সোহেলও শুয়ে পড়েছিল পাশের ঘরে। দরজায় টোকা দিয়ে ওকে ডেকে তুলতে আনলাম । ঘুম জড়ানো কন্ঠে ও সংক্ষেপে বালু আখন্দের কাহিনী জানালো । প্রতি পূর্ণিমা রাতেই তার এ ধরণের চীৎকারের রোগ। গ্রামের সবারই নাকি গা’সওয়া হয়ে গেছে।
- মাসের বাকী সময়ে সে কি সুস্থ থাকে ?
- হ্যা। আমাদের ক্ষেতেই তো কাজ করে বালু। কাজেকর্মে খুবই ভাল। শুধু একটু চুপচাপ, দরকার ছাড়া মুখ খোলেনা সাধারনত:। কিন্তু চলাফেরায় পাগলামো আছে বলে একেবারেই মনে হয়না। অথচ প্রতি পূর্ণিমের রাতে পুরোপুরি উন্মাদ!
- কোন আত্মীয়-স্বজন নেই ওর?
- চারকুলে কেউ আছে কি না জানিনা। জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছে। মায়ের হাতেই বড় হয়েছে বারো তেরো বছর বয়েস অবধি। তারপর তার মা মারা যায়। পাশের গ্রামে নাকি এক মামা আছেন তার, বালু মাঝে মাঝে সেখানে যায় বলে শুনেছি।
পূর্ণিমার আলোয় যেনো ঝলসে আছে চারপাশ। তারপরেও গাছপালা ও ঘরের ছায়াগুলো থেকে একটা ছমছমে ভয় ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের আশেপাশে। গা শিউরে উঠলো। বালু আখন্দের চীৎকার শোনা গেলো আবার। আর সে চীৎকারের সাথে জোৎস্নাও যেনো কেঁপে উঠলো শঙ্কায়। শিহাব যে কখন পাশে এসে দাঁড়ালো, টেরই পেলাম না।
- কি রে, ঘুমোবি না আজ ?
- ঘুম আসছে না রে। চীৎকার শুনতে পাস নি? ভয়ংকর! সোহেলকেও ঘুমোতে দিলাম না।
- আমিও পারছি না চোখ বন্ধ করতে। আওয়াজটা যেন এসে বিঁধছে মগজে। তোদের কথা শুনে তাই বেরিয়ে এলাম।
নিজের মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল শিহাব। গ্রামের পাশের ক্ষেতে কয়েকটা শেয়াল আওয়াজ তুললো হুয়াক্কাহুয়া শব্দে । সে আওয়াজ শুনে গ্রামের কুকুরগুলো ডেকে উঠলো এক সাথে আমাদের চারপাশের নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেঙ্গে । আর সে চীৎকারের সাথে বালু আখন্দের চীৎকার মিলে মিশে একাকার হয়ে লম্বা প্রতিধ্বনি হয়ে রইল। আমাদের বুকের ভেতরে ভয়ের শিহরণও মিশে রইল সে প্রতিধ্বণির সাথে।
- ও কি একা একাই থাকে? বিয়ে’থা করেনি ?
- করেছে। দু’বার। কিন্তু প্রথম বউ ভয় পেয়ে ছেড়ে গিয়েছে ওকে। তারপর গ্রামের মুরব্বীরা ধরে আবার বিয়ে দিয়েছে।
- দ্বিতীয় বউ আছে এখনও?
- আছে। বালু প্রতিমাসে পুর্ণিমার রাতে আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়। মেয়েটি খুব ভাল। আমাদের বাড়ীতেই কাজ করে। এখন মায়ের ঘরে শুয়ে আছে মেঝেতে।
উঠোনের উল্টোদিকের ঘরটির দিকে আঙ্গুল তুললো সোহেল। আমরা সেদিকে তাকালাম। জানালার ফাঁক দিকে মৃদু আলোর রেখা দেখতে পেলাম। বোঝা গেল, সেখানেও ঘুম এখন অবধি বাসা বাঁধতে পারে নি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো জোছনার আলোয় সে ঘরের ছায়ার শরীর বেয়ে বেয়ে।
- মারধর করে বউকে? প্রশ্ন করলাম আমি।
- একেবারেই না। । এক অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি করে। কেউ সামলাতে পারে না। মুখে ফেনা জমে যায়। এ দৃশ্য দেখাটাই ভয়ের!
