লুঙ্গির গীট আর শ্লীলতা বনাম অশ্লীলতা
১১ ই জুন, ২০০৬ ভোর ৬:১৬
শংকরের একটা ছোট উপন্যাস পড়েছিলাম অনেক আগে। বৃটিশ এক মহিলা কয়েকমাসের জন্যে কোলকাতা এসেছিলেন কোন এক বিষয়ের উপর গবেষনা করার উদ্দেশ্যে। কোলকাতায় মহিলাকে দেখাশোনার দ্বায়িত্ব ছিল শংকরের হাতে। কিন্তু ভদ্রমহিলা একসপ্তাহের মাঝেই কাউকে কিছু না বলেই ফিরে যান লন্ডনে। শংকর ভীষন অবাক হয়েছিলেন এতে। নিজে কোন ভুল করলেন কি না, তা ও তলিয়ে দেখছিলেন বারবার। কিন্তু নিজে থেকে কোন কারনই খুঁজে বের করতে পারেননি। কিন্তু ঘটনাটি ভুলতেও পারেননি।
কয়েক বছর পর শংকরের নিজেরই বিলেত যাবার সুযোগ হয়। ওখানে তিনি অনেক খুঁজে সেই মহিলার হদিস পান। তার কাছে জানতে চান, কেনো ওনি এমনি অকস্মাত দেশে ফিরে এলেন। শুনেই খুব লজ্জায় পড়ে যান মহিলা। ' না না, এ ভারী লজ্জার কথা, তোমাকে বলতে পারবো না'। কিন্তু শংকর নাছোড়বান্দা, তাই জিজ্ঞেস করেন, 'আমি কি কোন ভুল করেছিলাম'? ' না না, তুমি তো আমাকে একসপ্তাহ খুব ভালো দেখাশোনা করেছো'। 'তাহলে কোলকাতার নোংরা অগুনতি মানুষের ভীড়ে আপনার থাকা সম্ভব হয়নি '? ' তা হবে কেন ? আমিতো সব জেনেশুনেই ওখানে গিয়েছিলাম'। এমনি অনেক প্রশ্ন ও অনুরোধের পর একসময় সত্যি উত্তর দিলেন মহিলা। কয়েকবার ইতস্ততঃ করে অবশেষে লজ্জায় লাল হয়ে বললেন, ' আমাদের দেশে ছেলেমেয়েরা ভালবাসায় পড়লে হাতে হাত ধরে হাঁটে, আর তোমাদের দেশে দেখছি পুরুষে পুরুষে প্রকাশ্যে হাত ধরাধরি করে চলে। আমার খুব লজ্জা লেগেছে এ দৃশ্য দেখতে, তাই চলে এসেছি কোলকাতা ছেড়ে'।
অর্থাৎ একেক দেশে একেক আচার। এক জায়গাতে যা স্বাভাবিক অন্য জায়গাতে তা শ্লীলতার বাইরে। যারা কুপমুন্ডক, তারা তা বুঝতে চান না। চাইলেও বুদ্ধিবৃত্তিতে কুলোতে পারেন না। না পেরে বুদ্ধির অভাবে নিজের চারপাশটাই নোংরা ও কদর্য করে ফেলেন। সে কদর্য চোখে বাকী পৃথিবীটাও দেখতে থাকেন। তারা নিজের বাড়ীতে ভর্তা পোড়া খেয়ে অন্যের বাড়ী পোলাও কোর্মা খেয়েও বলবেন, 'তোমার বাড়ীর ভর্তা পোড়া খেতে অখাদ্য হয়েছে'। ভালো মন্দে তফাৎ করতে জানেন না তারা। এই মহিলাও হয়তো তেমনই কুপমুন্ডক ছিলেন। নইলে একটু সময় নিতেন। অন্য একটি দেশকে, পরিবেশকে বুঝতে সময় নিতেন। তারপর পৌছুতেন তার সিদ্ধান্তের দোরগোড়ায়।
শ্লীলতা, অশ্লীলতা তেমনি একটা বিষয়। সময়, দেশ, পরিবেশের উপর নির্ভর করে আপেক্ষিক । ভালো লাগা মন্দ লাগা প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু যখন ব্যখ্যার প্রশ্ন আসে, তখন তা আর নিজস্ব থাকে না। কিন্তু কুপমুন্ডকরা তা মানেন না। তারা তাদের নিজস্ব পছন্দকেই ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানোর প্রয়াসে ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পড়েন। তারা অজপাড়াগায়ের প্রান্তে বসে সারা পৃথিবী দেখে ফেলেন। তারপর যে ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসে তাতে তাদের চিন্তার কদর্য্যতার প্রকাশ আরো বেশী নগ্ন হয়ে ওঠে। অনেক সময় পর্নোগ্রাফীও পেরিয়ে যায়।
