ছোটবেলা থেকেই আমার উপর এই অপবাদ আছে, আমি ফালতু কিছু সেন্টিমেন্ট পুষে রাখি নিজের ভেতরে। এখন বুঝি, এ অপবাদ নয়। ঘটনা শুধু সত্য না, ভয়াবহ সত্য। ইদানীং তো নিজেকে অসুস্থ মনে হয়।
গল্পটা তাহলে খুলেই বলি??
আর্কি হওয়ার একটা সুবিধা হল, আমরা স্টুডেন্ট অবস্থা থেকেই কাজ শুরু করতে পারি, রিলেটেড কোন কাজ কিংবা সরাসরি ডিজাইনের।
সৌভাগ্য (কিংবা দূর্ভাগ্য) বশতঃ, আমি বেশ বাচ্চা কালে। থার্ড ইয়ারের শুরুতেই প্রথম একটা কাজ পাই। ১২০০ স্কয়ার ফিটে দুই ইউনিট - দু'টা বেডের।
আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমার শেখা সব তত্ত্ব কেমন যেন ওলট-পালট লাগতে থাকে।
প্রথম প্রশ্ন কিভাবে সম্ভব?? কোথায় কি হবে??
কাজটা করতে আমার রীতিমত কষ্ট হয়েছিলো। আমার নিজের ঘর ১৪' বাই ১৫' এবং আমার হয় না এতে। আমি কোন ভাবে নিজেকে মানিয়ে ৯' বাই ১০' এর ঘর বসাই।
আমাদের প্রথম ক্লাসে আহসান স্যার বলেছিলেন, কিছু কিছু দিক দিয়ে আমরা সেই মানুষ গুলোর জীবনের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করি, যারা আমাদের ডিজাইন করা বাসায় থাকে। ভালো পরিবেশ মানুষের জীবনটা হয়তো পাল্টে উল্টে দিতে পারবে না, কিন্তু মানুষ গুলোর দিনের শুরুটা এবং শেষ আমাদের হাতেই নিশ্চিত।
আমার হিসাব মেলে না। কি রকম বেকায়দা হলে মানুষ এই পায়রার খোপে থাকবে? আমার কষ্ট হতে থাকে সে মানুষগুলোর জন্য, সেই বাচ্চাটার জন্য যার জীবনটাকে আমি ৯' বাই ১০ ফিটের মাঝে আবদ্ধ কে দিচ্ছি, সেই বৃদ্ধ মানুষটা যে সারা জীবন খোলা মাঠে কাটিয়ে এখন বন্দি। সেই কষ্টটা আমি কাউকে বোঝাতে পারি না।
আমি কাজ করা ছেড়ে দেই, আমার পক্ষে সম্ভব না।
সময় কেটে যায়, মাঝে কিছুদিন আমার নিজেকেই বসবাস অযোগ্য সেইরকম একটা বাসায় কিছু সময় থাকতে হয়।
হয়তো সেই সময়েই আমি বুঝি প্রয়োজন জিনিসটা কি, এবং "বসবাসযোগ্যতা" কথাটা কতটা তত্ত্বীয় বুঝি, অথবা নয়। জানি না।
তারপরে, ক্লাসের কাজের প্রয়োজনেই এই আমাকেই কাজ করতে হয় কিছু অমানবিক সংখ্যা নিয়ে। করিও। যুদ্ধ করতে থাকি নিজের সাথে, হারতে থাকি নিজের কাছেই। ডিজাইন এবং প্রয়োজনের এই লড়াই থামে না।
আজ একটা বড় ভাইয়ের অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে বসে মনে হলো, এতো ঢেঁকি না, আস্ত রাইস মিল।
২২০০ স্কয়ার ফিটে চারটা ইউনিট - দুই বেড, দু'টা বাথরুম।
একবার চিন্তা করলাম বাথরুমটা একটু বড় করে তাতেই একটা বিছাান ফেলে দেবো কিনা।
তারপর কাজে বসে গেলাম। খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে একের পর এক মাপ দিতে থাকলাম CAD এ। বিছানা ৭' বাই ৩', তাহলে ৮' বাই ৫' এর ঘর হলে বেশ জায়গা ভালো হয়।
আধ ঘন্টা পর সেই বিরক্তিকর সেন্টিমেন্টটা ফেরত আসতে থাকে। আমার কাজের গতি কমতে থাকে। কাজ আগায় না, মাথার ভেতরে যুদ্ধের ডামাডোল বাজা শুরু হয়।
খুব ফালতু একটা সেন্টিমেন্ট, কিভাবে সম্ভব মানুষের এভাবে থাকা? যে মানুষটা চাচ্ছে বানাতে বাড়িটা, সে তো নিজেও থাকবে। কিভাবে মানুষ এরকম দাবি করতে পারে? কেন করে?
আমরা ডিজাইনার, আমাদের কাজ দেবে, করতে হবে।
কিন্তু মানুষের মাথায় এই পায়রার খোপে বসবাস করার বুদ্ধিটা কে ঢুকাইলো? কেন??
কেন মানুষ ভুলে যায় সে মানুষ, পায়রা না। এভাবে থাকাটা তার জন্য না।
আমি ভয়াবহ মন খারাপ নিয়ে বসে আছি, গত দেড় ঘন্টায় কিছুই হয়নি, যেখানে এতক্ষণে শেষ হয়ে আমার ঘুমায় পরা দরকার ছিলো। ৫"-৬" নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকি, যদি এই পায়রার খোপকে কিছুটা হলেও মানুষের বাসা বানাতে পারি।
খুব ক্লান্ত লাগে যখন মনে হয়, এই যুদ্ধটা আমার সারা জীবনের।
নিজেকে কেমন অসুস্থ লাগতে থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৯:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