- এমনি করে সারারাত চীৎকার করবে ও ?
- না। চাঁদটা ডুবে গেলেই চুপ হয়ে যাবে আবার।
কিছুটা সময় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকলাম আমরা তিনজন। কি কষ্ট নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে মানুষ তার প্রতিদিনের জীবনকে আগলে ধরে রাখে! সময়ের বুকে সাঁতরে এগিয়ে যায় সামনে। সারা মাসের জমিয়ে রাখা যে যন্ত্রণা বালু আখন্দের, তা একটি দিনে কোন এক প্রাকৃতিক বা মানসিক আকুলতার প্রভাবে আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে আসে। হয়তো এটা তার বাঁচারই আর্তনাদ, নয়তো বুক ফেটে মরেই যেতো সে।
কিছুক্ষন বালুকে নিয়েই কথা বলে বিছানায় গেলাম আমরা আবার। মইনের নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বালু আখন্দের কোন আর্তনাদ ও শুনেছে বলে মনে হলোনা। আমার আর ঘুম এলোনা। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতেই কেটে গেল রাত। মোরগের ডাক ও পাখির কিচির মিচির শুরু হবার আগেই তাত বোনার ঠকর ঠকর আওয়াজ শুরু হয়ে গেল। ক’বার ছন্দময় আওয়াজের পর সামান্য সুতো বদলের বিরতি। তারপর আবার সে ছন্দ অন্য ছকে, আবার বিরতি। তার একটু পরেই আজানের আওয়াজ শোনা গেল। এর মাঝে মিলিয়ে গেল বালু আখন্দের আর্তনাদের রেশটুকু। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে সোহেলের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাংলো। পাশের বিছানায় অকাতরে ঘুমাচ্ছিল মইন। সে ও উঠে গেলো সাথে সাথে। সোহেলের গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে এসে এমনি এক রহস্যের মুখোমুখি হবো, ভাবতে পারিনি। বসার ঘরের টেবিলে সকালের নাস্তা নিয়ে এল বালু আখন্দের বউ। আধহাত লম্বা ঘোমটার আড়ালে চেহারা গেল নি, কিন্তু নড়াচাড়ার ধাঁচ দেখে নিতান্তই অল্পবয়েসী বলে মনে হলো। নাস্তা খেতে খতে মইনকে খুলে বললাম সব। এ শুনেই লাফিয়ে উঠলো।
- চল, আজই বালুর মামার ওখানে যাই।
ঘুমের সময়টা ছাড়া বাকী সময়গুলোতে নানা বিষয়ে মইনের আগ্রহের কমতি নেই। ঘুমের সময় এলেই সে যেন অন্য গ্রহের জীব হয়ে যায়।
- কিন্তু শুনেছি অনেক বয়েস এই লোকের। অনেকদিন ধরে নাকি অসুস্থ। কথা বলতে পারবেন কিনা, সেটাই সন্দেহ!
