কোন মহৎ আদর্শকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বাস্তবায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আদর্শিক কাজের সাথে জড়িতদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থতা। তাবলীগী জামায়াতের প্রতি দেশ-বিদেশে অগণিত মানুষের আগ্রহ-আকর্ষণের পেছনে সেই গুণাবলীসমূহ বিশেষভাবে কাজ করছে। পেটের ধান্ধায় আজকের দিনের সদাব্যস্ত মানুষদের মধ্যে প্রায় দুর্লভ এসব গুণ সৃষ্টি করা কিংবা সৃষ্টি হওয়া সহজ ব্যাপার নয়।
এই ফিতনার যুগেও এই মহান দ্বীনী প্রচারের ক্ষেত্রে মানুষকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এই সংগঠনের প্রথম আহবায়ক হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর এটি একটি উজ্জ্বল অবদান। অবিভক্ত ভারতে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনামলে সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে হযরত ইলিয়াস (রহ.) প্রথমে এ নিয়মের তাবলীগের কাজ শুরু করেন। তাবলীগ বা দ্বীনী দাওয়াতের দায়িত্ব মুসলমানদের ওপর একাধিক আয়াত ও একাধিক হাদীসের দ্বারা অর্পিত। তন্মধ্যে বিখ্যাত আয়াতটি হলো-‘তা'মুরুনা বিল মারূফে ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকার,- ‘‘তোমরা কল্যাণের দিকে মানুষকে নির্দেশ করবে আর মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে তাদের বিরত রাখবে।’’
এছাড়া পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আরও সরাসরি বলেছেন, ‘বাল্লিগ মা উনযিলা ইলাইকা' -‘তোমার কাছে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অপরের কাছে পৌঁছাও।' বস্তুত এ আয়াত এবং এ জাতীয় আরও যেসব আয়াত ও মহানবীর (সা.) হাদীসের নির্দেশের ভিত্তিতে যুগে যুগে মুসলমানরা তাবলীগ বা ইসলামী দাওয়াতের কাজ করেছেন, পালন করেছেন দ্বীন প্রচার ও বিশ্বময় ইসলাম বিস্তারের দায়িত্ব, তাঁরা দ্বীনকে খন্ডিতভাবে না দেখে একে পরিপূর্ণ আকারেই দেখেছেন এবং পরিপূর্ণভাবেই মানুষের সামনে তুলে ধরে সমাজে এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।
ইসলামকে খন্ডিতভাবে যারা দেখেছিল, তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা কি আমার বিধান গ্রন্থের কিছু অংশ বিশ্বাস করো আর কিছুকে অবিশ্বাস করো? আল্লাহ অন্যত্র আরও বলেছেন, ‘তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো।' আরও ইরশাদ হয়েছে, মাইয়াবতাগী গায়রাল ইসলামে দ্বীনান ফালাই ইউকবাল-‘যারা জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু অনুসন্ধান করে, তা কখনও গ্রহণ করা হবে না।' সেই হিসেবে বুঝা যায়, দ্বীনের কতিপয় হুকুম সংক্রান্ত দায়িত্ব মুসলমানদের স্কন্ধ থেকে দূর হবে না বরং পুরো কুরআনে যা কিছু সবগুলোর তাবলীগ এবং এগুলোর হুকুমই ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠার তাবলীগ অন্তর্ভুক্ত। এটা এজন্যে যে, আমরা যখন নামাজ আদায় করি, তখন নামাযের আয়াতের ওপর আমল করা হলো, যখন যাকাত দেই, যাকাতের আয়াতের উপর আমল হলো, তেমনি যখন রোযা রাখি, রোযার আয়াতের ওপর আমল করা হলো, যখন হজ্জ করি এ সংক্রান্ত আয়াতের ওপর আমল আদায় হলো।
কিন্তু কুরআন মজীদে এগুলো ছাড়া আহকাম-এ-তা'যিরিয়া (Criminal Law) বা অপরাধ দন্ডবিধি প্রয়োগ সংক্রান্ত কিংবা অর্থনৈতিক ও শোষণের যেসব আহকাম আছে, যেমন সমাজে, রাষ্ট্রের পুরুষ-নারী, চোর-ডাকাতের হাতকাটা এবং জেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত এ জাতীয় পুরুষ ও নারী অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দান, সে সংক্রান্ত বিধানসমূহ যদি জারির কথা তাবলীগী দাওয়াতে ও প্রচার কর্মসূচিতে না থাকে- আবার থাকলেও সে অনুযায়ী এসব খোদায়ী আইন প্রয়োগের জন্যে যেই আইনগত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আছে, সেখানে তাদের প্রশিক্ষিতরা না গিয়ে, না বসে এসব আইন কার্যকর করা না হয়, তাহলে কি করে আল্লাহর এই সংক্রান্ত আয়াতসমূহের উপর আমল হবে? তেঁতুলের বীজ বপন করে কি ফজলি আমের আশা করা যায়? তা না করে কেয়ামত পর্যন্ত এসব আয়াতের হয়তো তিলাওয়াতই হবে, এগুলোর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর আমল কোনো দিনই হবে না।
এই জন্যে প্রিয় নবী (সা.) এবং তাঁর সুন্নাত ও আদর্শের অনুসারী উম্মত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে স্থান পেতে হলে মহানবীর পূর্ণ ইত্তেবা ও আল্লাহর কালামের ওপর পূর্ণ আমল ছাড়া গত্যন্তর নেই। আল্লাহ্ শেষ নবীকে উস্ওয়া বা উত্তম আদর্শ বলে কুরআনে ঘোষণা করেছেন। সেই উসওয়া বা আদর্শের অনুসরণেই একমাত্র মুক্তি লাভের উপায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ ভোর ৫:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



