার অবসান হলো।
বাবা বললেন,‘‘এবারতো মনে হয় একটা গরুই ছেড়ে দিতে হবে,খারু !’’
‘‘কী বলছো, বাবা ?’’ চমকে উঠলাম আমি।‘‘দু’টা গরু কি গাড়িটাকে জোরে টেনে নিয়ে যেতে পারবে ?’’
‘‘তাহলে একটা বাঈজিকে ফেলে দে,’’ নির্বিকার গলায় বললেন বাবা।
চাচা আপন প্রাণ বাঁচা! আমি তিনজনের মধ্যে সবচে’ মোটা মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম।
মেয়েটা প্রথমে গাড়ির পিছুপিছু দৌড়ে আসার চেষ্টা করলো কিছুক্ষণ, কিন্তু যখন বুঝতে পারলো দৌড়ে কোনো লাভ নেই,তখন মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ালো নেকড়েগুলোকে মোকাবেলা করতে। সামনের একটা নেকড়ের পা ধরে, মাথার উপর উঠিয়ে ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করলো, কিন্তু পেছনের নেকড়েগুলো একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার যুদ্ধংদেহী ভাবের অবসান ঘটিয়ে দিলো মুহূর্তে।
ওজন কমে যাওয়ার ফলে গাড়ি আরো জোরে ছুটছে। তবে তাতেও কোনো ফললাভ হচ্ছিলোনা।
‘‘আরেকটা ফ্যাল,’’ বললেন বাবা।
এবার আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, বললাম,‘‘মানুষের চেয়ে গরু কি বেশি দামি হয়ে গেল ? একটা গরুই না হয় এবার ছেড়ে দাও।’’
ছেড়ে দিলাম একটা গর“। লেজ উঁচিয়ে,হাম্বা-হাম্বা চিৎকার করতে করতে গর“টা মোড় ঘুরে আরেকদিকে ছুটতে শুর“ করলো। নেকড়ের দলও ছুটলো গর“টির পিছুপিছু। বাবা কেঁদে ফেললেন গর“ হারানোর দুঃখে।
কাঁদতে-কাঁদতে বললেন,‘‘বড়ো প্রিয় গর“ ছিলো রে,খার“ !’’
‘‘জীবনের চেয়ে তো আর বেশি প্রিয় নয়,’’ বললাম আমি। ‘‘আমরা তো বেঁচে গেছি।’’
কিš‘ কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শোনা গেল সেই অমানুষিক গর্জন।
‘‘কেয়ামত মনে হয় আজই হয়ে যাবে !’’ বিড়বিড় করে বললাম।
সর্বশক্তি প্রয়োগ করে গর“গুলো আরো জোরে ছোটানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো এটুকু, হাতের চামড়া ছিলে গিয়ে রক্ত গড়াতে শুর“ করলো। বেনোজলের মতো নেকড়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
‘‘আরেকটা মেয়ে ফেলে দে, খার“,’’ চিৎকার করে বললেন বাবা।‘‘আর কোনো রাস্তা নাই রে ,বাপ!’’

আমি কিছু বলার আগেই, দুজনের মধ্যে মোটা মেয়েটা কাঁপাকাঁপা হাতে রূপার নোলকটা খুলতে শুর“ করলো। তোমাকে হয়তো বলিনি,মেয়েটা আমার বড়ো পছন্দের ছিলো। তাই তাকে বাদ দিয়ে অন্য মেয়েটাকে বললাম,‘‘তুই বেরো !’’
কিš‘ মেয়েটা যেন বেহুঁশ হয়ে গেছে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পরও যেভাবে পড়েছিলো সেভাবেই পড়ে রইলো। গাড়ি আরো হালকা হয়ে যাওয়ায় গতি আরো বেড়ে গেল। কিš‘ পাঁচ মিনিটের মধ্যে নেকড়ে আবার আমাদের নাগাল পেয়ে গেল।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,‘‘আল্লাহ, এ তোর কেমন বিচার ! অভাব-অনটনের বেদেজীবন শেষ করে ধনী হতে যাচ্ছিলাম,সব শেষ করে দিলি !’’
যে-মেয়েটাকে আমি ফেলি নি, তার দিকে তাকিয়ে বললাম,‘‘ তুই নিজে লাফ দিবি, না আমি ধাক্কা দেবো ?’’
মেয়েটা নাকের নোলকটা খুলে আমার হাতে দিলো, তারপর দু’হাতে চোখ চেপে ধরে লাফ দিলো গাড়ি থেকে।
গাড়ি এখন হাওয়ায় উড়ছে। গর“গুলো ক্লান্তির শেষ পর্যায়ে,কিš‘ তারপরও ছুটছে মরিয়া হয়ে।এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে,বস্তি আরো ত্রিশ মাইল দূরে।
আর কোনো উপায় না দেখে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে নেকড়েগুলোর মাথায় মারতে শুর“ করলাম। কিš‘ তাতে কোনো হেরফের হ”িছলো না । বাবাকে দেখলাম ঘেমেনেয়ে একেবারে একাকার হয়ে গেছেন। শেষমেষ বাবা বললেন,‘‘ গর“ আরো একটা খুলে দে,খার“ !’’
‘‘পাগল হয়েছো, বাবা ? সেধে মৃত্যু ডেকে আনার কোনো মানে আছে !’’ চিৎকার করে বললাম আমি। ‘‘ আমাদের একজনকে তো অন্তত বেঁচে থাকতে হবে। একটা গর“ কি গাড়িটাকে টেনে নিয়ে যেতে পারবে ?’’
‘‘ঠিক বলেছিস,’’ বাবা বললেন।‘‘ আমি বুড়ো হয়ে গেছি, ক’দিন আর বাঁচবো, তোর বেঁচে থাকা জর“রি। আমি লাফিয়ে পড়ে কিছুক্ষণ নেকড়েগুলোকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।’’
চমকে উঠলাম আমি ! কিš‘ নির্মম সত্যটাকে না মেনে উপায় নেই বলে কথা বাড়িয়ে আর সময় নষ্ট করলাম না।
‘‘মন খারাপ কোরো না ,বাবা,’’ বললাম আমি। ‘‘আমি বেঁচে থাকলে একটা নেকড়েকেও রেহাই দেবো না।’’
‘‘তুই আমার বড়ো আদরের ধন রে, খার“,’’ কান্নাভেজা গলায় আমার দু’গালে চুমু খেতে খেতে বললেন বাবা। তারপর দু’হাতে দুটো বড়ো ছুরি তুলে নিলেন, এবং গলায় ভালো করে কাপড় পেঁচিয়ে নিলেন। লাফ দিতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বাবা বললেন,‘‘দাঁড়া, আমার পায়ের জুতাগুলো একেবারে নতুন, ভেবেছিলাম কমসেকম দশবছর পরবো,’’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন,‘‘দেখিস তুই এগুলো আবার পরিস না যেন, মরা মানুষের জুতা পরতে নেই। তুই জুতাজোড়া বেচে দিস কারো কাছে।’’
জুতাজোড়া খুলে গাড়ির ভেতরে ছুঁড়ে মারলেন বাবা। তারপর লাফ দিয়ে পড়লেন গাড়ির পেছন পেছন দৌড়ুতে থাকা নেকড়েগুলোর একেবারে মাঝখানে।
পিছু ফিরে চাইতে মন সায় দিলো না। বাবা লাফ দিয়ে পড়ার সাথে সাথে শুধু তার চিৎকার শুনতে পা”িছলাম : আয় ! আয়, হারামজাদা নেকড়ের বা”চারা ,আয় !
বাবার সাহসিকতায় সেদিন বেঁচে গেলাম। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে, অনেকগুলো নেকড়ে মেরে আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন বাবা।’
এইটুকু বলে খার“ আমার দিকে তাকালো। ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে যাওয়া আমার মুখের তাকিয়ে হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠলো সে। খকখক করে কেশে মাটিতে থুথু ফেললো একদলা। তারপর বললো, ‘এর পরের বছর অইপথে যাওয়ার সময় আরো ষাটটা নেকড়ে মেরেছি আমি।’
বলতে বলতে শীতল চোখজোড়া ধক করে জ্বলে উঠলো তার। তারপর হাসতে হাসতে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত,ক্ষুধার্ত,জোড়াতালি দেওয়া কাপড় পরা খার।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28795049 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28795049 2008-05-07 04:34:21
হিন্দি গল্প: নেকড়ে-১ মূল : ভুবনেশ্বর
রূপান্তর(হিন্দি থেকে) : মোসতাকিম রাহী


লেখক পরিচিতি ঃ পুরো নাম ভুবনেশ্বর প্রসাদ। ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহ্জাহানপুরে। হিন্দি একাঙ্কিকা নাটকের জনক হিসেবে পরিচিত এই প্রতিভাবান সাহিত্যিক একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও অনুবাদক ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর ছিলো অগাধ জ্ঞান। জীবিত অব¯’ায় খ্যাতি অর্জন করলেও, পুরো জীবনটা তিনি কাটিয়েছেন ভীষণ অর্থকষ্টে। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি, ১৯৫৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যদি তা সত্য হয়, তাহলে বলতে হয়, প্রকৃতি সাহিত্যপ্রেমীদের প্রতি অবিচার করেছেন। অকালে তাঁর মৃত্যু না হলে হিন্দি তথা বিশ্বসাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধ করে যেতে পারতেন এই সব্যসাচী লেখক। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত ‘ভেড়িয়ে’ গল্পের বাংলা রূপান্তর এটি। প্রথম প্রকাশিত হয় সমকালের সাহিত্য সাময়িকী 'কালের খেয়া'তে।



‘নেকড়ে আর এমন কী,’ খারু বেদে বললো। ‘ চাইলে আমি একাই ভোজালি দিয়ে একটা নেকড়ে মারতে পারি।’
কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমি তার কথা বিশ্বাস করলাম। খারু কোনো কিছুকে ভয় করে না। যদিও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, সত্তরের কাছাকাছি বয়সের এই বৃদ্ধ দেখতে তেমন আহামরি কিছু নয়,তারপরও তার যে-কোনো কথা কেন যেন বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না। তার আসল নাম হয়তো ইফতিখার বা এরকম কিছু ছিলো,কিন্তু তার লঘুকরণ ‘খারু’ তার চরিত্রের সাথে মিলে গেছে ভীষণ। তাকে সবসময় ঘিরে থাকে দুর্ভেদ্য কাঠিন্য। তার বরফ-শীতল চোখ এবং শাদা গোঁফের নিচে বেঁকে থাকা ঠোঁটজোড়া জানান দেয় নির্দয়তার!
জীবনের উপর অতিষ্ঠ, বিরক্ত-বিপর্যস্ত খারু বেঁচে থাকার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেললেও মৃত্যু যেন তাকে স্পর্শ না করার কসম খেয়েছে,রোগ-বালাই তার কাছে ঘেঁষতেও যেন ভয় পায় !
মিথ্যে বলার অভ্যেস খারুর নেই, কারো ভালো লাগুক বা না লাগুক মুখের উপর সত্য কথাটাই বলে সে;এবং সত্য বলে এটাই সে প্রমাণ করতে চায় যে, তা কতোটা ভয়ানক এবং অসুন্দর হতে পারে।
এই অবিশ্বাস্য কাহিনী -যা আমি এখন বলতে যাচ্ছি- খারু আমাকে একদিন শুনিয়েছিলো, তার স্বভাবজাত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। অন্য কেউ হলে হয়তো ওর এই গল্প বিশ্বাস করতো না, কিন্তু আমি খারুর বলা সেই কাহিনীর প্রতিটি শব্দ সত্য বলে বিশ্বাস করি।
‘আমি কোনো কিছুকে ভয় করিনা,হ্যাঁ, শুধু একটা জিনিস ছাড়া - যার নাম নেকড়ে !’ দম নিয়ে বলতে শুরু করলো খারু, ‘একটা নয় ,দু’-চারটে নয়, পুরো নেকড়ের পাল- দু’-তিনশো । যারা শীতের রাতে শিকারের খোঁজে বেরোয়, আর দুনিয়ার তাবৎ জিনিস যাদের খিদে মেটাতে পারে না; এবং এমন কেউ নেই যে এই শয়তানের দলের মোকাবেলা করতে পারে। লোকে বলে নিঃসঙ্গ নেকড়ে কাপুরুষ হয় - ভুল,একেবারে ভুল! নেকড়ে ভীতু নয়- নিঃসঙ্গ নেকড়ে একটু বেশি সাবধানী হয়, এই যা ।
‘তোমরা বলো শিয়াল খুব চতুর-চালাক হয়,নেকড়ে সম্পর্কে তোমাদের কোনো ধারণা নেই বলেই এরকম ভাবো । নেকড়ের মতো চালাক আর কোনো প্রাণী পৃথিবীতে আছে বলে আমি মনে করিনা। তুমি কি কখনো নেকড়েকে হরিণ শিকার করতে দেখেছো? নেকড়ে বাঘের মতো নাটক করেনা,ভালুকের মতো রাজকীয় ভাবও দেখায় না। একবার,শুধু একবার বিদ্যুৎগতিতে লাফ দিয়ে হরিণের ঊরুতে গভীর জখম করে দেয়-ব্যস্,তারপর অনেকদূর পিছু হটে হরিণের ঊরু থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়া রক্তের ধারা অনুসরণ করতে থাকে। পলায়নরত আহত হরিণ রক্তক্ষরণে একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। আর অমনি নেকড়ে বাবাজি ঝাঁপিয়ে পড়ে সাবাড় করতে লেগে যায় নিজের চেয়ে তিনগুণ বড়ো হরিণকে !
‘নেকড়ে ভীষণ বুদ্ধিমান এবং চালাক প্রাণী, ক্লান্তি এক জিনিস তার নেই। অবলা প্রাণিকুল নেকড়েকে যমের মতো ভয় করে। আমাদের গরুগাড়ির গরুগুলো তাগড়া-জোয়ান, প্রায় ঘোড়ার মতোই ছুটতে পারে তারা; কিন্তু নেকড়ের গন্ধ যখন তারা পায়-ঘোড়দৌড় আর এমন কি-পঙ্খিরাজও যেন তখন তাদের কাছে হার মানবে, একেবারে হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে চলে আমাদের গাড়িটাকে !
‘আমরা গোয়ালিয়রের রাজ থেকে আঈনে আসছিলাম। প্রচন্ড শীত পড়ছিলো, নেকড়ের দল যে শিকারে বেড়িয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের গাড়ি ছিলো কানায়-কানায় ভরা :আমি,আমার বাবা,গৃহস্থালি জিনিসপত্র এবং তিনটা কিশোরি বাঈজি। আমরা তাদের পশ্চিমে নিয়ে যাচ্ছিলাম।’
‘কেন ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘কেন আবার, বিক্রি করার জন্যে। তুমি কি ভেবেছো ক্ষ্যাপ মারতে নিয়ে যাচ্ছিলাম ! গোয়ালিয়রের মেয়েগুলো খুব রূপবতী হয়, আর পাঞ্জাবে তাদের খুব চাহিদা-একেবারে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় সবার মধ্যে। মুহূর্তের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায় চড়া দামে।সুন্দরী হলে কী হবে, মেয়েগুলো ওজনে কিন্তু খুব ভারী ।
‘আমাদের মজবুত একটা গরুগাড়ি আর তিনটে গরু ছিলো ঘোড়ার মতো তেজি । কাকডাকা ভোরে উঠে রওনা দিয়েছিলাম আমরা, দিনের আলো থাকতে থাকতে এগিয়ে যাওয়া সঙ্গীদের সাথে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো আমাদের।বিপদের কথা ভেবে আমরা দুটো তীর-ধনুক এবং একটা বন্দুক নিয়েছিলাম সাথে।
গরুগুলো এগিয়ে যাচ্ছিলো নির্ভয়ে। ইতোমধ্যে আমরা দশ মাইল পেরিয়ে এসেছি। এমন সময় বাবা বললেন, ‘‘খারু, নেকড়ে দেখতে পাচ্ছিস ?’’
গলায় ঝাঁঝ এনে বললাম,‘‘ কী বললে ? নেকড়ের গন্ধ পেলে তোমার গরুগুলো কি এমন নির্ভয়ে চলতো ? ’’
মাথা নেড়ে বুড়ো বললেন, ‘‘না রে বাপ,বুঝতে পারছিস না। নেকড়ে ঠিকই পিছু নিয়েছে, যদিও এখনও আমাদের চেয়ে অনেক মাইল পিছনে আছে। আমাদের গরুগুলো ক্লান্ত হয়ে না পড়লে চিন্তার কিছু ছিলো না, কিন্তু এখনও আমাদের আরও পঞ্চাশ মাইল যেতে হবে।’’
দম নিয়ে বুড়ো আবার বললেন,‘‘এই শয়তান নেকড়েগুলোকে আমি খুব ভালো করে চিনি। গতবছর এই নেকড়ের দল আক্রমণ করেছিলো কয়েদিদের একটা কাফেলাকে। উদ্ধারকারী দল এসে শেষপর্যন্ত পেয়েছিল শুধু সিপাহিদের বন্দুক আর কয়েদিদের বেড়ি। শয়তানের দল খেয়ে শেষ করেছিলো সিপাহি আর কয়েদিদের।’’
একটু পর বাবা আবার বললেন,‘‘বন্দুক ভরে নে !’’
বন্দুক আর তীর-ধনুক নেড়েচেড়ে দেখলাম, সব ঠিক আছে।
বাবা আবার বললেন, ‘‘বারুদের নতুন চোঙাটাও বের করে নে !’’
‘‘নতুন বারুদ !’’ চমকে উঠলাম আমি।‘‘ আমিতো পুরনোটাই এনেছি !’’
তখন বাবা রেগেমেগে গালাগালি শুরু করে দিলেন: তুই একটা অপদার্থ,অলস,হ্যানত্যান আরো কতো কী!
পুরো গাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলাম,কিন্তু কোথাও নতুন বারুদ পাওয়া গেল না। বাবা নিজেও সমস্ত জিনিসপত্র উল্টেপাল্টে দেখলেন।
‘‘হারামজাদা নেকড়ের বাচচা,তোকে আমি নতুন বারুদ দিয়েছিলাম;কোথায় রেখেছিস বল্ ?’’ কনুই দিয়ে আমার পিঠে ক্রমাগত মারতে-মারতে গর্জন করছিলেন বাবা।
গাড়ির কোথাও বারুদ পাওয়া গেল না।
‘‘শহরে পৌঁছে নিই,তারপর তোর পিঠের চামড়া যদি আমি তুলে না নিই..!’’বাবার কথা তখনো শেষ হযনি,এমন সময় হঠাৎ গরুগুলো ভয়ার্ত ভঙ্গিতে বিদ্যুৎবেগে দৌঁড়–তে শুরু করলো।বহুদূর পেছন থেকে একধরণের কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসছিলো ,ধীরলয়ের একরকম অমানুষিক গর্জন। পেছন ফিরে দেখলাম ধুলো উড়ছে বাতাসের সাথে। মনে হলো ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছে।
বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,‘‘ঝড় আসছে...’’
‘‘ঝড় নয় হারামজাদা, নেকড়ে !’’ তীব্র ঘৃণা আর আতঙ্কে চেহারা বদলে গেছে তার।
চাবুক দিয়ে পিটিয়ে গরুগুলোকে নির্দিষ্ট পথে রেখে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করলেন বাবা। যদিও তার কোনো প্রয়োজন ছিলো না, নেকড়ের গন্ধ ইতোমধ্যে তারা পেয়ে গেছে ! জান বাচানোর তাগিদে নিজেরাই ছুটছিলো পড়িমরি করে।
রেগিস্তানের খোলা সমভূমিতে সবকিছু অনায়াসে নজরে আসে । পেছনে বেশ কয়েক মাইল দূরে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম কালো মেঘের মতো একটা ছায়া ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।
গরু সামলাতে সামলাতে বাবা আমার উদ্দেশে বললেন,‘‘ তৈরি হ’, কাছে আসার সাথে-সাথে তীর ছুঁড়ে মারবি ! একটা তীরও যদি নষ্ট করিস, কলজে বের করে নেবো !’’
মেয়ে তিনটি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো।
‘‘চুপ করো !’’ মেয়েগুলোকে ধমক দিয়ে বললাম। ‘‘চিৎকার করলে ঘাড় ধরে নিচে ফেলে দেবো।’’
নেকড়ের দল দ্র“তগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিলো। আমাদের গাড়িও প্রায় হাওয়ায় উড়ে চলেছে। বাবা শেষ পর্যন্ত লাগাম ছেড়ে দিয়ে বন্দুক হাতে তুলে নিলেন।আর তীর ধনুক হাতে প্রস্তুত হয়ে রইলাম আমি। আমরা বাপবেটা দুজনেই শিকারে অভিজ্ঞ ছিলাম: অন্ধকারেও আমি তীর ছুঁড়ে উড়ন্ত মুরগি মারতে পারি, আর বাবার কথা কী বলবো-তিনি যদি কোনো কিছুতে নিশানা করেন আল্লাহও বোধহয় তার আশা ছেড়ে দেন।
নেকড়ে ইতোমধ্যে আরো কাছে চলে এসেছে। যখন আর চারশো গজের মতো দূরে তখন বাবা হঠাৎ গুলি করে একটা নেকড়েকে ফেলে দিলেন ! অব্যর্থ লক্ষ্য ! গরুগুলো পাগলের মতো ছুটছে, তাদের মুখের ফেনা বাতাসের সাথে উড়ে এসে আমাদের চোখেমুখে পড়ছে। নেকড়ের দল আরো দ্রুত কাছে চলে আসছে। গুলি কিংবা তীরের আঘাতে লুটিয়ে পড়া নেকড়েগুলোকে বিনা দ্বিধায় খেয়ে নিচ্ছে বাকিগুলো, তাতে অবশ্য তাদের এগিয়ে আসার গতিতে ছেদ পড়ছেনা মোটেও।
বাবা আমার কাঁধে বন্দুকের নল রেখে গুলি চালাতে শুরু করলেন: দুম ! দুম ! আওয়াজের চোটে কানে তালা লেগে যাচ্ছিলো, গরমের আঁচে পুড়ে যাচ্ছিলো গলা (এখনও আমার গলায় সেই পোড়া দাগ আছে !); কিন্তু সেদিকে নজর দেওয়ার মতো অবস্থা ছিলো না তখন। একটা তীরও নষ্ট না করে আমি ষোলোটা নেকড়ে মেরেছি ,আর বাবা মেরেছেন দশটা। কিন্তু তারপরও যেন নেকড়ের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে !
‘‘নে,বন্দুক নে,’’ আমার দিকে বন্দুক বাড়িয়ে দিয়ে বললেন বাবা। ‘‘আমি গরু সামলাচ্ছি।’’
বাবা ভেবেছিলেন গরুগুলো বোধহয় এরচে’ও বেশি জোরে ছোটার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু তার ধারণা ভুল ছিলো। পৃথিবীর কোনো গরু এরচে’ বেশি জোরে ছুটতে পারবেনা, এটা আমি হলফ করে বলতে পারি।
গুলি করে একটার পর একটা নেকড়ে আমি মেরেই যাচ্ছিলাম। মেয়েগুলো খুব দ্রুত বন্দুক ভরে দিচ্ছিলো, আর আমি পটাপট মেরে যাচ্ছলাম:দুম!দুম! মেয়েগুলো বড়ো লক্ষ্মী ছিলো। এরমধ্যে আরো দশটা নেকড়ে আমি ফেলে দিয়েছি। যখন বারুদ শেষ হয়ে এলো ততোক্ষণে মনে হলো নেকড়ের দলও হার মেনে নিয়েছে।
বাবাকে বললাম,‘‘নেকড়ে পিছিয়ে গেছে, বাবা !’’
জবাববে বুড়ো হাসলেন,‘‘ওরা এতো সহজে ক্ষান্ত দেবে না রে, বাপ, তারপরও ভয় নেই, তোর মতো লক্ষ্যভেদী ছেলে যখন আমার আছে,ভয়ের কী? আমিতো বলবো সাত মুলুকের বেদেদের মধ্যে তোর মতো শিকারি একজনও নেই।’’
(ক্রমশ)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28792504 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28792504 2008-04-29 14:26:07
একটি অকবিতা ====