আমার নিজস্ব বক্তব্য বলছি। শিল্প, সাহিত্য, চলচিত্রে যদি কাহিনীর প্রয়োজনে নগ্নতা আসে, সেক্স আসে, আমি তাকে অশ্লীল আখ্যা দিতে যাব না। আমার কাছে যা কিছু দেখতে সুন্দর, আমার আত্মার অনুভুতিতে সুন্দর, তার সবই গ্রহনযোগ্য। যদি তা না হতো, তাহলে পৃথিবীর বড় বড় শিল্পকে অস্বীকার করতে হতো। পিকাসো, গগা ও বা গুস্তাভ কিম্ট এর ছবির সামনে চোখে কাপড় বেধে দাঁড়াতে হতো। আমি তা করতে রাজী নই। যারা করবেন তাদেরকে বাঁধা দিতেও যাবোনা। কিন্তু যারা শ্লীলতা অশ্লীতার সংজ্ঞা দাড় করিয়ে আমাকে বাঁধা দিতে আসবেন, তাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হতেও দ্বিধা করবো না।
আমাদের সমাজ একটি দ্বিখন্ডিত সমাজ। ভাববেন না তসলিমা নাসরিনকে কোট করছি। এই মহিলার অনেক বক্তব্যের প্রতিই আমার সমর্থন নেই। আমাদের পাড়ায় একবার এক লোককে এক যৌনকর্মী সহ ধরা হয়েছিল। মেয়েটিকে পিটিয়ে পাড়া থেকে বের করা হয়েছিল। সারা পাড়াতে সাড়া পরে গিয়েছিল। পরদিন সকালে দেখি এই লোককেই সবাই সালাম দিচ্ছে। মাছওয়ালা থেকে শুরু করে শিক্ষক কেউই লোকটিকে সালাম সালাম বলতে দ্বিধা করেনি। আমাদের মন্ত্রীদের, রাজনীতিবীদদের, আমলাদের চোর জেনেও আমরা তাদেরকে সালাম জানাতে দ্বিধা করিনা। এসব আমার কাছে বরং অনেক বেশী অশ্লীল মনে হয়, এমনকি বেশ্যাপাড়ায় যাওয়ার চেয়ে আরো বেশী অশ্লীল। আমাদের সমাজ এত বেশী অশ্লীল যে, একজন দশ বারো বছরের বালিকাকে পর্যন্ত বোরখা পড়ে স্কুলে যেতে বাধ্য হয়। কাছা খুলে পাড়ায় পাড়ায় মস্তানী যুদ্ধকে আমার কাছে অশ্লীল মনে হয়। মসজিদের মোল্লারা যখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে নিজেদের গুপ্তাঙ্গে আরামের হাত বুলিয়ে বুলিয়ে ফতোয়ায় কোন কোমলমনা যুবতীর সারা জীবনের সপ্নকে ধ্বংস করেন, তাদেরকে আমার কাছে অশ্লীল মনে হয়। অশ্লীলতার ছড়াছড়ি আমাদের সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেসব নিয়ে নিয়ে ভাবতে গেলে তো নিজের দিকেই আঙ্গুল তুলতে হয়। আমরা তা করবো কেন ? কুয়োতে ডুব দিয়ে অন্যের দিকে আঙ্গুল তোলাই সবচেয়ে সহজ পথ। তবে গিটটি খুলে লুঙ্গী যে মাটিকে গড়াচ্ছে, সেদিকে একটিবারও নজর দেয়া দরকার।
ছবিটি আমার প্রিয় অষ্ট্রিয়ান চিত্রকর গুস্তাভ কিমট এর অাঁকা। অশ্লীল মনে হচ্ছে কি ?
