এই যে উঁকি দেওয়ার প্রসঙ্গ সেটা সহজ হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে যখন ধীরে ধীরে এমন সব প্রযুক্তি আসতে শুরু করেছে যার মাধ্যমে মাত্রা ছাড়ানো এই রহস্যময় মস্তিষ্কের গলি ঘুপতি সম্পর্কে জানা সম্ভব হচ্ছে।
কেউ যদি এই আধুনিক যুগে বসে অলৌকিকতা খুঁজে বেড়ায়, ছুয়ে দেখতে চায় তবে তাকে মানুষের মস্তিষ্কের কাছে আসলে হতাশ হতে হবে না। মাত্র কয়েক পাউন্ডের একতাল ঐ বস্তুর ভিতরে যেন হাজার হাজার ছায়াপথ লুকানো। স্যার চার্লস শেরিংটন যাকে নিউরোফিজিওলজীর গুরু বলা হয় তার ভাষায়:
the human brain is an enchanted loom where millions of flashing shuttles weave a disolving pattern, always a meaningful pattern, though never an abiding one, a shifting harmony of sub-patterns. It is as if the Milky Way entered upon some cosmic dance'
মানুষের মস্তিষ্কের কোষ সংখ্যা এক মিলিয়ন মিলিয়ন যা লিখতে ১ এর পরে ১২টা ০ দরকার, ১,০০০,০০০,০০০,০০০। এই প্রতিটা কোষ একেকটা একই সাথে জটিল ইলেকট্রাকেমিক্যাল মেকানিজমের যাদুর বাক্স, শক্তিশালী মাইক্রোডাটা প্রসেসিং ঘর এবং ট্রানসমিটিং সিস্টেম যা তার যাবতীয় জটিলতা নিয়েও আকারে অসম্ভব রকমের ছোট।
বিজ্ঞানীরা কেবলমাত্র ইদানীং বুঝতে শুরু করেছে চিন্তা, মেমোরী কিভাবে জন্ম নেয় কিভাবে কাজ করে। তবে এটা কেবলই বোঝার যাত্রা শুরু। সব রহস্যের জট এখনো খোলেনি। যেটা নিউরোসায়েন্টিস্টদের খুব ভাবায় তা হলো মন (Mind) ধারনাটা। কোথায় এর জন্ম এবং এটা কিভাবে কাজ করে।
ফাংশনাল এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং), পিইটি (পজিট্রন এমিশন টোপোগ্রাফি)এর মতো প্রযু্ক্তির ফলে এখন বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিস্ককে মেশিনে সংযুক্ত করে মজার মজার সব এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে বোঝার চেষ্টায় আছে মন কোথায় কিভাবে কাজ করে।
যেমন একটা এমআরআই স্ক্যানে আপনাকে ঢুকিয়ে দিয়ে আপনার প্রিয়জনের ছবি চোখের সামনে ধরলে দেখা যাবে মস্তিষ্কের নিদিষ্ট জায়গাটা খুব কাজ করছে। মস্তিষ্কের ভিতরে অনেকগুলো ভাগ করা জায়গা আছে, ভাগটা কাল্পনিক। তো দেখা যায় যে নিদিষ্ট কাজের জন্য (ফাংশনালিটি) মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গা দায়ী, তবে সম্পূর্ণভাবে না। যেমন দেখার ইমপালস হয়তো দিচ্ছে মস্তিষ্কের বিশেষ একটা এলাকা, শোনা আরেক জায়গায়, হাটাচলার ব্যালেন্স আরেক জায়গা এরকম।
বিজ্ঞানীরা বিশেষ এলাকায় এক্সিভিটি বাড়ছে না কমছে সেটা বোঝার জন্য ঐ এলাকায় রক্তচলাচল এবং কোষের গ্লুকোজ গ্রহনের হারটা খেয়াল করে থাকে। এটাকে অনেকটা শিশুদের কার্টুনে দেখানো মাথায় আলো জ্বলে ওঠার সাথে তুলনা করা যায়।
তো আপনার সামনে আপনার প্রিয়জনের ছবি যদি ধরা হয় তবে এমআরআই বা পিইটি স্ক্যানে দেখা যাবে মস্তিষ্কের কয়েক জায়গায় আলো জ্বলে উঠছে।