পুরুষ:
তোমার ছিলাম, তোমারই আছি, আদি থেকে অন্ত
গ্রীষ্ম–বর্ষা–শরত–হেমন্ত্–শীত আর বসন্ত!
গোলাপ–বেলি–স্বর্ণচাঁপা, তুমি রজনীগন্ধা
তোমার ঘ্রাণে পাগল আমি, সকাল–দুপুর–সন্ধ্যা!

নারী:
এতো বেশি ভালোবেসো না আমায়
এতো বেশি টেনো না কাছে:
ভয় জাগে মনে, তোমার প্রেমের বানে
খড়ের মতো আমি ভেসে যাই পাছে!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28732962 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28732962 2007-09-23 01:49:45
অবহেলা ঢেউয়ের ধাক্কায় আরো একটু ক্ষয়ে গেলো
ঘাটের পাথরগুলো!
এখন সন্ধ্যা -জোয়ারের সময়,
আজ তুমি ঢেউ গুনতে আসো নি!

গত একঘন্টায় চারজন যাত্রীকে না করেছে মনুমাঝি
আজ সে ওপারে যাবে না!
অবহেলায় কবির কিছু যায় আসে না, কবি অভ্যস্ত
তার কোনো ক্ষতি নেই;
ক্ষতি শুধু মনুদাশের:
আজ তার বউ রুষ্ট হবে!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28729724 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28729724 2007-09-06 14:49:07
প্রেমচাঁদের গল্প--লটারি--শেষপর্ব মূল: মুনশি প্রেমচাঁদ
রূপান্তর(মূল হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী
.....
প্রকাশ ছোটো ঠাকুরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বললো,‘আরে কাকা, পাথর তো নয়, মনে হয় গোলা ছুঁড়ে মারছে! পালোয়ানের মতো শরীর, এক ঘুষিতে বাঘকে পর্যন্ত পরাস্ত করতে পারেন। কতো লোক যে একটা মাত্র পাথরের আঘাতে পটল তুলেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অথচ আজ পর্যন্ত কোনো মোকদ্দমাই হয় নি তুফান বাবার বিরুদ্ধে। আর বাবাও দু’-চারটে পাথর মেরেই ক্ষান্ত হন না, যতোক্ষণ না আপনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাচ্ছেন, ততোক্ষণ মারতেই থাকবেন। আর রহস্য এই, জখম যতো বেশি হবে, লক্ষ্য হাসিলের সম্ভাবনা ততোই বাড়বে।’
প্রকাশ এমন গল্প ফেঁদে বসলো যে, ছোটো ঠাকুর কুঁকড়ে গেলেন ভেতরে ভেতরে। তুফান বাবার আস্তানায় গিয়ে মার খাওয়ার সাহস হলো না।

শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ণয়ের দিন এসেই গেলো জুলাইয়ের বিশ তারিখ। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। আশা আর ভয়ের দোলাচলে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি নি রাতভর।
বড়ো-ছোটো দুই ঠাকুর গঙ্গাস্নান সেরে মন্দিরে পুজো দিতে গেলেন। আজ আমার মনেও ভক্তি জেগে উঠলো। ভাবলাম মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে আসি।
‘হে প্রভু! তুমি অনাথের সহায়, আশ্রয়হীনের আশ্রয়, তুমি অন্তর্যামী, আমরা কতো কষ্ট করে টিকেট কিনেছি সেটা তুমি জানো প্রভু। তোমার কৃপাদৃষ্টি কি আমাদের ওপর পড়বে না প্রভু? আমাদের চেয়ে তোমার কৃপা পাওয়ার যোগ্য আর কে আছে?’
বিক্রম একেবারে সুটবুট পরে মন্দিরে হাজির। আমাকে ইশারা করে বললো,‘আমি ডাকঘরে যাচ্ছি!’ তারপর হাওয়া হয়ে গেলো। একটু পরে প্রকাশ মিষ্টির থালা হাতে নিয়ে মন্দিরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে গরিবদের মাঝে বিলি করতে শুরুকরলো।
দুই ঠাকুর তখনো ভগবানের চরণ ছুঁয়ে পড়ে আছেন। মাথা নিচু করে, চোখ বুজে একমনে প্রার্থনা করে চলেছেন।
হঠাৎ বড়ো ঠাকুর মাথা তুলে পুরোহিতের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ভগবান বড়োই ভক্তবৎসল, তাই না, পুরোহিত মশাই?’
পুরোহিত সমর্থন করলেন তাঁর কথা। বললেন,‘হ্যাঁ, বড়ো ঠাকুর, ভক্তের সুরক্ষার জন্যেই ভগবান ক্ষীরসাগর পাড়ি দিযেছেন, আর গজকে বাঁচিয়েছেন কুমিরের কবল থেকে।’
একটু পরে মাথা তুললেন ছোটো ঠাকুর। পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভগবান তো সর্বশক্তিমান, অন্তর্যামী, সবার মনের খবর জানেন, তাই না পুরোহিত মশাই?’
পুরোহিত তাঁর কথাও সমর্থন করলেন। বললেন,‘অন্তর্যামী না হলে সবার মনের কথা কী ভাবে বুঝতে পারেন? শবরীর প্রেমের গভীরতা দেখেইতো তার মনোকামনা পূর্ণ করলেন।’

পূজা সমাপ্ত হলো। যখন ভজন শুরু হলো দুই ভাই মিলে জোরে জোরে ভজন গাইতে লাগলেন। বড়ো ঠাকুর দুই টাকা দান করলেন পুরোহিতের সামনে রাখা থালায়। তা দেখে ছোটো ঠাকুর দান করলেন চার টাকা। বড়ো ঠাকুর কোপনজরে কিছুক্ষণ চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তারপর পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,‘আপনার মন কী বলছে পুরোহিত মশাই?’
‘ আপনার জয় সুনিশ্চিত, বড়ো ঠাকুর!’
ছোটো ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন,‘আর আমার?’
‘আপনারও জয় হবে, ছোটো ঠাকুর!’
বড়ো ঠাকুর সশ্রদ্ধ চিত্তে ভজন গাইতে গাইতে মন্দির থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আর তার পিছে পিছে ছোটো ঠাকুরও চললেন প্রভুর গুনগান গাইতে গাইতে।
আমিও বেরিয়ে এলাম তাদের পিছুপিছু। বাইরে এসে প্রকাশ বাবুকে সাহায্য করতে চাইলাম মিঠাই বিতরণে। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমি একাই করতে পারবো, মাস্টার বাবু। আর বেশি তো বাকি নেই, ধন্যবাদ!’
আমি লজ্জা পেয়ে ডাকঘর অভিমুখে রওনা দিলাম। এমন সময় দেখলাম বিক্রম হাসিমুখে সাইকেল চালিয়ে এদিকেই আসছে। তাকে দেখার সাথে সাথে সবাই যেন পাগল হয়ে গেলো। দুই ঠাকুর হামলে পড়লো তার ওপর বাজপাখির মতো। প্রকাশের থালায় তখনো অল্প মিঠাই পড়ে ছিলো, সেগুলো সহ থালাটা সে মাটিতে ফেলে দৌড়ে এলো বিক্রমের কাছে। আর আমি একফাঁকে বিক্রমকে কাঁধে তুলে নিয়ে নাচতে শুরু করলাম। সবাই মিলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। কিন্তু কেউ জানতে চাইছে না লটারির ফলাফল কী !
বড়ো ঠাকুর আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করে বললেন, ‘জয়, রাজা রামচন্দ্রের জয়!’
ছোটো ঠাকুর আরো জোরে বললেন, ‘জয়, হনুমানের জয়!’
প্রকাশও তার ভক্তি জাহির করলো: ‘তুফান বাবার জয় হোক!’
বিক্রম সবার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আলাদা আলাদা দাঁড়িয়ে বলো দেখি সবাই, যার নামে লটারি উঠবে সে আমাকে একলাখ টাকা দেবে। বলো, রাজি?’
বড়ো ঠাকুর বিক্রমের হাত ধরে বললেন, ‘আগে বল্ কার নাম উঠেছে!’
‘জি না,’ বিক্রম জবাব দিলো। ‘আগে বলুন, আমার শর্তে সবাই রাজি?’
ছোটো ঠাকুর রেগে গিয়ে বললেন,‘শুধু নাম বলার জন্যে একলাখ? শাবাশ!’
প্রকাশও গলা চড়িয়ে বললো, ‘আমরা কি ডাকঘর চিনি না?’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, যার যার নাম শোনার জন্যে তৈরি হয়ে যাও তবে!’
সবাই অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
‘হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখো সবাই।’
সবাই পূর্ণ সচেতন হয়ে, কান সজাগ করে দাঁড়ালো।
‘আচ্ছা, তো মন দিয়ে শুনুন সবাই। এই শহরের মানুষের বড়ো দুর্ভাগ্য, শুধু এই শহরের নয়, সমগ্র ভারতবাসীর দুর্ভাগ্য! লটারি জিতেছে আমেরিকার এক হাবশি লোক।’
‘মিথ্যে কথা!’ হুংকার দিয়ে উঠলেন বড়ো ঠাকুর। ‘ডাঁহা মিথ্যে কথা!’
ছোটো ঠাকুরও যোগ দিলেন তার সাথে, ‘এটা কিছুতেই সত্যি হতে পারে না। তিনমাসের একনিষ্ঠ প্রার্থনা কিছুতেই বিফল হতে পারে না।’
‘হাত-মাথা ফাটিয়েছি কি এমনি এমনি, মশকরা করছিস, অ্যাঁ?’ প্রকাশের ক্ষিপ্ত উক্তি।

এরকম আরো জনা পঁচিশেক লোক উদয় হলো কাঁদো-কাঁদো চেহারা নিয়ে। তারাও আসছে ডাকঘর থেকে, নিজেদের স্বপ্নের সমাধী রচনা করে।
‘নিয়ে গেছে সব লুট করে, হারামজাদা হাবশি! বদমাশ, শয়তান!’ প্রলাপ বকছে সব ক্লান্ত শ্রান্ত হতাশ মানুষ ।

বিশ্বাস না করার আর কোনো উপায় নেই। বড়ো ঠাকুর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গেলেন মন্দিরের দিকে। পুরোহিতকে ডিসমিস করে দিয়ে বললেন, ‘এজন্যে এতোদিন ধরে পালছি আপনাকে? হারাম খেয়ে খেয়ে চর্বি বাড়ানোর জন্যে?’

ছোটো ঠাকুরকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ তার কোমর ভেঙে দিয়েছে। দু’-তিনবার কপাল চাপড়ে রাস্তার মাঝখানেই বসে পড়লেন। কিন্তু প্রকাশের অবস্থা আরো ভয়ংকর। ক্রোধে অন্ধ হয়ে সে লাঠি হাতে ছূটে গেলো তুফান বাবার আস্তানার দিকে। আজ তুফান বাবাকেই মেরামত করা হবে।
ঠাকরুন বললেন, ‘আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। নিশ্চয়ই সবাই বেঈমানী করেছে। দেব-দেবতার আর কী দোষ! তাঁরা কি অন্যদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনবেন?’
রাতে কেউ খাবার মুখে দিলো না। আমি উদাস হয়ে বসে ছিলাম। বিক্রম এসে বললো, ‘চলো হোটেল থেকে কিছু খেয়ে আসি। আজ তো চুলা-ই জ্বলে নি ঘরে।’
আমি বিক্রমকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা তুমি যখন ডাকঘর থেকে ফিরে এলে তখন তোমাকে খুব খুশিখুশি লাগছিলো। ব্যাপারটা কী?’
‘আমি যখন ডাকঘরের সামনে হাজার হাজার লোকের ভিড় দেখতে পেলাম, তখন আমাদের পরিবারের লোকদের বোকামির কথা ভেবে ভীষণ হাসি পেলো। একটা শহরে যেখানে এতো লোক টিকেট কিনেছে, সারা হিন্দুস্তানে তো এর চেয়ে হাজারগুন বেশি হবে। আর সারা দুনিয়ার কথা ভাবো, লাখোগুন বেশি হবে না! আর আমি কিনা পর্বতপ্রমাণ আশা নিয়ে দৌড়ে গেলাম ডাকঘরে! যেই ফলাফল ঘোষণা করলো, আমার বিষম হাসি পেলো। এ যেন কোনো দানশীল ব্যক্তির তামাশা: একমুঠো ভাত নিয়ে যে ছড়িয়ে দিয়েছে লাখো লোকের মাঝে। আর আমাদের এখানে লোকজন কতো কিছু যে....
আমিও হেসে ফেললাম ওর কথায়। বললাম, ‘ঠিকই বলেছো, আমরা দু’জনও লেখাজোকা করে নেওয়ার জন্যে কতো না বাড়াবাড়ি করেছি! আচ্ছা, একটা কথা সত্যি করে বলো তো, তোমার নিয়ত কি আসলেই খারাপ ছিলো?’
‘কী করবে এখন আর জেনে,’ মুচকি হেসে বললো বিক্রম। ‘রহস্যটা পরদার আড়ালেই না হয় ঢাকা থাক!