- কথা না হলে ফিরে আসবো। আমরা তো এখানে ঘুরে রেড়াতেই এসেছি।
- কিন্তু দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে হবে। নইলে মনখারাপ করবে মা।
এরই মাঝে দুপরে বালু আখন্দের সাথে দেথা হয়ে গেলো আমাদের। সোহেলদের বাড়ীতে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ ছিলো। বালু এসেছে সেখানে কামলার কাজ নিয়ে গ্রামের আরো অনেকের সাথে। সোহেল দুর থেকে দেখিয়ে দিল আমাদের। সাধারন চেহারার তিরিশ-বত্রিশ বছরের জোয়ান। কাজে ফাঁকে অন্যদের সাথে দুপুরের ভাত খেতে এসেছিলো। চোখ ফোলা ফোলা, চেহারায় রাত জাগার ক্লান্তি। কপালের একটা অংশে আচড়ের দাগ দেখা গেল। আমাদের সামনে পড়ায় সমীহের সাথে পাশ কাটিয়ে গেল। কোন কথা বললো না।
দুপুরের ভুড়িভোজন শেষে সমান্য বিশ্রাম নিতেও ইচ্ছে করলো না। মন পড়ে রয়েছে পাশের গ্রাম কালন্দীতে। খাওয়া সেরেই চারজন মিলে পাশের গ্রামের দিকে রওয়ানা হলাম। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম বিকেল তিনটার কাছাকাছি এসে থেমেছে কাটা।
ছোট গ্রাম কালন্দী। মনে হল, গরীব লোকেরই বাস। গ্রামের অনেকটা ভেতরে বালু আখন্দের মামার কুড়েঘর। শহুরে লোক আমরা, তাই উৎসাহীর অভাব হলোনা। তারাই দেখিয়ে দিল ও নিজেরাও সেই ঘরের সামনে এসে আমাদের সাথে ভীড় করল।
খক্ খক্ কাশির আওয়াজ শোনা গেল কুড়েঘরের ভেতরে। কিন্তু আমরা ডাক দেবার পরও সে ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে এলো না। একটু ইতস্তত; করে আমরা নিজেরাই ঢুকলাম ভেতরে। দেখলাম একজন শীর্নকায় লোক তেলচিটচিটে কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে ঘরের কোনার একটি চৌকিতে। চৌকির কাছে মাটিতে একটি ময়লা এনামেলের বাসন ও তার পাশে একটি পানিভর্তি টিনের মগ। বোঝা গেল, বেশ বয়েসী বালু আখন্দের মামা,। অসুস্থ, তাই অন্যের সাহায্যের উপর ভরসা করেই বেঁচে থাকা তার। আমাদের দেখে অনেক কষ্টে পাশ ফিরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। শহুরে পোষাকে আমাদেরকে দেখে একটু সমীহের ভাব ফুটে উঠলো তার চেহারায়। সোহেল পাশাপাশির গ্রামের ছেলে, তাই তাকেই এগিয়ে দিলাম সামনে।
- আমরা পাশের গ্রাম রতনদিয়া থেকে এসেছি।
রতদিয়ার নাম শুনেই চমকে উঠলেন বৃদ্ধ। তার চোখ মুখ উজ্জল হয়ে উঠলেও উৎকন্ঠার মেঘ এনে নিভিয়ে দিল সে ঔজ্জল্য।
- কাউলকা ত পূর্ণিমা আছিল। বালুর ত অসুখের রাইত। খারাপ কিছু অইছে?
বলেই উঠে বসার চেষ্টা করলেন। মইন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে বসতে সাহায্য করলো। এর মাঝে উত্তর দিল সোহেল,
- না বালু ভাল আছে। ও তো আমাদের বাড়ীতেই কাজ করে, আজও কাজ করছে।
- বেশী পাগলামী করছে পোলাডা? আমি বুড়া মানুষ! কি করি কন্ ?
- না না, বেশী আর কি। প্রতিবারের মতোই..।
- তাইলে? আপনেরা আইছেন ক্যান্? কি অইছে?
বলেই প্রশ্নবিদ্ধ চোখে আমাদের দিকে তাকালেন বৃদ্ধ। তার চেহারার উৎকন্ঠা আরো বেশী বেড়ে উঠলো তাতে। কাশি শুরু হলো আবার। তার দমকে কেঁপে উঠলো শীর্ণ শরীর। মইন পানির মগটা এগিয়ে দিল। সে পানি খেয়ে কিছুটা শান্ত হলেন বৃদ্ধ। এবার এগিয়ে গেলাম আমি।
- আমার বালু অসুস্থতা সম্পর্কে কিছুটা জানতে এসেছি। ও এমন করে চীৎকার কেন করে, বলতে পারবেন?
- হেইডা কেমনে কমু বাবারা? আমরা মুখ্যু সুখ্যু গরীব মানুষ! আমাগ তো রোগ বালাই থাকবই।
- ওর মা তো আপনার বোন হতেন, তাইনা?
