-------------------------------------
হাইকুপাঠকেরা জানেন হাইকু একখণ্ড আশ্চর্য স্বপ্নের মতো। এই স্বপ্নে সচারচর দু’টি ইমেজ। দু’টি আপাতসম্পর্কহীন ইমেজ। এই দু’টি ইমেজ হাইকু পাঠকের মনের অন্তর্বিন্দুর শূন্যতায় বিদ্যুচ্চমকে মিশে যায় আর অনবদ্য একটা সর্বরূপময় অনুভূতি তৈরি করে। অতিসাধারণ দু’টি ইমেজের মিথস্ক্রিয়ায় আকস্মিক, জগতাতীত একটা রূপের সৃষ্টি হয়। সেটি ঘটে যেন সাধারণ বাস্তব কালে নয়, বরঞ্চ বলা যায় কাল্পনিক কালে, যুক্তিশীল উত্তেজনাপ্রবণ মনের বাইরে একটা নিঃশব্দ ইপিফ্যানির মতো, অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।
সবসময়েই যে এরকমটিই ঘটে তা নয়, বিভিন্ন কবিতে তার চারিত্র পাল্টে পাল্টে যায়, তবে দু’টি কমবেশি-দূরবর্তী ইমেজের পাশাপাশি অবস্থান হলো হাইকুর মূলগত গঠন।
হাইকুবিশ্ব উপমা রূপকের বিশ্ব নয়; কিংবা উল্টোভাবে বলা যায় হাইকুবিশ্বে জগতসমগ্রই হলো রূপক। অতিসাধারণ, খুঁটিনাটি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, আণুবীক্ষণিক দৃশ্যমানতা হাইকুতে সংক্ষিপ্ত, অনন্যসাধারণ সরলতায় বর্ণিত হয়।
হাইকু চিন্তাপ্রসূত নয়, বরং তাৎক্ষণিক, মুহূর্তনির্ভর, প্রবুদ্ধ দশার ফল। এবং অবশ্যই তা শুধু শব্দ। শব্দ এবং শব্দাবলী ছাড়া এই বিশ্বের আর কোনো অস্তিত্ব নেই, হাইকুভুবনে তা স্পষ্ট হতে থাকে।
হাইকু হলো কবিতার আত্মা।
.. .. .. .. ..
মাৎসুয়ো বাশো (১৬৪৪─৯৪) জাপানের কবি। জাপানের এডো যুগের (১৬০৩─১৮৬৮) সবথেকে বিখ্যাত কবি বাশো।
বাশো’র বাবা ছিলেন একজন নিম্নপদস্থ সামুরাই। বাশো’র জীবন চালিত হয় ভিন্ন পরিক্রমায়। দারিদ্র আর সঙ্কটের ভেতর দিয়েও ধীরে ধীরে বাশো’র জীবন হয়ে ওঠে একটি অনবদ্য কবিতা।
আজ বাশো’র নাম এবং তাঁর জীবন ‘হাইকু’ শব্দটার সমার্থক হয়ে গেছে। শুধু জাপানী সাহিত্যে নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্যে বাশো’র প্রভাব ব্যাপক।
জীবনের শেষ দশ বছরে বাশো একাধিক দীর্ঘ পরিব্রাজন সম্পন্ন করেন। আজকের আধুনিক জাপানের তুলনায় মধ্যযুগের জাপান তুলনা করা মুশকিল। পরিব্রাজন ছিলো তখন গভীর বিপৎসঙ্কুল। বাশোকে একজন আমৃত্যু পরিব্রাজক বলা যায়। ‘দ্যা ন্যারো রোড থ্রু দ্যা ডিপ নর্থ’ ট্রাভেলগটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে ধরা হয়।
বাশো’র কবিতা অপরূপ সহজতায় বিশিষ্ট। ঋতু, পাহাড়, সাগর, উপত্যকা, কীট আর পতঙ্গ, মর্নিং-গ্লোরি, চেরি, মন্দির, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, অশ্ব, হিম, বর্ষণ, তুষারপাত বাশো’র কবিতায় জাগিয়ে তোলে এক অন্য পৃথিবী─, চাঁদ আর একাকীত্বে সেই পৃথিবী নির্জন।
বাশো’র কবিতায় যে ইমেজগুলি স্ফুট থাকে সেগুলো খুব বেশি পরস্পর-দূরান্বয়ী নয়। তাতে এই কবিতাগুলো হয়ে ওঠে আরো স্পন্দিত এবং অন্তর্গতরূপে গতিময়।
......
মাৎসুয়ো বাশো’র হাইকু:
........
১.
শীতের বরষা
ঝরে গোয়ালের ’পরে;
ডাকে একটি মোরগ।
২.
আছি এক সরাইখানায়
বারনারীরাও ঘুমুচ্ছে যেইখানে─
শুঁটিঝোপ আর চাঁদ।
৩.
তেরছা চাঁদের আলো
বাঁশঝাড়ে;
ডাকে একটি কোকিল।
৪.