শেষ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728845 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728845 2007-09-01 15:45:05
প্রেমচাঁদের গল্প--লটারি--৪ মূল: মুনশি প্রেমচাঁদ
রূপান্তর(মূল হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী
......
কিন্তু তার এই আশ্বাস বাণী আমি মোটেও বিশ্বাস করতে পারলাম না। সন্দেহের যে-পোকা মনে ঢুকেছে, সেটা শুধু কেটেই চলেছে।
‘আমি আবার বললাম, ‘এটা আমি খুব ভালো করেই জানি যে, তোমার মনে কোনো কলুষতা নেই, কিন্তু লেখাজোকা করে নিলে ক্ষতি কী!’
‘কী দরকার অযথা!’
‘অযথাই না হয় করলাম।’
‘করলে পাকা দলিলই করতে হবে। আর তাতে দশলাখ টাকার হিসেবে কোর্টের ফিস আসবে প্রায় সাড়ে সাত হাজার। কোনো প্রয়োজন আছে এতোগুলো টাকা জলে ফেলার!’
আমি মনে মনে ভাবলাম, শাদা কাগজে লিখে নিলে কেমন হয়? এটা হয়তো ঠিক যে, শাদা কাগজের লেখা দিয়ে আমি আইনের আশ্রয় নিতে পারবো না। কিন্তু সমাজের সামনে, লোকজনের সামনে তাকে ধোঁকাবাজ প্রমাণ করতে,তাকে লজ্জিত করতে তো পারবো। আর লোকনিন্দার ভয় কার নেই! লোকজনের সামনে অপমানিত হওয়ার ভয়, আইনে সাজার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

‘শাদা কাগজে করলেও আমার কোনো আপত্তি নেই, ’বললাম আমি।
বিক্রম হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললো, ‘যে-কাগজের কোনো আইনি মূল্য নেই, সেটা করে কী লাভ?’
আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, বিক্রমের মনে শয়তানি আছে। নয়তো একটা শাদা কাগজে লিখতে অসুবিধে কী? রেগে গিয়ে বললাম, ‘তোমার মাথায় এখন থেকেই বদ মতলব ঘুরপাক খাচ্ছে।’
নির্লজ্জের মতো সে বললো,‘ তুমি বলতে চাইছো, এই অবস্থায় তোমার খেয়াল খারাপ হতো না?’
‘মোটেও না, আমি এতো নীচ নয়।’
‘আরে রাখো, কী আমার সজ্জন লোক রে! কতো দেখলাম তোমার মতো ভালো মানুষ!’
‘ এক্ষুনি তোমাকে কাগজে লিখে দিতে হবে। তোমার ওপর আমার আর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই।’
‘আমার প্রতি যদি তোমার আস্থা না থাকে তাহলে আমিও কোনো লিখিত কাগজ দেবো না।’
‘আচ্ছা! তো তুমি মনে করেছো আমার টাকা খেয়ে হজম করতে পারবে?’
‘কিসের টাকা তোমার, কেমন টাকা?’
‘দেখো বিক্রম, শুধু বন্ধুত্বই নষ্ট হবে না, তারচেয়েও ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে বলে দিচ্ছি!’
ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলো আমার ভেতরে।
এমন সময় হঠাৎ করে বৈঠকখানা থেকে ঝগড়ার আওয়াজ ভেসে আসায় আমার মনোযোগ সেদিকে চলে গেলো। সেখানে দুই ঠাকুর সব সময় বসে আড্ডা দেন। তাদের মধ্যে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো, যেটা শুধু দুই আদর্শ ভাইয়ের মধ্যে হতে পারে। একেবারে মানিকজোড়, ঠিক যেন রাম-লক্ষ্মণ! ঝগড়া দূরে থাকুক তাদের মধ্যে কখনো সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে বলেও আমি শুনিনি। বড়ো ঠাকুর যা বলবেন ছোটো ঠাকুর তা মাথা পেতে নেবেন, আর ছোটো ঠাকুরের ইচ্ছে অনিচ্ছের প্রতি সম্মান দেখিয়েই বড়ো ঠাকুর কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন। আমরা দুজন খুব অবাক হয়ে গেলাম এই বন্ধুপ্রতিম দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে বুঝতে পেরে। চুপিচুপি বৈঠকখানার দরোজায় গিয়ে দাঁড়ালাম দু’জন।
দুই ভাই ইতোমধ্যে নিজেদের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। চোখ লাল, হাতজোড়া মুঠি পাকানো, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে একজন আরেকজনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। বোঝা যায় শুধু হাতাহাতিটাই বাকি আছে।
ছোটো ঠাকুর বিক্রমকে দেখতে পেয়ে বললো, ‘যৌথ পরিবারে যা কিছু আসুক, যেখান থেকে আসুক, যার নামেই আসুক না কেন, সেটা সবার নামে সমান ভাগে হিসাব হবে।’
বিক্রমের বাবাও বিক্রমকে দেখতে পেয়েছে। এক কদম সামনে এগিয়ে এসে বিক্রমের বাবা, অর্থাৎ বড়ো ঠাকুর বললেন, ‘মোটেও না, আমি যদি কোনো অপরাধ করি তাহলে পুলিশ আমাকে এসে ধরবে, যৌাথ পরিবারকে নয়। শাস্তি আমি পাবো যৌথ পরিবারের কেউ পাবে না। এটা ব্যক্তিগত হিসাব।’
‘ঠিক আছে, এর ফয়সালা আদালতেই হবে।’
‘যাও, খুশিমনে আদালতে যাও। যদি আমার বউ ছেলে কিংবা আমার নামে লটারি ওঠে তাহলে তাতে তোমার কোনো অংশ থাকবে না। ঠিক তেমনি যদি তোমার নামে লটারি ওঠে তাহলে তাতে আমাদের কারো দাবি থাকবে না।’
‘যদি জানতাম, আপনার মনে কুমতলব আছে তাহলে আমিও আমার বউ-বাচ্চার নামের টিকেট কিনতে পারতাম।’
‘ওটা তোমার বোকামি!’
‘হ্যাঁ, কারণ আপনি আমার বড়ো ভাই, বিশ্বাস করেছিলাম আপনাকে।
‘এটা হচ্ছে একধরনের জুয়াখেলা, তোমার বোঝা উচিৎ। জুয়ার হারজিতের সাথে পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই, থাকতে পারে না। তুমি যদি কাল রেসের বাজিতে পাঁচ-দশ হাজার টাকা হেরে যাও তোমার পরিবার তো তার জন্যে দায়ী হতে পারে না।’
‘ভাইয়ের হক খেয়ে আপনি সুখী হতে পারবেন না।’
‘শকুনের প্রার্থনায় কি আর গরু মরে ভাই!’

বিক্রমের মা ভেতর থেকে দৌড়ে এলেন দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া লেগেছে শুনে। এসে দু’জনকে বোঝাতে লাগলেন।
ছোটো ঠাকুর রেগেমেগে বললেন,‘আমাকে নয়, তুমি তাঁকে বোঝাও। আমি তো একটা মাত্র টিকেট কিনেছি, তার কোনো ভরসা নেই। উনি চার চারটি টিকেট কিনে বসে আছেন। আমার চেয়ে লটারি পাওয়ার চান্স তাঁর চারগুন বেশি। এরপরও যদি তার খেয়াল খারাপ হয়ে যায়, এরচেয়ে লজ্জার, দুঃখের কথা আর কী হতে পারে!’
ঠাকরুন দেবরকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ আচ্ছা ঠিক আছে, আমার টাকা থেকে আমি তোমাকে অর্ধেক দিয়ে দেবো। খুশি তো?’
বড়ো ঠাকুর বউয়ের কথা শুনে ধমক দিয়ে উঠলেন, ‘কেন অর্ধেক দেবো, কোন হিসেবে দেবো? আমরা যদি ভালো মানুষি দেখিয়ে দেইও, সে পাবে পাঁচভাগের এক ভাগ। কোন যুক্তিতে তাকে অর্ধেক দেবো শুনি? ধর্মমতে বলো আর আইনমতে বলো।’
ছোটো ঠাকুর মুখ ভেংচে বললেন, ‘হ্যাঁ, দুনিয়ার যাবতীয় আইনতো সব আপনিই জানেন!’
‘নয়তো কী, ত্রিশবছর ধরে ওকালতি করছি!’
‘ওকালতি সব বেরিয়ে যাবে যখন কলকাতার ব্যারিস্টার এনে সামনে দাঁড় করিয়ে দেবো।’
‘কলকাতার হোক আর লন্ডনের, আমি থোড়াই কেয়ার করি।’
‘অর্ধেক ভাগ আমি নেবোই। সম্পত্তিতে যেমন আমার অর্ধেক অংশ আছে লটারিতেও আমার অর্ধেক চায়।’

এমন সময় বিক্রমের বড়ো ভাই প্রকাশ হাতে মাথায় ব্যান্ডেজ, আর দোমড়ানো মোচড়ানো কাপড়চোপড়ে তাজা রক্তের দাগ নিয়ে একেবারে হাসিমুখে এসে আরামকেদারায় ধপাস করে বসে পড়লো। বড়ো ঠাকুর ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘এ কী হয়েছে তোর? চোট পেলি কী করে? কারো সাথে মারপিট করে আসছিস না তো?’
প্রকাশ আরামকেদারায় শোয়া অবস্থায় সামান্য আড়মোড়া ভেঙে বললো,‘জি না, ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই, আমার কিছু হয় নি, আমি ভালো আছি।’
‘কী বলছিস কিছু হয় নি! মাথা আর হাতে চোট লেগে রক্ত বেরুচ্ছে! ব্যাপারটা কী, রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা হয়নি তো!’
‘একেবারে মামুলি আঘাত, বাবা, দু’-একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। ভয়ের কিছু নেই।’
প্রকাশের ঠোঁটে মুচকি হাসি। আশ্চর্য শান্ত তার হাবভাব। রাগ কিংবা অপমানের কোনো চিহ্ন তার চেহারায় নেই। প্রতিশোধ নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার মধ্যে দেখা যাচ্ছিলো না।
বড়ো ঠাকুর অস্থির হয়ে গেলেন তার আচরণে। বললেন,‘কিন্তু কী হয়েছে সেটা বলছিস না কেন? কেউ মারধোর করে থাকলে বল, থানায় গিয়ে রিপোর্ট করে আসি।’
প্রকাশ হালকা মেজাজে বললো, ‘মারপিট কারো সাথে হয় নি, বাবা। তুফান বাবার আস্তানায় গিয়েছিলাম একটু। আপনি তো জানেন, উনি লোকজন দেখলেই পাথর নিয়ে তাড়া করেন। আর ভয় পেয়ে যদি কেউ দৌড় দেয়, তাহলে ঐ বেচারা মরেছে! আর যে ইট-পাটকেল খেয়েও বাবার পিছে লেগে থাকবে, তার কপাল খুলে যাবে। পরশপাথর যে সে পাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আসলে উনি এভাবে লোকজনকে পরীক্ষা করেন।
‘আজ আমি ওখানে গিয়েছিলাম। প্রায় পঞ্চাশজন লোক আজ উপস্থিত ছিলো। কেউ মিষ্টি, কেউ কাপড়, কেউ দামি উপহার নিয়ে গেছে বাবার কৃপাদৃষ্টিলাভের আশায়। তুফান বাবা তখন ধ্যান করছিলেন। চোখ খুলে যখন সমবেত লোকদের দেখতে পেলেন, ব্যস, পাথর নিয়ে দৌড়ে এলেন আমাদের দিকে। শুরু হয়ে গেলো দৌড়ঝাঁপ। যে যেদিকে পারে ছুটে পালালো। মুহূর্তের মধ্যে খালি হয়ে গেলো বাবার আস্তানা। একা আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ঝিম মেরে। উনি আমাকে পাথর ছুঁড়ে মারলেন। প্রথমটা এসে লাগলো মাথায়। ওনার নিশানা একেবারে অব্যর্থ। মাথা ফেটে রক্ত পড়তে শুরু করলো। কিন্তু আমি নড়বার পাত্র নই। এরপর উনি দ্বিতীয় পাথরটা মারলেন, হাতে এসে লাগলো ওটা। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলাম। যখন হুঁশ ফিরে এলো, দেখলাম বাবার আস্তানায় কেউ নেই, একেবারে নীরব হয়ে আছে চারিদিক। তুফান বাবাকেও কোথাও দেখতে পেলাম না। মনে হয় গায়েব হয়ে গেছেন। কাকে ডাকবো? কার কাছে সাহায্য চাইবো? মাথার ক্ষত থেকে তখনো রক্ত গড়াচ্ছে, অসহ্য ব্যথায় মনে হচ্ছে হাত ছিঁড়ে পড়ে যাবে। কোনোমতে হাঁচড়েপাচড়ে উঠে দাঁড়ালাম, সোজা চলে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার দেখে বললেন হাড় ভেঙে গেছে। ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বললেন, গরম সেঁক দিতে। হাড় ভেঙেছে এটা এমন বড়ো কিছু নয়, লটারির টিকেট যে আমার নামে উঠবে এটা এখন নিশ্চিত। তুফান বাবার মার খেয়েছে কেউ, কিন্তু মনোবাসনা পূরণ হয় নি, এমনটা কখনো হয় নি। আমি লটারি পেয়েই বাবার আস্তানা পাকা করে দেবো।’
বড়ো ঠাকুরের চেহারায় খুশির ছায়া খেলে গেলো। ত্বরিত বিছানা তৈরি হয়ে গেলো বিক্রমের জন্যে। প্রকাশ শুয়ে পড়লো সেই বিছানায়। ঠাকরুন তাড়াতাড়ি বিক্রমকে পাখা করতে লাগলেন। ছেলের সফলতার আশায় তার চেহারায়ও খেলা করছিলো এক অদ্ভুত প্রসন্নতা। সামান্য আঘাত সয়ে দশলাখ টাকা পেয়ে যাওয়া মোটেও সহজ কথা নয়!
খিদের ঠ্যালায় ছোটো ঠাকুরের নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাচ্ছিলো। তবু এক পা-ও নড়ছিলেন না তিনি সেখান থেকে। যেই বড়ো ঠাকুর খাওয়ার জন্যে ভেতরে গেলেন আর ঠাকরুন প্রকাশের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে গেলেন, অমনি ছোটো ঠাকুর ছুটে এসে প্রকাশকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুফান বাবা কি খুব জোরে পাথর মারেন?’
(ক্রমশ...)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728729 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728729 2007-08-31 21:08:22
আজ এরশাদ বাদশার জন্মদিন http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728684 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728684 2007-08-31 14:12:18 প্রেমচাঁদের গল্প--লটারি--৩ মূল: মুনশি প্রেমচাঁদ
রূপান্তর(মূল হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী
........
আমি বিক্রমের দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করলাম। সে আমার ইশারা বুঝতে পারলো। চোখেচোখে দু’জনে পরামর্শ করে নিলাম। বিক্রম কুন্তিকে বললো,‘আচ্ছা তোকে একটা কথা বললে কাউকে বলবি নাতো? না না, তুই খুব লক্ষ্মী মেয়ে, আমি জানি তুই কাউকে বলবি না। এখন থেকে আমি তোকে ভালো মতো পড়াবো, এবার তুই ঠিকই পাশ করতে পারবি। আসলে হয়েছে কী, আমরা দু’জনেও একটা লটারি কিনেছি। তুই ঈশ্বরের কাছে আমাদের জন্যেও একটু প্রার্থনা করিস, বোন। যদি লটারি পেয়ে যাই তাহলে তোকে সুন্দর সুন্দর গয়না গড়িয়ে দেবো। সত্যি বলছি!’
কিন্তু কুন্তি বিশ্বাস করলো না বিক্রমের কথা। আমরা দু’জনে শপথ করলাম। তারপরও সে শয়তানি করতে লাগলো। শেষমেশ কসম খেয়ে যখন বললাম তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সোনা আর হিরে দিয়ে মুড়ে দেবো, তখন সে রাজি হলো আমাদের জন্যে প্রার্থনা করতে।
কিন্তু তার পেটে যে এই সামান্য কথা হজম হবে না সেটা আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারি নি। সে সোজা ভেতরে গিয়ে কথাটা মুহূর্তের মধ্যে রাষ্ট্র করে দিলো। শুরু হলো বকাবকি। মা-বাবা-চাচি যে-ই সামনে পাচ্ছে সে-ই দিচ্ছে বকুনি: কী দরকার ছিলো টাকা খরচ করার? নিশ্চয়ই মাস্টার এই বুদ্ধি দিয়েছে! এতোগুলো টাকা পানিতে ফেলে দিলি! বাড়িতে কতোজনে টিকেট কিনেছে, তোর কী প্রয়োজন ছিলো কেনার! ওরা পুরস্কার পেলে সেখান থেকে কি তোকে ভাগ দিতো না!
এরপর শুরু হলো আমাকে ধোলাই:‘আর তুমিও মাস্টার, একটা অপদার্থ! ছেলেমেয়েদের ভালো কিছু শেখাবে কি, উল্টো তাদের কুমন্ত্রনা দিচ্ছো!’
বিক্রম আদরের ছেলে, তাকে বেশি আর কী বলবে! রাগ করে দু’-এক বেলা খাওয়া বন্ধ করে দিলেই সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে, উল্টো তাকে সাধাসাধি করতে করতে সবার জান বেরিয়ে যাবে। সবার রাগ এসে পড়লো আমার ওপর। ‘এই মাস্টারের সহচর্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা!’ সবাই রায় ঘোষণা করলো।

ছোটোবেলার একটা ঘটনা মনে পড়লো আমার। আমিও বিক্রমের মতো কৌশল অবলম্বন করে একবার বেঁচে গেছিলাম মারের হাত থেকে। সেবার দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে একটা মদের বোতল আনা হয়েছিলো বাড়িতে। মামু অই সময় বেড়াতে এসেছিলেন আমাদের ওখানে। আমি করলাম কী, চুপিচুপি ভাঁড়াড়ে ঢুকে একটা গেলাসে করে কিছুটা শরাব নিয়ে খেয়ে ফেললাম। গলা জ্বলতে শুরু করলো, আর চোখ হয়ে গেলো টকটকে লাল। এমন সময় হঠাৎ কোত্থেকে মামু এসে হাজির হলেন। ধরে ফেললেন হাতেনাতে। আর এতোটা রেগে গেলেন তিনি যে, ভয়ে আমার কলজে শুকিয়ে গেলো। মা-বাবা সবাই মিলে বকাবকি শুরু করলেন। ভয়ে যখন আমি কাঁদতে শুরু করলাম, তারা শান্ত হলেন।
আর সেদিন দুপুরে মামু বেহেড মাতাল হয়ে গান গাইতে লাগলেন। এরপর শুরু হলো হলো মড়াকান্না, তারপর মাকে গালাগালি করলেন, আর দৌড়ে দাদুকে গেলেন মারতে । শেষে বমি করতে করতে একসময় মাটিতে পড়ে গেলেন অজ্ঞান হয়ে।

