পৃথিবীর দুই প্রধান ধর্ম, মুসলিম ও খৃষ্টান ইহলোকীয় পৃথিবীকে ছাড়িয়ে পরলোকীয় সময়কে মুল্যবান করে তুলে ধরে। বাইবেলে পরিস্কার ভাবেই বলা হয়েছে, "খ্রীষ্টানরা হচ্ছে ঈশ্বরের সেই মানুষ, যারা স্বর্গের যাত্রী। স্বর্গ হচ্ছে ঈশ্বরের সেই সেই সুন্দর, মনোরম দেশ, যার তুলনায় পৃথিবী কঠিন এক মরুভুমি মাত্র।" "আমাদের এই বর্তমান শহর স্থায়ী কোন বাসস্থান নয়, আমরা সেই স্থায়ী বাসস্থানের খোঁজেই আছি"। "পরলোকীয় স্বর্গেই নিহিত আমাদের জাতিসত্বার অধিকার, আমাদের লক্ষ হচ্ছে সেই দেশ, যার শাসনকর্তা যীশু নিজেই"।
মুসলমানরাও স্বর্গে যেতে আগ্রহী। স্বর্গ তাদের চোখে এক অতি সুন্দর বাগানের মতো। সেখানে গাছের শীতল ছায়ার নীচে হুর পরীরা নানা ধরণের সুস্বাদু পানীয় ও খাবার নিয়ে স্বর্গবাসীদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। পাশাপশি তারা এক অনন্ত সময়ের জন্যে ভয়াবহ নককের কথাও জানেন। তারা জানেন, একদিন বিচারে বসবেন আল্লাহ। তাঁর দাড়ি পাল্লাতেই পাপ পুণ্যের হিসেব নিকেশে নির্ধারিত হবে, কোথায় তাদের স্থান, স্বর্গে না নরকে।
হয়তো এই দুই ধর্মের প্রবাক্তারই উদ্দেশ্য ছিল মানুষের পরলৌকিক জীবনকে সুন্দর করে সাজিয়ে মানুষকে ইহলৌকিক জীবনকে যথাসম্ভব পাপমুক্ত রাখা। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যকে অপব্যখ্যা করে ধর্মীয় অনুভুতি মানুষ মারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, তা হয়তো তাঁরা ঘুনাক্ষরেও ভাবেন নি। ভাবলে হয়তো তাদের পাপ পূন্য, স্বর্গ নরকের ছবিগুলো অন্য তুলিতেই আঁকতেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিষ্পেষন যতো বেশী বড় হয়ে উঠে, ততো বেশী জায়গা গেড়ে বসে ধর্মীয় অনুভুতি। তারপর সে অনুভুতি মৌলবাদী উন্মাদনায় পরিণত হতে সময় নেয় না। আশে পাশের ভিন্ন চিন্তার মানুষগুলোকে শত্রু মনে হয়। আর সে শত্রুর জীবনের ও নিজের জীবনের বিনিময়ে রক্তের পথ ধরে হলেও স্বর্গকে আরো বেশী কাছের মনে হয়। আর সে সুযোগটিই সাদরে গ্রহন করে ধর্মব্যবসায়ীর দল। তারা এসব হতাশ মানুষগুলোকে এক একটি মানব বোমায় পরিণত করে নিজেদের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে। সে সাথে জীবন হারায় আরো অনেক সাধারণ মানুষ। অনেক শিশু তাদের বাবা-মাকে হারায়। অনেক পরিবারের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। বাস্তব পৃথিবীটাকেই নরকে পরিনত করে তারা। পকিস্তানে গতকালকের বোমা বিস্ফোরণে বেনজির ভুট্টোর সাথে প্রান হারিয়েছেন আরো অনেক সাধারণ মানুষ। জানা যায়নি তার পেছনে প্রেসিডেন্ট মোশারফের হাত ছিল কি না। কিন্তু হত্যাকান্ডটি যে মুসলিম মৌলবাদীরাই ঘটিয়েছে, পাকিস্তানের গত কয়েক মাসের ঘটনারপন্জী বিশ্লেষন করলে তাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।
এ ধরণের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ভাবলে ভুল করা হবে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে বাধ্য। পাকিস্তানী মৌলবাদীদের এ সাফল্যে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা হালে পানি পাবে আবার। তারা আবার ঝাপিয়ে পড়বে মানব ও মানবতা বিরোধী ধ্বংসকান্ডে। আমাদের আজকালকার আধুনিক সমাজে মৌলবাদীদের নানা ধরণের চেহারা। তাদের একটি অংশকে তাদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে পরিস্কার চিহ্নিত করা যায়। আরেকটি অংশ সুশীল সমাজের সুশীল চেহারার খোলসে লুকিয়ে রাখে নিজেকে। তাদের চিহ্নিত করার একমাত্র উপায়, নিজের সাবধানতা ও সচেনতাকে সবসময় জাগ্রত রাখা। এই সচেতনতা ও সাবধানতার মাধ্যমেই এই সব মৌলবাদী ধর্মান্ধদের বিভিন্ন বক্তব্যের আড়ালে তাদের আসল স্বরূপ খুজে বের করা সম্ভব হতে পারে। প্রথম দলের মৌলবাদীদের ইন্ধন যুগিয়ে শক্তিশালী করে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এরাই। এদের ভয়াবহ চরিত্র তাদের ভদ্র চেহারার অন্তরালে লুকোনো । এরা কাব্য করবে, সুন্দর জীবনের সুন্দর সুন্দর কথা বলবে, প্রাকৃতিক নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের গান গাইবে, পাশাপাশি যেখানে দরকার, সেখানে মৌলবাদকে সমর্থন দিয়ে আসবে অবলীলায়। এরা এমন এক কল্পিত ধর্মশাসিত দেশের ছবি একে সবার সামনে তুলে ধরবে, যেখানে অন্যধর্মের কোন অমর্ষাদা থাকবে না। কিন্তু সেখানে অন্যধর্মকে অমর্যাদা করা হয়, নিস্পেষন করা হয়, সেখানে ঠিকই সমর্থন জানাবে। এরা শহরে, বন্দরে, চারিদিকে, এমনকি আমাদের ব্লগেও রয়েছে। এদেরকে যদি আমরা চিহ্নিত ও প্রতিহত করতে না পারি, তাহলে বাংলাদেশ যে একদিন পাকিস্তানের মতোই মৌলবাদ ও ধর্মান্ধের ঘাটি হয়ে উঠবে, এর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