প্রকাশ করা হয়েছে: দেশ, দেশাচার, মানুষ, সময় বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
অতিথি বলেছেন:
নারী পুরুষ দুই পক্ষেরই শ্লীলতা অশ্লীলতা, শোভনতা, অশোভনতা আছে, সমাজ মানতে না চাইলে সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে হবে, এই 'দ্্বিখন্ডিত' সমাজকে ঠিক করতে আবার উলটা ট্রিটমেন্ট করলে হবে না। মানে বিদ্রোহ করে নারীরও অশোভন রাস্তা ধরা... তসলিমার কোন বইয়ে যেন পুরুষের রাস্তার পাশে টয়লেট করার অধিকার নিয়ে চিল্লাচিলি্ল করছিলেন, নারী পেট ফেটে মরে গেলেও তা করতে পারেন না, অথচ পুরুষ পারে এ কেমনতর কথা, নারী অধিকারের অভাব হ্যান ত্যান। আমার কাছে সেটা মোটেও অধিকার মনে হয় নি, জঘন্য একটা এবিউজ মনে হয়, বিকৃত মানসিকতা মনে হয়। পুরুষদের এই অভ্যাস দূর করতে হবে গণ সচেতনতা আন্দোলন করে। আমার মা একবার এক পুলিশকে আমাদের বাসার রাস্তার পাশে টয়লেট করতে দেখে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, ভদ্রলোকের কাজ শেষ হওয়ার পরে বিশাল লেকচার ঝাড়ছে। বেচারা খুব লজ্জা পাইছে। মনে হয় আর কখনও ওমন কাজ করবে না।
অতিথি বলেছেন:
সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও পুরুষদের হিপোক্রিটিক্যাল স্ট্যানস দূর করতে সুরুচীসম্পন্ন পুরুষ আর নারীদের এগিয়ে আসতে হবে, নারীকেও সেই অশোভনতার রাস্তা ধরার আহবান জানানো বিচ্ছিরি।
অতিথি বলেছেন:
আসলেই তাই শো ম চৌ। শিমুর মতো সারল্য নিয়ে চারপাশে তাকানো দরকার। চোখ মেলে দেখা দরকার, কোথায় আছি আর কতটুকু দৃষ্টি যায়। নিজের ভেতরে বিস্ময় দরকার। বিস্ময় দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। জানার পিপাসাকে বাড়িয়ে তোলে।
আমরা তা করি না। নিজের অর্ধ বিদ্যার গোলকধাধাতেই ঘুরপাক খেতে থাকি।
ধন্যবাদ সবাইকে ......।
সাদাত শাহরিয়ার বলেছেন:
ভালই লিখছেন। দশে পাচ দিলাম! পাশ মার্ক!
অতিথি বলেছেন:
চমৎকার লেখা। পাঠ না করে মন্তব্য করা যে আমাদের অধিকাংশের অভ্যাস তা একেবারেই সত্যি। আবার অনেক তীক্ষণ পাঠকও রয়েছেন। তবে আমার কাছে সবচেয়ে জরুরী বলে মনে হয় আত্ম-বিশ্লেষণ ও জানার চেষ্টা করা। কিন্তু এই জানার চেষ্টাতেই যদি বাধা দেয়া হয় তবে সেটি প্রমাণ করে মৌলিক সীমাবদ্ধতাকে। না-জানা কোন সমস্যা নয় কিন্তু না-জানাকে চিহ্নিত করতে না পারা খুবই সমস্যাজনক। আপনাকে ধন্যবাদ।
রাতমজুর বলেছেন:
৫+
মেঘ_কম বলেছেন:
+
মাসুদ আনিস রহমান বলেছেন:
ভালো লাগলো।
রিফাত হোসেন বলেছেন:
গুস্তাভকে ভাল পাই +
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
















তীরন্দাজ, অনেকদিন পর একটা ভালো লেখা পড়লাম। ধন্যবাদ।
যারা ব্লগে এসে দু-একটা পোস্ট পড়ে শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে ইন্টারনেট মাথায় তুলেন তাদের অর্বাচীনতা নিয়ে কি বলবো? শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিযে একটা প্রবন্ধও এরা পড়েছে বলে মনে হয়না।
বেসিক বা মূল তথ্য ও চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে যদি কোনো ধারণা না থাকে তবে এদের কি বুঝাবেন? বাংলাদেশে পাবলিক লাইব্রেরিতেও এখন পত্রিকা পড়া ছাড়া অন্য কারণে খুব কম মানুষ ঢোকে।
পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। জাতিকে বাঁচাতে হলে এটি প্রয়োজনীয়। আর সবাই সবকিছু বুঝে এই হামবড়া ভাবটা আমাদের জাতির বড় দোষ। ডাক্তারের চেয়ে ডাক্তারি বেশি বুঝে, কাঠমিস্ত্রির চেয়ে কাঠের সম্পর্কে বেশি জানে, ক্রিকেটারদের চেয়ে বেশি ক্রিকেট বুঝে..এই অলীক গোয়ার্তুমিতে ভুগে সিংহভাগ মানুষ।
আমি এটা জানিনা, শিখতে চাই; শিশুসুলভ এই সরলতা ছাড়া যে সত্যিকার এলেমদার হওয়া যায় না তা অনেকেই জানে না। আর কারো মাঝে এই অজ্ঞানতা স্বীকারের সরলতাও দেখিনা।