বিক্রমের বাবা বড়ো ঠাকুর সাহেব এবং চাচা ছোটো ঠাকুর সাহেব দু’জনেই ছিলেন জড়বাদী। পূজা-অর্চনায় তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিলো না, বরং হাসি তামাশা করতেন তা নিয়ে: পুরোপুরি নাস্তিক। কিন্তু এখন দেখলাম দু’জনেই খুব ঈশ্বর ভক্ত হয়ে উঠেছেন। বড়ো ঠাকুর সাহেব তো সকালে উঠেই চলে যান গঙ্গাস্নান করতে। আর পুরোটা সকাল মন্দিরে কাটিয়ে দুপুরবেলা সারা শরীরে চন্দন ঘষে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আর ছোটো ঠাকুর তো গরমজলে স্নান করার সময়ও রামনাম জপতে থাকেন। এরপর চলে যান পার্কে, সেখানে গিয়ে চড়ুই-কবুতরদের দানা খাওয়ান পরম আদরে।
সন্ধ্যার সময় দু’ভাই বাড়ি ফিরে চলে যান ঠাকুরঘরে। তারপর প্রায় অর্ধেক রাত পর্যন্ত শোনেন ভগবত গীতার শ্লোক। বিক্রমের বড়ো ভাই প্রকাশ সাধু-সন্ন্যাসীদের ওপর অগাধ আস্থা রাখে। প্রায়ই চলে যায় সে তাদের আস্তানায়, মঠে। সেখানকার ধুলোময়লা সাফ করে, আর দেবী মায়ের সেবায় লেগে থাকে সবসময়।
লোকে বলে লোভ-লালসা ভালো নয়,পাপ; কিন্তু আমার মনে হয় এই যে আমরা ধর্মকর্ম করছি, দেবদেবীর পূজা করছি, ব্রত পালন করছি, সবকিছুই কিছু না কিছু পাওয়ার লোভে। আমাদের ধর্ম, আমাদের বিশ্বাস টিকে আছে স্বার্থসিদ্ধির গোপন আখাক্সক্ষার ওপর।
লোভ যে মানুষের চরিত্র, মন-মানসিকতা আমূল বদলে দিতে পারে, এটা আমার জন্যে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।
আস্তে-আস্তে যতোই লটারির ফলাফল ঘোষণার দিন ঘনিয়ে আসতো লাগলো ততোই আমাদের মানসিক শান্তি উবে যেতে লাগলো। সারাক্ষণ ঐ চিন্তায় শুধু মাথায় ঘোরে। মাঝেমাঝে নিজের ওপর আমার অকারণে রাগ হতে থাকলো যে, বিক্রম যদি আমাকে লটারির ভাগের টাকা না দেয় তাহলে আমি কী করবো! যদি সে অস্বীকার করে যে লটারিতে আমার কোনো ভাগ নেই, তাহলে? আমার কাছে তো কোনো সাক্ষীসাবুদ, প্রমাণপত্র কিছু নেই। সবকিছু নির্ভর করছে বিক্রমের মর্জির ওপর। ওর মনে যদি বদ মতলব থাকে তাহলেই সেরেছে! কিছুতেই আমি দাবি করতে পারবো না যে, লটারিতে আমারও ভাগ আছে। টুঁ শব্দও করতে পারবো না, করলেও কোনো লাভ হবে না। যদি তার মনে কুমতলব থাকে তাহলে সেটা এখনই বোঝা যাবে, আর যদি তা না থাকে তবে আমার সংকীর্ণতার কথা জানতে পেরে খুব আঘাত পাবে।
আমি জানি, বিক্রম মোটেও এরকম নয়; কিন্তু ধনদৌলত হাতে এলে ক’জনাই বা ঈমান ঠিক রাখতে পারে! এখনো তো টাকা হাতে আসে নি, ঈমানদার সাজতে অসুবিধে কী! পরীক্ষার সময় তো আসবে তখন,যখন দশলাখ টাকা হাতে আসবে। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, যদি টিকেট আমার নামে হতো, তাহলে আমি কি বিক্রম কে এতো সহজে পাঁচলাখ টাকা দিয়ে দিতাম? হয়তো বলতাম, ‘তুমি আমাকে পাঁচটাকা ধার দিয়েছিলে, তার বদলে দশটাকা নাও, একশো টাকা নাও, আর কী করবে!’
কিন্তু না, এরকম অমানুষ আমি হতে পারবো না।
পরদিন আমরা পত্রিকা দেখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বিক্রম বললো, ‘যদি সত্যি সত্যি এখন লটারির পুরস্কারটা আমাদের নামে ওঠে, তাহলে আমার আফসোস হবে এই ভেবে যে, কেন শুধু শধু তোমার সাথে মিলে টিকেট কিনলাম!’ মুচকি হেসে সরল ভাবে কথাটা সে বললো। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম, এটা তার মনের প্রকৃত ছবি, যা দুষ্টুমির আড়ালে লুকাতে চাইছে সে।
আমি চমকে উঠে বললাম, ‘সত্যি! কিন্তু এই একই রকম অনুভূতি তো আমারও হতে পারে!’
‘কিন্তু টিকেট তো আমার নামে নেওয়া হয়েছে।’
‘তাতে কী?’
‘মনে করো, তুমিও যে টিকেটর ভাগিদার সেটা আমি অস্বীকার করলাম!’
মেরুদন্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো আমার। দু’চোখে আঁধার দেখলাম।
‘কিন্তু আমি তোমাকে বদলোক মনে করি না,’ ফ্যাকাসে হেসে বললাম।
‘ঠিক, কিন্তু শয়তান সওয়ার হতে কতোক্ষণ! ভেবে দেখো, পাঁচলাখ! খুব কম টাকা নয় কিন্তু! মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট।’
‘তো ঠিক আছে, এখনো সময় আছে, লেখাজোকা করে নিলেই হয়! আর কোনো সংশয় থাকবে না।’
বিক্রম হেসে বললো,‘তুমি বড়ো সন্দেহ বাতিক লোক,দোস্ত। আমি তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম। আমি কি কখনো তোমাকে ধোঁকা দিতে পারি! পাঁচলাখ কেন, পাঁচকোটি টাকাও যদি হয়্, আমার মনে কখনো খারাপি আসবে না, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকো।’
(ক্রমশ...)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728614 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728614 2007-08-30 22:56:31
প্রেমচাঁদের গল্প--লটারি--২ মূল: মুনশি প্রেমচাঁদ
রূপান্তর(মূল হিন্দি থেকে): মোসতাকিম রাহী
....
আঙটিটা দশটাকার কম হবে না। অই টাকা দিয়ে সহজেই টিকেট কেনা যায়। যদি কোনোরকম খরচ ছাড়াই টিকেটের অর্ধেক ভাগ পাওয়া যায় তাহলে মন্দ কী! কিন্তু আমার মতলব বোধহয় টের পেয়ে গেলো বিক্রম। বললো,‘পাঁচটাকা তোমাকে টিকেট কেনার আগেই নগদ দিতে হবে। তা না হলে আমি কিন্তু নেই।’
ওর কথা শুনে আমার ভেতর ন্যায়বোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। বললাম,‘ এটা কিন্তু ঠিক হবে না, কেউ যদি বুঝতে পারে যে তুমি আঙটি বেচে দিয়েছো, তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! তোমার সাথে আমাকেও অপমানিত হতে হবে।’
শেষ পর্যন্ত স্থির হলো আমাদের পুরোনো পাঠ্যবই বিক্রি করে সেই টাকায় টিকেট কেনা হবে। এই মুহূর্তে লটারি কেনার চেয়ে দরকারি কাজ আর কিছু নেই। আমি আর বিক্রম একসাথে মেট্রিক পাস করেছি। কিন্তু যখন দেখলাম কষ্ট করে যারা লেখাপড়া করে ডিগ্রি হাসিল করছে, তাদের চেয়ে গন্ডমূর্খরা বেশ ভালো আছে, তখন দু’জনে লেখাপড়া বন্ধ করে দিলাম।
আমি যোগ দিলাম ইস্কুলের শিক্ষক হিসেবে আর বিক্রম গেরস্থালি করতে
লাগলো। আমাদের বইগুলো এখন উইয়ের খাদ্য হওয়া ছাড়া আর কোন্ কাজেই বা আসবে! গোলাঘরের এককোণে বইগুলো ফেলে রেখেছিলাম, বের করে সেগুলো ঝাড়ামোছা করে একটা বড়ো গাঁটরি বাঁধলাম দু’জনের গুলো মিলিয়ে। ইস্কুলমাস্টার হিসেবে সবাই আমাকে চেনে। তাই কোনো দোকানে গিয়ে বইগুলো বেচতে লজ্জা লাগছিলো। বাধ্য হয়ে বিক্রমকেই এই মহৎ কর্মটি সাধনের ভার দেওয়া হলো। আর সে মাত্র আধঘন্টার ভেতর দশটাকার একটা নোট হাতে নাচতে নাচতে আমার কাছে ফিরে এলো। এতো খুশি তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। বইগুলো যদিও চল্লিশটাকার কম হবে না, কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের কাছে মনে হচ্ছিলো দশটাকা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি। এই টাকায় অর্ধেক ভাগ পাওয়া যাবে টিকেটের। দশলাখ টাকার পুরস্কার। পাঁচলাখ আমার, পাঁচলাখ বিক্রমের। এই দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলাম আমরা দু’জন।

‘পাঁচলাখ কিন্তু কম টাকা নয়, বিক্রম,’ প্রসন্নচিত্তে ওকে বললাম।
বিক্রম আমার মতো খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলো না।
বললো, ‘পাঁচলাখ কেন, এই মুহূর্তে পাঁচশো টাকাও আমার জন্যে অনেক। কিন্তু বহুবছরের স্বপ্নÑপরিকল্পনা বাদ দেওয়া কি এতোই সোজা! তবুও প্রোগ্রাম বদলাতে হবে। লাইব্রেরি গড়ার পরিকল্পনা বাদ, কিন্তু বিশ্বভ্রমণ তো আমাকে করতেই হবে।’

আমি আপত্তি করলাম,‘তুমি দু’লাখ টাকায় তো তোমার বিশ্বভ্রমণ শেষ করতে পারো!’
‘জি না, ওটার জন্যে বাজেট হলো সাড়ে তিনলাখ টাকা। বছরে পঞ্চাশ হাজার করে সাত বছরের প্রোগ্রাম।’


প্রতিদিন ইস্কুল থেকে ফেরার পর আমরা দু’জন একসাথে বসে এভাবে আমাদের স্বপ্ন রচনা করতাম। কথা বলতাম নিচুস্বরে, যাতে কেউ আমাদের কথা শুনতে না পায়। কারণ লটারির টিকেট কেনার রহস্য আমরা গোপন রাাখতে চাইছিলাম। সত্যি সত্যি যদি লটারি লেগে যায় তাহলে লোকজন কী পরিমাণ অবাক হবে সেটা ভেবে ভীষণ আমোদ হতে লাগলো আমাদের। এখন সবাইকে টিকেট কেনার কথা বলে দিলে সেই মজাটা আর পাওয়া যাবে না।
একদিন প্রসঙ্গক্রমে বিয়ের কথা উঠলো। বিক্রম দার্শনিকের মতো ভাব নিয়ে গম্ভীরগলায় বললো,‘ভাই, এসব বিয়ে-শাদির যন্ত্রণা সহ্য করা আমার কম্মো নয়! মেয়েছেলে মানেই ঝামেলা! বউয়ের খাই মেটাতে মেটাতে জীবন শেষ হয়ে যাবে।’
আমি তার সাথে একমত হতে পারলাম না। বললাম,‘বিয়ের পর খরচ একটু বাড়বে তা ঠিক, কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত দুঃখ-কষ্টের ভাগ নেওয়ার জন্যে একজন সঙ্গিনী না আসে তাহলে জীবনের মজাইতো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমি বিয়ে-শাদির বিপক্ষে নই। হ্যাঁ, এটা অবশ্য ঠিক এমন একজন সাথি দরকার যে সারাজীবন সঙ্গে থাকবে। এমন সাথি একমাত্র স্ত্রী ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।’
বিক্রম খেপে গেলো আমার কথায়। ‘তুমি থাকো তোমার মতো! কুকুরের মতো বউয়ের পেছন-পেছন ঘোরো, আর বাচ্চাকাচ্চার ক্যাঁওম্যাঁও কে ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করে খুশিমনে জীবন যাপন করো। তোমাকে অভিনন্দন! আমি থাকবো স্বাধীন, মুক্তবিহঙ্গের মতো। যখন যেখানে মন চায় চলে যাবো, যা মন চায় করবো। ইচ্ছে হলো বাড়ি ফিরবো, নয়তো ফিরবো না। পাহারাদারের মতো সারাক্ষণ একজন খবরদারি করবে এটা আমি সহ্য করতে পারবো না। বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই জবাব চাইবে:‘কোন চুলোয় গিয়েছিলে এতোক্ষণ,অ্যাঁ?’ আর খুশিমনে হয়তো কোথাও যেতে বের হলাম তখন বাধা দিয়ে বলবে:‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে মিনসের শুনি!’ দুর্ভাগ্যক্রমে যদি সেও সঙ্গী হয়, তাহলে তো কেল্লাফতে, পানিতে ডুবে মরা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকবে না!
‘ভাই, তোমার প্রতি আমি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাতে পারছি না। বাচ্চার সামান্য সর্দি-কাশি হলে অস্থির হয়ে দৌড়ে যাও হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে। আর একটু বয়স হয়ে গেলে ছেলেরা মনেমনে চাইবে কখন তুমি পটল তুলছো, যাতে তারা ইচ্ছেমতো চলতে পারে। সুযোগ পেলে তোমাকে বিষ খাইয়ে মারবে, আর প্রচার করবে তোমার কলেরা হয়েছিলো। এই ঝামেলায় আমি নেই, ভাই।’

এমন সময় কুন্তি এলো। বিক্রমের ছোটো বোন। বছর এগারো হবে বয়স, ষষ্ঠশ্রেণিতে পড়ে, আর পরীক্ষায় নিয়মিত ফেল মারে। ভীষণ দুরন্ত আর বেয়াড়া মেয়ে। এতো জোরে সে দরোজা খুললো যে, চমকে গিয়ে আমরা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বিক্রম রেগে গিয়ে বললো,‘অ্যাই বুড়ি শয়তান, কে বলেছে তোকে এখানে আসতে, অ্যাঁ?’
গোয়েন্দা পুলিশের মতো কুন্তি ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বললো, ‘তোমরা সারাক্ষণ কেবাড় বন্ধ করে এই ঘরে করোটা কী? যখনই আসি দেখি এখানে বসে আছো। কোথাও ঘুরতে যাও না, আড্ডা দিতে যাও না। কী মন্ত্র জপতে থাকো সারাক্ষণ দু’জনে মিলে?’
বিক্রম কুন্তির ঘাড় চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো,‘হ্যাঁ, একটা মন্ত্র জপছি, যাতে তাড়াতাড়ি তোর জন্যে একটা বর পাওয়া যায়, যে তোকে প্রতিদিন গুনে গুনে পাঁচটি চাবুক মারবে।’
‘এমন স্বামীকে বিয়ে করতে আমার বয়েই গেছে,’ নাক ফুলিয়ে জবাব দিলো কুন্তি। ‘আমি এমন কাউকে বিয়ে করবো যে আমার সামনে সবসময় মাথা নিচু রাখবে। আমি যা বলবো তা-ই করবে,আমার কথার অবাধ্য হবে না। মা বলেছেন লটারির পুরস্কার থেকে তিনি আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবেন। ব্যস, ঐ টাকায় ফূর্তি করবো। আমি তো দুই বেলা ঠাকুরের কাছে মায়ের জন্যে প্রার্থনা করি। মা বলেছেন, কুমারী মেয়েদের প্রার্থনা কখনো নিষ্ফল হয় না। আমার মন বলছে মা অবশ্যই লটারির পুরস্কারটা পাবেন।’

কুন্তির কথা মিছে নয়। আমার মনে পড়লো একবার নানাবাড়ি গিয়েছিলাম গ্রামে। তীব্র দাবদাহে চারিদিক শুকিয়ে মরুভূমি প্রায়। সামান্য বৃষ্টির জন্যে হাহাকার করছে সবাই। তখন গ্রামের সবাই চাঁদা তুলে একটা ভোজের আয়োজন করে যতো কুমারী মেয়ে আছে সবাইকে নিমন্ত্রণ করলো। আর ঠিক তিনদিনের মাথায় নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। কুমারী মেয়েদের আশীর্বাদে যে কাজ হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
(ক্রমশ...)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728401 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728401 2007-08-29 12:30:29
প্রেমচাঁদের গল্প--লটারি--১ ........
সংক্ষেপে প্রেমচাঁদ: প্রেমচাঁদের আসল নাম ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম এই কথাশিল্পী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই অবিভক্ত ভারতের বারাণসী জেলার লমহী গ্রামে। উর্দু ভাষায় তাঁর সাহিত্যের হাতে খড়ি, তখন তিনি ‘নবাব রায়’ ছদ্মনামে লিখতেন। ১৯০৭ সালে যখন বৃটিশ সরকার কতৃক তাঁর ‘সজ-এ-বতন’ গল্প সংকলনটি নিষিদ্ধ করা হয়, এবং এর সবকগুলো কপি জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন থেকে তিনি ‘মুনশি প্রেমচাঁদ’ ছদ্মনামে লিখতে শুরু করেন এবং এই নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। অতি অল্প বয়সে প্রেমচাঁদের মা-বাবা মারা যান, ফলে শৈশব কাটে তাঁর দারুণ দারিদ্র্যের মাঝে। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন কৃতিত্বের সাথে। তারপর গ্রামের সরকারি স্কুলে মাসে ১৮ রুপি বেতনে চাকরি নেন। পরে সাব-ডেপুটি ইন্সপেক্টর হিসেবে শিক্ষা বিভাগে কাজ করেন। ১৯২১ সালে গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন। এরপর একটি ছাপাখানা খোলেন, এবং নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘হংস’ নামক সাহিত্য পত্রিকা।
সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতে তাঁর দৃপ্ত পদচারণা ছিলো- গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, চিত্রনাট্য কোনো কিছুই বাদ যায় নি। দুইযুগের সাহিত্যিক জীবনে লেখা প্রায় তিনশো ছোটো গল্প আট খন্ডে ‘মানসরোবর’ নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর তেরোটি উপন্যাসের মধ্যে ‘গো-দান’, ‘রঙ্গভূমি’, ‘সেবাসদন’, ‘কর্মভূমি’, ইত্যাদি বিখ্যাত।
প্রেমচাঁদ তাঁর গল্পে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করতেন। যে-কারণে চরিত্র অনুযায়ী উর্দু এবং ইংরেজি শব্দের ব্যবহার দেখা যায় তাঁর গল্পে। গি দ্য মপাসাঁ’র গল্পের মতোই সমাজের সবশ্রেণির, সব পেশার মানুুষের কথা উঠে এসেছে তাঁর গল্পে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায় তাঁর গল্প এবং উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
১৯৩৬ সালের ১৮ অক্টোবর পরলোক গমন করেন এই কালজয়ী সাহিত্যিক।
.........
তাড়াতাড়ি বড়োলোক হতে কে না চায়? আমাদের এখানে যখন প্রথম লটারির টিকেট বিক্রি শুরু হয় তখন আমার বন্ধু বিক্রমের বাবা-মা,চাচা এবং বড়ো ভাই প্রত্যেকে একটা করে টিকেট কেনে। কে জানে কার ভাগ্য খুলে যায়! কারো নামে যদি লটারি লাগে তো টাকাটা ঘরেই রইলো, এই ভেবে একাধিক টিকেট কেনা।
কিন্তু ব্যাপারটা বিক্রমের সহ্য হলো না। অন্যদের নামে লটারি উঠলে তার কী লাভ? খুব বেশি হলে পাঁচ-দশ হাজার টাকা তার হাতে ধরিয়ে দেবে, এই-ই তো! কিন্তু এতো অল্প টাকায় তার কী হবে! তার চায় অঢেল টাকা! জীবনের রঙ-রস উপভোগ করার অনেক স্বপ্ন তার, অনেক পরিকল্পনা আছে। সে সারা পৃথিবীত ঘুরে বেড়াতে চায়,একেবারে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত। পেরু, ব্রাজিল, টিম্বাকটু, হনলুলু এসব জায়গায় যাওয়ার খুব শখ তার। তাও কোথাও গিয়ে দু-একমাস থেকে ফিরে আসা নয়, যেখানেই যাবে লম্বা সময় সেখানে থেকে সেখানকার সংস্কৃতি, রীতি-নীতি পর্যবেক্ষণ করবে। কারণ, বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনযাপনের ওপর বৃহদাকার একটা বই লেখার ইচ্ছে আছে তার। বড়ো একটা লাইব্রেরি খোলার ইচ্ছেও তার আছে, যেখানে থাকবে পৃথিবীর বিখ্যাত সব লেখকের বই। প্রয়োজনে দু’লাখ টাকা খরচ করবে সে লাইব্রেরির জন্যে। বাংলো, গাড়ি আর ফার্নিচারের কথাতো বলাই বাহুল্য!
বাপ-চাচা কারো নামে লটারি লাগলে পাঁচ হাজারের বেশি পাওয়া যাবে না। মায়ের নামে যদি ওঠে হয়তো বিশ হাজার টাকা তিনি দেবেন। কিন্তু বড়ো ভায়ের নামে উঠলে যে এক কানা কড়িও পাওয়া যাবে না, এটা হলফ করে বলা যায়।
খুব অভিমান হলো বিক্রমের। নিজের বাপ-ভায়ের কাছ থেকেও সাহায্য কিংবা দান-খয়রাত হিসেবে কিছু নেওয়া তার কাছে অপমানজনক মনে হলো। কথায় আছে, কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে কুয়োর পানিতে ডুবে মরা অনেক ভালো। কেউ যদি সংসারে নিজের স্থান তৈরি করতে না পারে, তো সংসার ত্যাগ করা-ই তার উচিৎ।
বিক্রম বেকার মানুষ, লটারির টিকেট কেনার জন্যে কে ওকে টাকা দেবে! অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সে আমাকে বললো, ‘আচ্ছা আমরা দু’জনে মিলে লটারির টিকেট কিনলে কেমন হয়?’
ওর প্রস্তাব আমার পছন্দ হলো। আমি তখন একটা স্কুলে মাস্টারি করি। মাসে বিশ টাকা মাইনে পাই। কোনোমতে খেয়েপরে দিন যাপন করি। আমার মতো মানুষের দশটাকা খরচ করে লটারির টিকেট কেনা আর হাতি কেনা একই কথা। হ্যাঁ, লটারি পেয়ে গেলে সেই টাকা কোথাও খাটিয়ে কিংবা ব্যাংকে রেখে নিশ্চিন্তে খাওয়া-পরা চলতে পারে। মাসে চার হাজার টাকা যদি আসে, জনের ভাগে দুই হাজার করে মন্দ নয়। বিক্রমকে বললাম, ‘আমারতো মনে হয় দু’হাজার টাকায় তুমি আরামসে চলতে পারবে।
উত্তেজিত হয়ে বিক্রম বললো,‘ ভিখারির মতো আমি থাকতে পারবো না, আমি রাজার হালে থাকতে চাই।’
‘দু’হাজার টাকায় সেটা তুমি সহজেই পারো।’
‘কিন্তু তুমি তোমার হিস্যা থেকে আমাকে দু’লাখ টাকা না দিলে আমি তো লাইব্রেরি বানাতে পারবো না।’
‘এটাতো অপরিহার্য নয় যে, তোমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে লাইব্রেরি বানাতে হবে।’
‘আমার লাইব্রেরিকে অবশ্যই অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে।’
‘এটা তুমি দাবি করতে পারো। কিন্তু আমার ভাগের টাকা থেকে তোমাকে আমি কিছুই দিতে পারবো না। আমার প্রয়োজনটা দেখো, তোমাদের অনেক সয়-সম্পত্তি আছে। তোমার ওপর তেমন কোনো দায়িত্বও নেই। কিন্তু আমার ওপর পুরো সংসারের বোঝা। দুই বোনের বিয়ে দিতে হবে, ভাইদের লেখাপড়া করাতে হবে। একটা বাড়ি তৈরি করতে হবে। আমিতো টাকাগুলো সোজা ব্যাংকে রেখে দেবো। তা থেকে যা সুদ আসবে সেটা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেবো। এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেবো, যাতে আমার অবর্তমানে কেউ অই টাকায় হাত লাগাতে না পারে।’