দেখার বিষয় মাথার যে অংশ প্রসেস করে সেটাও নি:সন্দেহে ব্যস্ত হয়ে যাবে। রঙ, আকার আকৃতি, সেই রঙ আইডেন্টিফিকেশন, লাইন, ডেপথ, আলো ছায়ার অর্থ করা - হাজারটা কান্ড ঘটবে ওখানে। কোটি কোটি নিউরনের পথ জুড়ে নিউরোট্রান্সমিটার নামের কেমিক্যালেরা ব্যস্ত হয়ে উঠবে।
ফেস রেকগনিশন অংশ নি:সন্দেহে সচল হবে। আপনার দেখা হাজার হাজার মুখের মেমোরী থেকে এই মুখটি আইডেন্টিফাই করবে ব্রেইন। শুধু এই আইডেন্টিফিকেশন পদ্ধতিটাই মারাতনক যাদুর মতো।
তারপরে স্মৃতিকোঠরে সাঁইসাঁই পুরনো স্মৃতির বাছাই থেকে বের হবে সবচেয়ে শক্তিশালী ইমোশনটা। যেমন মায়ের ছবি দেখলে হয়তো কারো মনে হতে পার মায়ের গায়ের গন্ধ, কারো হয়তো মা রান্নাঘরে দাড়িয়ে রান্না করছে সেই দৃশ্য অথবা কারো বা মায়ের বলা কোন কথা অথবা আজ অফিসে আসার আগে ঘুম থেকে জাগতে দেরী করায় মায়ের বকুনী ইত্যাদি।
অর্থাত এই যে আমাদের মন বলে যে জিনিসটা সেইটায় ঐ ছবিটা যে একটা ইমোশন জেনারেট করছে সেটা বোঝার জন্যই এতো ঝক্কি। কেন বিশেষ মুখ বিশেষ অনুভূতি জন্ম দিচ্ছে, কিভাবে সেই অনুভূতির জন্ম নেওয়া তার মেকানিজমটা বোঝার চেষ্টা।
একটা শব্দ, একটা ঘ্রান, একটা গান মনের গভীর থেকে তুলে নিয়ে আসে যে ইমোশন, যে ভাবের বণ্যা তার শারীরিক জন্ম কিন্তি মাথার ঐ কুঠুরীতেই। যাকে মন বলি তা হয়তো মস্তিষ্কের ইমপালস -এমনটা অনেক বিজ্ঞানীদের মতামত। কিন্তু গল্পটা যে এত সরলীকৃত না সেটাও স্বীকার করেন ডাকসাইটে নিউরোসায়েন্টিস্টরা।
আমরা একটা অপূর্ব সুন্দর ফুলের বায়োলজী, তার পরাগায়ন, পাতার সালোক সংশ্লেষণ বিজ্ঞানের মাধ্যমে জানলেও গাছের ভিতরে যে প্রাণ তার অলৌকিক রহস্যময়তাটা কিন্তু ধরাছোয়ার বাইরেই থেকে যায়। জটিল কেমিক্যাল সিনথেসিসে হুবহু নকল জবা তৈরী করা সম্ভব হলেও প্রকৃতি বিপুল মমতায় যে ফুল ফোটায় তার ভিতরের মুগ্ধতাটা বিজ্ঞানীদের ল্যাবের বিষয় না। তার জন্ম অন্য কোথাও। কিভাবে শু্ক্রানু, ডিম্বানু থেকে ভ্রুন হয় এবং তার বেড়ে ওঠা চলে মায়ের গর্ভে তা বিজ্ঞান বলতে পারলেও প্রাণ নামের অলৌকিক ফেনোমেনার রহস্য আমরা জানি না। সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানের প্রেমে পড়লে মায়ের ব্রেনের কোন অংশে কি নিউরোট্রান্সমিটার ব্যতিব্যস্ত হয় বিজ্ঞান বলে দিতে পারে আজ, কিন্তু ঐ নবজাতক সন্তানটার জন্য তীব্র প্রেমে পড়ার মুদ্ধতার ব্যাপারটা প্রকৃতির অন্য নিয়মে চলে। তা অন্যভূবনের অন্যকিছূ।
লেখার শিরোনামটা মূলত মস্তিষ্কের ভিতরের এক প্যারাডক্সের কথা বলার জন্যই দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই গল্প অন্য কিস্তিতে। মনের মধ্য আসলেই বাস করে কয়জনা সেই গল্পটা তাই বেশি বড় হয়ে যাওয়ার ভয়ে এই পোস্টে ঠাঁই পেলো না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