- হ আমার বইন, বড় আদরের বইন। বিয়ার পরই বালুরে পেডে রাইখ্যা জামাইডা মইরা গেল। বইনের কইলাম, চইলা আয় আমার এহানে। আইল না, জামাইএর ভিটামাটি কামড়াইয়া পইরা রইল। ভিটামাটি থাকলেও খাওন ত লাগব! সারারাইত পরের বাড়ীতে ধান বানতো।
- বালুকে দেখাশোনা করতো কে?
- গরীবের আবার দেখাশোনা কি। মা’য় ধান বানতো আর পোলা মাটিত শুইয়া শুইয়া চান্দের দিকে চাইয়া খেলত। একবারও কানতে শুনি নাই। চান্দের থাইক্কা বড় বড় চউখ কইরা চান্দের দিকে চাইয়ি খিল খিল কইরা হাসতো। হাসি শুইন্না মায়েও ডরাইত, রক্ত হিম আইয়া যাইত। কত কবিরাজ দেহাইল, তাবিজ দিল, পানিপড়া দিল, কাম অইল না। মা মরল তার বার বছর বয়েসে। তারপর থাইক্কাই সবগুলান পুর্ণিমার রাইতে এই চিক্কাইর। এমুন ভালামানুষ পোলাডা হেইদিন পাগল অইয়া যায়। মোল্লাসাব কয়, হেরে নাকি চান্দের জ্বিনে ধরছে। কয়, আবার ছাড়াইতে পারে না! আমি গরীব বুড়া মানুষ, আমি কি করমু? আপনেগো গাওএর মাইনসে মিল্লা হেরে মাইরধরও করছেন। কিছু অইছে? এইডা অইল গরীবের ভাগ্যের লিখন সাহেবরা, ভাগ্যের লিখন! পোলাডা চিল্লাইতে চিল্লাইতে মরবো!
একসাথে এতগুলো কথা বলে এই বলে আরো বেশী কাশতে থাকলের বৃদ্ধ। আমরা তাকে সালাম জানিয়ে বিদায় নিলাম। গ্রামের ছেলে ছোকরার দলও ছুটলো আমাদের পিছু পিছু। গ্রামের সীমান্ত অবধি তারা আমাদের পিছ ছাড়লো না।
অনেক ভাবনা মাথায় এলো, কিন্তু চুপচাপ রইলাম সবাই । তেমন বেশী আলোচনা জমে উঠল না আমাদের মাঝে। বাবার আদর পায়নি বালু আখন্দ, মায়ের শরীরের উষ্ণতা পায়নি, এমনকি ক্ষুধার্ত মায়ের বুকে দুধও হয়তো ছিল না। একা একা চাঁদের সাথে খেলা করে সময় কাটিয়েছে, চাঁদের চোখে চোখ রেখে বড় হয়েছে। মইন বালুর এই অস্বাভাবিকত্বকে ‘চন্দ্রাসক্তি’ বলে আখ্যা দিল। আমরা সবাই তাতে সাগ্রহে সায় দিলাম। বালুর শৈশবের এ অভিশাপ জড়িয়ে আছে তার ভাগ্যের বাকী জীবনের জন্যে। এ ভার থেকে তাকে মুক্ত করার ক্ষমতা কার আছে? এর কোন চিকিৎসা আছে কি? ক্ষুধার কোন চিকৎসা আছে কি?
ফিরতে ফিরতে সন্ধ্য ঘন হয়ে এলো অনেকটা। কোন বাড়ীতের মাটির পিদিম জালানো হলেও তাতে যেন সন্ধ্যার অন্ধকার আরো বেশী ঘনিভুত হলো। সেহেলদের বাড়ীতে যাবার পথের পাশেই বালু আখন্দের খড়ের ছাউনী দেয়া ঘর। তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে গতরাতের কথা ভেবে কিছুটা শিউরে উঠলো শরীর। কিন্তু সে ঘরের ভেতর থেকে হঠাৎ শোনা গেল বালু আখন্দ ও তার বউএর আনন্দোজ্জল হাসি। তাতেই সে ভয়ের শিহরণ কেটে গেল সহসা।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০০৭ রাত ১০:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