বিক্রম সহানুভুতির সুরে বললো,‘ ঠিক বলেছো, এই অবস্থায় তোমার কাছ থেকে কিছু চাওয়াটা অন্যায়। যাক, আমিই কোনো একটা ব্যবস্থা করে নেবো। কিন্তু একটা ব্যাপার কি খেয়াল করেছো, ব্যাংকের সুদের হার তো আজকাল অনেক কমে গেছে।’

আমরা বেশ কয়েকটা ব্যাংকে গিয়ে তালাশ করলাম। আসলেই সুদের হার খুব কম দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। শতকরা দু’-আড়াই টাকা সুদে টাকা ফেলে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তারচেয়ে সুদে টাকা ঋণ দেওয়া শুরু করলে কেমন হয়? বিক্রমও সফরে যাবে না, দু’জন মিলে কারবার দাঁড় করে ফেলতে পারবো। কিছু অর্থ হাতে এসে গেলেই বিক্রম সফরে যাবে। লেনদেনের ব্যবসায় সুদও পাওয়া যাবে প্রচুর। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত কারো জন্যে বিশ্বস্ত জামানত পাওয়া না যাবে, তাকে ঋণ দেওয়া হবে না। সে যতো সম্মানী মানুষই হোক না কেন। অবশ্য এর চেয়ে সম্পত্তির দলিল দস্তাবেজ রেখে টাকা দিলে আরো ভালো হয়, কোনো খটকা থাকবে না।
যাক, টাকা খাটানোর রাস্তা তো ঠিক হলো। এখন টিকেটে কার নাম থাকবে সেটা হলো কথা। বিক্রমের নাম থাকবে, নাকি আমার? বিক্রম তার নাম,লেখানোর আগ্রহ দেখালো। যদি তার নাম না থাকে টিকেটই কিনবে না সে। কোনো উপায় না দেখে আমি মেনে নিলাম। কোনোরকম লেখাজোকা না করেই, যে-কারণে পরে আমার সমস্যা হয়েছিলো।

শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর গোনা, কবে টিকেট কিনবো! সকালে ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই আমার চোখ চলে যেতো ক্যালেন্ডারের পাতায়। বিক্রমের বাড়ি আর আমার বাড়ি ছিলো পাশাপাশি। স্কুলে যাওয়ার সব খরচ বাঁচিয়ে পাঁচটাকা কোনোরকমে যোগাড় করা যায়। তারপরও ভাবতাম, যদি কিছু বাড়তি টাকা অন্য কোনোভাবে জোগাড় করা যেতো তাহলে খুবই ভালো হতো!

বিক্রম বললো,‘আচ্ছা, আমার আঙটিটা বেচে দিলে কেমন হয়? বাড়িতে বলবো যে হারিয়ে গেছে!'
(ক্রমশ...)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728309 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28728309 2007-08-28 22:07:02
ঠাট্টা এখানেই থমকে দাঁড়াও।
জেনে নাও--
এজীবন যেপে কোনো লাভ নেই:
ফলাফল শূন্য!
পথের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখবে
যাপিত জীবনের পুরোটাই ছিলো ঠাট্টা!
তারচে' এই ভালো
এখানেই দু'জন থমকে দাঁড়াই
এখানেই যাই মরে;
মরে গিয়ে বেঁচে যাই
প্রগলভ এক ঠাট্টার হাত থেকে!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28727240 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28727240 2007-08-22 21:07:19
শামসুর রাহমানের মৃত্যুদিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি শামসুর রাহমান
----
যে-পথে হাঁটে না কোনো পথচারী, আমি অন্যমনে
সেখানে একাকী বসে ধূলিকণা নিয়ে
খেলা করি গোধূলিতে। মাঝে মাঝে হাওয়া জোরে বয়ে
খেলা পন্ড করে দিতে চায়।

বুনো ফুল, বুলবুল এবং ফড়িং কৌতূহলে
দ্যাখে ক্রীড়াপরায়ণ আমাকে, ইঙ্গিতে
জেনে নিতে চায়
বুঝি বা খেলার রীতিনীতি। যে-লোকটা এরকম
তন্ময়তা নিয়ে ধূলিকণা
হাতের তালুতে বেশ কোমল নাচাতে
পারে এই নিরালায় দর্শকবিহীন
সে কেমন মানুষ?তাদের
কাছে এই প্রশ্ন খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আমি
শুধু মুঠো মুঠো ধুলো চৌদিকে ছড়াই।

কে যেন আড়াল থেকে বেশ স্বপ্নময় কন্ঠস্বরে-
'একটু অপেক্ষা করো, জোনাকিরা জড়ো
হলে ঝোপেঝাড়ে অন্ধকারে,
তোমার হাতের এই ধূলিকণা কিছু জ্যোতির্ময় হয়ে
তুলবে ঝংকার চরাচরে;
থামিও না খেলা তুমি ভরসন্ধ্যেবেলা।'
২৭.১০.৯৪
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28726383 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28726383 2007-08-17 21:39:05
সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা বত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে, খুনিরা বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে আজো। রাজা যায় রাজা আসে, খুনিদের কিছুই হয় না। জাতির জনকের কুসন্তান শেখ হাসিনাও ক্ষমতায় ছিলেন, কিন্তু পাঁচ বছরেও বিচারকার্য সমাধা হয় নি।
প্রতি বছর পনেরো অগাস্ট আসে,
ক্ষোভে আমাদের বুক ফেটে যায়,
জলে আমাদের চোখ ভেসে যায়...
আমরা কাঁদি...
সকাতরে..
সকলে..
অক্ষম,অথর্ব আমরা, আমাদের ক্ষমা কোরো পিতা...




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28725893 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28725893 2007-08-15 13:09:59
মহাদেব সাহা'র কবিতা--মন ভালো নেই মন ভালো নেই;
ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা
সারাদিন ডাকি সাড়া নেই,
একবার ফিরেও চায় না কেউ
পথ ভুল করে চলে যায়,এদিকে আসে না
আমি কি সহস্র বর্ষ এভাবে
তাকিয়ে থাকব শূন্যতার দিকে?
এই শুন্য ঘরে, এই নির্বাসনে
কতোকাল,আর কতোকাল !
আজ দুঃখ ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি,
উদ্যানে উঠেছে ক্যাকটাস -
কেউ নেই, কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই,
শুধু শূণ্যতার এই দীর্ঘশাস, এই দীর্ঘ পদধনি।

টেলিফোন ঘোরাতে ঘোরাতে আমি ক্লান্ত
ডাকতে ডাকতে একশেষ;
কেউ ডাক শোনে না, কেউ ফিরে তাকায় না
এই হিমঘরে ভাঙ্গা চেয়ারে একা বসে আছি।

এ কী শাস্তি তুমি আমাকে দিচ্ছো ঈশর,
এভাবে দগ্ধ হওয়ার নাম কি বেঁচে থাকা !
তবু মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, আমি বেঁচে থাকতে চাই
আমি ভালোবাসতে চাই, পাগলের মতো
ভালোবাসতে চাই -
এই কি আমার অপরাধ !
আজ বিষাদ ছুঁয়েছে বুক, বিষাদ ছুঁয়েছে বুক
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই;
তোমার আসার কথা ছিলো, তোমার যাওয়ার
কথা ছিলো -
আসা-যাওয়ার পথের ধারে
ফুল ফোটানোর কথা ছিলো
সেসব কিছুই হলো না, কিছুই হলো না;
আমার ভেতরে শুধু এক কোটি বছর ধরে অশ্রুপাত
শুধু হাহাকার
শুধু শূন্যতা, শূন্যতা ।
তোমার শূন্য পথের দিকে তাকাতে তাকাতে
দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেলো,
সব নদীপথ বন্ধ হলো, তোমার সময় হলো না -
আজ সারাদিন বিষাদপর্ব,সারাদিন তুষারপাত...
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28725704 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28725704 2007-08-14 15:14:01
আহা জীবন!! আবুধাবি রাজধানী হলেও প্রায় সব ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান শাখা দুবাইয়ে, সেখান থেকে পরিচালিত হয় সমস্ত কাজ।
তো গেলাম, এবং টাকা জমা করে ফেরার পথে ভাবলাম কিছুক্ষণ পার্কে বসি। আরব সাগরের কোল ঘেঁষে দৃষ্টিনন্দন পঁয়তাল্লিশটা পার্ক বানিয়েছে আবুধাবি সিটি কর্পোরেশন। দুবাইয়ের মতো ঘিঞ্জি নয়, খোলামেলা বিশাল এলাকা নিয়ে। আমি যে-পার্কটির কথা বলছি সেটা সমুদ্রের কাছাকাছি হলেও নতুন নয়, অনেক পুরনো। অনেকগুলো খেজুর গাছ, একটা ফোয়ারা আর কয়েকটা বেঞ্চ ছাড়া আর তেমন কিছু নেই এটাতে। তারপরও এই ন্যাড়া পার্কটাতেই বসতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। বিশেষ করে দুপুরবেলা গনগনে গরমের ভেতর যখন তাপমাত্রা থাকে ৪০ এর ওপর। মন খারাপ থাকলে কিংবা, সদ্য আঠারোতে পা রাখা অস্থির মেয়েটার সাথে যখন খুব বেশি ঝগড়া হয়, তখন এখানে এসে বসে থাকি,আর নানা রঙের মানুষ দেখি।
আজ পার্কে ঢুকতেই একটা দৃশ্যে চোখ আটকে গেলো। খেজুর গাছের তলায় সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছেন বেশ কয়েকজন ক্লান্ত মানুষ। কনস্ট্রাকশন কোম্পানির কাজ চলছে ধারে কাছে কোথাও। দুপুরবেলা দু'ঘন্টার কর্মবিরতি, এই অল্পসময়ে শহরের বাইরে ক্যাম্পে গিয়ে খেয়ে ফিরে আসা প্রায় দুরূহ। তাই পার্কে বসেই নাকেমুখে অল্পকিছু গুঁজে দিয়ে অসহনীয় গরমের মধ্যে গাছ তলায় শুয়ে আছেন মানুষগুলো। পরিশ্রমের কাজ, সে-অনুযায়ী বেতন খুবই কম। তারপরও মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা'র মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের যেন অভাব স্পর্শ না করে, তাদেরকে চারদেয়ালের নিরাপদ সুশীতল আশ্রয়ে রাখার জন্যই অকল্পনীয় কষ্ট করে যাচ্ছেন এঁরা। এঁদের অনেকের্ই সুশোভন ঘরবাড়ি আছে, ছেলেমেয়েরা ভালো কাপড় পরে স্কুল-কলেজে যায়। দামি মোবাইলে বন্ধুদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে। ভালো রেস্তারাঁয় খেতে যায়। কিন্তু তারা কি জানে, কী অমানুষিক পরিশ্রম করে তাদের বাবা, তাদের ভাই টাকাগুলো পাঠাচ্ছেন তাদের জন্য?
হয়তো জানে, হয়তো জানে না!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28724883 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28724883 2007-08-09 16:25:07
আবুল হাসানের কবিতা -- ২ আবুল হাসান
-----------
দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর
সেখানে বুনবো আমি তিন সারি শুভ্র হাসি, ধৃতপঞ্চইন্দ্রিয়ের
সাক্ষাৎ আনন্দময়ী একগুচ্ছ নারী তারা কুয়াশার মতো ফের একপলক
তাকাবে এবং বোলবে,‘তুমি না হোমার? অন্ধ কবি ছিলে? তবে কেন হলে
চক্ষুষ্মান এমন কৃষক আজ? বলি কী সংবাদ হে মর্মাহত রাজা?
এখানে আঁধার পাওয়া যায়? এখানে কি শিশু নারী কোলাহল আছে?
রূপশালী ধানের ধারণা আছে? এখানে কি মানুষেরা সমিতিতে মালা
পেয়ে খুশী?


গ্রীসের নারীরা খুব সুন্দরের সর্বনাশ ছিলো। তারা কত যে উল্লুক!
ঊরুভুরুশরীর দেখিয়ে এক অস্থির কুমারী কত সুপুরুষ যোদ্ধাকে
তো খেলো!
আমার বুকের কাছে তাদেরও দুঃখ আছে, পূর্বজন্ম পরাজয় আছে
কিন্তু কবি তোমার কিসের দুঃখ? কিসের এ হিরন্ময় কৃষকতা আছে?
মাটির ভিতরে তুমি সুগোপন একটি স্বদেশ রেখে কেন কাঁদো
বৃক্ষ রেখে কেন কাঁদো? বীজ রেখে কেন কাঁদো? কেন তুমি কাঁদো?
নাকি এক অদেখা শিকড় যার শিকড়ত্ব নেই তাকে দেখে তুমি ভীত আজ?
ভীত আজ তোমার মানুষ বৃক্ষশিশু প্রেম নারী আর নগরের নাগরিক ভূমা?

বুঝি তাই দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও তুমি অনাবাদী রাখবে না আর
এম্ফিথিয়েটার থেকে ফিরে এসে উষ্ণ চাষে হারাবে নিজেকে, বলবে
ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি
পুনর্বার আমাকে হোমার করো, সুনীতিমূলক এক থরোথরো দুঃখের
জমিন আমি চাষ করি এদেশের অকর্ষিত অমা!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28724160 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28724160 2007-08-04 15:25:37
আবুল হাসানের কবিতা - ১ আবুল হাসান
-----------
প্রথম প্রকাশ: বিচিত্রা--ডিসেম্বর ১৯৭৫
---------
যেখানেই যাই আমি সেখানেই রাত!