বয় শরতের হাওয়া:
তবুও সবুজ
বাদামের খোসাগুলি।
৫.
শীতের প্রথম ধারা─
বানরও চায় যেন
একখানা রেনকোট।
৬.
বসন্ত:
নামহীন পাহাড় এক
ভোরের কুয়াশায় অবগুণ্ঠিত।
৭.
কতই না ভালো!
দেখে-যাওয়া এই বিদ্যুৎ আর
ক্ষণস্থায়ী জীবনকে না ভাবা।
৮.
মধ্যমাঠ,
অনুরতি নেই কিছুতে,
ভরতপাখিরা গায় গান।
৯.
বসন্তবৃষ্টি
ছাদ থেকে পড়ে চুইয়ে
বোলতার বাসা থেকে ফোঁটা ফোঁটা।
১০.
নিস্তব্ধতা─
সিকাডার তীব্র নিনাদ
কুরে কুরে ঢোকে প্রস্তরে।
[সিকাডা: উষ্ণ অঞ্চলের লাফিয়ে-চলা বড় পতঙ্গবিশেষ।
মাথার দুই দিকে এর বৃহৎ দু’টি চোখ। সিকাডা শিরা-উপশিরাময়
স্বচ্ছ ডানাযুক্ত। পুরুষ সিকাডা একরকম একটানা উচ্চস্বর নিনাদ
সৃষ্টি করে। খোসা পরিত্যাগ করা সিকাডার একটি বৈশিষ্ট্য।
জাপানী হাইকুতে এই পতঙ্গটি ঘুরে-ফিরে আসে।]
১১.
প্রথম তুষার
ঝরে
আধা-নির্মিত সেতুর ওপর।
১২.
মর্নিং-গ্লোরি-ও
দেখা গেল
বন্ধু নয় সে আমার।
[মর্নিং-গ্লোরি: নরম নীলাভবেগুনি ফুল। একরকম বাগানলতা।
ফুল অন্যান্য রঙেরও হয়। বহু প্রজাতির দেখা যায়। এই লতার
অপরূপ ফুল ফোটে সকালে আর দুপুরের আগেই বুজে আসে।
ছায়াকুঞ্জ তৈরিতে ঘনসবুজ পাতার মর্নিং-গ্লোরি অনবদ্য।
জাপানে এই ফুল বহুল আদৃত।]
১৩.
মাছওলার হাঁক
মিশে যায়
কোকিলের চিৎকারে।
১৪.
এই পুরাতন গ্রাম─
পার্সিমনবৃক্ষ-ছাড়া
নেই বাড়ি একটিও।
[পার্সিমন: দীর্ঘজীবী প্রাচ্যদেশীয় বৃক্ষ। বৃক্ষ পনেরো থেকে ষাট ফুট
পর্যন্ত উঁচু হয়। গাব পরিবারের এ ফল জাপানে অতি আদৃত, ফল
মিষ্টি, লাল, হলুদ, কমলা রঙের হয়।]
১৫.
সাগর আঁধার হয়ে আসে;
বুনো হাঁসেদের স্বর
ক্ষীণ শাদা।
১৬.
শীতের উদ্যান,
চাঁদ সরু এক সুতা,
পতঙ্গরা গায় গান।
১৭.
গোধূলির বরিষণে
এই উজ্জ্বলরঙ জবা...
এক মায়াময় সূর্যাস্ত।
১৮.
ক্ষোদিত দেবতারা গেছে বহুকাল...
ঝরা পাতাগুলি জড় হয়
মন্দির দেওড়িতে।
১৯.
মাঝে মাঝে আসে মেঘ,
চাঁদ-দ্যাখা থেকে
মেলে অবসর।
২০.
কেউ নেই এই পথে
শুধু আমি,
হেমন্ত গোধূলি এই।
২১.
মৌমাছি এক
টলমল এলো বেরিয়ে
পিয়নিবৃক্ষ থেকে।
[পিয়নি: চীনা ফুল। গুল্মজাতীয় গাছ। পিয়নি বৃক্ষও রয়েছে।
এডো যুগে জাপানে পিয়নি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সুবাসিত এই
ফুল লাল, শাদা বা হলুদ হতে পারে।]
২২.
প্রাচীন শহর নিস্তব্ধ...
ভাসে পুষ্পের সৌগন্ধ...
আর গোধূলির ঘণ্টা।
২৩.
মঞ্জরিত শাদা চেরির ওপরে
কুয়াশার শাদা মেঘ...
প্রভাতোজ্জ্বল পর্বত।
২৪.
জেগে আছি রাতে;
ক্ষীণ লণ্ঠন,
জমে আসে তৈল।
২৫.
জাগো! আকাশ হলো আলো!
চলো যাই পথে বেরোই আবার...
সাথী প্রজাপতি!
.. .. .. ..
[Robert Hass, Jane Reichhold ও অন্যান্যদের ইংরেজি অনুবাদ থেকে
বাংলা রূপান্তর: নান্নু মাহবুব।]
.. .. .. ..
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১০ ভোর ৪:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