স্টেডিয়ামে খোলা আকাশের নিচে রেস্তোরাঁয়
অসীমা যেখানে তার অত নীল চোখের ভিতর
ধরেছে নিটোল দিন নিটোল দুপুর
সেখানে গেলেও তবু আমার কেবলই রাত
আমার কেবলই শুধু রাত হয়ে যায়!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723976 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723976 2007-08-03 01:28:49
রম্যগল্প-রামসিংহের ট্রেনিং *******
সংক্ষেপে হরিশংকর পরসাঈ:
রম্যলেখক হিসেবে হিন্দি সাহিত্যে হরিশংকর পরসাঈ
একটি পরিচিত নাম। জন্মগ্রহণ করেন ১৯২২ সালের ২২ অগাস্ট, ভারতের মধ্য প্রদেশের হোশঙ্গাবাদে। নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে কিছুদিন বনবিভাগে চাকরি এবং অধ্যাপনা করেন, কিন্তু কোনোটাতেই মন বসাতে না পেরে ১৯৫২ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণোদ্যমে লেখালেখি শুরু করেন। স্থায়ীভাবে আস্তানা গাড়েন জবলপুরে এসে। সেখানেই ’৫৬ সালে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘বসুধা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা। কিন্তু আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে বেশিদিন চালাতে পারেন নি পত্রিকাটি, মাত্র দু’-বছরের মাথায় ’৫৮ সালে ‘বসুধা’র অকালমৃত্যু ঘটে। ‘বিকলাঙ্গ্ শ্রদ্ধা কি দৌর’ বইয়ের জন্যে হরিশংকর ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে জবলপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে ডি লিট উপাধিও দেওয়া হয়।
প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহÑ ‘হাঁসতে হ্যায়, রোতে হ্যায়’, ‘ভূত কে পাঁও পিছে’, তব্ কি বাত অউর থি’, য্যায়সে উনকে দিন ফিরে’, ‘বৈষ্ণব কি ফিসলান’, ‘শিকায়াত মুঝে ভি হ্যায়’, ‘আপনি-আপনি বিমারি’, ‘ঠিঠুরতা হুয়া গণ্তন্ত্র’, ‘নিঠল্লে কি ডায়েরি’, ‘মেরি শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গ রচ্নায়েঁ’, বোল্তি রেখায়েঁ’, ‘এক লেড়কি পাঁচ দিওয়ানে’, ‘অউর অন্ত্ মেঁ’,‘নট্ কি খোজ’, ‘মাটি কহে কুমহার সে’, ‘পাখন্ড্ অধ্যাত্ম’, ‘সুনো ভাই সাধো’, ‘বিকলাঙ্গ্ শ্রদ্ধা কি দৌর’। এছাড়া ছয়খন্ডে প্রকাশিত ‘পরসাঈ রচনাবলী’ ।
মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৫ সালের ১০ অগাস্ট।
*******
প্রতিদিন সন্ধ্যায় রামসিংহ আমার কাছে আসে। মুখোমুখি বসে ঘন্টাখানেক গালিগালাজ করে ফিরে যায়।
পড়শিরা হতবাক ওর এই কান্ডে। আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘ লোকটা কি পাগল হয়ে গেল নাকি?’
‘না,’ উত্তর দেই আমি।
তখন তারা আমাকে পরামর্শ দেয় রামসিংহকে কষে একটা ধোলাই দেওয়ার জন্যে, আর তাতে যদি আমার আপত্তি থাকে, তাহলে ব্যাপারটা যেন তাদের ওপর ছেড়ে দেই Ñ প্রতিবেশীর দায়িত্ত্ব হিসেবে এই মহৎ কাজটি তারা সানন্দেই করবে।
কোনো জবাব না দিয়ে আমি হাসি।
তখন তারা মনে মনে আমাকে পাগল না কি কাপুরুষ ভাববে সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে।
রামসিংহ শুধু গালাগালি করেই ক্ষান্ত হয় না। একরাতে সে আমার বাড়িতে গাঁজার কয়েকটা পোটলা রেখে যায়। পরদিন সকালে এসে সে আমাকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য রাখার দায়ে। হাতকড়ার বদলে রুমাল দিয়ে আমার হাতজোড়া বাঁধে।
রামসিংহকে আমি ছোটো ভাইয়ের মতোই আদর করি। নিজেকে যোগ্য করে তোলার তার এই প্রচেষ্টা দেখে আমি খুশি না হয়ে পারি না। খুব দ্রুত রামসিংহ কাজ শিখে নিচ্ছে, বোঝা যায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে সে উন্নতি করতে পারবে।
আট-দশ দিন আগের কথা। রামসিংহের বড়ো ভাই হনুমান সিংহ বিষম হতাশ আর মনমরা হয়ে আমার কাছে আসে। বলে, ‘তুমি জানো, হরিশংকর, আমার ছোটো ভাই রামসিংহ ছুটিতে এসেছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে গেছে। পুরো বাড়িটাকে সে মাথায় তুলে রেখেছে। ঘরের দরোজা বন্ধ করে সে নিজে নিজে চিৎকার-চেঁচামেচি আর খিস্তি -খেউর করে। একদিন খিড়কির ফুটো দিয়ে আমি দেখলাম, আমাদের পূর্বপুরুষ আর রাজনীতিবিদদের যে-ছবি দেয়ালে টাঙানো আছে, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে সে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে।’
‘একদিন আমি আমার ছেলে মুন্নাকে পড়াতে রামসিংহকে বলে বাইরে চলে যাই। যখন বাড়ি ফিরে এলাম, তখন আমার বড়ো মেয়ে আমাকে বললো, ‘বাবা, রামসিংহ কাকার কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি? তুমি বাইরে চলে যাওয়ার পর মুন্না পড়া ছেড়ে উঠে বাইরে খেলতে চলে যায়। যখন সে ফিরে এলো তখন কাকা মুন্নাকে বললেন, ‘এই মুন্না, জলদি একআনা দে, নয়তো দাদাকে বলে তোকে মার খাওয়াবো।’ আমরা হাসাহাসি করতে করতে মুন্নাকে একআনা দিয়ে বললাম কাকাকে দিয়ে আসার জন্যে। হা ভগবান, উনি ঐ একআনা নিয়ে পকেটে রেখে দিলেন!’
‘রামসিংহ আজকাল উদ্ভট সব কান্ড করে বেড়াচ্ছে। ছোটো বাচ্চাদের পানি আনার জন্যে হুকুম দেয়, আর একটু দেরি হলেই চিল্লাতে শুরু করেÑ ‘জলদি পানি নিয়ে আয়, ভেবেছিস কী, অ্যাঁ? সাত বছরের জন্যে চোদ্দশিকের ভেতর ঢুকিয়ে দেবো।’ দোস্ত, আমি এখন কী করি, বলোতো? ওকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে হেসে বলে, ‘আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে, দাদা, অতো দুশ্চিন্তা কোরো না।’ ভাই, আমার মনে হয়, তার মাথা পুরোটাই খারাপ হয়ে গেছে।’

রামসিংহকে আমি ছোটোবেলা থেকেই চিনি। খুবই সৎ, ভদ্র এবং বিনয়ী ছেলে সে। আর একারণে ব্যাপারটা মেলাতে পারছিলাম না।
পরদিন রাস্তায় তার সাথে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপার কী, রামসিংহ, এসব কী শুনছি?’
সে বললো, ‘বুঝতে পারছি, হরিদা, দাদা আপনার কাছে এসে অভিযোগ করেছে। আসলে কেউ আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছে না। আমি সবাইকে বলছি, একটা মাস আমাকে সময় দাও। আমার মাথা পুরোপুরি ঠিক আছে, আমি পাগল হই নি।’
আমি বললাম, ‘তো তুই এসব উদ্ভট কাজ কেন করে বেড়াচ্ছিস?’
উত্তরে সে যে-গল্পটা আমাকে শোনালো, সেটা হুবহু তার ভাষাতেই এখানে উদ্ধৃত করছিÑ
‘হরিদা, আমি তখন সবে পুলিশে জয়েন করেছি। নতুন ইন্সপেক্টর। মনে তখন সততা, ন্যায়পরায়ণতা আর মানুষের সেবা করার চিন্তা। একজন সৎ, আদর্শ পুলিশ অফিসার হওয়ার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একদিন সকালে পাশের গ্রামের একটা ছেলে এসে রিপোর্ট করলো, রাতের বেলা তাদের বাড়িতে চুরি হয়েছে। আমি খোঁজখবর করার জন্যে তাড়াতাড়ি সেখানে গেলাম।
‘ওদের বাড়ির উঠোনে একটা বুড়ো লোক মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলো। আমাকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে, ভীতস্বরে বললো, ‘দারোগা সাহেব, আপনি!’ উঠোনে একটা ছোটো খাট রাখা ছিলো, আমি গিয়ে সেটাতে বসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলামÑ ‘বাবা, আপনার ঘরেই কি চুরি হয়েছে?’
‘কিছু না বলে লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, চুরি কি আপনার এখানে হয়েছে?’ সে বললো, ‘আমাকে বলছেন, হুজুর?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি।’ তখন বুড়ো বললো, ‘কিন্তু দারোগা সাহেব, আমার নাম তো ‘অ্যাই শালা বুড়ো’, ‘বাবা’ তো আমার নাম নয়।’
আমি বুড়োর কথা কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি আবারো জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, চুরি কবে হয়েছে?’ বুড়ো উত্তর না দিয়ে চুপ মেরে রইলো। আমি আবার জিজ্ঞেস করতেই বুড়ো হাত জোড় করে বললো, ‘ভুল হয়ে গেছে, হুজুর। ছেলেটা অবুঝ। আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম, এই ফাঁকে ছেলেটা রিপোর্ট করতে চলে গেছে। আমি থাকলে কিছুতেই রিপোর্ট করতাম না, আর আপনাকেও কষ্ট করে এখানে আসতে হতো না। ছেলেটার বয়স কম, না বুঝে রিপোর্ট করেছে, ওকে মাফ করে দিন, হুজুর।’
‘আমি ফাঁপরে পড়ে গেলাম। এই লোক বলছেটা কী? তাকে বললাম, ‘আপনি তো বড়ো আজব কথা বলছেন। চুরি হলেতো রিপোর্ট অবশ্যই করতে হবে। আমরা পুলিশেরা আছি কী জন্যে? আমাদের দায়িত্বই তো চোরদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া, আর আপনাদের চুরি যাওয়া মাল উদ্ধার করা। এবার বলুন, কখন চুরি হয়েছে, আর কী কী জিনিস খোয়া গেছে!’
বুড়ো আবারও চুপ মেরে গেল। অসহায় দৃষ্টিতে সমবেত লোকজনের দিকে তাকাতে লাগলো। বুড়োর ছেলে একটা গেলাসে করে দুধ এনে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো। আমি নিতে না চাইলে বুড়ো বললো, ‘নিন হুজুর, আমার পোষা গাইয়ের দুধ।’ আমি বললাম, ‘না না, এখন আমি ডিউটিতে আছি। আপনার কাছ থেকে কিছুই আমি খেতে পারবো না, এমনকি এক টুকরো সুপারিও না।’
আমি দেখলাম সমবেত লোকজন খুবই অবাক হয়ে গেলো আমার কথায়। বড়ো বড়ো চোখ করে তারা আমাকে দেখতে লাগলো। আমার প্রতিটি কথায় ওরা চমকে উঠছিলো, আর ফিসফাস করে কী সব বলছিলো একে অপরকে।
আমি বুড়োকে বললাম, ‘বাবা, আপনিও খাটে এসে বসুন আমার পাশে। মুরুব্বি মানুষ, দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন?’
‘এইকথা শুনে বুড়ো ভয় পেয়ে দু’পা পিছিয়ে গেলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে কানে কানে কী যেন বললো। আমি খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। ওরা এতো ভয় পাচ্ছে কেন? আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ওরা কানাকানি করেই চলেছে। একটু পর বুড়ো জেব থেকে কিছু টাকা বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, ‘হুজুর, আমি মানছি আমাদের ভুল হয়ে গেছে। ছেলেটার বয়স কম, না বুঝে রিপোর্ট করেছে। আমি হলে জীবনেও রিপোর্ট করতাম না। আমি জানি, আপনার অনেক কষ্ট হয়েছে, অনেক জরুরি কাজ ফেলে আপনি ছুটে এসেছেন। আপনার সময়ের মূল্য আছে, এই পঞ্চাশটা টাকা রাখুন। ছেলেটাকে মাফ করে দিন, ভবিষ্যতে এরকম ভুল আর কোনোদিন হবে না।’
‘আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম ওর কথা শুনে। কিছুক্ষণ গুম মেরে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘দেখুন, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হয় আপনি একটা পাগল, নয়তো আমি স্বপ্ন দেখছি। আমি কেন টাকা নেবো? সরকার আমাকে বেতন দিচ্ছে আমার কাজের জন্যে। এর বাইরে কারো কাছ থেকে একটা পয়সা নেওয়াও আমার জন্যে হারাম।’
বুড়োর প্রতিক্রিয়া হলো দেখার মতন। দেখলাম ভয়ের ছায়া সরে গিয়ে তার চেহারায় কঠোর একটা ভাব ফুটে উঠছে। উপস্থিত গাঁয়ের লোকজনদের দিকে তাকিয়ে সে বললো, ‘ কী, এখনো তোমাদের সন্দেহ আছে?’
সমস্বরে লোকজন জবাব দিলো, ‘না!’
তখন বুড়ো সবাইকে হুকুম করলো, ‘তবে আর হাঁ করে দেখছো কী, বাঁধো শালাকে!’
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকজন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হাত-পা বেঁধে ফেললো দড়ি দিয়ে। এরপর বুড়ো একটা লোকের দিকে ফিরে বললো,‘যা, থানায় গিয়ে ইন্সপেক্টর সাহেবকে বল, এক জোচ্চোর-ডাকাত পুলিশের উর্দি পরে ধোঁকা দিতে এসেছিলো আমাদের। বুঝতে পেরে আমরা তাকে বন্দি করেছি।’
‘মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার। চিৎকার করে বললাম, ‘আমি ঠগবাজ নই। আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর।’
‘তুই মোটেও পুলিশ ইন্সপেক্টর নস। এই পোশাক তুই চুরি করেছিস, আর পুলিশ সেজে এসেছিস আমাদের ধোঁকা দেওয়ার জন্যে। কিন্তু বাছা, আমাকে ধোঁকা দেওয়া এতো সহজ নয়। তুই কি ভেবেছিস আমি কোনোদিন পুলিশ দেখি নি, অ্যাঁ? পুলিশের লোক দেখতে দেখতে বুড়ো হয়ে গেলাম। পুলিশ কখনো তোর মতো সুন্দর ব্যবহার করে না। তুই একটা ঠগবাজ।’
‘আমি জানতে চাইলাম, ‘কেন তোমার সন্দেহ হলো যে, আমি পুলিশ নই?’
বুড়ো উত্তর দিলো, ‘তোর মধ্যে সাচ্চা পুলিশ অফিসারের কোনো লক্ষণই নেই। পুলিশ অফিসার দেখতে দেখতে আমি চুল পাকিয়ে ফেললাম। কেউ আমাকে ‘অ্যাই শালা বুড়ো’ ছাড়া কোনোদিন সম্বোধন করে নি। আমার তো তখনই সন্দেহ হয়েছে, যখন তুই আমাকে আদর করে ‘বাবা’ বললি। এরপর আমার ছেলে যখন দুধ নিয়ে এলো, তুই খেলি না। আমার দেওয়া টাকাও নিতে চাইলি না। কোনো পুলিশ অফিসার এরকম করবে না। আমরাতো কখনো চুরির রিপোর্টই করি না, পুলিশ আসবে এই ভয়ে। পুলিশ আসলেই বিরক্ত করে মারবে, টাকা চাইবে, মারধোর করবে। আর তুই বলছিস কি না এক পয়সাও নিবি না, উল্টো চোর খুঁজে বের করে শাস্তি দিবি! এরকম পুলিশ অফিসার তো আমি আমার বাপের জন্মেও দেখি নি। তুই অবশ্যই একটা জোচ্চোর-ধোঁকাবাজ। কিন্তু বাছা, কম্মো কাবার করতে পারলি না, তার আগেই ধরা পড়ে গেলি এই বুড়োর চোখে। এবার আসল পুলিশ অফিসার আসছে থানা থেকে। পাঁচ-দশ বছরের সাজাভোগ করার জন্যে তৈরি হয়ে যা।’
‘বুঝলেন, হরিদা, এরপর বিকেল পর্যন্ত আমি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওখানে পড়ে রইলাম। সন্ধে হওয়ার আগেই আমার এক সহকর্মী ইন্সপেক্টর এলো থানা থেকে। এসেই সে বুড়োর চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে শুরু করলো। বুড়োকে বললো, ‘কিরে শালা বুড়োর বাচ্চা, ওনাকে বেঁধে রেখেছিস কেন?’
গালি শুনে বুড়োর চেহারায় স্বস্তির ভাব ফুটে উঠলো। বললো, ‘এ কথাটাই আমি এই ঠগবাজ লোকটাকে বলছিলাম।’ এরপর আমার দিকে ফিরে বললো, ‘দেখেছিস, পুলিশ অফিসার এরকমই হয়, হুজুরের মতো। আর তুই কিনা ‘বাবা বাবা’ করছিলি!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রামসিংহ তার গল্প শেষ করলো। বললো, ‘এই দুরবস্থার পর আমি বুঝতে পারলাম, হরিদা, আমার ট্রেনিঙ অপূর্ণ রয়ে গেছে। পুলিশের উর্দি পরা অবস্থাতেও সাধারণ লোকজন আমাকে পুলিশ মানতে নারাজ। সবাই মনে করে আমি ঠগবাজ। তাই একমাসের ছুটি নিয়ে আমি বাড়ি চলে এসেছি, আমার ট্রেনিঙ পুরো করার জন্যে।’
আমি তাকে বললাম, ‘রামসিংহ, আমাদের বড়োই দুর্ভাগ্য যে, তোর-আমার দু’জনেরই পিতা এই ভবসংসার ছেড়ে চলে গেছেন। নইলে তাদের ওপর তুই প্র্যাকটিস করে দু-চারদিনের মধ্যে তোর অসমাপ্ত ট্রেনিঙ শেষ করতে পারতি। যাক, তা যখন হওয়ার নয়, এখন আমি আছি, তুই আমার ওপর প্র্যাকটিস চালিয়ে যা। তোর উপকারে আসতে পারলে আমি খুশিই হবো।’
এরপর থেকে রামসিংহ প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে এসে আমাকে গালাগালি করে, আর আমি হাসিমুখে তা হজম করি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723920 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723920 2007-08-02 18:28:18
জিজীবিষা সবকিছু নিরর্থক মনে হয় তুমি না থাকলে!
তোমার একটুখানি শূন্যতায়
ভরা জ্যোৎস্না পানসে হয়ে যায়,
সৌন্দর্য হারায় শীতের সকাল;
নিদারুণ দৈন্যতায় ভরে ওঠে এই কবির গৃহখানি!
দুঃখ-কষ্টে ভরা এই জীবনে জড়িয়ে আছো বলেই
পথের শেষটুকু দেখার দুঃসাহস করতে সাধ জাগে!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723892 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723892 2007-08-02 15:33:55
কাজী আনোয়ার হোসেনের গল্প (২) কাজী আনোয়ার হোসেন
----------------------

৬.বড়মামার গাড়ির টানা হর্ন শুনে বুক কাঁপতে শুরু করল মিতার। দোয়া-দরুদ পড়ে ফুঁ দিল বুকে, যাতে ভেঙে পড়ে সবার সামনে বেইজ্জত না হয়। গেটে এসে থামল গাড়ি। ওই তো, নামছে আজিম! সেই ঋজু, সুঠাম দেহ, চিতানো বুক, ব্যাকব্রাশ করা চুল; সেই স্বতঃস্ফূর্ত, উজ্জ্বল হাসি। আর পাশেÑওহ্, ভারী মিষ্টি তো মেয়েটা!Ñঠিক যেন ফুটফুটে এক লালপরী। বয়সটা যদিও একটু কমÑটেনেটুনে বড়জোর সতেরো হবে। কমনীয় চেহারাটা টুকটুকে লাল কাতান শাড়িতে কেবল সুন্দর না, অপূর্ব সুন্দর লাগছে দেখতে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল মিতার নিজেরই অজাšে-। চট্ করে ঘাড় ফিরিয়ে চাইলেন বড়খালা। মনটা শক্ত করল মিতা। দায়িত্বের কথা মনে পড়ল ওর। আজিম তখন মামা-খালুদের সালাম করে পরিচিতদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। মিষ্টি হাসি মুখে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ওর বউ। মুখ নাড়া দেখে কেন যেন মনে হলো আজিম জিজ্ঞেস করল: মিতা কই? মিতা আসেনি? তারপর হাতের ইশারায় এগোতে বলল বউকে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে মিতার, গরম ভাপ বেরোতে চাইছে দুই গাল আর কান দিয়ে। ও জানে না, ওর হিংসে করবার কোন কারণই নেই: ওর ফরসা গালের লালচে আভা, কোমর ছাড়িয়ে নেমে যাওয়া মেঘবরণ চুল, আর কাজল-কালো আয়ত চোখ এ-মুহূর্তে ওকে নববধূর চেয়ে অনেক-অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এগিয়ে আসছে আজিম বউ নিয়ে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়তে চাইছে ওদের ওপর। কী যেন বলল আজিম, হো-হো করে হেসে উঠল সবাই। খালা-খালুরা হাসছে, হাসছে মামা-মামীরাও, হেসে গড়িয়ে পড়ছে ছোটদের দল। কে যেন বলল, ‘একদম মায়ের চেহারা!’ এখনি খোঁজ পড়বে শরবতের। রান্নাঘরের দিকে ছুটল মিতা। সাদামাঠা শাড়ি পরে চলে এসেছে ও, লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে ভাবতে যে, একটু পরেই ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে আজিম ওর বউকে। হাসবে মেয়েটা মেকাপবিহীন মিতার গ্রাম্যতা দেখে। হাসুক, সাধারণ এক স্কুল টিচার আর কত ভাল কাপড় পরবে। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে আজিমের গমগমে গলা শুনতে পেল মিতা, ‘মিতা কোথায়? মিতাকে দেখছি না যে! মিতা গেল কোথায়?’ কে কী উত্তর দিল শোনার জন্য অপেক্ষা না করে হাঁটবার গতি বাড়িয়ে দিল মিতা। দৌড়ে পালিয়ে এলো রান্নাঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে। ওখানে অলক আর রুবিকে দেখে বলল, ‘আমি শরবত গুলাচ্ছি, তোমরা কলটা ছেড়ে দিয়ে ট্রে-র গাসগুলো ভরে নিয়ে ছুট দাও, ঠিকাছে? দেখো, কেউ যেন বাদ না পড়ে।’ ছুটল ওরা ট্রে-ভর্তি শরবতের গাস নিয়ে। টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শরবত গুলাতে গুলাতে আরও কয়েকবার আজিমের গলা শুনতে পেল মিতা। ‘মিতা গেল কই? কোথায় মিতা?’ ক্রমেই কাছে চলে আসছে গলাটা। কোথাও লুকাতে পারলে হতো, ভাবছে মিতা। কিন্তু তার আগেই দেখল নীল জিন্স পরা একজোড়া পা ব্য¯- ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে রান্নাঘরের দিকে।

৭. মাথা নিচু করে ঢুকল আজিম রান্নাঘরের মেয়েলি-সাইজ দরজা দিয়ে। টুলের ওপর দাঁড়ানো মিতাকে দেখল আপাদম¯-ক। একগাল হেসে বলল, ‘কি ব্যাপার, মিতা? সারা বাড়ি খুঁজে কোত্থাও পাচ্ছি না তোমাকে! শেষে নানু বলল: দেখ্ গিয়ে, রান্নাঘরে থাকতে পারে। আমি এলাম, খুঁজে মরছি তোমাকে, আর এখানে লুকিয়ে রয়েছ তুমি?’ ‘লুকিয়ে কোথায়?’ বলল মিতা। ‘আমি তো সম্বর্ধনার কাজে ব্য¯-!’ আরেক টুকরো বরফ ড্রামে ফেলবে কি না ভাবছিল ও, কথা বলতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ে গেল ওটা ড্রামে। ‘এইয-যাহ্! আজিম ভাই, এতবড় বরফের চাঁই তো পানসে করে দেবে শরবত!’ বরফ তুলতে গিয়ে মিতার গায়ে ছিটকে এলো শরবত। হা-হা করে হেসে উঠল আজিম। ‘তোমার হাতের তৈরি শরবত, কিচ্ছু ভেবো না, মিষ্টিই থাকবে।’ এই বলে রুমাল বের করে সোৎসাহে মুছিয়ে দিল ও মিতার হাত, শাড়ি, কপাল। হঠাৎ মিতার চোখে চোখ পড়ল আজিমের। চট্ করে হাতটা ছেড়ে দিয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে হাসল ও। ‘তোমার চিঠি পেয়েছি,’ টুল থেকে নেমে বলল মিতা। ‘কী বলতে চেয়েছিলে বুঝতে পেরেছি। সত্যিই, দারুণ! অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটা!’ ‘সত্যিই! তাই না?’ বলল আজিম। ‘যেমন দেখতে, তেমনি ওর ব্যবহার, চালচলন। ঠিক যেন মাঝবয়েসী গিন্নি একটা। আমি পাকশি আসছি শুনে কিছুতেই ছাড়ল না। এখন চুটিয়ে গল্প করছে নানীদের সঙ্গে। কিন্তুÑহোয়াট ডু ইউ মীন বাই বুঝতে পেরেছি? কী বুঝতে পেরেছ? তুমি জানতে তোমার জন্যে কী নিয়ে ছুটে আসছি আমি ঢাকা থেকে?’ ‘ছুটে আসছ...আমার জন্যে! মানে?’ ‘অনেক ভেবে দেখলাম, মিতা। মাঝে হাসপাতালে ছিলাম বেশ কিছুদিন। এতদিন ভেবেছিলাম আমাদের সম্পর্কটা বুঝি শুধুই বন্ধুত্বের, কিন্তু হাসপাতালের বেডে শুয়ে-শুয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম, তোমাকে আমার চাই-ই চাই। বুঝে গেছি, তোমাকে ছাড়া সত্যিই আমি বাঁচব না, মিতা।’ কিন্তু ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে, বিয়ে করে বসেছে একটা কচি মেয়েকে। মিতা বুঝতে পারছে আজিমের মনের অবস্থাটা। যখন পরিষ্কার বুঝল সব, তখন দেরি হয়ে গেছে অনেক। আজিমের একটা হাত ধরল মিতা। নরম চোখে চাইল ওর চোখে। বলল, ‘এসব কথা থাক, আজিম ভাই। আর কখনও উচ্চারণ কোরো না একথা। আমিও কি ছাই জানতাম তুমি আমার কী ছিলে? এখন মন থেকে ঝেড়ে ফেলো সব স্মৃতি। সব এখন অতীত। ভুলেও ভেবো না আর, কী হতে পারত। তুমিÑ’ ‘এসব কী বলছ তুমি, মিতা?’ তাজ্জব হয়ে গেছে আজিম। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ওর হাসিখুশি মুখটা। ‘বলছি, বিয়ের পর এসব নিয়ে আর ভাবতে নেই।’ এতক্ষণে হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আজিমের মুখ। বলল, ‘অ্যাঁ? বিয়ের পর মানে? কে বলেছে আমি বিয়ে করেছি? তুমিও বুঝি তাই বিশ্বাস করেছ?’ ‘কেন? করোনি বিয়ে?’ দিশেহারা মিতার চেহারা। হাসি আসছে, কিন্তু মিতার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মন খুলে হাসতেও পারছে না আজিম। বলল, ‘মউ? মউয়ের কথা বলছ? ও তো আমার আপন ভাগ্নী!’ ‘কী বললে?’ ‘তাই তো! সঙ্গে মউকে নিয়ে আসছি বলায় নানু শুনেছে বউকে নিয়ে আসছি। ও হলো শাš-া আপুর মেয়ে, এসএসসি দিয়ে বসে ছিল, চেপে ধরল মামার সঙ্গে ও-ও যাবে ওর মা’র নানীবাড়ি। গেটের কাছে সবার ভুল ভেঙে দেওয়ায় কি রকম হাসির হুলোড় উঠলÑতুমি শোনোনি?’ শুনেছে, কিন্তু বুঝতে পারেনি মিতা। হঠাৎ করে বড্ডো দুর্বল বোধ করছে, অবশ লাগছে শরীরটা। আজিমের চোখে চোখ রেখেই নামিয়ে নিল দৃষ্টি। ওর চিবুক ধরে মুখটা উঁচু করল আজিম, কিন্তু চোখ তুলল না মিতা। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী এনেছ আমার জন্যে?’ পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল আজিম, লাজুক ভঙ্গিতে হাসছে। বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল বড়সড় হীরে বসানো ঝকঝকে একটা সোনার আংটি। ওটা দেখেই কাঁপা শ্বাস টেনে দম আটকে ফেলল মিতা। ওর বামহাতটা তুলে নিল আজিম তার শক্ত, পুরুষালি হাতে। ‘দিই পরিয়ে?’ বলে অনুমতির অপেক্ষা না করেই পরিয়ে দিল ওটা মিতার অনামিকায়। দুটো দিনের অসহ্য মানসিক চাপ আর সামলাতে পারল না মিতা, ডুকরে কেঁদে উঠে মুখ লুকাল আজিমের বুকে।


৮.এমনি সময়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন নানীজি। ‘অই, ছ্যারা! কী করছত অরে? আমার মিতা কান্দে ক্যান?’ ‘আমি কিচ্ছু করিনি, নানু। বিশ্বাস করো। এইটা পরিয়ে দিতেই কেঁদে উঠল!’ মিতার হাতের দিকে চাইলেন নানীজি। ‘আংটি! কীয়ের আংটি?’ ভুরুজোড়া কপালে তুললেন নানীজি। তারপর একগাল হাসলেন। ‘আইচ্ছা! এই বিয়াপার? আমিও তো এরই লেইগা নিচে নামলাম। আমরা আইজই কামটা সাইরা ফালাইতে চাই।’ নানীজির পিছন থেকে কথা বলে উঠলেন মেজো মামা, ‘কিন্তু ওদের বাপ-মাকে না জানিয়ে...’ চমকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ওরা পুরো ব্যাটেলিয়ান নানুর পিছনে খাড়া। চট্ করে সরে দাঁড়াল মিতা। ‘খলিল, তুই চুপ র্ক! অই, ফজল, তুই লৌরায়া গিয়া কাজী সাবেরে লইয়া আয়। শুব কামে জলি জলি! ঘর রেডি, সাজানি কমপিলিট, খানাপিনা তৈয়ার, আমরা হ¹লতে হাজিরÑতাইলে আর দেরি কীয়ের?’ মায়ের আদেশ পেয়ে ছুটলেন বড় মামা। ‘আর খলিল, যা তো, বাপÑবাবুর্চিগো কইয়া দে, অহনি জানি খাওনটি বাইরা না ফালায়।’ ছুটলেন মেজো মামাও। ছোটখালা বললেন, ‘কিন্তু, মা, এই কাপড়ে মিতার বিয়ে হবে কী করে? ফটো উঠলে কেমন দেখাবে?’ ‘আরে রাখ্! তগো বাবলু ক্যামেরাম্যান আর কী ফোটু তুলব! আর, এই কাপড়ে বিয়া হইব মাইনি? আমার বেনারসি পইরা বিয়া হইব মিতার। নাত-বৌয়ের লেইগা আলাদা কইরা গয়না রাইখা দিছি নাÑহেইটি পইরা বিয়া হইব।’ একটু চিš-ায় পড়লেন নানীজি, ‘অহন এই ছ্যারারে কী পরাই? মনে অইতাসে কইত্তে বাদাইম্যা একটারে দইরা আইনা আমোগো রাজকইন্যার লগেÑ’ ‘এক কাজ করলেই তো হয়,’ বুদ্ধি জোগাল রুবি। ‘নানার শেরোয়ানি আর পাগড়ি দেখেছিলাম না, নানু, তোমার স্টীলের আলমারিতে?’ ‘ঠিক কইছে তো ছেমরি!’ সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। নানীজি হুকুম করলেন, ‘এইবার পোলা আর মাইয়ার দল ফারাক যাও। পোলারা এই ছ্যারারে লইয়া যাওগা, ঠিকঠাক মথন রেডি কইরা আনবা। রাইত আটটায় বিয়া। আমরা আমাগো মাইয়া লইয়া দোতালায় গেলাম।’ হই-হই করে আজিমকে ঘিরে ধরল ছোটরা। ছোটমামার নেতৃত্বে চলল ওরা দহলিজঘরের দিকে। ঘাড় ফিরিয়ে মামা বললেন, ‘মা, হাতে বেশি সময় নেই; আমাদের আচকান-পাগড়ি পাঠিয়ে দিয়ো তাড়াতাড়ি।’ গলা নামিয়ে আজিমকে বললেন, ‘তোর বাপকে একটা খবর দেওয়া দরকার ছিল না?’ ‘বলেই এসেছি, মামা। বাবা বলল: তোর মামারা আছেন ওখানে, কোনও অসুবিধে হবে না; এই সুযোগে আমি আরও দুটো টাকা কামিয়ে নিই।’ ‘দুলাভাইয়ের খালি সবতেই ঠাট্টা!’ ‘আসলে মাইল্ড একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে তো, বেশি নড়াচড়া নিষেধ।’

৯. অবাক লাগছে মিতার, মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছে জেগে-জেগে। সবাই মিলে সত্যিসত্যিই ওকে রাজকন্যে বানিয়ে দিল আধ ঘণ্টার মধ্যে। বড়খালা ওর চিবুক নেড়ে কপালে চুমু দিলেন। নানীজির বিয়ের বেনারসি একদম নতুন হয়ে আছে। দারুণ মানিয়েছে গহনাগুলোও। বিয়ের আসরে ওকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারেনি আজিম, হাঁ করে চেয়ে ছিল বোকার মত। ঠিক আটটায় বিয়ে হয়ে গেল ওদের। সবাই তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েদেয়ে ঢেকুর তুলে ইরিনার থালা থেকে পান তুলে নিয়ে যে-যার বাড়ি চলে গেল। সব শেষ হয়ে গেলে সন্তুষ্টচিত্তে হাসলেন নানীজি। ভাবলেন, তাঁকেও কি এই শাড়ি পরে এমনই সুন্দর লেগেছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে? বিড়বিড় করে আপনমনে বললেন, ‘কী কপাল! পাইয়া গেলাম মনের মথন নাত-বৌ! কিন্তুক, আসলেই কি ‘মউ’রে ‘বউ’ হুনছিলাম?’ দুষ্টু হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটে!
-----------------------
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723597 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723597 2007-07-31 18:02:57
কাজী আনোয়ার হোসেনের গল্প (১) কাজী আনোয়ার হোসেন
------------------
১.আপন মনে গুনগুন সুর ভাঁজছে মিতা শাহনাজ, তৈরি হচ্ছে স্কুলের জন্য। কাল একটু রাত জেগে পরীক্ষার খাতাগুলো দেখে রাখায় সকালে কাজের চাপ একদম নেই। সদ্য পাটভাঙা, লালপেড়ে, সুন্দর একটা সুতির ছাপা শাড়ি পরেছে ও আজ; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোখোঁপায় গোটা কয়েক কাঁটা গুঁজে নিয়ে পাউডারের পাফ বুলাচ্ছে নাকে-মুখে। মর্নিং শিফটে বাচ্চাদের দুটো ক্লাস নিয়ে ফিরে আসবে,গোসল-খাওয়া সারবে বাসায়, তারপর আবার ডে শিফটে সেভেন-এইটের দুটো ক্লাস নেবে দুটো থেকে চারটে পর্যš-। ব্যস, ছুট্টি। খাতা-কলম, র‌্যাপিড রিডার, সবুজ সাথী, ড্রইংবক্স সব ওর বুটিক-ব্যাগে পুরে ওটা কাঁধে ঝুলাতে যাবে, এমনি সময় ঝনঝন শব্দে বাজল টেলিফোন। কেন জানি ওর মনটা আগাম গাইল: হয়তো খারাপ কোনও খবর। ভয়ে ভয়ে রিসিভার কানে তুলল ও। ‘কে কও? মিতা?’ নানীজির কাঁপা গলা। এই রসিক বৃদ্ধাকে ওর ভারি পছন্দ। এ-শহরে টিচার হয়ে এসে প্রথম ছয়টা মাস পেয়িং গেস্ট হিসেবে ছিল ও এঁদের পরিবারে, বিশেষ করে এঁর মধুর, ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে। এখনও নানীজির বাড়িতে যখন-তখন ওর অবাধ যাতায়াত। ও-বাড়ির সবকিছুতে ওকে থাকতেই হবে, কোনও অনুষ্ঠানে যদি না যায়, নানীজি নিজে চলে আসেন নিতে। মিতার সাড়া পাওয়ামাত্র রেলগাড়ি ছুটালেন নানীজি। ‘কী বিয়াপার, মিতা, ভুইলা গেছো নিকি আমাগো? আহো না যে? অসুক-বিসুক অইল নিকি আবার? এক সাপ্তা গেল গা, পাত্তাই নাই!’ প্রথমে বাঁধা-ধরা অনুযোগ সেরে নিয়ে এইবার শুরু করলেন নানীজি পুরো খবর, ‘এইদিকের গটনা জানো না, মিতা? আজিম তো আইতাছে। সইন্ধ্যার গাড়িতে আইব, আগামী কাইল।’ একটু ইত¯-ত করলেন তিনি, তারপর বলে ফেললেন আসল খবর, ‘বউ নিয়া আইতাছে আজিম।...কী কইলা?...হ, বউ নিয়া। ঢাকা থেইকা ফোন করছিল আমারে কাইল অনেক রাইতে। হাতে এক্কেরে সময় নাই। কও দেহি, তারাহুরা কইরা আমরা অহন কী ব্যব¯-া করি! বাড়ির হগলতে এক্কেরে পেরেশান হইয়া পড়ছে। আইজ বিকালে পারিবারিক মীটিন। তুমি আইজ ইসকুল থেইকা সিদা আমাগো এইহানে আইসা পড়ো। হগলতে মিলা বুদ্দি-পরামশ্য কইরা দেহি কী করা যায়।...কী কইলা?...হ, এই বাড়ির হগলতে তো থাকবই, কয়জন আপ্তীয়-স্বজনরেও ডাকুম।...কী কইলা?...পিট্টি লাগামু কইলাম! তুমি আপ্তীয়রও বেশি, তুমি একটুও দেরি করবা না, মিতা। একটা আয়োজন করতে হইলে...’ বলেই চললেন নানীজি। বাড়িঘর গোছগাছ করা, নাতি-নাতবৌয়ের জন্য সুন্দর করে একটা ঘর সাজানো, বাড়ির বাইরের আলোকসজ্জা, খানাপিনার ব্যবস্থা, ডেকোরেটরের সঙ্গে কথা বলাÑহ্যাঁ, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে, সময় কম। রিসিভার কানে ধরে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে মিতা। বাগানের লাল-নীল-হলুদ ফুলগুলো রঙ হারিয়ে কেমন মলিন হয়ে গেছে, এক রঙ অন্য রঙে মিলেমিশে ঝাপসা। ফোন ছেড়ে জানালার সিক ধরল মিতা। মনে হচ্ছে কণ্ঠনালীর কাছে এসে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা, চিš-াগুলো অস্পষ্ট। ধীরে ধীরে কিছুটা রঙ ফিরে এলো ফুলে, মাতালের মত ঢলাঢলি কমল ওদের। মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়ে আসতে নির্জলা, নিষ্ঠুর, বা¯-ব সত্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠল ওর কাছে: ব্যাপারটা ঘটল তা হলে, বিয়ে করে ফেলল আজিম। ভয় ছিল, এমনটা হতে পারেÑকিন্তু সত্যি সত্যি ঘটেই গেল! আগে থেকে বলল না, মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার একটু সুযোগও দিল না ওকে! একটু ভাবল না ওর কথা! সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর এলো নিজেরই মন থেকে। কেন ভাববে? বিরাট ব্যবসায়ীর একমাত্র পুত্র, নিজেও গতবছর এমবিএ পাশ করে নেমে পড়েছে ব্যবসায়, অল্পদিনের মধ্যেই দাঁড় করিয়ে ফেলেছে আলাদা নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; উনত্রিশ বছরের তরতাজা, স্বাস্থ্যবান যুবক; যেমন দেখতে-শুনতে, তেমনি ছোট-বড় সবার সঙ্গে ভদ্র, স্বতঃস্ফূর্ত, মিষ্টি ব্যবহার; পরিবারের সবার আদরের ধন, চোখের মণি, কলজের টুকরোÑসে কেন ওর মত সাধারণ এক স্কুল টিচারের কথা ভাবতে যাবে? কিন্তু তা হলে আগে যেখানে ঢাকা থেকে বছরে একবার বেড়াতে আসত, গত দেড়টা বছর প্রতিমাসেই ছুটে এসেছে কেন ও নানা-বাড়িতে? আর এসেই কেন হই-হই করে খোঁজ করেছে মিতার? ছুটির কটা দিন ওর সঙ্গে হাসি-গল্পে মহানন্দে কাটিয়ে দিয়ে কেন প্রতিবার মন খারাপ করে ফিরে গেছে ঢাকায়? এর উত্তর জানা নেই মিতার। ও অবশ্য বরাবর ভদ্র দূরত্ব বজায় রেখেছে, এরকম একটা ভয় ছিল বলেই তীক্ষè উপস্থিতবুদ্ধির কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রেখেছে নিজেকে, সহজ বন্ধুত্ব হিসেবে হালকা করে দেখেছে সম্পর্কটাকে। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে ওরা নদীর তীর ধরে অনেক, অনেকদূরÑকিন্তু হাত ধরেনি কেউ কারও। মুখ ফুটে কেউ বলেনি কিছু। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে মিতা, মনের গভীরে কোন আশাই দানা বাঁধেনি ওর? ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস পড়ল।Ñনা, তা বলতে পারবে না। যাক, এখন কিছুতেই কিছু এসে যায় না। টেনিসনের লাইনটা মনে পড়ছে: ‘সুখের দিনগুলো স্মরণ করলে চরমে পৌঁছবে তোমার দুঃখ।’ ভুলে যাও, ভুলে যাও।

২.স্কুলের ঘণ্টা পড়তেই সচকিত হলো মিতা। কর্তব্য যখন বেদনার কাঁধে হাত রেখে সাš-¡না দিয়ে বলে: ‘আরে, দূর, বাদ দাও তো! কাজ পড়ে আছে না তোমার!’ তখন সে-কথায় কান দেওয়াই ভালো। বেরিয়ে পড়ল ইতি। ইঁট বসানো সরু পথের ওপর ঘন হয়ে বিছিয়ে রয়েছে ইউক্যালিপ্টাসের শুকনো ঝরা পাতা। একটু এগিয়ে বামে বাঁক নিয়ে একশো গজ গেলেই স্কুল। দু’বছর হলো বিধবা মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে চাকরি নিয়ে এসেছে ও এখানে। এখন মনে হয় কত যুগ ধরে যেন আছে ও এই শহরে। ছোট্ট একটা মেয়ে ইউক্যালিপ্টাসের ফরসা গায়ে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিল তার প্রিয় আপার জন্য, মিতা কাছে আসতেই দৌড়ে এসে ভেজা-ভেজা কচি হাত দিয়ে ধরল ওর হাত। ‘আচ্ছা, মিতাপা, ঘাসফড়িংগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় যায়?’ ‘আমি জানি না তো, বেনু সোনা।’ আনমনে জবাব দিল মিতা। অতীতে চলে গেছে ওর মন। বি.এ. পাশ করে চাকরি নিয়ে ও যখন পাকশিতে আসে, ওর তখন তেইশ, আজিমের সাতাশ। একমাসও হয়নি নানীজির বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে আছে, এমনি সময়ে ঢাকা থেকে এলো সবার প্রিয়, পরিবারের হিরো আজিম আহমেদ। এসেই সন্ধ্যায় দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ‘ভউ’ করে ওকে ভয় দেখিয়ে নতুন মানুষ দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। লজ্জায় লাল। দৃশ্যটা মনে পড়ায় হাসি এসে গেল ঠোঁটে। মিতার হাসি দেখে ছোট্ট মেয়েটা ওর হাতটা নিয়ে নিজের গালে ঠেকাল। ‘আচ্ছা, আপা, তুমি লাল রসগোলা বানাতে পারো?’ ‘না, সোনা।’ ছোটবেলায় মা হারিয়ে আজিম আর ওর বড় বোন শাš-া নানীবাড়িতে মানুষ হয়েছে সাত-আট বছর। তারপর ওদের বাবা এনাম আহমেদ দুজনকে ঢাকায় নিয়ে যান। শাš-ার বিয়ে হয়ে যায় সেই বছরই, আজিম মন দেয় লেখাপড়ায়। কিন্তু নানীবাড়ির হাসিখুশি খোলামেলা পরিবেশের আকর্ষণে প্রতি বছরই গরমের ছুটিতে ছুটে চলে আসে ও এখানে। গত সতেরো বছর ধরে এর কোন হেরফের হয়নি। কিন্তু মিতার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই এসেছে ও পাকশিতে, হাসি-গল্পে মাতিয়ে দিয়ে গেছে সবাইকে। গল্প করতে গিয়ে দুজনেই আবিষ্কার করেছে অদ্ভুত মিল রয়েছে ওদের দুজনের রুচিতে, চিš-ায়, মন-মানসিকতায়। ‘মিতাপা, আমার জন্মদিন জুলাই নাকি জুনমাসে ভুলে গেছি।’ ‘ভাল করেছ, সোনা।’ গত বছর এমবিএ পাশ করে বাবার ব্যবসায় যোগ না দিয়ে নিজেই আলাদা ব্যবসায় নেমে এক বছরে অনেক উন্নতি করেছে আজিম। গত ছ’টা মাস প্রতিবার যখন এসেছে, ওর জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে এসেছে, ওর কাছে সেটা ভাল লাগলে মনে হয়েছে ধন্য হয়ে গেছে আজিম। নানাবাড়ির জমজমাট গল্পের আসরে ইদানীং মাঝেমাঝেই মামা-মামী-খালা-খালুরা ওর বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন, আজিম কোন জবাব দেয়নি, লাজুক হেসেছে, আর চোরা চোখে তাকিয়েছে মিতার দিকে। ‘আচ্ছা, আপা, এই শহরে কি বাঘ আছে?’ ‘না, সোনা।’ ‘ভালুক?’ ‘নাহ্!’ এই তো কদিন আগে হঠাৎ আজিমের একটা দীর্ঘ চিঠি এলো মিতার বাসার ঠিকানায়। ওতে নানান কথার শেষে লেখা ছিল কী যেন বলবে ও মিতাকে আগামীবার পাকশি এসে। এখন বোঝা গেল কী বলতে চেয়েছিল। অথচ ও ভেবেছিল, হয়তো...রাগ হচ্ছে মিতার নিজের ওপর, আঘাত লাগছে আত্মসম্মানে, কেন খুশি হয়ে উঠেছিল ওর গোটা অ¯ি-ত্ব? কী ভেবে? ভাগ্যিস কোন উত্তর লিখে নিজেকে খেলো করে ফেলেনি ও! ক্লাসে পৌঁছে রুটিন কাজের মধ্যে কিছুটা স্ব¯ি- খুঁজে পেল মিতা। প্রথমেই ব্যাগটা ডেস্কের ওপর নামিয়ে বই-খাতা বের করে সাজিয়ে রাখল। গত কদিন ধরেই ছাত্র-ছাত্রীদের ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি মুখস্থ করাচ্ছে, বলল, ‘জাহাঙ্গির, যেটুকু শিখিয়েছি খাতা না দেখে বলো তো শুনি!’ সোৎসাহে শুরু করল জাহাঙ্গির: বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? এটুকু বলতেই উঠে দাঁড়াল বেনু। ‘আপা, আমি বলি?’ ‘ওর বলা হয়ে যাক, বেনু, তারপর। কেমন?’ বেনুর আবৃত্তি শেষ হতেই ‘গুড’ বলে চক নিয়ে ব্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ইতি। আজ আরও দুটো চরণ লিখল: ভুঁইচাঁপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল, মাড়াসনে মা, পুকুর থেকে আনবি যখন জল।

৩. প্রায় সবাই হাজির। দোতলায় নানীজির শোবার ঘরে কেউ চেয়ারে, কেউ লম্বা বেঞ্চে, কেউ খাটে, কেউ টুলেÑযে যেখানে পেরেছে বসেছে। মিতা পৌঁছতে ওকে ডেকে নিজের ইজিচেয়ারের পাশে একটা গদি আঁটা মোড়ায় বসালেন নানীজি। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল আলোচনা। ছোটখালার ইচ্ছে সামনের আঙিনায় প্যান্ডেল টাঙানো হোক। মেজোখালার ইচ্ছে শহরের সবাইকে দাওয়াত করা হোক। মেজো মামা আপত্তি করলেন: ভোজ লাগানোর কোন দরকার নেই, বিয়ে হয়ে গেছে, এখন শুধু আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে চা-বিস্কিটের একটা সম্বর্ধনা হলেই যথেষ্ট। নানীজি বললেন: মোরগ পোলাওয়ের লগে আর কী-কী থাকবো, হেইটা নিয়া চিš-া করো। বড়খালা বললেন: টিকিয়া, বোরহানী আর খাসীর কালিয়া। আর মুরগীর রোস্টÑজিভ টেনে বলল ছোট্ট ইরিনা। এইবার ছোটরা কাঁইমাই শুরু করল। পুবের বড় বেডরূমটা সাজানো হবে আজিম ভাই আর ভাবীর জন্য। ফুলের দায়িত্ব থাকবে অলকের ওপর, কাগজ-কাটা সাজসজ্জার ভার নিতু ভাবীর ওপর। সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবে ছোটখালু। কেনা-কাটা, প্যান্ডেল, বাবুর্চি-বেয়ারা এসবের ভার নিলেন বড়মামা। ‘ডিনার সেট, পেট, গাস এসব ভাড়া না করে নানুর আলমারি থেকেÑ’ এর বেশি আর বলতে পারল না মেজখালার মেয়ে নাসিমা; বাঙাল ভাষায় ফুঁসে উঠলেন নানীজি। ‘খবরদার! আমার কইলজা হাতরাইয়া কিছু যদি বাইর করবি, নলী বাইঙ্গা ফালামু কোলাম!’ ‘ধরতে পারলে তো!’ বলল অলক। ‘দৌড়ে তুমি পারবে আমাদের সঙ্গে?’ হাসলেন নানীজি, তারপর ভুরু কুঁচকে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘আলমারিতে চোখ দিবি না, ব্যস, কোইয়া দিলাম!’ ‘আচ্ছা, চায়নিজ করলে কেমন হয়?’ নতুন এক প্র¯-াব তুলল বড়খালার ছোটমেয়ে রুবি। ‘হল ভাড়া নিয়েÑ’ ‘খুব খারাপ হয়,’ জবাব এলো তারই মায়ের কাছ থেকে। ‘কেন?’ জানতে চাইল তাঁর আরেক মেয়ে। ‘আমি তো উপর-নিচ করতেÑ’ বলতে নিয়েছিলেন নানীজি, কিন্তু কথা শেষ করবার আগেই প্র¯-াব উইথড্র করে নিল রুবি। ‘আমি ভাবছিলাম, যদি ঢাকার পশ্ এলাকার আল্ট্রা মডার্ন মেয়ে হয়,’ ব্যাখ্যা দিল রুবি, ‘তা হলে আমরা ভাবীকে দেখিয়ে দিতে পারতাম, এখানে আমরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই।’ নতুন আইডিয়া খেলল তরুণ ফটোগ্রাফার বাবলুর মাথায়: ‘গেটের ওপর আজিম ভাইয়ের একটা ছবি এনলার্জ করে টানিয়ে দিলে কেমন হয়?’ ‘খুব ভাল হয়,’ বলল মিতা। ‘কাবাবঘরের গেটে যেমন খাসীর ছবি টাঙানো থাকে, তাই না?’ সবাই হো-হো করে হেসে ওঠায় লজ্জা পেয়ে মিতা আপারই আঁচল তলায় লুকাল বাবলু। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল মিতা। চা-না¯-ার ফাঁকে-ফাঁকে ঘণ্টা দুয়েক আলোচনা, হাসি-তামাশা আর গল্প-গুজব চলল, সবার সঙ্গে সমান তালে আড্ডা দিল মিতাও। প্রত্যেককে যার-যার দায়িত্ব বেঁটে দিলেন নানীজি, এমন কি ছোট্ট ইরিনাও পেল একটা পান-সুপারী সাজানো থালার দায়িত্ব। মিতার ওপর পড়ল বাদাম-পে¯-া দেওয়া শরবত তৈরি করা এবং সবাই ঠিক মত পেল কিনা দেখবার দায়িত্ব। পরদিন দুপুরে আসবে কথা দিয়ে বাসায় ফিরে গেল ও।

৪. পরদিন শুক্রবার। স্কুল নেই। সন্ধের আগেই নানীজির প্রশ¯- রান্নাঘরের কোণে টেবিলের উপর রাখা একটা কল লাগানো ড্রামে কুচি করা বাদাম-পে¯-া দেওয়া মিষ্টি দইয়ের শরবত বানিয়ে ফেলল মিতা। বড় দেখে তিনটে বরফের চাঁই ছাড়ল ওতে। বর-কনে পৌঁছে গেলেই গাসে-গাসে ঢালা হবে শরবত। তখনও ওর হাজির থাকতে হবে, কারণ কল খুলে ঢালার আগে বড় হাতা দিয়ে আচ্ছামত গুলাতে হবে, দেখতে হবে মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না। কাপড় পাল্টে আসছি বলে ঘরে ফিরে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল মিতা। কিচ্ছু ভাল লাগছে না, উঠে দাঁড়াবারও শক্তি নেই শরীরে। বুক ভেঙে উঠে আসতে চাইছে কাঁপা-কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। আধঘণ্টা শিথিল ভঙ্গিতে পড়ে থেকে, নিজেকে চোখ রাঙিয়ে অনেক কষ্টে তুলল ও বিছানা থেকে। শথ ভঙ্গিতে সাদামাঠা একটা শাড়ি পরল ও, কাজল দিল চোখে, মুখে হালকা পাউডার বুলিয়ে, কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ পরেই রওনা হলো আলো-ঝলমল বাড়িটার দিকে। অভ্যাগতরা আসতে শুরু করেছেন। দূর থেকে ট্রেনের সিটি কানে আসতেই ধক্ করে উঠল মিতার বুকের ভিতরটা। ওই, আসছে ওরা! বড় মামা গাড়ি নিয়ে গেছেন ওদের আনতে। ওর ইচ্ছে হলো ঝোপে-জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে পড়ে, এমন কোথাও, যেখান থেকে ওদেরকে দেখা যায়, কিন্তু ওকে কেউ দেখতে না পায়। মাথা নেড়ে বাজে চিš-া দূর করে দিল মিতা। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না, মনটাকে শক্ত করে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকতে হবে। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায় ওর ভিতরে কী চলছে। গম্-গম্ করছে বাড়িটা ঠিক বিয়ে-বাড়ির মতই। সবাই চারদিকে এমন ভাবে ছুটোছুটি করছে, যেন পিঁপড়ের বাসায় খোঁচা দিয়েছে কেউ। ‘আরে, মিতা আপা! তুমি এতক্ষণে আসছ?’ নিচতলার বারান্দায় উঠতেই বলল ছোটখালার বড় মেয়ে ঝর্না, ‘সেই কখন থেকে পাগল হয়ে খুঁজছে নানু তোমাকে! জলদি ওপরে যাও, নইলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে তোমার নানীজি!’

৫. প্রাচীন বাড়িটাকে আর চেনাই যাচ্ছে না। ছোটরা সত্যিই সুন্দর করে সাজিয়েছে কাগজের ফুল আর নকশা দিয়ে। সিঁড়ির ধাপে আর ল্যান্ডিঙে আলপনা আঁকা হয়েছে। সুন্দর লাগছে। দোতলায় উঠে গেল মিতা। সিঁড়ি বেয়ে পিলপিল করে উঠছে-নামছে উৎসবের বাহারি সাজ-পোশাক পরা নানান বয়েসী চেনা-অচেনা অসংখ্য ছেলেমেয়ে। ওকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন ছোটখালা। ‘বাহ্! ভারি সুন্দর লাগছে তো তোমাকে আজ!’ মৃদু হেসে পাশ কাটাল মিতা। নানীজির কাছে যেতে হাত ধরে বসালেন তিনি পাশে। কেন খোঁজ করছেন জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘কী কইলা?’ ‘আমাকে খুঁজছিলেন বলে?’ ‘হ।’ ‘কেন?’ কেন খুঁজছিলেন মনে নেই নানীজির। নিজ দায়িত্বের কথা ভেবে সচকিত হলো মিতা। ‘আমার একটা টুল দরকার ছিল যে, নানীজি। ওর ওপর চড়ে শরবত ঘুঁটতে হবে ঢালার সময়।’ ‘ঠিক কইছ। তোমার বড়খালা আছে রান্নাঘরে, অরে কইলেই একটা টুলের ব্যব¯-া কইরা দিব।’ রান্নাঘরে চলে এলো মিতা। টেবিলের ধারে একটা টুল রাখা, তার ওপর বসেই অপেক্ষা করছেন বড়খালা ওর জন্য। ওকে দেখেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর চোখদুটো। ‘দারুণ লাগছে তোমাকে, মিতা!’ ওর চিবুক স্পর্শ করে আঙুলে চুমো খেলেন বড়খালা। ‘আজিমটা একটা আ¯- গাধা! কাছের মানুষটাকে মনে ধরল না, হুট করে বিয়ে করে বসল কোথাকার কোন্ মেয়েকে। অথচ আমরা সবাই জানি একমাত্র তোমাকেই সত্যি-সত্যি মানায় ওর পাশে।’ ‘শরবতটা এখন একবার ভাল করে ঘুঁটে বরফ দিয়ে রাখলে হতো না, খালা? মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না কে জানে!’ টুল ছেড়ে উঠে পড়লেন বড়খালা। ‘ঠিক বলেছ। তুমি নাড়ো, আমি একটা গাসে নিয়ে চেখে দেখি।’ টুলে উঠে দাঁড়াল মিতা ইয়া বড় এক কাঠের ঘুঁটনি নিয়ে। বড়-বড় আরও কয়েকটা বরফের চাকা ছাড়া হলো টবে। মিনিট পাঁচেক ঘাঁটাঘাঁটির পর চেখে দেখা গেল মিষ্টি বেশি লাগছে, তার মানে বরফ গললে একদম ঠিক হবে। আবার ঢাকনা বন্ধ করে রাখা হলো, সার্ভ করবার আগে আবার একবার ঘাঁটতে হবে, ব্যস। এবার দোতলার বারান্দায় চলে এলো মিতা বড়খালার সঙ্গে। এখান থেকে দেখা যাবে বর-কনেকে গেট দিয়ে ঢুকবার সময়। ফুলের তোড়া নিয়ে তিন-চারটে বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়েছে গেটের দু’পাশে। বিরিয়ানী আর টিকিয়ার গন্ধ ভেসে আসছে নিচ থেকে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723596 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723596 2007-07-31 17:53:12
শামসুর রাহমানের কবিতা ------------------
এ কেমন সন্ধ্যা ঘিরে ধরেছে আমার
প্রিয় এই শহরকে আজ। চতুর্দিকে
গুঁড়িয়ে পড়ছে ঘরবাড়ি। নরনারী, শিশুদের
বুকফাটা কান্নায় কাঁপছে পথঘাট, গাছপালা।

এই তো নিজেকে আমি ইট, পাথরের
স্তূপ থেকে আহত শরীর তুলে দেখি আশেপাশে,
সবদিকে অগণিত লাশ, কোনও কোনও
স্থানে ভাঙা পুতুল-জড়ানো হাতে নিষ্প্রাণ বালিকা।

আমাদের ছোট ঘরবাড়ি খুঁজে খুঁজে
আখেরে অধিকতর ক্লান্ত শরীরে অজানা
জায়গায় ভগ্নস্তূপে বসে পড়ি। হঠাৎ সমুখে
একটি ধূসর খাতা দেখে দ্রুত হাতে তুলে দিই।

আবিষ্কৃত খাতার প্রথম দুটি পাতা
গায়েব হলেও অবশিষ্ট বেশ কটি পাতা জুড়ে
রয়েছে কবিতা, সত্যি বলতে কী, কতিপয় পদ্য
পড়তেই উদ্ভাসিত প্রকৃত কবির পরিচয়।

কখন যে রাত ওর কোমল শরীর
নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে, অদূরে গাছের
পাতাময় ডাল থেকে পাখির নিঝুম গান ঝরে
জ্যোৎস্নার ধরনে। ভেসে ওঠে আকাশে অনেক মুখ।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723460 http://www.somewhereinblog.net/blog/mustakimrahiblog/28723460 2007-07-30 17:54:42